মগ্নতায় বিবর্ণতা ॥ প্রদীপ আচার্য





বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিরতি ট্রেন ষোলশহর স্টেশনে থামলে প্রায় সব যাত্রী নেমে যায়। বিভিন্ন বগির আনাচে কানাচে বসে থাকা গুটিকয়েক যাত্রীর শেষ গন্তব্য বটতলী। আমার গন্তব্য বরাবরই স্টেশনবিহীন। স্টেশনবিহীনই কেন বলি, আমার মতো অনেকেই মাড়িয়ে যায় গৎ বাঁধা নিয়মের ষ্টেশন। ষোলশহর স্টেশনের পর বগি ফাঁকা হয়ে গেলে দেখি, এক যুগল আরও কাছাকাছি হয়। আমার পাশেই তারা বসে নিবিড় ভঙ্গিমায়, হাতের ওপর হাত। ফুরিয়ে আসা সময়ের বাকি পথটুকু তাদের মৃদুস্বর আমার কানে এসে বাজে। বাসায় আমার বিয়ের কথা চলছে। যুগল কণ্ঠের মৃদু গুঞ্জন শুনতেই মনে হল, তবে কি সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা পথ হাঁটে অনিশ্চিত স্বপ্নযাত্রায়। চিন্তার মগ্নতা সরিয়ে আমি সজাগ হই। প্রতিদিনের ট্রেনটা বটতলী স্ট্রেশনের কাছাকাছি এসেই ক্লান্তিতে হাই তোলে। উত্তরের পাহাড় আর সারি সারি উঁচু ছায়াদের কাছাকাছি এসে ট্রেনটি সবুজ নিঃশ্বাস নিতে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায়; আর তখনই আমি টুপ করে নেমে পড়ি দেওয়ানহাট ওভারব্রীজের নিচে। নামতেই স্বস্তি। ট্রেনকে ফাঁকি দিয়ে স্টেশনবিহীন পথে গন্তব্যের কাছাকাছি থাকতে পারার নিশ্চয়তা মনকে চনমনে করে তোলে। চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে প্রথম প্রথম ভয় পেতাম, ক্রমশ চৌকস হয়েছি এ খেলায়। মস্তিস্কে হামাগুড়ি কাটে প্রেমিক ছেলেটির কথা, অতো ভেবো না, বর্তমানকে নিয়ে থাক…

বিশ্বাস আর অনিশ্চয়তা একসাথে ভর করে মস্তিস্কে। হঠাৎ কিছু ভাবনা এলোমেলো পথ হাঁটে সেখানে আর আমি রেলপথ ধরে হাঁটতে থাকি পশ্চিমের পথে।
ফাল্গুনের মাঝামাঝিতে গত কয়েকদিনে সূর্যের তেজটা হঠাৎই বাড়তে শুরু করেছে। পড়ন্ত দুপুরে ক্লান্ত রেললাইনগুলো একটু যে জিরোবে সেই সুযোগ নেই। এ সময়ে রেললাইনের ওপর বাড়তে থাকে মানুষের পারাপার। দিনেশেষে বাড়ি ফেরার তাড়ায় উত্তর দক্ষিণে ছোটাছুটি করে হাজারো পা। ফেরীঅলার সংখ্যা বাড়ে রেল লাইনের দুধারে। কারো ঝুড়িতে তরকারী, কারো বা মৌসুমী ফল, সস্তা রঙ করা কাপড়, শুঁটকি, পিঠা আরো কতো কী। পশ্চিমের এ হাঁটা পথটুকু প্রতিদিন দেখতে দেখতে এতসব মানুষের মুখগুলো নিবিড়ভাবে চেনা হয়ে গেছে আমার। এমনই সহজ, সমান্তরাল জীবনের খোঁজে রেললাইনের নিবিষ্ট মোহ কারো কেড়ে নিয়েছে শৈশব, কারো বা বার্ধক্যের বিষণ্ন অবসর। তেমনই একজনকে এখানে মাছ বিক্রি করতে দেখি আজকাল। বয়স বড় জোর ন বছর। ক’দিন আগেও তার দাদীই এখানে মাছ বিক্রি করত। সে ছিল দাদীর একান্ত সহচর। আজকাল আর দাদীকে দেখি না। কী এক অসুখ করেছে তার, বিছানা থেকে নাকি উঠতেই পারে না আর। দেওয়ানহাট ব্রিজের নিচে গড়ে ওঠা গোটা