মনে হচ্ছিল, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান ॥ অদ্বৈত মারুত



সবকিছুরই একটা প্রস্তুতি প্রয়োজন, যেমন- খাওয়ার আগে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে নেওয়া, শরীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে উত্তমরূপে গোসল করা এবং গোসলটা গরম পানি দিয়ে হবে, না ঠাণ্ডাপানিতে- সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। লেখালেখির ব্যাপারটাও এ থেকে কম নয়। কী লিখব, কেমন করে লিখব- তার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন। ব্যাপক পঠন-পাঠনের মধ্যদিয়ে চেতনা জাগ্রত হয়। একজন লেখকের জন্য এটা খুব দরকারি। লিখতে লিখতেই বোধকরি, স্বরের ব্যাপারটা চলে আসে। এই যে আলাদা করে পাঠককে চেনানো, লেখাপাঠমাত্রই পাঠক ধরে ফেলবে- এটা অমুকের লেখা, তার জন্য দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। সত্যিকার অর্থে, লেখালেখির শুরুতে এসব বিষয় মাথায় ছিল না। ফলে গত শতাব্দীর নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে লেখালেখি শুরু করলেও, প্রথম বইপ্রকাশে পনেরো বছর লেগে যায়। অথচ সমসাময়িক বেশিরভাগ কবির বইপ্রকাশ পায় লেখালেখি শুরুর পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যেই।
‘বইপ্রকাশে দেরি হয়ে যাচ্ছে’-এমন একটা ভাবনা ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে তাড়া করে ফিরছিল। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি বই করতে। অর্থাৎ পরিচিত দুয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ, যাদের কবি ভাবতাম- জ্যৈষ্ঠ, সমসাময়িক- কেউ আমার কবিতা নিয়ে সেভাবে মন্তব্য করেননি; না নেতিবাচক, না ইতিবাচক। ফলে নিজের ভেতরে নিজেকে ক্রমে গুটিয়ে নিয়ে রেখেছিলাম ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এ সময় পর্যন্ত ছোটকাগজ ছাড়া জাতীয় কোনো দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিকে আমার কোনো কবিতা প্রকাশ পায়নি। পায়নি মানে নিজেকে ক্রমে গুটিয়ে রাখার কারণে পাঠানোর তাড়না অনুভূত হয়নি। ফলে এই পনেরো বছর পাঠের মধ্যেই ডুবিয়ে রেখেছিলাম নিজেকে। এই পনেরো বছর স্বল্প কিছু কবিতার পাশাপাশি লিখে ফেলি বেশ কিছু ছড়া, কিশোরকবিতা।
যেহেতু আমার কবিতা নিয়ে কারও তেমন মন্তব্য পাইনি, ফলে প্রথম বই হিসেবে কবিতার বইয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটুক, এমনটা চাইনি। শিশুতোষ লেখা নিয়ে প্রথম বই করব বলে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু সেখানে বাদ সাধলো অলংকরণ। কে করবে? শিল্পীর টাকা কোথায় পাব- এসব ভাবনা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। আর নিজেকে গুটিয়ে রাখায় এ নিয়ে কারও সঙ্গে তেমন আলাপও হয়নি কখনো।

‘বই একটা করতেই হবে’- ভাবনাটা মাথাচাড়া নিয়ে উঠল ২০১০ খ্রিস্টাব্দে। মনে হচ্ছিল, ‘লেখক হিসেবে সবদিক থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি। কাজেই নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে চাইলে এ বছরই একখানা পুস্তক দরকার’ ভেবে কবিতার পাণ্ডুলিপি গোছানো শুরু করি ওই বছরের জানুয়ারিতে। গোছাতে গিয়েই বাঁধলো আরেক বিপত্তি। যেটাই গ্রন্থভুক্ত করব বলে বেছে নিই, পরের দিন আবার পড়তে গিয়ে ফেলে দিই। এভাবে জানুয়ারির দ্বিতীয়, তৃতীয় সপ্তাহ পার হওয়ার পর আবারও সিদ্ধান্ত নিই ওই বছর বই না করার। চরম উত্তেজনা তখন। লেখা বাছাই করছি, বাকিগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছি। যেটা বাতিল করছি, সেটা সবখান থেকে ফেলে দিচ্ছি। ফেলে দেওয়ার পরের দিন আবার ওই বাতিল লেখাটা ভাবনায় অনুরণন তুললে ছিঁড়ে ফেলার জন্য বাড়তে থাকা ক্রোধে, ঘৃণায় কতভাবে যে নিজেকে জ্বালিয়েছি, পুড়িয়েছি, তার হিসেব নেই। এভাবেই ৩ ফর্মার একটা পাণ্ডুলিপি দাঁড় হয়ে যায়। সমকালে তখন শিল্পী দেওয়ান আতিকুর রহমান আমার সহকর্মী। ভয়ে ভয়ে একদিন বলেই ফেললাম বইয়ের একটা প্রচ্ছদ করিয়ে দেওয়ার জন্য। আতিক সজ্জন মানুষ, বন্ধুবৎসল; সমসাময়িক বলেই কিনা জানি না, রাজি হলেন। পাণ্ডুলিপি পড়তে চাইলেন। কয়েকদিনের ভেতর প্রচ্ছদ করিয়েও দিলেন। কিন্তু বইটি কোথা থেকে প্রকাশ হবে- জানতে চাওয়ায় আর সদুত্তর দিতে পারিনি। সত্যিই তো, তখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশনী সংস্থার সঙ্গে প্রাথমিক আলাপও হয়নি।

ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ। বিকালবেলা। সমকাল অফিসের বাইরে চায়ের দোকানে গল্প হচ্ছিল নানা বিষয় নিয়ে। বড়ভাই সাইফুল ইসলাম তখন সমকালে, মফস্বল ডেস্কে কাজ করেন। কথাপ্রসঙ্গে জানালেন, তারও প্রকাশনী সংস্থা আছে এবং ওই বছর কার কার বই করছেন। আমার কথা শুনে তিনি বই করে দেবেন বললেন। তার আশ্বাস শুনে ভেতরে এমন একটা অনুভূতি হলো, যা আগে কোনোদিন হয়নি। একদম ভিন্ন রকম; আগের এমন আনন্দ-অনুভূতির সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম না। উড়ু উড়ু, নারীর খোঁপাখোলা চুলের মতো; প্রেমিকার প্রথম হাত ধরার মতোও তো নয়। আহা, প্রথম সন্তানের পিতা হওয়ার পর ওই অনুভূতিটা আবার জেগে উঠেছিল কিছুটা। বোরহান আজাদকে দিয়ে সমকালেই মেকআপ দিয়ে, ওখান থেকেই ট্রেসিং পেপারে তা বের করে সাইফুল ভাইয়ের হাতে যেদিন তুলে দিলাম, সেদিনের অনুভূতি আরও হৃদয়ঘন, গভীর। চোখ দিয়ে দুয়েক ফোঁটা আনন্দাশ্রু পড়েছিল কী? হতে পারে।

কথা ছিল ফেব্রুয়ারি ১০ তারিখ বইটি মেলায় আসবে। বই এলে তবেই মেলায় যাব ভেবে ততদিনে আর মেলায় যাওয়া হয়নি। ১০ তারিখ বই এলো না। বই নিয়ে এই প্রথম মনখারাপ শুরু হলো। কবিতার বই করতে গিয়ে যে কিছু খরচ হয়- এমন ভাবনাটা তখন পর্যন্ত মাথায় ঢোকেনি। বইপ্রকাশ নিয়ে আগে কোনো লেখকের সঙ্গে কথাও হয়নি। আর প্রচ্ছদ, মেকআপ বিনে পয়সায় খুব সহজে হাতে পাওয়ায় ধরেই নিয়েছিলাম, একইভাবে বইটাও হাতে পাব। পাওয়া গেল না।

১৪ তারিখ। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এদিনও বই মেলায় আসার কথা থাকলেও এলো না। ২১ তারিখেও এলো না। ফলে প্রথম বইপ্রকাশ নিয়ে যতটা উৎফুল্ল ছিলাম, ততটাই ভেঙে পড়লাম। সাইফুল ভাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তাও ওই কয়েকদিন বন্ধ হয়ে গেল। দেখা হলেও না দেখার ভান করে থাকি। না কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করি যে, ভাই, আমি খুব ক্ষেপে আছি আপনার ওপর।
২৮ তারিখ বিকালবেলা। অফিস থেকে বের হবো। এমন সময় সাইফুল ভাইয়ের ফোন। নিচে নামো। শহিদের দোকানে আসো। সাইফুল ভাই মুরুব্বি মানুষ, বড়ভাই। তার সঙ্গে তো এই বই ছাপাছাপির শুধু সম্পর্ক নয়। তিনি আমার দুলাভাইয়ের বন্ধু। একই রাজনৈতিক আদর্শের মানুষ। একসঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন সিরাজগঞ্জে নিজেদের এলাকায়। ফলে তাকে ওই সম্মানটুকু সবসময় দেওয়ার চেষ্টা করতাম, করি।

শহিদের চায়ের দোকান। সাইফুল ভাই বসে আছেন। কাঁধে ঝোলাব্যাগ। পাশে বসতে বললেন। ব্যাগ থেকে বের করলেন ‘নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে’, আমার প্রথম কবিতার বই। ভেজা ভেজা, হাতে নিয়ে মনে হচ্ছিল, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান। এইমাত্র মায়ের পেট থেকে বের করে এনে হাতে তুলে দিলেন। মাত্র পাঁচ কপি। ‘আমার বই, আমার’! যতবার বইয়ের দিকে তাকাই, ততবার আনন্দে বুকের মধ্যে কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। যত পৃষ্ঠা উল্টাই, তত ভালো লাগার আবেশে চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু বের হতে থাকে। আমি আর মাথা তুলি না। তুললেই সাইফুল ভাই, শহিদ, দোকানে বসে, দাঁড়িয়ে চা পান করতে থাকা চোখগুলো আমাকে দেখবে; কে কীভাবে নেবে, কে জানে।

এভাবে কতক্ষণ বসেছিলাম, মনে নেই আজ। রাতে ভীষণ ঘোরের মধ্যদিয়ে বাসায় ফিরে না খেয়ে বইয়ের মুদ্রিত প্রতিটি শব্দ বারবার পড়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম রাত- আজ খুব মনে পড়ে।
‘নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে’ আমার প্রথম বই। একুশে বইমেলা ২০১০ খ্রিস্টাব্দে বইটি প্রকাশিত হয় ৩৬ পুরানা পল্টন থেকে। প্রকাশক সাইফুল ইসলাম। প্রকাশনী উত্তরাধিকার ’৭১। মূল্য ৭০ টাকা। বইটি উৎসর্গ করা হয় আব্বা আর মাকে। এই বইটি নিয়ে একটিই আলোচনা প্রকাশ হয় অচিন্ত্য চয়ন সম্পাদিত সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘অদ্রি’তে। আলোচনা করেছিলেন অনুপম হাসান।