‘বিষ্ণু দে’ থেকে মামুন মুস্তাফা ॥ শহীদ ইকবাল



কথাটা অনেকদিনের। ওঁর কবিতা নিয়ে, কিছু কাজ করা প্রসঙ্গে। এখনও ওই প্রত্যয়ে মনসমেত যে প্রস্তুতি নিতে পেরেছি- তা মন থেকে নির্দেশ পাই নি। এ নির্দেশ ঠিক কাব্য-‘রূপক’/‘লক্ষণা’ জ্ঞাপক নয়। কাব্যকারের তীরন্দাজ পথ-পরিক্রমা যাচাইয়ের সংবেদ থেকে। সেটি নিশ্চয়ই কখনো কার্যকর হবে। তবে এটুকু এখানে উল্লেখ করি যে, এই শিরোনাম একপ্রকার ওইরূপ চিন্তাবলয়ের সামান্য ভূমিকামাত্র। অন্তত, তাঁর পঞ্চাশে! ভাবি, কেন সে লেখে? কবে সে লেখার সরীসৃপ সৌকুমার্য আমাকেইবা পেয়ে বসে- এসব এন্তার প্রশ্ন বন্ধুত্বের বন্ধনে তৈরি হবার আগেই ভেবে নেই ওঁর সারবত্তা বা কেন সে কবি- সে-প্রসঙ্গটি! কবিতাই তো সে লিখেছে। আরও পেছনের প্রেরণা তাঁর ওই কবিত্বসত্তাজাত- ওটা ছাড়া সে লেখে কেমনে? ছন্দ গড়ে কেমনে? মামুন মুস্তাফার প্রিয় মানুষ কবি আবুবকর সিদ্দিক। আমার শিক্ষকরূপে তাঁকে যখন পেয়ে যাই- তখন কবিতার করণকৌশল টুকটাক জেনেছিলুম, ওই কোনো এক সময়ে। তিনিই বিষ্ণু দে’কে প্রথম আমার সম্মুখে আনেন। ঠিক মার্কসিস্ট বলে নয়, প্রকৃত প্রবহমান কবিরূপে; স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যতের জনকরূপে। তবে মামুনকে ইচ্ছেপূর্বক টেনে- ঠেলে ওই ধারাপ্রকোষ্ঠে ঢুকানো আমার ইনটেনশান নয়। ওঁকে ওই পর্যন্ত রথের রশি ধরেই এগুতে হয়, চলার স্বাদ জমে ওঠে তাতে। বিষ্ণু দে তখন আমার কেন্দ্রের ধারাবিবরণীতে জমে ওঠে। এটা নিছক একধরনের টেক্সুয়াল বিন্যাস ও সমাবেশমাত্র। কাউকে কোনো পর্যায়ে ফেলে এখানে ছোট বা বড় করা নয়! একদমই শব্দব্রহ্মের স্বাদ ও তৃপ্তির স্মৃতিকে ধৃতি করাই উদ্দেশ্য।