দশ-পনেরো ঝুপড়ির একটিতে সে আর দাদী থাকে। মেঘনার ভাঙনে সব নদীর পেটে গেলে সে চট্টগ্রামে এসেছিল বাবার কোলে চড়ে। কবে, সেটা সঠিক বলতে পারে না। হাতের ইশারায় উচ্চতা দেখায়। তার বাবা নাকি রিক্সা চালাত, ট্রাকের ধাক্কায় রাস্তায়ই মরে পড়েছিল লোকটা। ঘটনাটা এতটাই নির্বিকারভাবে বলে সে, যেন ট্রাকের ধাক্কায় ব‍াবার এই মৃত্যু খুবই মামুলি ব‍্যাপার, নিতান্তই সাধারণ। বরং বাবা মারা গেলে মায়ের আবার বিয়ে করাটা তার বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে, দুচোখে প্রবল বিস্ময় নিয়ে ব‍্যাপারটার বিশদ বয়ান করে সে। তার মা, শীতের এক ঘোরলাগা সন্ধ্যায় কপালে বড় লাল টিপ লাগিয়ে, পরনে লাল ডুরে শাড়ি পেঁচিয়ে, আধহাত ঘোমটা টেনে ওভারব্রীজের ওপর থেকে ঝুঁকে আছে নিচে, হাত নাড়ছে তার দিকে তাকিয়ে। মায়ের অন‍্যহাত জড়িয়ে আছে অচেনা এক পুরুষের শক্ত বাহু। দুচোখে প্রবল বিস্ময় আর অবিশ্বাস নিয়ে সে দেখছে মায়ের এই অচেনা, অপরিচিত রূপ। কানে বাজছে দাদীর আক্ষেপভরা কণ্ঠ, হায় রে দুইন্না। প‍্যাটের পোলাডার কথাও ভাবলি না। ছেলেটার বয়ানে তার মাকে সেদিন শেষবারের মতো দেখার সেই দৃশ্যটা আমার চোখে ভাসে প্রায়ই। দৃশ্যটা বয়ান করার সময় দুচোখের বিস্ময় ছাপিয়ে সেখানে তার মায়ের জন‍্য জমাট তৃষ্ণা স্পষ্ট দেখতে পাই আমি। দুচারটে পোঁটলা, পুরনো কিছু বাসন, আর সামান‍্য বিছানার সরঞ্জাম নিয়ে তার আর দাদীর সংসার এখন, বছর দুই হল এখানে আছে তারা।
ট্রেন থেকে নেমে রেল লাইন ঘেঁষে বসা রুগ্ন এ বাজারটা অতিক্রম করতে হয় আমাকে প্রতিদিন। যেতে যেতে দেখি আর ক্রমশ বিশ্বাস করতেও শুরু করি যে, এই বিকেল আমারই জীবনের এক ক্লান্ত ক‍্যানভাস। মুছে ফেলার কথা ভাবি না। জানি, পরিবর্তনই সত্য। আমি মনে মনে ছেলেটিকে খুঁজি। দেখি খুদে সে ফেরীঅলা আজও রেললাইনের ধারে পুরোনো জং ধরা একটি থালায় ছোট, মাঝারী, সব মিলিয়ে গোটা বিশেক হরেক মাছ কেরোসিন কাঠের একটি পুরোনো ভাঙা বাক্সের ওপর রেখে বিক্রির জন্য পসরা সাজিয়ে বসা। পরনে প্রতিদিনের মতোই ময়লা হাফ প্যান্ট। এতটাই অযত্নে প্যান্টের বয়স বাড়ে যে, রঙ বোঝা দায়। গায়ে সাদা একটি অপরিষ্কার শার্ট। শার্টের ঠিক মাঝখানে একটি মাত্র বোতাম কোনো রকমে ডান বামের অংশকে একত্রে ধরে রেখেছে। আজ দেখি তার ডান হাতে একটি ছোট্ট খেলনা গাড়ী। আগে চোখে পড়েনি কখনো। ভাল করে খেয়াল করতেই দেখি গাড়ীটির পেছনের দুটো চাকা নেই। সামনে কেউ এসে দাঁড়াতেই ছেলেটি মাথা তুলে হাঁক ছাড়ে, মাছ লইবেন? মাছ? টাটকা মাছ হইব।

সামনে থেকে লোকজন চলে গেলে, কোলাহল কমে এলে, সে খেলনা গাড়ীটা তার শরীরের ওপর চালাতে থাকে, খেলায় ডুবে যায়। আবার সামনে কেউ এসে মাছ দেখছে মনে হলেই সে পুরোদস্তুর ব‍্যবসায়ী হয়ে আবারো প্রশ্ন করে, মাছ লইবেন? মাছ?
