বিষয় নিঃসঙ্গতা ॥ দীলতাজ রহমান


নিঃসঙ্গতা এবং একাকিত্ব দুটি বিষয় একরকম মনে হলেও দুটিতে ফারাক আছে। তবে সে ফারাক বিস্তর নয়। নিঃসঙ্গতা শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্বের একটি ছবিও দ্যোতিত হয়ে ওঠে। তারপরও যেমন কেউ কারো ভালোবাসা নিয়ে একসাথে চলার শপথে একটানা বছরের পর বছর দূরে থাকছে এবং যতদিন তারা জানছে, তারা একজন আরেকজনকে ভালবাসে, এই ‘ভালো’ জানাটুকুর নামই ভালোবাসা! আর এই জানাটুকু নিয়েই কিন্ত তারা সারাজীবন হাসি-খুশি প্রাণবন্ত থাকতে পারে। এমন কি তারা নিজ গুণাবলি দিয়ে চারপাশের মানুষেরও জীবন ভরিয়ে রাখে। কিন্ত যখন দু’জনের একজন কোনোভাবে আঁচ করতে পারে, বা সন্দেহই করে যে আরেকজন তার কথা কম ভাবে। বা তার জীবনে তার চেয়ে অধিক গুরুত্ব নিয়ে অন্য কারো প্রবেশ ঘটেছে, সে কিন্তু আগেও যেমন ছিলো, তেমনি আছে ঘরভরা মানুষের ভেতরে। পরিপার্শ্ব তেমনি মুখর। কিন্তু তবু সে অসহায় বোধ করে। সে ভেঙে পড়ে ওই ‘ভালোজানা’টুকু শিথিল হলো বলে।

একজনের সঙ্গে তার বিশেষ ভাব ছিলো, এখন তা নেই। মানুষ আসলে ওই বিশেষ ভাবটুকুরই কাঙাল। যেমন একজন একদিন অসময়ে এসে বললেন, জানেন, ইউনিভার্সিটিতে আমরা একসাথে পড়েছি। ওর চেয়ে আমার রেজাল্টও ভাল ছিলো। কিন্তু চল্লিশ বছর ধরে সংসার করতে করতে, শেষ ক’বছরে কেমন করে সবকিছুতে চিড় ধরলো, ও এখন আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, যেন আমি মূর্খ, আনকালচার্ড, মোটকথা আমি যেন ঘরের প্রয়োজন হারানো কোনো বস্তু। তারওপর আবার ঘরের ভেতর এখন ছেলের বউকে পেয়ে আমার থেকে তাকেই বেশি মূল্য দিয়ে কথা বলে। এতে আমি কোনঠাসা হয়ে পড়ি না, বলেন? অথচ আপনাকে তো আগেও বলেছি, মা-বাবার অমতে ওকে আমি বিয়ে করেছি। জানেন, পূর্ণিমার চাঁদের আলো জানালা দিয়ে গড়িয়ে যখন ঘুমন্ত ওর গায়ে এসে পড়তো, আমি বিমূঢ় বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। অধীর হয়ে পরখ করতাম, কে বেশি সুন্দর।ও যখন ব্যাংকে কেরানীর চাকরি করেছে, আমি সরাসরি অফিসার হিসাবে ঢুকেছি’।

জুঁই আপার মুখে তাদের স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কের চড়াই-উৎরাই নিয়ে আক্ষেপ শুনতে শুনতে সেদিনই আমি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছুলাম, যে, একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা কিছুতেই এক নয়! একঘর মানুষের ভেতর বসবাস করেও জুঁই আপা ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। তার চোখের নিচে কালির দাগ ক্রমশ গাঢ়ো হয়ে উঠেছে, তার এককালের প্রেমিক, স্বামীর মানসিক নৈকট্য হারিয়ে।
মানুষ যদি ভেতর থেকে নিজের উৎকর্ষ সাধন করে চলে, সেটাই যদি হয় তার তার ধ্যান-জ্ঞান ও সাধনা, এতে নিজের দৃঢ় এক অবস্থান সবখানে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রবী ঠাকুর যেজন্য বলে গেছেন, ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।’