দুই

আমি প্রথমত চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি-নব্বুই বিস্তর কৃত্য সাধ্য করি কিছু টিপ্স-কায়া ধরে। চল্লিশ এক গদ্যভার গ্রহণ করলো কবিতার ভেতরে, গদ্যে সমর-সুভাষের আবেগ থাকল নিষ্কণ্টক, রাজনীতি জুড়ে বসলো জোয়ালে; পঞ্চাশ আরও ছড়ার আবর্ত নিয়ে হলো ছান্দসিক, বিশাল তার আবর্ত, উদাহরণে শক্তি বা বীরেন্দ্র-মণীন্দ্র; পরে ষাটে নাগরিক মহুয়ার বনে নতুন নস্ট্যালজিয়া; অতঃপর যুদ্ধপ্রজন্মের বুকে স্বপ্নের দাপুটÑ স্বরে পেরোনোর কবিতা-সংকেত, গদ্যের রঙ তাতে আলাদা; আর আশি তুমুল ক্রেজি রাজপথে গরীয়ান, বৈদেশিক ও বিচ্যুতির সংকেতে দৃঢ়, প্রত্যাবর্তনেও। তারপর নব্বুই ছেকে নিল বিস্তর অভিজ্ঞতা। পুরাণে-পুনঃনির্মাণে শুদ্ধচারিতার অর্থারোপ, অধিকারের জন্য গদ্য আনলো অনলের চিতার পোড়া বাষ্প হয়ে। এ ধারার চটজলদি সংকেতে বিষ্ণু দে কী করে ‘উর্বশী’ ও ‘আর্টেমিসে’র মিলমিশ করে ‘ক্রেসিডা’র সন্তাপ ছেড়ে দেন বায়ুভারে বিস্তৃত এসেন্সে! উহ! কী মজার এসেন্স। এরপর বিস্তার আর অভিজ্ঞতার অভিঘাত অতঃপর এই ওঁর কৃত্য- এলিজি লেখা, ‘দশদশমী’ বলে পদার্পণ সমাহার রচনা করা। যোগ বা বিয়োগ হানা কিছু করা নয়। চেখে চলাও নয়। ধারা ও ধারণাটি পরিস্রুত বা প্রতিশ্রুত করার ইঙ্গিতে তাঁর সাবিত্রীর জানালা খোলা (১৯৯৮), কুহকের প্রত্নলিপি (২০০১), আদর্শলিপি : পুনর্লিখন (২০০৭), এ আলোআঁধার আমার (২০০৮), পিপাসার জলসত্র (২০১০), শিখাসীমন্তিনী (২০১২), একাত্তরের এলিজি (২০১৩), শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি (২০১৫), ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র (২০১৭), কফিনকাব্য (২০১৮), দশ দশমী [নির্বাচিত কবিতা] (২০২০) রচনাসমূহ। কী আছে ওতে? তাঁর কবিতা তো দুর্বহ, গতানুগতিক নয়। ভাঙ্গেন তিনি। এ আলোআঁধার আমার থেকে শনিবার ও হাওয়া ঘুড়িতে বাচ্যার্থের তীব্র পরিবর্তন ও বেশ আকর্ষণীয় সীফনগুচ্ছ কৃত্য তাঁর। তারপর স্বতঃস্ফূর্ততার ভেতরে প্রহরের পালগুলো ভেসে আসে- পুরাণ, ইতিহাস, দৈনন্দিনতার অবশিষ্টতায় থাকে পরিপূর্ণ আটকানো। একপর্যায়ে সবটুকু কাব্যযশের নান্দনিক উচ্ছ্বাসে নির্মল দুর্মর হয়। দেশীয় উপাদানে ও উপকরণের নবায়ণের ভেতরে মামুন চিরায়ত প্রত্নশীলতার স্বরূপে সারার্থ করেন, বৈচিত্র্যময় আভা গড়ে তোলেন- সেখানে ইমেজ ও আবেগের নির্যাস নতুন অর্থবহতায় স্নিগ্ধতার পরিবেশ বজায় রেখে চলে তিনি বলেন- ‘মৃত্যুর পরণে ছিল ভেজা শাড়ি। বিধবার ছায়া নিয়ে বেড়ে উঠলো গেরস্থালি। আর রাগের নাগপাশে অনিদ্রা খেলা করে। রাবণ-সময় বয়ে আনে কুরুক্ষেত্র, সে সংবাদে জটিলতা বাড়ে…’- এমন দুর্দান্ত পংক্তিমালায় ছত্রিশটি স্তবক থরে থরে সাজিয়ে পুরোট হয়ে ওঠে শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ির কাব্যবার্তা। এটা পরিণত কাব্য। এর ভেতর দিয়ে শক্ত সামর্থ্যে তিনি চলতে থাকেন- নব্বুইয়ের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে :

জল্লাদের দড়ির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল কেউ কেউ। হয়তোবা সাধারণ …। কিন্তু ফাঁসির মঞ্চের আলো নেভেনি। যমের বাড়ি থেকে আপ্যায়িত হয়েছিল এই দেহ। জল্লাদ তখন পানশালার রাজা। ঢুলু ঢুলু চোখে ঠিকই টান দিয়েছিল বেলজিয়াম দড়িতে। আমি তখন বেলজিয়াম আয়নায় চিনেছি নিজের চেহারা- সেখানে কোনো গন্ধবর্ণ নেই। ব্রাহ্মণ কিংবা শূদ্র কিছুই ছিল না- কেবল লালগালিচার বিশুদ্ধ কফিন উঠেছিল মহাসমারোহে …