তার ছোট্ট শরীরের কালো ছায়া তখন পুবের রেল লাইনের কাছাকাছি ছুঁয়ে যায়। এ যেন সংগ্রাম আর সহজাত স্বভাব একসাথে চলা। নিজেকে শৈশবের আনন্দটুকু থেকে বঞ্চিত না করার এই খেলাটুকুতে আমি তার সহজাত শৈশবের স্বাভাবিক স্ফুরণ দেখি। মুখ দিয়ে গাড়ী চলার পিপ পিপ, ভুউউউমমমম ইত‍্যাকার ক্রমাগত শব্দের মধ্যে গাড়ীটি তার চিকন রোগা বাম হাত বেয়ে বুকে, বুকের ওপর দিয়ে নিচে নেমে তলপেট ঘুরে আবার উল্টো পথে চলতে থাকে। এভাবেই চলে তার খেলা। কখনও খেলার মনোযোগ তার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে বলতে ভুলিয়ে দেয়, মাছ লইবেন? মাছ? আবার খেয়াল ভাঙে। আবার সে হাঁক ছাড়ে জোরে। মাছের থালাটায়ও আজ কেমন এক অলসতা ভর করে। অন‍্যদিকে অতিক্রম করে আসা ওভারব্রীজের এখন দম ফেলার সময় নেই। অফিস ছুটির সময় শত গাড়ী ব্রীজের ওপর এপার-ওপারে দ্রুত গতিতে ছুটে যায়। নিচ থেকে ওপরের দিকে ওভার ব্রীজের দিকে তাকালে মনে হয় কোনো একশন মুভি চলে। খুদে মাছ ফেরীঅলার সেদিকে মনোযোগ নেই। গায়ের ওপর খেলনা গাড়ীটা চালানোর সময় সে থামে, ওভার ব্রীজের দিকে তাকায়, আবার চালাতে শুরু করে ছোট্ট শরীরটার ওপর। ব্রীজের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজে সে। তার মুখের ভাষা বুূঝতে আমাকে বেগ পেতে হয়। তার মুখের ওপর অসংখ্য দুর্বোধ‍্যতার প্রলেপ জমে সহজ রেখাগুলো গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। আর আমি দেখতে থাকি নিজের ভেতর তৈরী হওয়া, চেনা, পরিচিত কোনো পথ রচনায়, সংঘর্ষের ভয় এড়াতে চেনা পথেই নিয়মিত হাঁটা। আজ তার মাছ বিক্রিতে আগ্রহ নেই। নাকি আমিই সে হয়ে হারিয়ে যাচ্ছি ক্লান্ত রেলপথের বিকেলের গতিতে। ছেলেটি আরো জোরে তার শরীরের ওপর গাড়ীটা চালাতে থাকে, কাঁধ হয়ে বাম হাতের তালু ছুঁয়ে আবার ঘুরে এসে গতি নেয় তলপেটের দিকে। এবার বুকের কাছে আসতেই গাড়ীটা সোজা বোতামে লেগে বোতামটা ছিঁড়ে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়। কোথায় পড়ল বোতামটা। কোথায়? সামনেই মাছের থালা, থালায় পড়ল? খুঁজে দেখি তো। না না, থালায় তো পড়েনি। তাহলে নিশ্চয় মাটিতে। অথবা রেল লাইনের ফাঁকে। গাড়ীটা পকেটে রেখে ছেলেটি খুঁজতে থাকে বোতামটি। আমিও অদৃশ্য ছায়া হয়ে খুঁজি তার সাথে । ততক্ষণে শেষ বিকেলের মৃদু বাতাস তার শার্টের সামনের দিকটা হালকা করে উড়িয়ে দিলে শীর্ণ বুকের কালচে রঙ গোধূলীকে আহ্বান জানায়। রেলের গেইটম্যানের বাঁশির শব্দে একটি লোকাল ট্রেন ঝিমোতে ঝিমোতে পুবের দিকে সর্পিল ভঙ্গিমায় এগোয়। এতক্ষনের চেনা পরিবেশ মুহুর্তে পাল্টে গিয়ে হাঁক-ডাক, ছুটোছুটি শুরু হয় আবার। এখানে কোন স্টপেজ নেই, তবুও লাফিয়ে লোক নামতে থাকে অনেক। আমার দৃষ্টি শার্ট থেকে ছেঁড়া বোতামটিকে অসংখ্য বোতাম হয়ে রেলের চাকায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। বুুঝি টেনে নিয়ে যায় সময়কেও। ট্রেনটি চলে গেলে আমি তার আরো কাছে গিয়ে দাঁড়াই। দেখি বাম হাতের মুঠোয় দলা পাকানো তার শার্ট। শার্ট থেকে ছেঁড়া বোতামটি আর খুঁজে পায়নি সে। তবু তার চেষ্টা হারিয়ে যাওয়া বোতামটা খুঁজে পাওয়ার। আমি তাকে এড়িয়ে যাই। এড়িয়ে যাই নিজের অক্ষমতাকেও। যদি আমাকেও শুনতে হয়, মাছ লইবেন?

শব্দহীন চিৎকারে বলি, আমার কাছে মাছ কেনার টাকা নেই। টাকা বাঁচাতে চলন্ত ট্রেন থেকে এখানেই নামতে হয় আমাকে। সারা দিনের শেষে আমার পকেটে থাকে পাঁচ টাকা। গন্তব্য পথের খরচ কমাতে প্রতিদিন এ পথে হেঁটে উঠতে হয় মোড়ের বড় রাস্তায়। সেখান থেকে টেম্পু ভাড়া পাঁচ টাকা। সেটুকু অতিক্রম করতেই চোখ গিয়ে পড়ে দেয়ালে লেখা, কাজী অফিস। আজ এ লেখাটা অন্য রকম অনুভব নিয়ে হাজির হয় চিন্তায়। মনে পড়ে সে যুগলকে, ছেলেটির কথা, অত ভেবো না, বর্তমানকে নিয়ে থাক…
সময় আজ কি বড় ক্লান্ত, সত্যিই ক্লান্ত কি এ রেলপথ, নাকি ক্লান্ত দিনের শেষে পাঁচ টাকা বাঁচানোর আমার সুচারু চিন্তা। গোধূলী স্থির আজ। আমার মাথায় কিলবিল করতে থাকে অক্ষমতা, মাছ কেনার টাকা নেই। হারিয়ে যাওয়া বোতামটির হদিস কি আর মিলবে, প্রেমিক যুগলের অনিশ্চিত স্বপ্নের পথ, দিনের শেষে পাঁচ টাকা বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম। সামনে হাঁটতে হাঁটতে অমনোযোগে পেছন ফিরে তাকাই। পুবের ষ্টেশন থেকে একটি ট্রেন দ্রুত এদিকেই আসতে দেখি, পেছনে ফেলে আসা বাজার থেকে কোনো এক হাহাকার কানে আসে কি আসে না, বাচ্চা একটা ছেলে ট্রেনে চাপা পড়েছে…
ট্রেনের শব্দ আর মাথার ভেতর চলতে থাকা ভাবনা পেছনের চিৎকারটা ভাল করে শুনতে দেয় না। কেবল জোর করে আওড়াতে, একদিন সব মাছ কিনে নেব…