বুড়ি ও বৃক্ষবিশ্বাস ॥ শহীদ ইকবাল



আমাদের কালে সন্ধ্যার পর এলাকা জুড়ে ভরাট অন্ধকার নেমে আসতো। তখন বুড়ি আমাদের বাইরে যেতে নিষেধ করেন। বোধ করি শীতের রাতে এ ভয়টা আরো ঘিরে থাকতো আমাদের। জ্বীন-পরী কিংবা কোনো কবরস্থানের ভয়। সেখানে বুড়ো গাছ ছিল। প্রচুর কুশি ছিল গাছের শরীরে। বিরাট এলাকা জুড়ে নানারকম গাছ। কয়েকটা গাছ সার বেঁধে হাত ধরাধরি করে দাঁড়ানো থাকতো। গাছের মধ্যে তখন অনেক উপগাছ। লতায়পাতায় জড়ানো বেশ মোটা কাণ্ডের এসব গাছ এই পাড়ার সক্কলের ভাগ্য নির্ধারণ করতো। যেমন মকবুল মারা গেলেন কারণ ওই গাছের পশ্চিম দিকের নুয়ে পড়া শাখাটা। ওই শাখার নিচে দাঁড়িয়ে একদিন জরুরি কাজ সারার পর সে আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। ওখানেই উল্টে পড়ে মারা যান। মধ্যিবাড়ির হান্নান একদিন সন্ধ্যার পর পাশের জামগাছটায় কী যেন দেখে- তারপর অজ্ঞান। সে আর ভালো হয়নি। এখনও তার মাথা পাগল।

বড়বাড়ির সক্কলেই ওই আড়ার গাছগুলা নিয়া নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা কারণ অনুসন্ধান করে। কারণ, এরা বেশ শিক্ষিত। আর্থিক প্রতিপত্তি তাদের অনেক। তাদের প্রায় সবাই বাইরে থাকেন। কেউ ডাক্তার, কেউ খনি-বিশেষজ্ঞ, কেউবা অধ্যাপক। তাছাড়া তাদের শুদ্ধ উচ্চারণ, বাড়ি জুড়ে চাকর-বাকর, কোনো খুনজখম হলে বিচার-আচার সবই তারা করে। এমনকি কোনো কারণে থানার ওসি এই রাস্তায় কোনো ডিউটিতে গেলে, এখানে অবশ্যম্ভাবী যাত্রাবিরতি তাদের থাকবেই। তারপর বড়বাবু, এখানে নানারকম পদের তেল-দুধের নাশতা করাবেন, রাষ্ট্র-দেশ নিয়ে বুলি আওড়াবেন, চায়ের কাপে ধোঁয়া তুলে সেকেন্ড অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে চলে যাবেন।

এসব দৃশ্য এ পাড়ার ছোটবাড়ি, মদ্যিবাড়ি বা একটু এক্সটেন্ডেড হালিম মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত সকলেই জানে। পশ্চিমে মৌলবী বাড়ির লোকরাও এসব অনেককাল দেখে চলেছে। যাই হোক, এতো প্রতিপত্তি থাকার পরও ওইসব প্রাচীন গাছের পাপভক্ষণের কোনো কিনারা তারা কোনোকালে করতে পারেননি। কিন্তু সকলেই মেনে নেয়, এই গাছগুলো একালে বড়বাড়ির কারো ক্ষতি করে না। তবে প্রচারিত আছে অনেক আগে জনাব মকবুলার রহমান চৌধুরীর দাদা ওই গাছের গোড়ায় কী কারণে চোট দিলে রক্ত বাহির হয়। সেটা নিয়া তিনি যখন আশ্চর্য হন, তখন রাতে স্বপ্নে দেখেন ওটা ওই পূর্ব-পুরুষের রক্ত, যেটা দেখে সে ভুল করেছে। এখন এর বিনিময়ে সে পাড়ার সক্কলকে তিন শুক্কুরবার বাদ জুম্মা ভোজ দিবে। তারপর ফাড়া কাটবে এবং তার বাড়ির কোনো তাহলে ছায়া থাকবে না। কাউকে এ পাপও আর নেবে না।

