মাতাল নদীর প্রত্নবিহার : বেদনা জাগানোর কাব্য ॥ ফাতেমা আবেদীন নাজলা

বইটা হাতে নিয়ে উলটে-পালটে দেখার সময় বইয়ের নামে চোখ স্থির, ‘মাতাল নদীর প্রত্নবিহার’। চোখের সামনে ভেসে উঠলো উদ্দাম এক নদীতে সাঁতরে চলছেন সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিকরা। প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, কামনার বাসনার পুরাকীর্তির সন্ধানে এবার প্রত্নতত্ত্ববিদের খোলসে ঢাকা প্রেমিকরা অবগাহনে নেমেছে প্রেমের নদীতে।

৫৩ কবিতার যে মালা গাঁথা হয়েছে এই বইটিতে, তার সবই প্রেমের বিশাল মহাকাশ স্থাপন করেছে কাব্যমহিমায়। কবি সম্ভবত জীবনানন্দ শিষ্য। প্রকৃতি আর প্রেমের প্রতিস্থাপন, যোজন, বিয়োজন, অভিযোজন; সব কিছুই কবি জীবনানন্দের কবিতায় পাওয়া যায়। এখানেও ঠিক তেমনি করে প্রকৃতি আর প্রেমের অবাধ্য মিলন খুঁজে পাবে পাঠক।

কাব্য পাঠে প্রথমেই পাঠকরা ঝোঁকেন কাব্যধারার দিকে। হালের কাব্য ধারা আধুনিকতার দুয়ার পেরিয়ে উত্তরাধুনিক গণ্ডিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। যেখানে নেলসন ম্যান্ডেলা আর বারাক ওবামারা সগীরের মায়ের থেকে ঝাল সরিষা চাটনি দিয়ে চিতই পিঠা খান। আর সে সময় তাদের পাখায় ওড়ে মহাকাশচারী কোনো জীব। সেই ধারার কাব্যপাঠকরা একটু বিভ্রান্তির মধ্যেই পড়বেন, কারণ এখানে কোনো উত্তরাধুনিক কবিতা নেই। বরং আধুনিকতার মোড়কে জড়ানো কিছু অতি প্রাচীন প্রেমময় কবিতার সন্ধান নিজেকে চোখ বন্ধ করেই প্রত্নতত্ত্ববিদ করে তুলবে। যদিও ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ নামে কবিতাটির শব্দ বিন্যাসে উত্তরাধুনিক হতে গিয়েও পরিসমাপ্তি টানা হয়েছে আদিম চেতনাময় প্রেমে। ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ নামটি একটু পরিচয় করিয়ে দেয় বৈকি কবিতাটি কেমন হতে পারে? যেখানে কবি একজন মৃত বাঘ। আর এই কবিতার কাব্যধারা যাই হোক না কেন, নামের কল্যাণে ঠিকই কবি উৎরে যাবেন। আষাঢ় মাসের গল্পগুলোতে কত কীই-না থাকে।

মানুষ নাকি একটি বই পড়ে একজন লেখককে আদ্যোপান্ত অনুভব করতে পারে। লেখকের বই তার বিমূর্ত প্রতিকৃতি। কারও যদি খোঁজার সাধ হয় লেখক মানুষটি কেমন, তবে বইটির প্রথম কবিতা তাকে পরম কামনাময় প্রেমিক পুরুষ হিসেবে আবিস্কার করলেও দ্বিতীয় কবিতায় পাঠকরা নড়েচড়ে বসবেন তার বিশেষণ খুঁজতে। এখানে তিনি একজন হতাশ বিষাদগ্রস্ত মানবাত্মা। প্রেতাত্মার কাছে আত্মসমর্পণকারী একজন আষাঢ়গ্রস্ত মানব। সময়ের আবর্তনে যে হৃদয়ে আষাঢ়ের বর্ষণ।