এই ওপেন এন্ডেড থেকে যায় তাঁর ‘বিচারক’, ‘গোরখোদক’, ‘জ্যোতিষী’, ‘নর্তকী’, ‘কসাই’, ‘খুনী’- প্রভৃতি। পরিবর্তিত রোডম্যাপে সমাজনিরপেক্ষ দ্যোতনায়- বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে প্রশ্নদ্যোতক হয়ে ওঠেন কবি। করে ফেলেন তখন এক সময়ের অংশীদার। ‘মূলত সমাজ, রাষ্ট্র এবং এর চারপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশ আর মনোজাগতিক ক্রিয়া থেকেই কবিতার উদ্ভব’- কবির এ স্বীকারোক্তিই সহজাত করে কবি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা দাঁড় করান কবিতায়। সেখানে দ্বিমতের অবকাশ কম। কিন্তু কবিতার প্রবহমান স্রোত একার ভেতর দিয়েই অনন্ত পৃথিবীর চূড়ান্ত সত্যটি নিরপেক্ষরূপে প্রকাশ করেন- সেটি স্মর্তব্য করে চেতন-অবচেতন যেভাবেই হোক- মামুন তার বিস্তর কাব্যরেখার ভেতরে প্রতিষ্ঠিত করেন; মহাকাব্যিক সকল তুচ্ছ-অতুচ্ছ সমগ্রতাকেই ধারণ করেন তিনি- অত্যন্ত নম্র পাদবীক্ষেপে। ফলে এমন নম্রতার বিপরীতে প্রতিক্রিয়ায় শানানো অবাধ-উন্মুক্ত উপাদানের আকণ্ঠ সক্রিয় শরীরী উল্লাস তার কবিতায় বিভাসিত হয়। না, ঠিক ততোটা নয়! এটি দুর্বলতা মনে করি। কারণ, অক্রিয়তার ধারাবিবরণী অনেকক্ষেত্রে অধরামাধুরীর মতোন মনে হয়। সেখানে ঘাস, জননী, এপিটাফ, পিতা, নক্ষত্র, শাদা কবুতর নির্বিরোধী, একধরনের নরোম রোদের ম্রিয়মান স্বর যেন। কিন্তু সেইটিই আবার শেষ কথা নয়! কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই যে ঝলসে ওঠে দরিয়া বিবি, জোবেদার শরীরী গন্ধ কিংবা নিষাদগৃহ। ধরেই নিই, কবিপ্রেরণা তো আলাদা কোনো ‘আরোগ্য হাসপাতাল’ নয়- ফলে ভেদোরিয়ার পথে পাঠক পেতে চায় রক্ত-মাংসের পাখির উল্লাসময় কলোরব- যা একুশ শতকে রোদজ্বলা মুমূর্ষু জীবনের অন্তিম স্বর- এবং ক্রান্তিকালের রাগী চক্ষু হয়ে যা বিবিধ পাঠকের সামনে হয় অবমুক্ত। কবি যতোটা আত্মগত তার ততোটাই তিনি জনতার- সেটি ‘সাবিত্রীর জানালা খোলা’র কবির কাছে প্রাপ্য অধিকার বলেই সঙ্গত মনে হয়। এরূপে একে একে কবি-প্রহরার পাশ ফেরা। এবার আমি কেন্দ্রে ফিরে আসি।