দুই, চার, পাঁচ বছর প্রেম করে বিয়ের পর এমনও তো হচ্ছে ছয়মাস সংসার টেকে না। কারণটি হচ্ছে, বিয়ের আগে নিজের সবকিছুকে একজন আরেকজনের কাছে অপরূপ করে তুলে ধরেছে। একজন আরেকজনের ভেতর তখন খুঁজে পেয়েছে নিজের চাওয়ার যাবতীয় কাঙ্ক্ষিত রূপ। কিন্তু বিয়ের পর একে অপরের কাছে যখন আসল রূপটি জাহির করে ফেলে, জীবনের টানাপোড়েনকে সমঝে টেনে না ধরে প্রতিপক্ষের রূপটি, পাওনাদার রূপটি প্রকাশ করে ফেলে, গলদটি শুরু হয় তখনি। গলদ নিয়ে সংসার টিকলেও, পাশাপাশি শুয়ে সন্তান উৎপাদন করা চললেও তার বিচ্ছিন্ন মন আবার সঙ্গ খোঁজে। আর তখনি হয় পরকীয়া। কারণ মানুষ একা থাকলেও মানুষের মন কখনো নিঃসঙ্গ থাকতে চায় না।

আসলে মানুষের মন নীড়ের মতো একটি অকৃত্রিম বাসা চায় পাখির মতো সেখানে একা বিশ্বস্ততার সাথে নিরিবিলি হতে। আবার সে নিজে অকারণেও অনেক সময় পরকীয়া করে ঘরের বউটিকে চায় শুদ্ধাচারী। এই সব কিছুই কেবল নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্ত হয়ে সঙ্গের নানা স্বাদই আস্বাদন করা মানুষের প্রয়াস।

বৃদ্ধ মা অথবা একা বাবাকে তার সমর্থবান সন্তানেরা অবহেলা করে। বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, অনেক সময় দেখা যায় বাড়ির থেকে সে বৃদ্ধাশ্রমের পরিবেশ-খাওয়া-দাওয়া ও চিকিৎসা ব্যাবস্থা সব ভাল এবং সেখানে আছে তাদের মতো আরো বহু মানুষ। কিন্তু কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার সেখানে মন টেকে না। কারণ সেখানে সে তার নিজের শৈশবকে হাঁটতে দেখে না। ছেলেমেয়ে ভাত-কাপড় আশ্রয় না দিক, এটা নিয়ে পিতা-মাতার নিজের সন্তানদের ওপর ক্ষোভ থাকলেও দেখা যায়, কোনো ক্ষোভ থাকে না তার পরবর্তী বংশধরের ওপর। এইযে মানুষের নিঃসঙ্গতা কাটানোর একটি নেশা, জড়িয়ে থাকার নেশা তাই তাকে শতরকম টানাপোড়েনে দীর্ণ হয়েও সেই সঙ্গকে আকড়ে থাকারই এ এক অনিবার্য প্রয়াস।

গ্রামের একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পৌঢ়া গৃহবধু তার বিধবা বৃদ্ধা শাশুড়িকে প্রতিবেলায় ডেকে জানতে চান, ‘আম্মা ভাতের চাল কতগুলো দেবো’? যে মহিলার ছেলেমেয়ে কলেজে পড়ে, তিনি কি নিজে কম জানেন, কোন বেলায় তার কতগুলো চাল লাগবে? তারপরও শাশুড়িকে তার গুরুত্ব দিয়ে চলার ভেতর শৈশবে দেখা সে পরিবারটির যে লালিত্য আজো আমার মনে লেগে আছে, তা আমাকে ভীষণ প্রশান্তি দেয়। অন্যদিকে দেখি, ছেলেমেয়ে বড় হয়ে যার যার মতো নিজেদের সব করে। অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতেও তারা মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করে না। আর এই ভার দিনে দিনে তাদেরকে ক্লিষ্ট করে ফেলে।

আমরা ইচ্ছে করলেই নিঃসঙ্গতা এড়াতে পারি। আমরা প্রত্যেকেই কি নিজের নিজের দিক থেকে চেষ্টা শুরু করবো নিঃসঙ্গতার মতো ঘাতককে রোধ করার।