মানুষ বোঝা দায় ॥ মণীশ রায়




ওর নাম শিনু।
আদি বাড়ি নেত্রকোনার কাজলায়। বেশ নাদুস-নুদুস থলথলে শরীর, পোয়াতি নারীর মতো। গায়ের রং গাঢ় বাদামি, মাথার ঠিক মাঝখানে একটুকরো স্ট্রবেরি-ঝুঁটি। পা ফেলে সুখি চালে; কেবলি চোখ ঘুরিয়ে ডানে-বাঁয়ে দেখার অভ্যেস। মনে হয় খাবলা দিয়ে একসঙ্গে চারপাশে কী ঘটছে সব দেখে ফেলবে এক লহমায়। মুখে অনর্গল-অবিরাম কথার ফোয়ারা, কক-কক, কক-কক। থামতেই চায় না।
যে-ফড়িয়া ওর মতো আরও অনেককে ঢাকা-ময়মনসিংহ বাসটার মাথায় তুলে দরমার দমবন্ধ খাঁচায় করে এ শহরে বেশি লাভে বিক্রি করার ধান্দায় এনেছিল, শিনু সেখান থেকে পালিয়ে আসা এক তেজী পক্ষী।

চোখের সামনে বিশাল-বিপুল ঢাকা; এ শহরে জীবনে এই প্রথম। অচেনা সুন্দর সব রাস্তাঘাট। চোখের সামনে যা কিছু সব ওর তুলনায় অতিকায়, দৈত্যাকৃতি; মাটি থেকে ক্ষুদে শিনুর দৃষ্টি ইট-কাঠ-লোহার আস্তরণে ঢাকা এক-একটি বিল্ডিংয়ের মাথা পর্যন্ত পৌঁছুতেই চায় না। এটুকুন মানুষের এতো বৈভব? ওর অবাক দৃষ্টি প্রসারিত-সঙ্কুচিত হয় ক্ষণে ক্ষণে।

এদিক-ওদিকে ছুটে বেড়ায় শিনু। যত দেখছে তত বিষ্মিত হচ্ছে। কিন্তু ছুটে ছুটে যা সে খুঁজে পেতে চাইছে তা পাচ্ছে না। সে দিগবিদিক ছুটাছুটি করে কাজলার জল-হাওয়ার স্পর্শ পেতে চাইছে ওর শরীরে। কিন্তু আসুরিক এ শহরের কোথাও মাটি নেই, ক্ষেত নেই, জমি নেই, উঠোন নেই, নদীর পাড় নেই, দিগন্তহীন আকাশ নেই, সূর্যালোকের উত্তাপ নেই, বনবাদাড়ের ছায়া নেই, এলোমেলো ডোবা-পুকুরের স্নিগ্ধতা নেই। সব এখানে ঝকঝকে-তকতকে আর গোছগাছ করা বসতবাটি, তাহলে নিজেকে লুকাবে কোথায় শিনু?
সে ভালোই জানে এখানে কারও খাওয়া-খাদ্যের খুব একটা অভাব হয় না, তবে কাজলার মতো সেগুলো রাস্তা-ঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে না কখনও। গ্রাম-গঞ্জ উজাড় করা অফুরান খাদ্যসম্ভার এখানকার ঘরে-ঘরে, বাজারে-বাজারে। সেসব দিয়ে তাদেরই ক্ষুধা মিটে যারা স্বার্থ আর স্বজনপ্রীতির জালের ভেতর বাস করে এখানে, কেবলমাত্র তারাই এসব রকমারি খাওয়া-খাদ্যের স্বাদ মুখে নিয়ে বেড়ে ওঠে এখানে। দিনের পর দিন সেই খাদ্য খেয়েই শিনুরা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যে পরিণত হয়; সেই কাজটা করে রমজানের মতো ফড়িয়ারা।