তিন

কবিতা যে প্রণোদনার ফসল সেটি সময়খণ্ডের ভেতর দিয়ে স্থিতিজ্ঞাপক হয়ে ওঠে। ‘আমারে তুই আনলি কেন?’- কোনো সহজ কথা কী? কী তার বার্তা? বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘প্রবহমান মনন’কে আবিষ্কার করেন। কেন? আবুল হাসান পাথরে লাবণ্য ধরার কথা বলেন। কেন? একাত্তরে জন্ম নেওয়া মামুন ক্রান্তিকালের কণ্ঠস্বর শোনান। কখনোবা ফিরে যাওয়া শৈশবের কুহকের প্রত্নলিপি বয়ান করেন। তখন দেখা যায়, ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যতে’র ভুবনমোহিনীরূপ তাতে বাঙময় হয়, বিস্তার পায় তার মহাকাব্যিক রঙ- কেন? কীভাবে? পূর্বাপররূপে এসব উত্তর খোঁজার চেষ্টাই এমন প্রস্তাবনার সংঘরূপ গড়ে তোলা। কবিতার কেন্দ্র যখন নির্বাচিত সংকেত ও লক্ষণ তখন সিনট্যাকটিক স্ট্রাকচারের ভেতর বের করে নিতে হয় মিনিং, আভিজ্ঞতা আর অবজার্ভেন্স। যেখানে শব্দের ‘ফ্রি প্লে এরিয়া’ তৈরি হয়। পড়ে নিই কিছু পংক্তি :

পটেশ্বরী বাগেরহাট! তোমার গায়ে আমি রেখে
গেলাম আমার ধুলোছাপ।
আষাঢ়স্য শেষ দিবসে ’৬২র-এর
কয়লার ট্রেন আমার পিতাকে নামিয়ে
দিয়ে গেল তোমার কোলে।

ছায়া বদলে যাচ্ছে ক্রমাগত, তৈরি করছে অন্য প্রকরণ :

তুমি যেন নজরবন্দী। অথচ শুভপরিণয়ের আগে সব বাঙালি মেয়েরাই বাইরের জগতটাকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হয় লোকাচারের প্রথা অনুযায়ী। তুমি যেন হাঁপিয়ে উঠছো। দু’একটা চিরকুট তুমি আমার নামে পাঠাচ্ছো, কী ভাবে! ভাবতেই অবাক লাগছে।

অতঃপর,

এখানেই ছিলে তুমি, ঠিক এইখানে,
হাত রাখো। দ্যাখো তার অনুভূতিটুকু।
জ্যামিতিক কম্পাসে গাঁথা কষ্টের দানা।

এবং,

তারপরে হঠাৎ সন্ধে নামে। মৃত
বাড়িটার দেয়ালে নিভে আসা সূর্যের
অন্তিম আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে। বৃষ্টির
প্রসঙ্গ এলে বাড়িটার এমনি ছবি
ভেসে ওঠে। কার ছায়া তির তির কাঁপে?