মকবুলার রহমান চৌধুরী ওসব না মানলে বিরাট অসুখে পড়েন তখন এবং দ্রুততর সময়ে রক্তবমির ভেতর দিয়ে তার মৃত্যু সম্পন্ন হয়। তবে এই মৃত্যু সহজ মৃত্যু আছিল না। লক্ষ লক্ষ লোক জানাজায় শরিক হয়া তার জন্য তখন দোয়া করেছে। এবং তার বিয়ানো দশ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হায়াত দারাজ কামনা করছে। কিন্তু কাজ তেমন হয় নাই। দশ সন্তানের মধ্যে চারজন বাদে সবাই বাপের মতো রক্তবমি করে মারা গেছেন। সাথে সাথে এই বাড়িও তারা পাপমুক্ত করে ফেলেছেন। ফলে চারজন আর কোনো সমস্যায় তেমন পড়েন না। তাদের পরের প্রজন্মের অন্য সন্তানরাও তেমন আর কোনো সমস্যায় পড়েন নাই। কিন্তু সকলেই আওয়াজ দেয় ও বিশ্বাস করে রাইতে কেউ ওদিকে যাবেন না। গেলে মকবুল কিংবা হান্নানের পরিণতি হতে বাধ্য। এখন এই পাড়ায় মকবুল ও হান্নানকে নিয়াই সকলে ভাবে। বড়বাড়ির পুরনো চোরা ইতিহাস চোখে দেখা নয়, শোনা কথা মাত্র। বুড়ি তাই এখনও আমাদের রাইত হইলে বের হতে দেন না। বুড়ি আগুন জ্বালায়, নানারকম রান্না করে, পিঠে পুলি করে, বকুল ফুলের মালা গেঁথে দেয়, গরমে তালের পাখায় বাতাস করে, বাড়ির পোষা কচি মুরগি খাওয়ায়, পুকুরের মাছ কিংবা পোষা গরুর খাঁটি দুধ, ছাগলের দুধ আরও কত কী খাওয়ায় আমাদের। আমরা মুগ্ধ।

রাতের হ্যাজাগে, এসব কচি ও সুস্বাদু খাবার একালে দুর্লভ হলেও আমরা বুড়ির কারণে খুব পেয়েছি। তবে বুড়ির আর একটি রসিকতা ছিল, কবুতর খাওয়ানো। এলাকার নতুন আঠা-আলু দিয়ে পাতলা ঝোল করে কবুতরের মাংস খাওয়াতেন তিনি। এতো সুন্দর কবুতর, কীভাবে অনায়াসে সে জবাই দিয়ে আনতো তা ভাবতেও অবাক লাগে। গোল হয়ে বসে, ওসব কাটাকুটির কাজ একদিকে হতো অন্যদিকে ধানের আটা ঢেকিতে নির্মাণ চলতো। একদিন বুড়ির ঢেকিতে হাত পড়ে। তখন আউৎ করে ওঠে, আর কিছু বলে না। তবুও ঢেকির পাদানি চলতেই থাকে। পাশের দিকটায় বিরাট বড় ইঁদারা তখন। ওতে মোহর বেগম পড়ে গিয়েছিলেন বলে প্রচার আছে। খুব শীতল সে ইঁদারার পাড়। কতোকাল আগের ইটের খোয়া দিয়ে এই শান বাঁধানো ইঁদারা। পায়ের চাপে চাপে ক্ষয়ে গেছে। একপুরুষ দুইপুরুষ তিনপুরুষ চলে গেছেন।

কতো হাওয়া বইয়ে গেছে এর ওপর দিয়ে আর কতো জলও গড়িয়ে গেছে; কতো সুখদুঃখের কান্নাহাসি ওখানে মাখা আছে কেউ জানে না। উপরে একটা বড় মিষ্ট আমগাছ ছায়া দেয়। গরোমে তা ভালো কিন্তু শীতে খুব অভিশাপ। শুধু একবাড়ির লোক নয়, অন্য বাড়ির ছেলেবুড়ো আসে এখানে দীর্ঘক্ষণ- বসে বসে আলাপ পাড়ে, কথাবার্তা চালায় কিন্তু কেউ বাধা দেয় না, রাগও করে না। সময় যতো গড়াক ওসব নিয়ে তাড়া নেই তাদের কারো। খাবার আর চুলোর আগুন জ্বলন্ত যেমন তেমনি ইঁদারার পাড়ও কোলাহলে ভরপুর। কিন্তু দিনের পরে রাত নেমে এলে সবটা এলাকা জুড়ে আশ্চর্য শুনশান। কোথায় এতো জনমানুষ কই যায়, মিলিয়ে যায়- যেন উত্তর নেই। কেউ সেসব নিয়ে কোনো কথাও বলে না। যার যার মতো গৃহে বা ঘুমিয়ে পড়ে সময় গড়িয়ে দেয়।

