বিষয় কবিতা ॥ আজিজ কাজল


বিষয়ভাবনা, উপস্থাপনা, আঙ্গিক ও প্রকরণগত জায়গায় সময়বিচারে কবিতায় এসেছে অনেক ধরনের পরিবর্তন। কবিতা এখন তার আগের সময়ের খোল নলচে পাল্টে দিয়ে নতুন বৈচিত্র্য ও মতবাদে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে কবিদের কেউ চেষ্টা করছেন বিষয়ের বৈচিত্র্য আনতে, কেউ আঙ্গিক বিচারে আবার কেউ সৃজন ও মননের জায়গা থেকে সরলভাবে নিজের উপস্থাপনা তুলে ধরতে চেষ্টা করছেন। এভাবে চলছে নানা ইশারা ও ভাঙনের খেলা। আবার কেউ কোন দায়বদ্ধতা ছাড়াই শুধু সময়কে ধারণ করছেন। কেউ চেষ্টা করছেন যে কথা আগে বলা হয়নি সে কথা নতুন করে কিভাবে বলা যায়? আসলে এত্তোসব ঝক্কি-কথা বাদ দিয়েও শেষ কথা হচ্ছে আমি যা লিখেছি/লিখছি তা কবিতা কিনা? এর পরেই আসছে অন্য বিষয়।

প্রাচীন যুগ এবং মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ে আধুনিক যুগের (বিশ্ব সাহিত্যের) সরাসরি প্রভাব বাংলা সাহিত্যে পড়তে শুরু করে। শিল্পবিপ্লবের মতো প্রযুক্তির উৎকর্ষ যেখানে আগেই শুরু হয়েছিল, সেখানেই দেখা দেয় ফরাসিবিপ্লবসহ নানা ধরনের শিল্প আন্দোলনের (চিত্রকলা থেকে শুরু করে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়)। এভাবে ইউরোপীয় সাহিত্যের বড়ো বড়ো আন্দোলনের ঢেউগুলো বিশ্ব সাহিত্যেও পড়েছে। কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলার খণ্ডিত রেনেসাঁ এবং আধুনিক কবিতার যাত্রা-চিহ্ন থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশেষ করে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো শক্তিমান শিল্পীর বিস্ময়কর আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হয়েছে। তিনি সাহিত্যে মানবতাকেই বড়ো করে দেখেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র কথা। রামায়ণ থেকে কাহিনীর অংশ নিয়ে রচিত এই মহাকাব্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরো বিষয়টিকেই পাল্টে দিয়েছেন। রামায়ণে যেখানে রাবণ রাক্ষস, মেঘনাদবধ কাব্যে সেই রাবণই স্নেহবৎসল পিতা, মানবিক গুণাবলীর অনন্য উদাহরণ।

মোটাদাগে শুধু ভিক্টোরিয়ান যুগের কথা চিন্তা করলেই আরেকটি বড়ো সত্য ধরা পড়ে। সময়টি দর্শন এবং বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সাহিত্যের আরেক উৎকর্ষের যুগ হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া বড়ো বাঘা বাঘা দেশের অধীনে যেসব উপনিবেশ অঞ্চল ছিলো; যাদের জীবনযাপন ও সাহিত্যের (পরোক্ষ অথবা প্রত্যক্ষ) প্রভাব
সরাসরি পড়েছে উপনিবেশ অঞ্চলগুলোতে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, ব্রিটিশ সময়ে আমাদের পাক ভারত উপ-মহাদেশের কথা। শিক্ষা কাঠামো, ভাষা, ব্যাকরণ, নিয়ম কানুন বা আইনগত—অনেকগুলো সিস্টেম তারা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। সুতরাং শিল্প সাহিত্যের কাঠামো এবং অন্তর্গত বিষয়সহ অনেক কিছুতে তাদের অনিবার্য প্রভাব থেকে গেছে।