এইসব পংক্তিমালার ধারাবিবরণী শতাব্দীসন্ধিতে দাঁড়ানো। দেখা যাচ্ছে, মামুন মুস্তাফা প্রথমদিকে ঠিক স্বাভাবিক মন্ময় কবিদের মতো কিশোরগন্ধা, শৈশবকাতর। কতোকটা আত্মপরিচয়জ্ঞাপকও। গন্ধটা পুরনোকে ফিরিয়ে আনা, পুরনোয় ফেরা। তাতে নতুনত্ব কতোটুকু? কবির নতুনত্বটা ধরা পড়ে ক্রম-উন্মীলনে, যা পুনর্গঠিত হয় পরের স্তবকে। নিঃসাড়, অবমুক্ত। যেখানে তিনি সাবজেক্টিভ। সত্তাপ্রবণ। এ পর্যায়টি লাবণ্যময়। বিশেষত্ব : চেতন-রোমান্টিক উত্তাপের প্রাবল্য। সতর্কমুক্ত। পরে সেটি আরও পরিপক্ব। ব্যক্তি প্রবাহিত হচ্ছে সমষ্টিধারার দিকে। তারপর আরও অধিক রোমান্টিক, পরের উদ্ধৃত স্তবকগুচ্ছ। বোধের এই স্বতঃশ্চলতা কবির কাব্য-পরিক্রমার দায়ে তৎপর। এই তৎপরতা তার চেতনাকে একাকী করছে না, ব্যষ্টিকও নয়- করছে নৈর্ব্যক্তিক ও তপ্ত অভিজ্ঞপ্রবণ। দেখার বিষয়, উচ্চরণও কিন্তু লাগসই। অর্থাৎ প্রবাহিত উত্তাপে তা পাল্টে যাচ্ছে। সংকল্পটা নতুন। নতুনের ধারায় নবতর ইঙ্গিত ও পদক্ষেপ। ছন্দ-কাঠামোও বদলে ‘কান তৈরি’ করে নিচ্ছে। নম্রতলে দাঁড়িয়েও এ পর্যন্ত (২০১০ সময়পরিধিতে) বেশ আস্বাদনের প্রতিপাদ্যে ঋজু দাঁড়ানো এ কবিকণ্ঠ। বলছিলাম, পূর্বাপরত্বের প্রশ্নটি। যেখানে এই কবির স্বরূপটি চেনা যায়। বৈশিষ্ট্যটি দৃঢ়তররূপে হয় চিহ্নিত। বিষ্ণু দে বিরাশিতে প্রয়াত হন। নানা প্রবন্ধে কবিতার রুচি ও সংবেদের সতর্কতার কথা বলে চলেন তিনি। সে দৃষ্টে কবিতা উপায়হীনরূপে পাল্টেছে। তবে বিষ্ণু-সমর-শঙ্খে নিজের মতো আবেগরুদ্ধ গদ্য সৃজিত করে কবিতা এগিয়েছে, সময়-রাজনীতির নানাবিধ জটিল কিনার ধরে। বাংলা কবিতায় সেটি এই বাংলাদেশে পৌঁছেছে অন্য বাস্তবতায়। বিশেষত, বাংলাদেশ ভূগোলকে কেন্দ্রে রেখে। নিসর্গ, নয়া জীবন, নতুন রাজনীতি আর উৎপাদন-সম্পর্কের স্বরূপে কবিতার সেই আবেগরুদ্ধ গদ্যধারা ক্রমাগত বাস্তবমুখি পরিকাঠামোর পাটাতনে নিষ্পন্নতা প্রতিপন্ন করেছে। এই সম্পন্নতা বা নিষ্পন্নতার স্বীকারোক্তি কেমন? সেটি মামুন মুস্তাফার কাব্যে দৃশ্যমান। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে অন্য কবিদের মতো অন্যতম সমীপ্যে তা প্রকাশমান। কবির নিজের মতোই তা নানা স্বরূপে সিদ্ধ। বড় ও অভিজ্ঞ কবিগণ শব্দকে এক এক তালে বা লয়ে বিন্যস্ত করেছেন, দীর্ঘ স্বজ্ঞার স্বভাবজ বাতিঘরে দাঁড়িয়ে। বাস্তবকে অনির্দেশ্যরূপে যেন বুনে দিয়েছেন। কিন্তু মামুনের উপর্যুক্ত উদ্ধৃত নমুনাংশে শব্দের ঐরাবত অহমিকা নিছক না হয়ে নিজস্ব পরিশিষ্টে ব্যঞ্জনাময় হয়েছে। এ এক বিরাট স্পেসে উন্মীলনের শুভসংবাদ পরিপ্রেক্ষিত। সেটিও স্বভাবজ। অবচেতন-অচেতন দ্বৈরথ-উত্তীর্ণ। বাংলাদেশের কবিতাস্রোতে মামুনের আগে পরে বা সমসময়ের