এতোক্ষণে মানুষের সুস্বাদু খাদ্যই হয়ে পড়ার কথা শিনুর। কপাল ভালো; তাই হয়তো সবার চোখ এড়িয়ে চলে আসতে পেরেছে লোকালয়ে। শিনু তো জেনে-বুঝেই কোতল হতে এসেছে ঢাকায়। তবু যে-কটা দিন বেঁচে থেকে ঘুরাঘুরি করা যায় সেটাই বোনাস। একটা দিন বাড়তি বেঁচে থাকার সৌভাগ্যও কি কম?
এখানে ওর মতো যাদের আনা হয়, সবাই মরতেই আসে। সে-ই শুধু যে চতুরালির আশ্রয় নিয়ে এখন পর্যন্ত বেঁচে রয়েছে, তাতেই আনন্দে ডগমগ সে। অজানা পরিবেশে এ-গলি ও-গলি ঘুরে বেড়ানোর মজাটাই আলাদা। যা চোখের সামনে পড়ছে সবকিছুই যেন নতুন ঠেকছে। তবে কোথাও এতটুকু খুদকুঁড়ো পড়ে নেই, সব সাফসুতরো। এটাই যা কষ্ট।

এসময় শিনু নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে। সামনে পড়লে লোভী মানুষগুলো কি ওকে ছেড়ে কথা কইবে? ওদের লোভ শিনুকে কখন যে জলন্ত উনুনে নিয়ে গিয়ে ফেলবে মোটেই আগাম বলার উপায় নেই। তবে যত সময় গড়াচ্ছে ক্ষুধার জ্বালা তত বাড়ছে। কাছাকাছি একটা বাজার পেলেই হয়। সেখানেও সমস্যা, সকালের দিকে বাজারগুলো মুখর থাকে মানুষের পদভারে। এসময় সেদিকে পা না বাড়ানোই ভালো। দুপুরের দিকে মিইয়ে আসে ব্যস্ততা। তখন না হয় লুকিয়ে সেখানে গিয়ে কিছু খেয়ে নিলেই হবে। শহরের বাজারে কি খাওয়ার অভাব?

লুইকে মনে পড়ছে খুব। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসতে খাঁচার ভেতরই প্রেম জমে উঠল। একেবারেই অচিন পাখি। দুরন্ত, দুর্দম তার মতিগতি। ভেসে গেল দুজন দুজনায়। সেই লুই নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফড়িয়ার হাত ধরে বাজারে এসে গেছে। হয়তো বিক্রি হবার পর কষা মাংস হয়ে মানুষের পাকস্থলিতেও চলে যেতে পারে- কে জানে? প্রেমিক বেচারা লুই। ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল এসময় ওর ভেতর থেকে।
শিনুরও একই হাল হতে পারত। কিন্তু এখনও বেঁচে রয়েছে সে। এই মানব নিয়ন্ত্রিত হিংস্র পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই আশ্চর্যের বিষয়। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণই আশ-এর বেশি কিছু বলার নেই।

ফড়িয়া রমজান ছটা খাঁচা নামাল বাসের ছাদ থেকে। সবকটার নিচেরটায় গাদাগাদি করে রাখা ওকে; চোখের সামনে একটা ফোকর। ভয়ে কেউ সেদিকে তাকাচ্ছেও না। লুই তো রতিক্লান্ত, ঝিমোচ্ছে একপাশে। সবাই জানে একটু পর কপালে কী ঘটবে। তাই নিস্তেজ-নিস্তরঙ্গ জীবন বইছে সবার মাঝে। শুধু সে একা একা ঠোঁটের চাকু চালাচ্ছে খাঁচার দরমায়। খুট, খুট খুট। বহু কষ্টে লুই একবার চোখ মেলে তাকাল ওর দিকে। বিরক্ত হয়ে বলল,‘রমজান টের পাইলে সবার আগে তোরেই জবাই করবে। ভাল চাস তো চুপ থাক। ভাগ্যরে মানতে শিখ’।

মুখে কিছু বলল না শিনু। চোখ ঘুরিয়ে একবার শুধু তাকাল দুরন্ত প্রেমিক লুইর দিকে। তারপর একই কাজ চালিয়ে যেতে থাকে একাগ্র চিত্তে। সামান্য একটুখানি ফাঁক হতেই নিজের শরীরটা বের করে ফেলে; দরমার সামান্য খোঁচা লাগল বটে ; তবে খাঁচা থেকে বের হবার পর প্রাণভরে খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নেবার সঙ্গে কোনকিছুরই আর তুলনা হয়না। লুই ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল। শুধু সে কেন, সবার চোখেই বিস্ময়। সামান্য কষ্ট সহ্য করবার ইচ্ছাশক্তি যাদের নেই তারা তো তাড়াতাড়ি প্রাণ হারাবে- সেটাই স্বাভাবিক।

