মাটির ঘ্রাণ ॥ মনিরুজ্জামান খান


লোকটি হাঁটছে। সারাদিন টই টই করে হাঁটে। শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা। কখনো ভ্রমণ ব্যাগ নিয়ে, কখনও বাজারের ব্যাগ, কখনো বা অন্য কোনো ব্যাগ হাতে। কোনো দিন বোতল কুঁড়োয়, কোনো কোনোদিন সস্তা সবজি কেনে বা বিস্কুট পাউরুটি।

লোকটি মধ্য বয়সী, অবিবাহিত। শরীরটা বেশ ভারী। এই যে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে তাতে ক্লান্ত হয় কিন্তু পরোয়া করে না। লোকটি যে পোশাক-আশাক পড়ে সেটাও খেয়াল করার মত। কখনো পড়ে শরীরের আকারের চেয়ে বড় পোশাক। কখনো টাইট, কখনো ঠিকঠাক মতো কেতাদুরস্ত পোশাক। কখন কেনো বা কোনটা পড়ে বোঝা যায় না। তবে বেশীরভাগ সময় পড়নের কাপড়ে ময়লা থাকে বা প্যান্টের সেলাই খোলা বা শার্টের অংশবিশেষ ছেঁড়া। এসব নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই।
খলিফা পট্টির ব্যস্ত রাস্তা। রিক্সা চলছে, মানুষ হাঁটছে। লোকটি যে পথে আসছে। তার বিপরীত দিক থেকে আসছে দুজন। একজন যুবক অন্যজন বালক। লোকটিকে দেখে বালকটি বলল, আপেল পাগল, আপেল পাগল, আপেল পাগল। এতেও লোকটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হাঁটছে তার রাস্তা ধরে। তবে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্রলোক প্রতিবাদ করল। বালকটিকে বলল, এই তুমি ওনাকে পাগল বলছ কেনো?
ছেলেটি চতুর চাহনিতে হাসতে হাসতে চলে গেল।
বালকটির সাথে থাকা যুবকটি জানতে চাইল- এই আপেল পাগল কি? সেকি আপেল খেতে খুব পছন্দ করে? বালকটি বলল, না, লোকটির নাম আপেল।

জন্মের সময় তার চেহারা ছিল টসটসে আপেলের মত। তাই হয়তো বাবা-মা নাম রেখেছিল আপেল।
লোকটি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিল, আমেরিকায়। আমেরিকার নাগরিক সে। এখনও যেকোনো সময় সেখানে যেতে পারে। বাধাহীন ভাবে থাকতে পারে। কিন্তু যায় না। যেতে ইচ্ছে করে না।

এক সময় আমেরিকা যাওয়াটা ছিল তার স্বপ্ন। বাবা-মায়ের হাত ধরে আমেরিকা গেল বটে কিন্তু থিতু হতে পারলো না। হোটেলে ডিশওয়াশিংয়ের কাজ করল, রাস্তায় গাড়ী চালাল, পেট্টোলপাম্পে চাকরি করল কিন্তু ভালো লাগল না। কারণ তার ঝোঁক ছিল, ভালোলাগা ছিল গণিত শেখা। গণিতে পাণ্ডিত্য অর্জন করা। সেটিই আর হয়ে উঠলো না। স্বপ্নভঙ্গ হল। অথচ আমেরিকার জীবন-যাপনে টিকে থাকার জন্য এতো চাপ নিতে হচ্ছিল যে তার দম রুদ্ধ হয়ে আসছিল। আগে বাবা মারা গিয়েছিলেন এবার মা মারা গেলেন। মায়ের লাশ নিয়ে আমেরিকা থেকে দেশে ফিরলেন আপেল। আর ফেরা হল না আমেরিকায়, ফিরতে ইচ্ছে করল না। ভাই-বোনেরা টেলিফোনে বোঝাল, চাপ দিল কিন্তু কিছুতেই আর ফিরলো না সে।

লাশ দাফনের পর, মায়ের শেষ অনুষ্ঠানাদির পর, আত্মীয়-স্বজন চলে যাওয়ার পর আপেল তালুকদার পৈত্রিক বিশাল বাড়ীতে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমালো, একদিন দুইদিন তিনদিন। তারপরেই শুরু হল ঘুমের সমস্যা। বিপরীত সময়ের দেশ থেকে আসার কারণে রাতে আর ঘুম হয় না। সারারাত কুট কুট করে কাজ করে। একবার কাগজ কেটে টুকরো করে, টুকরোগুলো বস্তায় ভরে। আবার সেগুলো বস্তা থেকে বের করে গণনা করে। কখনো বই পড়ে। বই পড়তেও অভিনব এক পদ্ধতি অবলম্বন করে। বইয়ের পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে আলাদা করে। অধ্যায় অনুযায়ী ভাগ করে। তারপর পড়তে শুরু করে। এভাবেই কাটছিল রাতগুলো। কিন্তু দিনের বেলা মহাবিরক্ত হয়ে উঠলো আপেল।