তলকুঠুরিতে শিহাব সরকার, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, বায়তুল্লাহ কাদেরী, বদরে মুনীরের কবিতা এক বিশেষ বাক্প্রতিমার কঠোর তন্তুজালে বিনির্মিত হতে দেখা যায়। সেটির দেখা মেলে আমাদের ‘আধুনিক’/বৈশ্বিক (উত্তরাধুনিক/ বিউপনিবেশায়ন না বলে) হওয়ার চলতি পথে। তাতে শ্রম উৎপাদন-কাঠামোর বাস্তবতা কবিতার আন্তঃকাঠামোতে প্রজ্জ্বল। এসব চলমান কবিদের কবিতা নতুনতর আবর্তে বাঁকবদলের দিশায় নিরীক্ষিত। কবিগণ তাতে নিজেকে পেয়েছেন নিজের মতো করে। পক্ষিগোত্র, পাখিতীর্থদিনে ও মামুনের কবিতা এক তীক্ষ্ণধী সংবেদে আত্মীকৃত কবিতাগ্রন্থ। এগুলো বেশ তৎপরতার সঙ্গে সমুত্থমান। সর্বব্যাপ্ত। নিখিল প্রণোদনাকে বিচিত্র অভিপ্রায়ে মুখর করে তুলেছে কবিতার সাংকেতিক সামর্থ্য ও অর্থ-বিষয়। মামুন মুস্তাফা নিজেকে মেলে ধরেছেন অতঃপর শিখাসীমন্তিনী থেকে অন্য এক লয়ে। সেটি তিনি খুঁজে নিয়েছেন, আলাদা রঙে। পঠনের ধারাবিবরণীতে আমি মনে করি এটি দ্বিতীয়পাঠ। বিষয় : গোলাপ সুন্দরী বা সাহেব বিবি গোলাম ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অনিন্দ্য পাঠ-সংবেদ। নির্ভার হয়ে এসব কাব্যে ফুটে উঠেছে কুসুমকান্তি লোভনরূপ। ফুটন্ত গোলাপকুসুম যেন। বেশ আনন্দদায়ক। পুনঃপাঠ এতো নিবিড় ও নিমগ্নপ্রবণ হতে পারে, এই কবিতাগুলোই তার প্রমাণ। ঠিক সেইটিই পৌঁছেছে একাত্তরের এলিজিতে। এই দুটি কাব্য কবিকে অন্য উচ্চতা দিয়েছে। তুলনীয় না করেও বলা চলে, এ এক অন্যেতর উচ্চাভিলাসী অভীপ্সা- যা আমাদের বৃত্তকে বিস্তৃত করে, মুক্ত-নিসর্গের হাওয়া টেনে নেয় ভেতরে আর গড়ে দেয় সর্বার্থদ্যোতক রসনিষ্পত্তির অকুণ্ঠ-চাল। স্বতঃস্ফূর্ততার কথা কবিতায় আছে কিন্তু তার ভেতরে যে দুর্মর মননের টান সেটি অপ্রকাশ্য নয়। নানান রঙে অর্থাৎ ইতিহাস, নৃ-জীবন, স্মৃতি-শ্রুতি পূর্ণ প্রশ্বাসে প্রতিধ্বনিত। এটি শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ির ভেতরে নির্বাধ হয়ে ধরা পড়েছে। পাঁচ বছরে (২০১১-২০১৫) মামুন এই রীতিটি জারি রাখেন। পূর্বোক্ত কেন’র উত্তরে বলবো : একটা চরম নিরীক্ষার শাসন এতে ঘনীভূত, কোনোরকমের পুনরাবৃত্তিক কণ্ঠ যেন চেপে না বসে সে সামর্থ্যটি দেখানো, ঋজু প্যাসেজের মনোলগিক কানেক্টিং প্রণালী, শব্দকে তাবৎ ঐতিহ্য ও অনানুষ্ঠানিকতার ভেতর পুরে দেওয়ার যোগ্যতর অটুট প্রচেষ্টা- ইত্যাকার অভিমুখে কবির কাব্যপ্রবাহ সমস্ত প্রতিরোধ ছাপিয়ে সম্মুখের দিকে এগিয়ে চলে। ফলত, এটি একটি স্পেলও বটে। সে স্পেলটি যে শেষ হয়ে গেছে- তা নয়। মনে হয়, একটা পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এটির পূর্ণ পর্যাবৃত্ত পরবর্তীতে এখন দেখার বিষয়।