শিনু একবারও পিছনে না তাকিয়ে গুটি গুটি পায়ে পালিয়ে আসে সেখান থেকে। এখন পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। ফড়িয়ার এখানে খাওয়া-খাদ্যের অভাব ছিল না। কিন্তু সেগুলো সব অখাদ্য-কুখাদ্য। ভুষির ভেতর লুকানো থাকে বড় বড় পাথরকণা। ক্রেতার কাছে ওজন বাড়াতে এ ফন্দি। খেতে অনীহা প্রকাশ করলে জোর করে গলা চেপে তারপর খাইয়ে দিত ওর লোকজন। কোনও দয়া-মায়া নেই। গ্রামে-গ্রামে ঘুরে-ফিরে শস্যকণা খুঁটে খাওয়ার যে অনির্বচনীয় আনন্দ তা মনে করে খুব বিষণ্ন হচ্ছে মন। মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কি করে অসহায়দের উপর?

দুই বাড়ির এক চিলতে ফাঁকা জায়গায় শিনু ভেকধারী জ্যোতিষীর মতো ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে। বড় রাস্তায় হকারগুলো গলা ছেড়ে মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে, ‘এ্যাই দেশি মোরগ। বড় মোরগ’। কেউ বা ‘এ্যাই তরকারি’, ‘এ্যাই রুই মাছ, তেলাপিয়া, ফাঙ্গাস’, ‘এ্যাই আপেল, কমলা নিবেন’ বলে গলির হাওয়া গরম করে তুলছে। বাঁশ ফাড়ার শব্দের মতো এক-একজনের গলার স্বর। শুনে শিনুর ভেতর ভয় জড়ানো কাঁপুনি ঝড় তুলে বারবার।

শীতের দুপুরবেলা। মরা রোদের ছায়া শুকনো ধুলাময় গাছের মগডালে। মাঝে মাছে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা মেরে দুইবাড়ির মাঝখান দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে চলে যায়। তখন শিনুর শরীরে ন্যাংটো শীতের শিহরণ খেলে। একটুখানি উত্তাপের জন্য প্রাণ আইঢাই করতে থাকে।
হঠাৎ হতচ্ছাড়া দুটো দাঁড়াকাক উপর থেকে ওকে দেখতে পেয়ে আলাপ জমাতে উড়ে এসে ওর সামনে এসে পড়ল।

‘কি ব্যাপার? ঢাকায় নতুন? ওয়েলকাম। আমার নাম ঝাংপু’। বলে মাথা নুইয়ে কৃষ্ণচোখের হাসি হাসে।
দ্বিতীয় জন আরো স্মার্ট। বলে, ‘যে কোন বিপদে অবশ্যই পাখিসমিতির একজন হিসাবে তোমার পাশে অবশ্যই থাকব আমি। কথা দিলাম। আমার নাম টিলুয়া। সবাই টি বলে চিনে। নতুন শহরে সু-স্বাগতম’। সে-ও মাথা নুইয়ে একধরনের কেতা দেখায় ওর সামনে।
শিনুর কেন যেন দুটোকেই্ শহুরে বাটপার বলে মনে হল। ওদের থেকে দূরে থাকাই উত্তম। নইলে কখন ফোর-টুয়েন্টি প্যাঁচে ওকে ফেলে দেবে, কে জানে।

শিনু প্রশ্ন করল, ‘কাছেধারে কি কোন বাজার আছে ভাইজান? ক্ষুধায় পেট এক্কেরে জ্বলতাছে’।
‘নাইস। আমরা আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। তবে আপনি তো দেখতে অপরূপ সুন্দরী এক পাখি। দেখলেই মানুষের ইচ্ছে হবে খেতে। কাউ-কাউ-কাউ’। বলে সে নিজের কথায় নিজেই হেসে উঠে। কালাচাঁনের হাসিটা বেঢপ লাগে শিনুর কাছে।
‘আমার জন্য অত ভাবন লাগদ না। রাস্তাটা কুনদিকে হেইডা কইন যে। পচ্চিমদিকে’? কর্কশস্বরে প্রশ্নটা করে সে।

