বেদনার আশ্রয় কবিতা॥ ইসলাম রফিক


শাবনুরের লাল হয়ে ওঠা জলে ভেজা চোখটা মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। সালমান শাহ আর শাবনুর। বিরহী সেই চোখ মনের কোনে দাগ টেনে যায়। আমরা সবাই সালমান শাহ হয়ে যাই। আমরা একজন শাবনুরের জন্য অপেক্ষা করি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তারা অন্য ঘরে যায়, অন্য স্বরে, অন্য সুরে। আমরা বিরহীরা পড়ি থাকি কবিতায়, ‘আহা বাসন্তী, সেই বাসন্তী, ডাকাত স্বামীর ঘরে চার সন্তানের জননী’। কী করে যে সময়টা চলে যায়, বুঝি না, বোধগম্য হয় না। যে সকালটা শুরু হতো কোহিনুরকে দেখে, সেই সকাল স্মৃতি হয়ে গেছে। জীবনের প্রথম কবিতার নাম কোহিনুর, জীবনের প্রথম গল্পের নাম কোহিনুর, জীবনের প্রথম প্রেমের নাম কোহিনুর।
আমাদের গ্রামের নাম সাগাটিয়া। বড় সাগাটিয়া। নির্জন, নিরব, কোলাহলমুক্ত গ্রাম। গ্রামের পেট চিরে মাটির রাস্তা চলে গেছে নাড়ুয়ামালা হাট থেকে রামেশ্বরপুর হয়ে মহাস্থান বরাবর। গ্রামের উত্তর-দক্ষিণ দুই পাশেই বিল। ছাগল চরানো, শাক তোলা, বিলের ঘোলা পানিতে দলবেঁধে ডুব দেয়া, বিকেল হলেই গ্রামের একমাথা থেকে অন্যমাথা বেড়ানো, এইসব করেই তো শৈশবে কৈশোরে বেড়ে ওঠা। কৈশোরের স্কুল বন্ধুদের মধ্যে কোহিনুরও তো একজন। এক সাথে চলাফেরা করতে করতে কখন যে এক হয়ে যাওয়া, বুঝিইনি। প্রতি ভোরে কোহিনুর না ডেকে দিলে ঘুম ভাঙে না। চুপ করে শুয়ে থাকি ডাকার প্রতীক্ষায়। কখনো না এলে মন খারাপ দিয়ে সকালটা শুরু হয়। রাতে জোরে জোরে স্কুলের পড়া পড়ি, যদি শুনতে পায় সে। পাশেই তো বাড়ি। রাত জেগে পড়াশুনা করি, আমি ভাল ছাত্র এটা বোঝানোর জন্য। সেই পড়া কখনো কাজ দেয়, কখনো দেয় না।
আমরা পাথার শুদ্ধ হাঁটি। আমি, কোহিনুর, সাহেদা, জিনু। তিনজনের সাথে একজন। তিনজনই ক্লাসমেট। খেলার সাথী, শাক তোলার সাথী, বেড়ানোর সাথী। আমাদের দেখে সাহেদা, জিনু টিপ্পনী কাটে। আমরা হেসেই উড়িয়ে দেই। আমরা সাইকেল চালানো শিখি। বাবার সাইকেল। বিকো সাইকেল।

সাইকেলের সামনে কোহিনুরকে উঠিয়ে নিয়ে উঠানে বার বার চক্কর দেই। সাইকেল চালানোর আনন্দের চেয়ে সামনে বসানোর আনন্দ বড় হয়ে ওঠে। গোসলে নেমে আমরা ডুব সাঁতারের নামে কাছাকাছি আসি। কোহিনুরের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর সাহস আমাকে আরো সাহসী করে তোলে। আমরা সিনেমা দেখতে যাই। মেরিনা সিনেমা হলে ‘প্রেম বিরহ’ ছবির বদলে আমরা নিজেরাই বিরহী হয়ে উঠি। সিনেমা শেষে বাড়ি ফিরে দেখি আমরা আরো কাছাকাছি এসেছি। একা আর চলতে পারিনা। সকাল কিংবা সন্ধ্যায়। সন্ধ্যায় পুকুরের পাড়ে দেখা না হলে রাতটা দীর্ঘ হয়ে যায়, কালো হয়ে যায়, বিরহী হয়ে যায়। আমরা তুই থেকে তুমিতে নামি। তুই বলতে কেন যেন লজ্জা করে। ডাক বদল বন্ধুরা ভাল চোখে নেয় না। গন্ধ খুঁজে পায়। সেই গন্ধের ঘ্রাণ বাবার কাছ অবধি চলে যায়। যৌথসভায় বাবার হাতে পিটুনি খাই। নির্দয় পিটুনি। একা একা কাঁদি। কান্না শেষে কোহিনুরের কাছে যাই। কেননা, কোহিনুরইতো একমাত্র আশ্রয়। সারাটাদিন কোহিনুরের কাছাকাছি থাকি। তার পাশে বসে থাকি, তার পড়াশুনা দেখি, তার চুলে বিলি করে দেই। এইসব করেই তো দিনযাপন। এইসবের মাঝে কখন যে কবিতা লেখা শুরু করেছি, বুঝতেই পারিনি। কবিতায় খাতা ভরে যায়, কোথাও ছাপা হয় না। সংজ্ঞা না জেনেই গল্প লিখি, উপন্যাস লিখি। সেগুলো এখনো বাক্সে বন্দী। কোনদিনই পাঠক যা দেখবে না।
প্রেমটা যখন গাঢ় হয়ে ওঠে, বাবা আমাকে নিয়ে সাগাটিয়া ছাড়লেন। না হলে কোহিনুরের কাছ থেকে আমাকে মুক্ত করা যাবে না। বাবারা কেন এমন হয় ? বাবারা যদি ছেলে-মেয়ের কষ্টটা বুঝতো? গাবতলিতে এসে মনমরা হয়ে থাকি। সময় কাটে না, পড়াশুনায় মন বসে না। শরৎচন্দ্র পড়ি। দেবদাস পড়ি। চরিত্রহীন পড়ি। ছবির দেশে কবিতার দেশে পড়ি। এগুলো আনন্দের চেয়ে বেদনা দেয় বেশি। বেদনার আশ্রয় কবিতা। তাই কবিতা লিখি।
আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে শাবনূরের লাল অশ্রুভরা চোখ। সেই চোখ তো শুধু শাবনূরের নয়। তার প্রতিচ্ছবি আমি কোহিনুরের চোখে দেখতে পাই। কোহিনুররা কবিতা হয়ে বেঁচে থাকে।