বিষাদের মতো অভিজ্ঞতা ॥ আলম শাইন



প্রথম উপন্যাস লিখি ১৯৮৯ সালে। তখন কলেজে পড়তাম। পাণ্ডুলিপি সেবা প্রকাশনীতে জমা দিলে, মাস দুয়েক পরে চিঠি আসে, ‘এটি ছাপানোর যোগ্য নয়’। চিঠিটা পড়ে খানিকটা দমে গেলাম। লেখা যে হচ্ছে না, তা স্পষ্ট হতেই লেখক হওয়ার চিন্তাভাবনা বাদ দিলাম। তারপর ইচ্ছে হয়েছে খবরের কাগজে কাজ করার। আমি তখনো অধ্যয়নরত। সুতরাং আমার জন্য সুবিধার হয় যে কোন পত্রিকার প্রতিনিধি হলে। এর আগে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় ফিচার লিখতাম। যাহোক, তখন (১৯৯২ সাল) ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ পত্রিকার জয়জয়কার। আমি নিউজ পাঠাতে থাকলাম। কয়েকটি নিউজ ছাপাও হয়েছে। সেসময় ভোরের কাগজের সম্পাদক ছিলেন মতিউর রহমান। আমি সরাসরি তার সঙ্গে দেখা করলাম জুয়েল হাউসে গিয়ে (সম্ভবত পল্টনে)। তিনি আমার আগ্রহ দেখে রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) উপজেলার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিলেন। সেই পত্রিকায় বছর খানেক কাজ করার পর ১৯৯৩ সালের দিকে ‘দৈনিক জাতীয় নিশান’ পত্রিকার বার্তা বিভাগে চাকরি নিলাম। অনিয়মিত বেতনাদির কারণে মাস ছয়েকের মধ্যে চাকরিটা ছেড়েও দিলাম। তারপর অন্য চাকরিতে সম্পৃক্ত হওয়ায় দীর্ঘদিন সংবাদপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারিনি।

১৯৯৭ সালে আবার লিখতে চেষ্টা করলাম। সেবা প্রকাশনীর রহস্য পত্রিকার জন্য দুই-তিন পাতার গল্প লিখে আমার গিন্নিকে দেখালাম। সে কিছু ভুলভাল ঠিকঠাক করে দিতেই লেখাটা সুখপাঠ্য মনে হলো। এবার সাহস করে লেখাটা ডাকযোগে পাঠিয়ে দিলাম রহস্য পত্রিকার ঠিকানায়। লেখা পাঠানোর পর কয়েক মাস কেটে গেল। একদিন অফিসে এলে আমার এক সহকর্মী একটা চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ইনভেলাপ ছিঁড়ে চিঠিটা বের করে পড়ে আমি তাজ্জব। চিঠিটা সেবা প্রকাশনী থেকে এসেছে। পড়ে জানলাম, কয়েকমাস আগেই আমার লেখাটা ছাপা হয়েছে রহস্য পত্রিকায়, সেই লেখার সম্মানীবাবদ ১৫০ টাকা সেবার অফিস থেকে নেওয়ার অনুরোধ। তারপর রহস্য পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছি। পরবর্তীকালে ২০০০ সালের দিকে ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ পত্রিকার সাহিত্যপাতার তরুণ লেখক সংখ্যায় লিখতে শুরু করলাম। উক্ত পত্রিকায় ৫৯টি রম্য এবং ছোটগল্প ছাপা হয়েছিল। সেসময় কবি নাসির আহমেদ জনকণ্ঠের সাহিত্যপাতা সম্পাদনা করতেন। তিনি তরুণদের জন্য ‘তরুণ লেখক সংখ্যা’ শুরু করলেন। সংখ্যাটি প্রতিমাসের প্রথম শুক্রবারে বের হতো। কবি নাসির আহমেদ আমার লেখা প্রতি সংখ্যায় ছাপতেন। ভুলত্রুটি থাকলে বলে দিতেন। তখন থেকেই মূলত তিনি আমার গুরু। আজও তিনি আমার লেখা পড়ে ভুলত্রুটি থাকলে জানিয়ে দেন, ঠিকঠাক করতে নির্দেশনা দেন।