বুড়িও তাই। বুড়ি রাতের শেষ যাত্রী। রাতের পর ঢিলাঢালা কাজ করতে করতে সবার শেষে সে ঘুমোতে যায়। বুড়ি খায় কখন ঠিক জানা যায় না। অন্য ব্যক্তিগত কাজ তো দূরের কথা। রান্নার খরচ বা রান্নার উপাদান কে দেয়, কোন হাটে সেসব কেনাকাটা হয়- কেউ জানে না। এ নিয়ে কারো উচ্চবাচ্য কখনোও শোনা যায় না। বুড়ি পান খান। মুখে তার লেগে থাকে দুনিয়ার আরামের হাসি। সুযোগ পেলেই তিনি বড়বাড়ি যান। তাদের প্রশস্তি সব সময় মুখে মুখে। সেখানে তার প্রভাব ছিল। প্রভাবটা আনুগত্যের কারণে। বড়বাড়ির বিরাট সিংহদুয়ার দিয়ে যখন তিনি ঢুকতেন তখনই সকলে দেখেন- বুড়ি এলো। আজ সারাদিন সে রয়ে যাবে। সব বুবুদের সঙ্গে আরামের সব অশেষ গল্প চলবে। আর মকবুলার চৌধুরীর গুণগান পারলে একটু কান্নাও সেরে নেওয়া তার তখন।

বুড়ির যে কবর জেয়ারত শরীয়তে হারাম- তাই কেঁদে মনের সুখ পয়দা করা। ওই বাড়িতে যাওয়া-আসার পথটাও বেশ ঘুর। সিংহদ্বার পেরিয়ে মসজিদ তারপর গোলা ঘর, গোলাঘরের পাশে কবরস্থান লাগোয়া ফুলের বাগান, তারপর ওয়াক্ত মসজিদ পার হয়ে একটা বিরাট এজমালি পুকুরের পাশ দিয়ে মোটা রাস্তা। সে রাস্তায় প্রতিদিন সাপের খোলস দেখে সে। কিন্তু ওসবে ভয় নেই। একবার সাপ এসে নাকি ঠোক্কর দেয়, রক্ত নির্গত হয়, পরে সাদা শাড়ি পেঁচিয়ে আটকিয়ে ব্লেড দিয়ে নিজেই চিরে রক্ত বের করে নিজের শরীর বিষমুক্ত করে। ওঝা পর্যন্ত ডাকতে হয়না। পর পর দুইবার এসব করেছে সে। বুড়ি তবুও রাত-বিরেতে ওই রাস্তা ছাড়েনি। বুড়ির আর একটা নিষেধাজ্ঞা আমাদের বড় রাস্তায় যেতে না দেওয়া। বড় রাস্তাটা কী? ওটা দিয়ে ঢাকার গাড়ি যায়, গোয়ারমেন্টের গাড়ি চলে, বড় বড় লরি আরও কতো কি- ওখানে গেলে দুর্ঘটনা হতে পারে। বুড়ি দেখিয়ে বলে, এই ধানের ক্ষেত মাড়িয়ে, বড়পুল ছোটপুল পেরিয়ে- রাস্তায় যাবি না। কান ধর। তখন দূর থেকে মহির চিৎকার করে, ‘ভাগিনা মামীর দুধ খাইলা?’ লোকটা খুব অশ্লীল জাতের মনে হয় আমাদের কাছে। তখন সেরকম আর একজনকে মনে হয়- ‘বুড়ি! শাহানশাহ আমার প্যান্ট খুইলা খুতু দিছে’। তারপর বুড়ি বলে, কিচ্ছু না, ইয়ারকি করে। উনারা ভালো মানুষ।