‘আপনি খুবই বুদ্ধিমতী। বলে দেবার দরকার নেই, আন্দাজেই ধরতে পেরেছেন। যাহোক, আমাদের ভুলবেন না যেন। আফটার অল পাখি-পাখি ভাইবোন তো’। টিলুয়া বিদায় জানায় ওকে। এমন সুন্দরী যে খুব লোভ হয় মুরগিটাকে সাথে নিয়ে বুক টানটান করে ঘুরে বেড়াতে, উড়ে যেখানে খুশি সেখানে চলে যেতে। অথচ পাখিকুলে খুব একটা কদর নেই ওদের। জন্মের পর থেকেই নিজেদের কদাকার-কুৎসিত হিসাবে জেনে এসেছে। যেন পাঁচের বার ওরা। সেটাই ছোট এই মগজের ভেতর গেঁথে রয়েছে। তাই কারও সঙ্গেই স্বাভাবিকভাবে বন্ধুত্ব পাতাতে পারে না। কোথায় যেন বাধে। নইলে শিনু ওকে এড়িয়ে চলে? কেন?
অবশ্য টিলুয়াদের নিয়ে যা কিছু খারাপ রটনা, সবই মানুষের তৈরি। মানুষের মতো প্রভাবশালী আর কেউ নেই প্রাণীজগতে। ওরা যা বলে, যা বাবে, তা-ই সই। এর ব্যত্যয় হবার জো নেই। যাদের ওরা মজা করে খেতে পারে, তাদেরই প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে। অন্যদের আজে-বাজে কথা বলে দমিয়ে রাখে। এমন কি চরিত্রহনন করে ওদের সমাজচ্যুত করে রাখে আজীবন। এ-ও মানুষের সমাজের হিংস্র কূটনীতি। নইলে কালো রং ছাড়া ওদের আর কি দোষ? মানুষ কি আজেবাজে পোকামাকড় , বাদুড়-সাপ-কুমির খায় না? যত দোষ ওদের বেলায়?

গলা ছেড়ে কা-কা করে ওঠে ঝাংপু আর টিলুয়া। ডাকের সঙ্গে ঠোঁট থেকে শীতের হিম-ধোঁয়া বের হয়ে যায়। এ শুধু ধোঁয়া নয়, সম্ভবত বুকভরা ওদের দীর্ঘশ্বাস, যা মুখ খুলে ওরা কখনোই বলতে পারে না। অগত্যা ওরা উড়াল দিয়ে অন্যত্র চলে যায়।
শিনুর কেন যেন ভয় হচ্ছিল। কেবলি ফটকা বলে মনে হচ্ছিল দুটোকে। কাজলায় থাকতে এগুলো কত যে ওদের ছানাদের তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে তার সীমা-পরিসীমা নেই। সুযোগ পেলে সাপ যা, দাঁড়কাকও তাই। একে হাতছাড়া না করে সুযোগ একবার হাতিয়ে নিয়ে পরক্ষণে যারা সাধু-সন্ত বনে যাওয়ার ভান করে, ঝাংপু -টিলুয়া এর ব্যতিক্রম কেউ নয়। খুব বুঝতে পারে নীরব শিনু।
পেট রীতিমতো খালি। বেশ কবার পাথরভরা বিষ্ঠা ছাড়ার পর এখন চোঁ-চোঁ করছে পাকস্থলি। সে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারে না। খাওয়া আর খাদ্য হওয়ার ভেতরই তো ওদের জীবন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই কেন আর ক্ষুধায় কষ্ট পাওয়া?

দ্রুত তালতলা বাজারে ঢুকে পড়ে শিনু। বুকটা ধড়ফড় করছে। একটা বড় রাস্তা পেরোতে হল মাঝখানে। এ যেন রাস্তা নয়, দ্রুতযানের ব্রহ্মপুত্র নদ। কতবার যে গাড়ির নিচে চলে গেছিল সে- ভাবলেই পাখাগুলো খাড়া হয়ে যায় শিহরণে। ভয়ে-ত্রাসে কোনরকমে উড়াল দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে বাজারে ঢুকেছে। এত কোলাহল আর সহ্য হয় না। কদিন এখানে থাকলে এমনিতেই নেতিয়ে পড়বে শিনু। কাজলার সবুজ বনানি আর জলাশয়ের আনাচে কানাচে বেড়ে ওঠা ওর উত্তাল প্রাণটুকু কখন বাষ্প হয়ে এ শহরের বাতাসে মিশবে- হয়তো সে টেরই পাবে না।