লেখকদের এই বদলে যাওয়ার বা কল্পনাশক্তির কারণে হয়তো তারা পাঠকের কাছে বহুরূপী হরবোলা হয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। এই টিকে থাকার বহু ছন্দ, ভাব, আবেগের আনাগোনাকেই সাহিত্য বৈচিত্র্যময়তা বলে বিশ্বাস করে। আর এখানেই কবি সাফল্যের সিঁড়িতে পা রেখেছেন। বৈচিত্র্যের অভাব নেই। প্রকৃতির প্রতিটি ছন্দময়তা উঠে এসেছে কাব্যে। সমুদ্র, মেঘ, নক্ষত্র, ঋতু বদলের খেলা, নদীর উথাল-পাথাল, কুয়াশার বর্ণহীন আলোকমালা। ভেসে যাওয়া শাপলা-শালুক, বৃক্ষের দৃঢ়তা, জলজের বহমানতা, বাতাসের গান, সূর্যের আবাহন, দিবসের ভাগ, পাহাড়ের বিশ্বাস- কী নেই এই তেপ্পান্ন কবিতার শব্দমালায়। সুনিপুণ হাতে দক্ষতার সঙ্গে প্রকৃতির যে ছবি তার কবিতায় বিদ্যমান, তা অনায়াসে পাঠককে মুগ্ধ করবে। যেন প্রকৃতিতেই জনম, প্রকৃতিতেই নিমজ্জমান এক অহর্নিশ জীবন।

কবিতা পাঠ করার সময় পাঠক যা নিয়ে নড়েচড়ে বসেন, তা হলো ব্যাকরণ। কবিতার ব্যাকরণ। এটা অবশ্য অভিজাত পাঠকমাত্রই বুঝতে পারেন। কারও কাছে কবিতা শুধুই মনের ভাব প্রকাশ শব্দের মাধ্যমে। কারও কাছে কবিতা অষ্টক ষটকের সিঁড়ি টপকিয়ে শুধুই বিভাজনের ব্যাপার। আবার কেউ-বা নাকের ডগার চশমাটা একটু আঁটো করে নিয়ে তাকিয়ে দেখেন। তাদের মতে, কবিতার কিছু ধরা-বাঁধা নিয়ম আছে, যেটাকে সোজা বাংলায় ব্যাকরণ বলা যায়। মানে কবিতার ব্যাকরণ। এই সব ছাড়া কবিতা লিখলে কবিতা হবে না। সেই সব পাঠককে আধুনিক কবিতা পড়তে গিয়ে একটু হতাশ হতেই হবে। কারণ মোহাম্মদ নূরুল হকের এই কবিতার বইটিতে ছন্দ, ছেদ, যতির যে বিন্যাস বা বিভাজন রয়েছে, তা ছাপিয়ে প্রকট হয়েছে কাব্যভাব। বলার প্রচণ্ড ইচ্ছা প্রাকৃতিকভাবেই এক অপূর্ব বিন্যাস তৈরি করেছে।

দেখো। দেখো–পার্বতীর স্নানঘাটে জলেরা লিরিক
ঘুমভাঙা ঢেউ জাগে নিতম্বের ঢলে
আর ডানে দুলে উঠে মেধার অহম
কবিরাই অহংকারী-মুর্খের লাশে ভারী শশ্মান-কবর
...
দেখো দেখো
পার্বতীর স্নানঘাটে
জলেরা লিরিক
ঘুম ভাঙা ঢেউ জাগে
নিতম্বের ঢলে 

এ রকম চরণের বিভাজন ছাড়া অন্য কোনো ব্যাকরণ খোঁজা নিতান্তই ভুল হবে। আহ্বান আর বিশ্লেষণের যে আন্তরিক সম্মেলন ঘটানো হয়েছেম তাতে কবিতার ব্যাকরণ বোধ করি না থেকেও উপস্থিত। অন্যদিকে

অসুখী বয়সী এসে দাঁড়িয়েছি হাওয়ার কার্নিশে-বাতাসেরা আজ বড় উদাসীন।
হাওয়াদের মাঠে মাঠে ডুবে যাচ্ছে জোনাকির জ্বলন্ত হৃদয়।
বালিকারা প্রজাপতি নিপুন রাধিকা; কবিতার ভাঁজপত্রে জ্বলে ওঠে বালকের মন।
কেন আজ গান শোনে অবেলায় বিকেলের তরুণ হৃদয়?
মুঠোফোনে বাজে বাঁশি বাবলার সারি কাঁদে রাধিকার অশ্রুভেজা কাঠের উনুনে।
ভাদ্রের আকাশে ভাসে বয়স্ক দুপুর-গলে আলেয়ার কোমরের ভেজা ভাঁজে ভাঁজে
অসুখী বয়সে এসে বাতাসেরা বড় উদাসীন-হাওয়াদের মাঠে মাঠে জ্বলছে হৃদয়।