বুড়ির পানমুখা চোখমুখের গোরা হাসি আমাদের মনে সন্তুষ্টি আনে। গড়গড়ার মতো সন্তুষ্টি। গড়গড়া পিঠাটা কুসোরের নালী গুড়ে জমে ভালো। সেটা তিনি বুঝিয়ে দেন। তবে এরকম চলনশীল কোনো একদিন রাতে এক অজানা কারণে বুড়ির আদেশ বা চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা বাইরে চলে আসি। ঘন কালো কঠিন কালিগোলা অন্ধকার তখন। কেউ কাউকে দেখে না। এই প্রথম অন্ধকারের রূপ দেখা। বিরাট কাচারিঘরের বারান্দায় কয়েকজন বসা। তারা হুকা টানে। ছাইয়ের আলোতে আবছা মুখ দেখা যায়। সে মুখে লাল রঙা তাপ আর তীব্র আনন্দ। ‘ওহ্, ওই গাছতলা ছুঁয়া যে আসতে পারবে সে কাল দুইটা তম্পুরা বাজী পাবে’।

কী যে শিরশির হাওয়া! গা ঝমঝমিয়ে ওঠে। তখন গল্প জমে ওঠে। ওই গাছগুলোর গল্প। কবরস্থানের গাছের গল্প। ভূত আর জ্বীনের গল্প। এসব একটানা কিছুক্ষণ শোনার পর আমরা আর ঘরে ফেরার সাহস পাই না। কেউ কাউকে ছাড়িও না। একাকী হলে, মরণদশা! তখন জোট না ছাড়ার কারণে কাছারির বারান্দায় বসে বসে খালি নানারকম আজগুবি গল্প শোনা। ওইসব বৃক্ষের গল্প। মকবুল আর বোকা পাগলা হান্নানের গল্প। মরা মকবুল খুব ভালো আছিল রে! এইখানে বসি সে হুকায় টান দিছিল। কইতে কইতে অনেকেই কান্নার ভাব আনে। সেজন্য ওই গাছের অভিশাপ নিয়ে কারো তেমন কথা নেই। তবে অভিশাপ যাই হোক, বুড়ি কী কারণে কাকে খুঁজতে ওই পুকুরের পাড় দিয়া কোথায় যেন চলে যায়। বাইরে যখন খুব মিশমিশে অন্ধকার,আমাদের গল্প বলাবলি থামেনি। তখন বাড়ির ভেতরে হ্যাজাগের আলোতে ঠুনকো একটা কথা কাটাকাটি হয়। যার কেন্দ্র ছিল বিধবা বুড়ির মৃত স্বামী। সেই স্বামী নিয়া কিছু কইলে তিনি বরাবরের মতো এবারও ম্লান হন, মরিয়া যান। হতাশায় কুকড়িয়া যান। কারণ, নয় বচ্ছর বয়সে তিনি তাহার হাত ধরিয়া এ বাড়িতে পা রাখেন। খুব কষ্ট পান সবদা ওই বিষয়ক আলাপে। সেটাই হলো। এই দুর্বল জায়গা নিয়া কেউ কথা বললে সে বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হইছে। মরমে মরিয়া যায়। কী এক অকারণে সেদিন অন্ধকার রাতের আঁধারে তিনি বেরিয়ে পড়েন। শোনা যায় ওই পুকুর পাড় ধরে তিনি ওই গাছগুলোর দিকে যান। যান আর যান… যাইতেই থাকেন।

আমরা ইচ্ছে হলেও একাকী কাছারির বারান্দা থেকে ফিরতে পারি নাই। কিন্তু তুচ্ছ একটা ঝগড়ায় তিনি যখন রাগ করিয়া বাহির হইয়া যান, তখন আরো ভয় লাগে। অন্ধকার থেকে আরও অধিক অন্ধকারের দিকে যাওয়া যায় না। কখন বা কেন তা ঘটল কেউ জানেও না। কেউ তা জানতেও পারে নাই। আমরা সেদিন রাতের বহু কেচ্ছার অংশীদার হই। হুহু হাওয়া ওঠে কিন্তু বুড়ির চলিয়া যাওয়ার শেষটা শোনা যায় নাই। নাকি শেষটা আমরা জানি নাই! বুড়ি কী আর ফিরিয়া আসেন নাই!! সকলেই বলে তিনি তার স্বামীর ন্যায় বৃক্ষ-বিশ্বাসী ছিলেন। এ বাড়ির খোটা খেয়ে সেই বিশ্বাস নিয়া তিনি অনন্ত আঁধারে মিশিয়া গেছেন, আবার বুঝি আসিবেন না, নাকি আবার আসিবেন, কইবেন : ‘ভূত তো আমিই, জ্বীন নাকি তোরা, আয় আয় আয়… চাঁদ মামা !!!’