তবে এতে কিছু সীমাবদ্ধতাও অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে যখন এই এক্ষুণি প্রয়াত বাবরের প্রার্থনার কবি শঙ্খ ঘোষ কিংবা শ্রীজাত আর এদেশে তীব্রতররূপে মামুন-জেনারেশনের বানপ্রস্থের আগে, মায়ার মুরতি যাতনার যতি কিংবা সরাইখানা ও অন্যান্য মানুষ পড়ি তখন কিছু পর্যবেক্ষণ নজরে আসে। যা মামুন অতিক্রমে সক্ষম কিন্তু দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার দুরাশায় থমকে থাকেন। পড়েন পুনরাবৃত্তিক ও উচ্ছল আবেগী অতিকথনের ঘেরাটোপে। প্রথমত : প্রতীকী ঘনত্ব-কাঠামোতে তীক্ষèতার অনুরণন তো দরকার। সেটি কোথায়? কিছু পছন্দের কবিতা কবিনামে উদ্ধৃত করলে, মামুনের কবিতা-অনুরণনের সংকটটি বোধে আসতে পারে :

(ক)
আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?
ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।
[শঙ্খ ঘোষ]
(খ)
শেষমেশ তাকে থামিয়ে ডেকে উঠলো একটা কাক
যে ডেকে উঠেছে বারেবারে, আর তোমরা তাকে চিনতে পারোনি
এবারও পারলে না।
কার্নিশ থেকে ডাকতে ডাকতে সে উড়ে গেল কোনদিকে
সে-ডাক ঘর ছাড়ার, না ঘরে ফেরার, কেউ জানে না।
[শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়]
(গ)
এখন কোথাও কোনো শব্দ নাই আর,
নিসর্গ মিউট করে দিয়েছে সব।
[মাসুদ খান]
(ঘ)
কেউ না, কেউ নাই, তুমিই একজন
ছায়ায় ঢেকে দিতে পারো গগন
আমাকে ঢেকে দাও তোমার চেতনায়,
তোমার কোলে নাও সমর্পন
[বদরে মুনীর]

(ঙ)
অথচ ঋতুর বদল হলেই সংকুচিত হয় তোমার দরজা
কখনো তোমাকে আর ছোঁব না জেনেই
প্রতিজন্মে সন্ন্যাস নিয়ে খেলা করি
খেলা চলে, খেলা জমে।
[অহনা বিশ্বাস]