বাজারে ঢুকতেই সবার সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ওর উপর শিলাবৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ে। মানুষগুলোর চোখে একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে তাক করছে ওকে- এটা গৃহস্থ-পালানো নাকি খাঁচা-পালানো? এমনভাবে তাকাচ্ছে যে মনে হচ্ছে, ওর পরিচয় যা-ই হোক, ওর এ স্বাধীনতাটুকু কেউ সহ্য করতে পারছে না। মানুষের সহজাত ঈর্ষা আর সন্দেহবাতিক স্বভাবই যেন বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ওর চলার পথে। পাশাপাশি ভয়ও কম হচ্ছে না। কে কখন ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে দখল করবে, সেই চিন্তা মাথায় রেখে চারদিকে নজর রেখে এগোচ্ছে শিনু। স্বভাবে মেয়ে তো, সব বুঝেশুনেই তবে চলতে হয়।

সহসা ভীমরুর চোখে পড়ে যায় শিনুকে। বখাটের মতো একলাফে ওর রাস্তা আগলে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘কইত্বে আইলা? এই অঞ্চলে কি নতুন’?
‘নেত্রকোনার কাজলা। হুনছেন নাম? মৈমনসিং। বুজলাইন? অহন পথ ছাড়ুইন যে। পেডে বহুত ক্ষুদা। দানাপানি খাইতে বাজারে আইছি। উপকার না করতে পারলে পথ ছাড়ুইন’।
কথাগুলো চটাং চটাং। কোন মিঠার পরশ নেই। প্রথমে রাগ হল খানিকটা। ঘাড়টা মটকে রক্ত-মাংস খাওয়ার ইচ্ছে জাগল তৎক্ষণাৎ। পরক্ষণে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়। কেন যেন একটা প্রেম-প্রেম ভাব উসকে ওঠে এসময়।

‘খাওয়ার কোন অভাব নাই সুন্দরী। দেদার খাওন। এইখানে খাইতে খাইতে এমন অবস্থা অয় যে খাইতেই ইচ্ছে করে না। তহন উপাস থাহি। হাহাহা’। সে যে বিশাল বড়লোক পরোক্ষে সেকথাটাই জানিয়ে দেয়।
‘আপনের লগে তো আমার বনত না। আমি নিরামিষ খাই। সামান্য শস্যকণা হইলেই অয়। খুটখুট কইরা খাই আর কুককুক কইরা গীত গাই। আমরা অতি সরল নিরিহ কিসিমের পক্ষীশ্রেণী। আপনেরার মতন না’। বলে শিনু পালাবার পথ খুঁজতে থাকে। শিনু ভালো করেই জানে, ওর তাকানোর ভেতর যতই ভক্তিযোগের প্রেম ঝরুক, আসলে সুযোগ পেলেই ওর শাক্ত হতে এতটুকু বাধবে না। খুব জানা আছে।
ভীমরুর মনে প্রেম ও ভোগ একসঙ্গে হেঁটে বেড়ায়। শিনুকে দেখার পর সেটি জাগ্রত হয়ে ওঠে। মুখে বলে, ‘তুমি এমন সুন্দর আর তরতাজা, তোমাকে সামান্য শস্যকণা খাওয়াইতে পারুম না, কি কও? চল আমার লগে’।

শিনু দেখল ভীমরু নাছোড়, ভদ্রতা রক্ষা করে এগোনোও যাচ্ছে না। অগত্যা সে বলল, ‘ঠিকাছে, আপনি আগে আগে চলুইন। আমি পিছ পিছ আইতাছি’।
ভীমরু বুঝতে পারে শিনু ওকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে নিজেও তো নিজেকে বুঝতে পারে না। সামনে দাঁত বসানোর উপযোগী কিছু পেলেই শরীরে যেন চনমনে শিহরণ খেলে যায়। এর থেকে কিছুতেই নিস্তার মিলে না। মনের ভেতর যতই ত্যাগভাব আনতে চায়, বাস্তবে এসে নিজের অজান্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের উপর। বিড়ালতপস্বী স্বভাব কখন যে বৃষ্টির জলে ভেজা উঁইঢিপি হয়ে পড়ে টেরই পায় না।
সে এবার নিজেকে জাহির করে, ‘প্লিজ আমাকে অন্যদের মতন ভাইবেন না। আমি অন্যরকম। আমি অসহায়দের কষ্ট বুঝি। বলছি তো, একবার বিশ্বাস কইরা দেখেন। গ্যারান্টি দিতেছি, ঠকবেন না’।
‘আপনে বেশি কতা কন যে। সামনের দিকে মুখ চাই্য়া চলুইন। ওষ্ঠা খাইবেন কৈলাম’।
ওরা বাজারের এক পাশে ভুষির দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। বস্তা বস্তা ভুষিমাল চারপাশে। কিছু গাড়িতে উঠছে, কিছু দোকানে তুলছে দোকানদার।