এই কবিতায় গদ্যভাব প্রবল। হয়তো এটাকেই পাঠক মুক্তছন্দ বা গদ্যকবিতা ভেবে পাঠ করবেন। কেমন একটি বিচ্ছিন্ন আহত সময়ের গান এই কবিতায় কী ছন্দ দিয়েই না গাইলেন!

এই কাব্য গ্রন্থের সবচেয়ে বড় গুণ এখানে দুর্বোধ্যতা নেই। অন্তস্থঃভাব একটি সরল অর্থোবোধকতা তৈরি করেছে। সৃষ্টি করেছে কাব্যিক আকুতির যা নিঃসন্দেহে কাব্য পাঠ করার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে। পাঠকরা যদি মনে করেন পাঠ করা মাত্রই তাতে স্পর্শের অনুভূতি পেতে হবে, সেক্ষেত্রে কবি স্পর্শ জাগাতে পেরেছেন পাঠক হৃদয়ে।

কত সূর্য পুড়ে যায় বিধবার উষ্ণ দীর্ঘশ্বাসে
রাখি নাই সে খবর
লিখি নাই সে রকম খুব কোন জলজলিরিক
এত প্রেম-অসহ্য আমার
আজ খুব ঘৃণা প্রয়োজন
কেউ থাকুক আমার-আমি যার ঘৃণার পুরুষ।

কাউকে কামনা করার সে কী তুমুল আবেদন! কেউ থাকুক আমার, আমি যার ঘৃণার পুরুষ। প্রেমের বেদনায় অসহ্য প্রেমিকারা হয়তো আক্ষেপে, অন্তঃযন্ত্রণায় ঘৃণার পুরুষ হতে চায়, যা কবির শব্দমালায় বন্দি হয়েছে। যাতে অতীত থেকে শুরু করে ভুত-ভবিষ্যৎ সব জায়গায় পা রাখতে হয়। তবে কখনো কখনো অতীতচারণ পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার মতো বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। লেখক মাত্রেরই এই বিষয় মাথায় রাখা উচিত। মোট তেপ্পান্ন কবিতার বইটিতে কতবার যে চণ্ডীদাস, রাধিকা এসেছেন, বেহুলা লখিন্দর এসেছেন, দেবালয় ছেড়ে কৃষ্ণ আর পৌরানিক কাহিনি, সব এই কবিতায় এসে বাসা বেঁধেছে। এর দুটো কারণ পাঠক আবিষ্কার করতে পারে:

১। কবির অতীতপ্রীতি রয়েছে এবং এই ইতিহাস ছাড়া তার জানার গণ্ডিটা মেঘফ্রাই করে খাওয়ার মধ্যে কিংবা গেলাসে গেলাসে প্রেমের তরল পানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
২। কবির খুব প্রিয় চরিত্র এই সব চরিত্র, যার ফলে বারবার খুঁজে পাওয়া যায় এসব

হারমোনিয়ামে গলা সাধি মৃত লখিন্দর
আমার লাশের গন্ধে বিব্রত ঈশ্বর কাঁদে বেহুলার কোলে

অথবা-

লং শটে বন্দি করি লখিন্দরের বাসর
আজ যদি বুধবার, তবে তুমি রাধিকা হওনা কেন?