কবিতা লেখার জন্য বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাস, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, শিল্প সাহিত্যের শুরু কোথা থেকে এবং কিভাবে হয়েছে সে সম্পর্কে জানা জরুরি কিনা সে বিষয়ে তর্ক থাকতে পারে, তবে বিশ্ব সাহিত্য পাঠ এবং তার শুরুটা কিভাবে হয়েছে এ বিষয়ে জানা জরুরি মনে হয়। হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিজেকে বহির্বিশ্বে মেলে ধরা, সে বিষয়ে ভাবনাও এখন সময়ের দাবী। অন্যথায় দায়হীন, কবিতানামক আবেগ নির্ভর কিছু কথামালায় আমরা আটকে যাবো। কবিতা আর লেখা হবে না। মূল ধারার কবিতা লিখতে গেলে বিষয়গুলো জরুরি নবীন লিখিয়েদের জন্য। এছাড়া ছন্দজ্ঞান থাকাটাও জরুরি। কেননা ছন্দ বিষয়ে পাঠ থাকলে ছন্দ ভাঙাটা সহজ হয়।

পৃথিবীতে বস্তুগত এবং ভাবনাগত মৌলিক (যত শিল্প) যা হওয়ার মোটামুটি তা হয়ে গিয়েছে। এখন চলছে রিফর্মেশন। কবিতার ক্ষেত্রেও যা বাস্তব সত্য। কবিতায় এখন অনেক কমপ্যাক্ট বা কনট্রাকশান হচ্ছে। ফলে স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত যেই মাত্রায় কবিতা লিখি না কেনো, কবিতা নদীর মতো স্রোতস্বিনী এবং তার একটা গীতিময়তা আছে। তাই ছন্দ না থাকলে সে যে-কবিতাই হোক না কেনো কবিতা তার সহজাত আবেদন বা গুরুত্ব হারাবে।

সাম্প্রতিক কবিতার কথা নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে গেলে কথা অনেক লম্বা হয়ে যাবে; সংক্ষেপে বলতে গেলে বহু পুরনো প্রাচীন কবিতাও সময়ের নিরিখে এখনো সাম্প্রতিক। সামসময়িক অনেক কবি লেখকরা সেই চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন আখ্যান-উপাখ্যানসহ অঞ্চল-প্রভাবিত হঁলা-গীতিকাকেও অনুসরণ করছে। তারা আমাদের লালন-হাসন-রাঁধারমন-উকিলমুন্সী, শাহ আব্দুল করিমসহ অনেকের অধ্যাত্ম আর আধ্যাত্ম্যকে দারুণ ভাবে ভাঙছেন। কেউ ফর্মে ভাঙছেন, কেউ বা পুরো কন্টেটের ভেতর দিয়ে ভাঙছেন। এভাবে অনেকে যাপিত আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুন উদ্যম দেয়ার চেষ্টা করছেন। এটা পজিটিভ। তবে তা বিশ্বসাহিত্য পাঠ, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান চেতনাসহ বিভিন্ন শিল্প আন্দোলন বা ইজমের (পাঠ-অভিজ্ঞতার) মধ্য দিয়ে হলেই বেশি ভাল।

অতিমাত্রায় প্রযুক্তি নির্ভরতা আমাদের যাপন আর চিন্তা-চর্যায় শেকড়কে চেনার বা জানার উপলব্ধি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কথা হচ্ছে আমি এই সময়ে বসে যদি ইউরোপীয় গ্রাম্য সমাজ, পরিবেশ-পরিপার্শ্ব হলিউডের সিনেম্যাটিক দৃশ্য বা অ্যাডভেঞ্চারিজম-প্যাটার্নের ভেতরে কবিতা লিখি, হবে? আবার দেশীয় আচার নিয়ন্ত্রিত চটুল শব্দ, বাক্য, উপমা দিয়ে কবিতা লেখা শুরু করি; তাও কবিতা তার সময়োপযোগী সহজাত আবেদন হারাবে। মাটিজাত ভাষিক যে মৌলিক চেতনা— তার বাঁধনও আলগা করে দেবে। তাই নিজ মাটি, আচার-অভ্যাসের ভেতরের আবহাওয়া, ভূপ্রকৃতি বা অ্যাডভেঞ্চারিজমকে প্রাধান্য দিয়েই আমাকে বৈশ্বিক হতে হবে। নতুন কবিতা লিখতে আসা বহু কবিও আছেন, যারা না বুঝেএই প্রবণতা ধরে বা এই অভ্যাসের মাঝে কবিতা করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টা তাদের সবসময় মাথায় রাখা একান্তই জরুরি।