তবে এভাবে কোনো অধিকার মামুনের কবিতায় আমি আরোপ করতে চাই না। কিন্তু কবিতাযাপনে/উদ্যাপনে তীব্রতার তীর যখন ললিতলোভন হয়ে ওঠে, তখনই তো তা অনুরণনের প্রশ্নে (ইমেজ তো বটেই) কবিতা। কারণ, শব্দের খেলা তো মূলত ইমেজেরই খেলা। স্মরণে আনি, মামুনের প্রথম লেখা ১৯৯৮-এ; তারপর পেরিয়েছে ক্রম-পরিবর্তন (যখন প্রশ্নাতীত পরিবর্তন নয়!)। বুভুক্ষার মজ্জাজগৎ তো আর আগের মতো নেই। প্রযুক্তি কেড়ে নিয়েছে মাঠ-তরু-মানুষ-জীবন-স্রষ্টা। ফলে দশদশমীর পূর্ণ আভাসে কিছু কবিতার আড়ালে অকবিতার পৃষ্ঠামুণ্ডন চললে, আমাদের তখন মণ্ডনকলার পূর্ণসত্তার ‘বিনয়ে’ পৌঁছাতে হয়। তাতে তেমন কী অর্জন ঘটে? নম্রপ্রপাতে মামুন মুস্তাফা আহসান হাবীবের অনুগামী বা কিছুটা কাছাকাছি যদি গণ্য হন, তখন বিষয়ের সজ্জা বা প্রকরণ তো অক্রিয়তা দৌর্বল্যে স্থির হয়ই। কিন্তু ২০১০’র পরে কিছু কবিতায় তো তা আবার মিলেমিশে আশার ভেলায় অন্ধিসন্ধি খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে বিষয়ের অহংকার কী প্রকরণের র্যঁদায় মুটিয়ে যায় না। ‘বিহান ঘুম। জাগাতে চাইনি,/দেখেছি জননীর শিয়রে শৈশব’ কিংবা ‘মাঝি জলেশ্বরীর গল্প বলে। নদীর বাঁকে বাঁকে ঢেউয়ের দোলায় প্রসারিত হওয়া শাদা শাপলার কথা।’- এ উচ্চারণের পরের পঠনটি দশদশমীর শেষ অধ্যায় পর্যন্ত জারি থাকা সমীচীন মনে হয়। প্রশ্ন তা থাকে কী? নাকি, আগামীতে তা বহ্নিমান হবে? সেটি এখন এই পঞ্চাশে তাঁর চ্যালেঞ্জ মনে করি। কবিতায় যদি নশ্বরের ভেতর অবিনশ্বরত্ব চাপানো হয় তাতে তো গোল বাঁধে। সৃষ্টির পথ সংকীর্ণ হয়। অথচ মামুন-চারিত্র্য তা নয়। কারণ, ‘কসাইয়ের চাপাতির নিচে মাংসের দলা’র আত্মকথন তো তাঁরই আবিষ্কার! সেখানেই বিশ্বাসতাড়িত হয়ে এই ‘মধুর ভুল’ (যদিও কবিতা-পারঙ্গমতায় ভুল বলে কিছু হয় না) সম্মুখে আনার সাহস করি। কিংবা প্রখর জীবনের মধ্যবিত্ত কুহকী স্বর তিনি পয়দা করেনÑ তাতেই আস্থার বিবেচনা স্থির হয়। তবে কবিকে পেরোতে হবেই তো! কালরেখাই তা পেরিয়ে দেয়। যেহেতু তিনি প্রকৃত কবি, কবিতাই তাঁর মহত্ত্ব। দ্বিতীয়ত, উপরের কিছু উদ্ধৃতির স্বরে যে ব্যক্তিত্ব সেটি তাবৎ মজ্জার তাপে রাশি রাশি আনন্দের নীমিলিত জোড়া চোখ। এই উত্তাপ শেষ পর্যন্ত কমে আসে যেন? সে কী পুনরাবৃত্তি না আত্মস্থতার অমনোযোগ- যা গভীরতর অসুখের স্বরকে চেনাতে সাহস করে না! সেটি অনতিক্রান্ত বৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতা বা নিরাকরণ নৈর্ব্যক্তিকতার দোষই মনে হয়। বস্তুত, তা সময়ের ঝালর বুঝি। প্রশ্নটি এমনই তোলা থাক। তৃতীয়ত, তাঁর নম্র স্বরকে জটিলবৃত্তে আঁটাতে গেলে সহজ প্রকরণেই সংযমের তাল তৈরি করতে হবে। সেই তালেই অন্তঃস্রোত বিকিরিত হবে। এমনটা মনে হয়। যা হোক, এগুলো ঠিক বোধের পালকের পাখা ঝাপটানি। নিশ্চয়ই কবি এসব চিনে নিতে সক্ষম, অন্তত তাঁর মতো করে। সর্বোপরি, তিনিই যখন নিজস্ব।

চার

শুরুতেই বলেছি, এটি উপর্যুক্ত শিরোনামের প্রস্তাবনামাত্র। ফলে, শিরোনাম দেখে নিশ্চয়ই কেউ সিদ্ধান্তে যাবেন না। বিষ্ণু দে’র পরে কবিতা শব্দার্থে এখন অনেকদূর। কিন্তু বিষ্ণু তো চিরপাঠ্য। আর তাঁর কবিতার গতি বাংলাদেশ হওয়ার পরও চলমান ছিল। এর ভেতরে কতো রথী, কতোরকম বেড়ে উঠেছেন, বহমান থেকেছেন। এই বাংলাদেশে ষাটের পর আরও কতো নতুন বিষয়ার্থ জমে জমে একুশ শতকের গা ছুঁয়ে তা এখন পঞ্চাশে পর্যবসিত। এইটি বুঝে নিলে এ লেখার বন্ধুকৃত্য-সংবেদ উপর্যুক্ত বিবরণীতে বুঝে নিতে বেগ পেতে হয় না।

যা হোক, পঞ্চাশে এসে আমার বন্ধুর জন্য অনেক আশার (অন্তত আমার কাছে) এই কণ্টকময় অপাঠ্য প্রবন্ধটি ভূমিষ্ঠ করা গেল, অনতি-পরিসরে। হয়তো তা ঠিক রচনা নয়, আমার তুচ্ছ চেতনাধারার অকপট সিম্ফনি-‘ন্যায়’- গুণগুণতানমাত্র। শ্রদ্ধা ও স্যালুট মামুন- হে কবি। তুমি আয়ুষ্মান হও।