যাহোক, অনেকগুলো লেখা পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর আমার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করে লিখলাম উপন্যাস ‘ঘুণে খাওয়া বাঁশি’; সেটা সম্ভবত ১৯৯৯ অথবা ২০০০ সালের দিকে। পরের বছর উপন্যাসটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক সোনালী বার্তা’য় ধারাবাহিক ছাপা হয়। উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি ২০০১ সালে শিরীন প্রকাশনীতে জমা দিলে প্রকাশক মলাটবন্দি করতে রাজি হন। কিন্তু তিনি শর্ত জুড়ে দেন, উপন্যাসের নাম পরিবর্তন করতে হবে। তিনি নাম ঠিক করলেন ‘ওরাই এখন মুক্তিযোদ্ধা’। এই নাম কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে এক দেড়শ শব্দ লেখা আছে, তাই এ নাম’।
বইয়ের নাম পছন্দ হয়নি আমার, কিন্তু বই ছাপা হবে সে আনন্দেই আমি রাজি হয়ে যাই উপন্যাসের নাম পাল্টাতে।

ইতোমধ্যে কম্পোজ শেষ, প্রথম প্রুফ দেখলাম আমি, প্রচ্ছদের থিমও দিয়েছি আমি। এবার অপেক্ষার পালা। অস্থির লাগছে। কবে বই ছাপা হবে, কবে হাতে পাব। শুধু জল্পনা-কল্পনাই করছি না, রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেল আমার। বই বেরুবে ফেব্রুয়ারি মেলায়। এখনো মাস খানেক অপেক্ষা। কী আর করা। অপেক্ষার পালা শেষ হয়, যথাসময়ে বই ছাপা হয়। লেখক কপি হাতে পেয়ে খুশিতে ফেটে পড়লাম। নিজকে লেখক হিসেবে ভাবতে লাগলাম। খুশি হলাম, ভীষণ খুশি হলাম বই হাতে পেয়ে। দ্রুত বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম। কিন্তু বইয়ের প্রথম পাতা উল্টাতেই সেই খুশি মুহূর্তেই উবে গেল। চোখ টলটল করতে লাগল। কি দেখছি আমি, বইয়ের লেখক দুইজন? অর্থাৎ আমার নামের নিচে প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম ছোট্ট করে লেখা। হায় কপাল, কী থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছি না। রাগে দুঃখে ক্ষোভে ফেটে পড়লাম। একদিকে উপন্যাসের নাম পরিবর্তন, আরেক দিকে দ্বৈত লেখক। কী করার এখন তা বুঝতে পারছি না। প্রকাশক সাহেবকে ফোন দিলাম, বৃত্তান্ত জানালাম। শুনে তিনি বইয়ের পাতা উল্টে দেখে নিজেও লজ্জিত হলেন। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিলেন, কালি দিয়ে প্রচ্ছদ শিল্পীর নামটা ঢেকে দেবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজটি করেছেনও তিনি। কিন্তু সেক্ষেত্রে আরেক বিপত্তি ঘটল। কালোকালি না দিয়ে দিলেন লালকালির প্রলেপ, ফলে ওই নামটি নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। আজও জ্বলজ্বল করছে সে নামটি, যা নজরে পড়লেই আমার কাছে বিষাদের মতো লাগে প্রথম প্রকাশিত বইটি। পরবর্তীতে ‘ঘুণে খাওয়া বাঁশি’ নামে ভিন্ন গল্পের আরেকটি উপন্যাসও লিখেছি। তারপরও প্রথম প্রকাশিত বইয়ের সেই যন্ত্রণাটা আমি ভুলতে পারিনি।