প্রায়ই প্রতিবেশীরা তাকে দাওয়াত করে খাওয়ায়। বন্ধু-বান্ধবরা আসে। সবারই যেন একটা উদ্দেশ্য আছে। তারা আমেরিকায় যাওয়ার ম্যাজিকটা জানতে চায়। আপেল তাদের নিরাশ করে। বেকার বন্ধু, নিম্নবিত্তের প্রতিবেশী তারাও আসে, আমেরিকা প্রবাসী এই বোকা-সোকা মানুষটার কাছ থেকে কিছু টাকা খসানো যায় কি-না। তারাও নিরাশ হয়। আপেলের মনে হয় পৃথিবীটাই যেন হয়ে উঠেছে ব্যক্তিস্বার্থের ধান্ধা।
এভাবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সে একা হয়ে যায়। কিন্তু একটি কাজ শুরু করে, গোপনে। নিম্নবিত্তের প্রতিবেশীদের শাক-সবজি কিনে দেয়, সাবান-ডিটারজেন্ট কিনে দেয়। ধারণা করা হয়, এই গরীব মানুষদের পুষ্টি এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু বিত্তবান বন্ধুদেরও যখন কম মূল্যের সাবান উপহার দেয় তখন পর্যবেক্ষদের ধারনাও এলোমেলা হয়ে যায়। তারা বিষয়টা বুঝতে পারেনা। অপরিচ্ছন্ন মনে হয়। সন্দেহ হয়। তবে কী এই উপহার দেয়ার পিছনে কোন উদ্দেশ্য আছে? সে কী মনের ময়লা পরিস্কার করার কথা বলছে? আপেল এসবের কিছুই বলে না।

অন্যদিকে তার এই সহজ-সরল জীবনে যে একটা কালো মেঘ আনাগোনা করছে এটা সে ঠাহর করতে পারে না। বিক্ষুব্ধ প্রতিবেশী, ধান্ধাবাজ বন্ধু, আপেলের ভালো চায়, এমন মানুষও তাদের মধ্যে আছে যারা আমেরিকা প্রবাসী তার ভাই-বোনদের সাথে ফোনে কথোপকথন করে বা কথা লাগায় বা তার কর্মকাণ্ড জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয় ভাই-বোনেরা। যার ফল ফললো তড়িৎগতিতে। আপেল তালুকদারের কাছে অর্থ আগমনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল।

আপেল দমবার পাত্র নয়। উল্টো স্রোতে নৌকা বাওয়া মানুষ। ধুম করে ঘোষণা করল সে ক্যারি আউট জব করবে। এই সমাজে যাকে ফুট-ফরমায়েশের কাজ বলা হয়। কারো বিদ্যুতের বিল জমা দিয়ে দেয়, কারো গ্যাস বিল, কারো বা ব্যাংকে ছোট ছোট অংকের টাকা লেনদেন করে দেয়। তাতে পারিশ্রমিক হিসেবে যে তুচ্ছ টাকা পায় তাই দিয়ে ঝোল আর রুটি বা ভাত আর ঝোল খায়। মাঝে মাঝে চাষের পাঙ্গাস মাছ দিয়েও পেট ভরে খায় যাতে শরীরে প্রোটিনটা ঠিক থাকে। শুক্র ও শনিবারে সুযোগ পেলে অনিমন্ত্রণে দাওয়াতও খেতে যায়। আয়োজকরা তাচ্ছিল্য করে কিন্তু খেতে দেয়।

আত্মীয়-স্বজন, বিত্তবান বন্ধুদের সম্মানে ঘা লাগে। তারা আরো দূরে চলে যায়। আমেরিকায় ফোন চালাচালি করে। তাদেরও মান-সম্মান চুরমার হয়ে যায়। ভাই-বোনেরা আমেরিকা থেকে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ক্যারি আউট জব বা ফুট ফরমায়েশের কাজ বন্ধ করার কথা বলে। আপেল মনে করে সব কাজই কাজ। কাজের আবার ছোট বড় কী। কোন নিষেধাজ্ঞাই মানে না আপেল তালুকদার। বরং দিন দিন নিম্নবিত্ত মানুষের সাথে তার জীবন একাকার হয়ে যায়।