শিনুর সামনে প্রচুর খাবার। সে মনের আনন্দে খুটে খেতে লাগল সেসব। ভুলেই গেল পাশে দাঁড়ানো ভীমরু লোলুপ চোখে ওরই দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মাছি-পিঁপড়ে ভরা নাড়িভুঁড়ি আর কত খাওয়া যায়? মাঝে মাঝে তো তাজা মাংসের স্বাদে শরীর-মন জুড়াতেও ইচ্ছা করে, করে না?
শিনু গান ধরে মনের আনন্দে। কক-কক, কক-কক, কউ-উ। আসলে পেট ভরা থাকলে আর স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারলে গান চলেই আসে গলায়। বাধা দেয়া যায় না।
সহসা পিছনে চোখ চলে যায়। ভীমরুর উপর নজর পড়তেই কেমন যেন একটু লজ্জাই পায় শিনু। মুখে বলে, ‘কী দেখতাছুইন’?
‘তুমারে। চোখ ফেরান যায় না’।
‘কেরে, ঘাড় মটকাইবার চাইতাছুইন। অবুঝ না, বুঝি কৈলাম সব’।
‘ছিঃ। এই কতা কইতে পারলা? বলছি না, সবাই সমান না’।
‘আমার গানডা কেমন লাগল’? আচমকা প্রশ্ন করে প্রসঙ্গ পাল্টে দিল শিনু।
‘গান গাইতাছিলা? বুঝি নাই তো। তুমরার কক-কক আর আমরার ঘেউ-ঘেউর অনেক তফাত’।
‘এইজন্যই ডরাই। বুজলাইন’? বলে সে নিবিষ্ট মনে গমের দানা, ভুষির কণা খেতে থাকে।
সহসা চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দে পুরো বাজার গরম হয়ে ওঠে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেল একটা সাদা গাড়ি, কৌতূহলী লোকজনের একটা জটলা এর চারপাশে। বেশি দূর নয়, তবু শিনু কিছুই বুঝতে পারছে না। ভীমরু ছুটে গেল সেদিকে। যাওয়ার সময় ওকেও ইশারা করল পিছু আসতে। সে সতর্কভাবে পা পেলে এগোতে থাকে। মানুষের পায়ের ফাঁকে সামান্য জয়গা পেয়ে সে সেঁধিয়ে গেল ভিড়ের ভেতর। ভীমরু আগেভাগেই সেখানে মুখ বাড়িয়ে ঘটনা দেখছে। এবার শিনুও উঁকি মারল গলা উঁচিয়ে।
এক মহিলা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে একটা ছোট মেয়েকে ধমকাচ্ছে। সহসা ভীষণ জোরে একটা চড় মারল অসহায় মেয়েটার কচি গালে। মেয়েটা কেঁদে ফেলল, ‘আপু আমারে মারতেছেন ক্যান? আমি কি করছি? আপনি টাকা দেন নাই তো। এই যে আমার হাতে রুমাল বেচার ট্যাকা দুইশ। আপনে দেন নাই তো ট্যাকা’। কান্নার সঙ্গে সঙ্গে কথাও বলছে।