নয়তো বা–

এসো সখী রজকিনী জলছত্র খেলো
লাফিয়ে উঠুক মুঠোবন্দি রাধিকার স্তন
জলন্ত সূর্যের ঠোঁটে চুম্বন একেঁছি চণ্ডীদাস।

বারবার ঘুরে ফিরে এই চরিত্রগুলোর বিচরণ নিঃসন্দেহে কোনো সরল পাঠকের মনে বিরক্তির কারণ ঘটাবে। নয়তো করে তুলবে সন্দেহপ্রবণ। আরও যে দুজন মানুষ লেখার মধ্যে সাবলীল বিচরণ করেছেন তারা হচ্ছেন লালন ও হাসন।

লালন কে নিয়ে গোটা একটি কবিতা রয়েছে–সভ্যতাকে সমর্পণ করেছেন লালনের হাতে। এই কবিতার মাধ্যেমে কবির লালনভক্তির তীব্রতা খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্য আরেকটু বিচার বিশ্লেষণ করে দেখলে অনায়াসে অনুভব করা যায়, লেখক হয় চিত্রকর, নয় চিত্রকলা গবেষক। যে হারে অনায়াসে ছবি এঁকে গিয়েছেন সভ্যতার, অতীতের। আর কত ছবির তো অঙ্কন শেষে পান করে নেন গেলাসে গেলাসে। কবিতার আস্বাদন হয়তো চিত্রকররাও পাবেন। তাই এই আবাহন।

এত আনন্দ, এত প্রেম, এত বেদনা, এত বিচ্ছেদের অবুঝ কবিতার মাঝে নির্লিপ্তের মতো ঠাঁই দিয়েছেন, ‘ছুটির ঘণ্টার’, ‘মৃত্যু দিনের’। মাতালও শবযাত্রা চেনে। শেষ সময়কে সবার ভয়। তাই এত বৈচিত্র্যময়তার মধ্যে মৃত্যুর আলাপনকে আমি নেহায়েত সচেতনতাই বলবো।

তুমি আমি এবং কবিতার সংসার

এইরাত নদী হবে খরস্রোত…তুমুল শব্দের
কবিতার সরোবরে রাজ হাস কাটুক সাঁতার
তুমি আমি ভেসে যাবো লখিন্দর বেহুলার গ্রামে
তুমি আমি রাধাকৃষ্ণ…শিরি-ফরহাদ;
না কি আমি দেবদাস; তুমি সেই বিখ্যাত পার্বতী?

বরং তুমিই বলো কোন নামে তোমার সম্মতি!

এই কবিতাই প্রমাণে যথেষ্ট যে কবি তার কবিতার প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল সংসারের রমণী সন্ততির পাশে কবিতাও একটি উপাদান। চাইলেও ছাড়তে পারবেন না কবিতা নামের সংসার। যেখানে কবি অসহায় প্রেম ও কবিতার সাথে।

সব মিলিয়ে গতানুগতিক আধুনিকতা বজায় রেখে এটি একটি চমৎকার বই। পাঠকদের মনে নিঃসন্দেহে বিশাল একটি ছাপ রাখবে।
মাতাল নদীর প্রত্নবিহার হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর কাব্য। নির্দ্বিধায় পাঠকের মনের ভেতরে প্রবেশ করে যাবে। ৬৪ পৃষ্ঠার এই বইটির মনোরম প্রচ্ছদ করেছে মোস্তাফিজ কারিগর। প্রকাশ করেছে ভাষাচিত্র। মূল্য নব্বই টাকা।

পাঠক হিসাবে জোর দিয়ে বলতে পারি, নিতান্তই কারও যদি এই কবিতার বইটি ভালো লেগে না থাকে, এর উৎসর্গপত্রটি আপনাকে চমকে দেবে।

আজ আমি আকাশের নীল বল্কলে ঢেকেছি আমার পৌরুষ
মৃত হরিণের হাড়ে জেগে ওঠে মুদ্রাহীণ নটীর কোমর
আদিগন্ত অনিবার্য পাপে ডুবে যেতে যেতে পুড়ি মনস্তাপে
পৌরাণিক বিকেলেরা হেটে যায়-গিলে খায় ঘুমন্ত নগর

বাতাসের ক্যানভাসে আঁকা নেই ঈশ্বরের সরল আবেগ
মহাকাল চেয়ে দেখে কালমঞ্চে ভেসে যায় মাটিগন্ধা মেঘ-

কবি ও তার কাব্যগ্রন্থের উত্তোরত্তর সাফল্য কামনা করি। কাব্যময়তায় ভরে যাক আমাদের দিন। আলোতে আসুক এই সব ভালো লাগার ভালোবাসার কাব্যকথা।