আচমকা একদিন পৈত্রিক ভূমি থেকে ফসলের টাকা পায়। এই টাকা তার কাছে উদ্ধৃত্ত মনে হয়। তার বাড়ির বিশাল আঙিনায় ছিন্নমূল মানুষের জন্য ঘর তুলে দেয়। দেখতে দেখতে এই বাড়ীটা বস্তিবাড়ীতে পরিণত হয়।
এই ভেসে আসা মানুষগুলোকে আশ্রয় দিয়ে তার যেমন ভালো লাগে মাঝে মাঝে খারাপও লাগে। খারাপ লাগে তখন, যখন তাদের চালাকি দেখে। যখন তাদের আপন স্বার্থের হিংস্র প্রকাশ দেখে।

একদিন এই বস্তিবাড়ীর একটি মেয়ে তাকে খাবার দিয়ে যায়। অনেক দিন পর আপেল আনন্দ পায়। খেতে গিয়ে মায়ের হাতের স্পর্শ পায়। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ ভেতর থেকে কান্না উথলে ওঠে। কিছুতেই থামাতে পারে না। চিৎকার করে কাঁদে। বন্ধ ঘর থেকে কান্নার শব্দ বাইরে যায় না। কেউ শুনতেও পায় না।

একজন লেখকের সাথে আপেলের পরিচয় হয়। কথা হয়। লেখকের বই কেনে। তারপর থেকে প্রতিদিন সে লেখকের কাছে একবার করে আসে। তাকে সিগারেট কিনে দেয়। কি লিখছে তার খোঁজ নেয়। লেখক বুঝতে পারে না, যে লোকটি ফুটফরমায়েশের কাজ করে সামান্য অর্থ জোগাড় করে সে কেনো প্রতিদিন তাকে সিগারেট কিনে দেয় বা মাঝে মাঝেই তার বই কেনে।

হঠাৎ লেখকের মনে হয়, সে কী তাকে এমন কোন লেখা লিখতে বলে, যা পড়ে সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের যে যুদ্ধ চলছে তা থেমে যাবে।
একদিন রাতে আপেল খুব ক্লান্ত বোধ করে। তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়ে। তারপর নিজেকে আবিস্কার করে হাসপাতালের বিছানায়। সে বুঝতে পারে না এখানে কেন। পরে জানতে পারে রাতে সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তার উঠানে বসবাস করা ভেসে আসা মানুষগুলো তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। এখনও তার শরীর দূর্বল, ক্লান্ত। একা একা ওঠে বসতে কষ্ট হয়। ডাক্তার জানিয়েছে দীর্ঘ অনিয়ম, ভারসাম্যপূর্ণ খাবারের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে খবর ছড়িয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে আমেরিকা প্রবাসী ভাই-বোনেরা জেনেছে। তারা উদ্বিগ্ন। বড় বোন মোবাইলে ধমকের সুরে বললো, অনেকতো হল, এবার আমেরিকায় চলে আয়, আমি টিকেট পাঠিয়ে দিচ্ছি।

আপেল হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে। বড় বোন আমেরিকায় যাওয়ার টিকেট পাঠিয়েছে। শরীরটা ক্লান্ত। মনটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকায় চলে যাবে।
সোল্ডারওয়ালা দুই পকেটের শার্ট পরেছে আপেল। অনেক মানুষেরই এই ধরনের শার্ট পরতে ভালো লাগে। তবে আপেল পরেছে ফিদেল ক্যাষ্ট্রো এই ধরনের শার্ট পরতো বলে।

বৃষ্টি পড়ছে। ঝুম ঝুম বৃষ্টি। ভালো লাগছে আপেলের। বৃষ্টি তাকে টানছে। প্যান্ট-শার্ট পরেই নেমে পড়লো বৃষ্টিতে। হাঁটতে হাঁটতে পৌছলো বিশাল কলেজ মাঠে। বৈশাখ মাসের প্রথম বৃষ্টি। মাটির ঘ্রাণ ভেসে আসে। বুক ভরে বাতাশ নেয়, ঘ্রাণ নেয় আপেল। সারা শরীর ভিজে জ্যাব জ্যাবে। হঠাৎ তার মনে হলো আমেরিকা যাওয়ার টিকেট তার পকেটে। টিকেটটা বের করল পকেট থেকে। ভিজে একাকার। ব্যবহার যোগ্যতা নেই। হতাশ হয়। ঠিক সেই সময় বৃষ্টির ঝাপটা মুখে এসে লাগে। ভেসে আসে মাটির ঘ্রাণ। মোহিত হয় আপেল।