‘আবার এক কথা? মুখে মুখে তর্ক? বললাম না দুটা দুইশ টাকার নোটের একটা আমার? কত পড় পাঁজি। এই বয়সেই চুট্টা হয়ে গেছে। দে, আমার টাকা দে? তোর থেইকা রুমাল নিমু না। আমার ঢের শিক্ষা অইছে। আমার টাকা ফেরত দে’? বলে মধ্যবয়স্ক মহিলাটি জোর করে অনিচ্ছুক মেয়েটার কচি মুঠোর আঙুল কখানা খুলে টাকাটা ছিনিয়ে নেয় নিজের হাতে। তারপর পাশে দাঁড়ানো গাড়িটায় উঠে দরজা লক করে দেয়। মহিলাকে এসময় বেশ আত্ম্ম্ভরী আর নিষ্ঠুর দেখাচ্ছিল শিনুর কাছে।
ভিড়ের ভেতর থেকে একজন মুরুব্বীগোছের লোক বাচ্চা মেয়েটার কান ডলে বলে উঠল, ‘কি লো সুরভী, এখনই চুরি বিদ্যা শিইখা ফেলাইছিস? রুমাল না বেইচা পকেটমার হ। নইলে তরে যে পাডাইছে হেরে ক খানকি বানাইতে’। বলতে বলতে খিকখিক করে হাসতে থাকে লোকটা। পরনে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী, এর উপর ময়লা কোট। মুখে পান, মাথায় কাচা-পাকা লম্বা চুল। হাতে পাকানো লাঠি। শিনুকে ভীমরু ফিসফিস করে জানাল, ‘এই বাজারের রাজা মিঞা দারোয়ান। যার পিছে লাগে হের জীবন শেষ’।
মেয়েটা কান্নাভেজা চোখে সূর্য দেখার মতো লোকটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রাজা যা বলে তাই সই। নইলে এ বাজারে ঢুকতেই দেবে না কাল থেকে। রুমাল বেচতে না পারলে খাবে কি? শিনুর কেন যেন বড় মায়া লাগে ওর প্রতি।

ভীমরু আবারও চাপা গলায় শিনুকে জানায়, ‘মাইয়াডা চুর না’।
‘কেমন বুজলাইন’?
‘আমি চিনি তো সুরভীরে। হের বাপটা হার্মাদ। হারাদিন মদের উপর থাহে। ইচ্ছা অইলে রিক্সা চালায়, নাইলে বউ-মাইয়ারে ধইরা পিডায়। পেডের দায়ে মাইয়াডা রুমাল বেচে বাজারে আর রাস্তার মোড়ে। আর মাডা কাম করে বাড়ি বাড়ি। মাইয়াডা ভালা। কদিন ভালা থাকব কেডা জানে। এই বস্তির কত ভালা মাইয়ারেই তো খারাপ অইতে দেখলাম’। বলে ভীমরু আকাশের দিকে তাকায়। চেহারায় মুরব্বীসুলভ ভাব এনে বড় করে একটা কুঁই শব্দ তোলে। শিনু বুঝতে পারে না এ শব্দের মর্মার্থ। সে তখনও মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের সঙ্গে কোথাও কি সে একটা মিল খুঁজে পাচ্ছে?
সহসা শিনুর চোখের সামনে একটা আচানক ঘটনা ঘটল। মহিলার গাড়িটা লোকজনের ভিড়ে হাঁটার গতিতে বেশ কিছুক্ষণ এগিয়ে গিয়ে থেমে গেল। সেখান থেকে নেমে এল ড্রাইভার। দাড়ি রাখা কামেল চেহারার মাঝবয়েসী লোকটাকে দেখে সুরভী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। হয়তো আরও মার খাবে ভেবে অসহায় দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকায়। শিনু ছুটে যায় সেদিকে।

ড্রাইভার প্রথমেই মেয়েটির হাতে কেড়ে নেয়া একশ টাকার নোটটি ফেরত দিয়ে বলে ওঠে, ‘আমার ম্যাডামের ভুলা রোগ। দশ-বিশ মিনিট আগের কতাও মনে রাকতে পারে না। তুই মাফ করিছ। এই নে আরও পঞ্চাশ ট্যাকা। বয়স্ক মানুষডারে ক্ষমা কইরা দেইছ’। বলে লোকটা আদর দেয় ওর গাল ধরে। তারপরই ড্রাইভার ছুটে যায় রাস্তার মাঝখানে অবৈধভাবে দাঁড় করানো গাড়িটার দিকে।
দৃশ্যটা দেখে শিনুর চোখে জল এসে যায়। পাশ থেকে ভীমরু বলে, ‘বলছিলাম না মাইয়াডা নির্দোষ’।
‘আার গাড়িওলি বুড্ডি’। পিটপিট করা চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
‘হেই বেডি তো রুগি। কি আর করবো’। ভীমরু শিনুর দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে উত্তর দেয়।
‘মানলাম না। রুগে পড়লেও মানুষ চিনন যায়। বেডিডা হিংস্র। নইলে অদ্দুরা দুদের শিশুরে এমনে কইরা চড় মারতে ফারে’। শিনু উষ্মা ঢেলে দেয়।

‘আমি মানিনা। রুগ এমোন জিনিস ভালারেও খারাপ বানাইয়া ছাড়ে। বুজলা’?
‘হ, বুজছি। বেডির স্বভাবডা আফনেরার মতন, আমার মতন না’। বলে কককক করে হেসে ওঠে। কথায় কথায় ভীমরুর সঙ্গে ধীরে ধীরে সহজ হয়ে ওঠে শিনু।
ভীমরু এবার প্রসঙ্গ পাল্টায়। সুযোগ একেবারে হাতের তালুর ভেতর সুড়সুড়ি দিতে শুরু করেছে। নরোম গলায় বলে, ‘চল একটু ঘুইরা বেড়াই’।
‘চলেন’। সরল বিশ্বাসে উত্তর দেয় সে।
ওরা হাঁটতে শুরু করে। ভীমরু জিজ্ঞাসা করে, ‘পেট ভরছে তো’?
‘হুম। বলেন কি বলতে চাইছেন’?
ভীমরু এবার থামে। জায়গাটা তালতলা বাজারের পিছনদিকে, বেশ নিরিবিলি। দেরি না করে সে সোজাসুজি শিনুর চোখের দিকে তাকায়; মুখে বলে, ‘মাংসাশী মানুষের ভাব-ভালোবাসা বইলা কিছু নাই রে। সব ভালবাসা খাওনে। আয়, এইবার আমার আদর তোরে দিই’। বলেই ঘোঁৎ শব্দে এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিনুর উপর।

ভীমরুর উপর শিনুর সন্দেহ ছিল গোড়া থেকেই। দাঁতাল নেকড়ের গুষ্টি-জ্ঞাতি যে শত চেষ্টাতেও বদলাবে না তা সে ভালোই বুঝতে পারে। তবু কত আচানক ঘটনাই ঘটে দুনিয়ায়। এই যে এখন পর্যন্ত ওর বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকা- তাও কি কম আশ্চর্যের?
তবু শিনু সতর্ক ছিল প্রতি পদক্ষেপে। নিরিবিলিতে আসার প্রস্তাবে সে আরো তৎপর থাকে ভেতরে ভেতরে। তাই ভীমরু ঝাঁপ দিতে না দিতেই সে উড়াল দেয় শুন্যে। ওর ক্ষুধার্ত দাঁতে লেগে থাকে শিনুর দুটো পালক। ঘটনার আকস্মিকতায় সে বিস্মিত, হতভম্ব। পরক্ষণেই আকাশে শিনুর দিকে লক্ষ রেখে ছুটতে থাকে। ইচ্ছে- যেখানেই পড়বে সেখানেই গিয়ে সবার আগে ঘাড় মটকাবে ওর। মাথায় চড়ে রয়েছে রাগ। ওকে না খাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই এ রাগ দমবে না।

প্রাণভয়ে শিনু অনেকখানি উড়ে গিয়ে যেখানে পড়ে সেখানে দাঁড়ানো সেই মার খাওয়া ছোট মেয়েটি। ভয়ে-ত্রাসে শিনু ডানা ঝাপটে অবিরাম কককক করতে থাকে। সুরভী ওর দিকে একঝলক তাকিয়েই বিপদের গন্ধ পেয়ে যায়। দেরি না করে ওকে কোলে তুলে নেয় পরম মমতায়। অদূরে দাঁড়ানো রাগী চেহারার ভীমরু। লক্ষ্য করছে সব। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না মানুষের সাথে লড়ার।
মেয়েটি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠল, ‘চিন্তা কইরো না। তুমারে আমি বস্তিত নিয়া পালুম’।
এবার সে ফিরে তাকাল ভীমরুর দিকে। মুখে বলল, ‘যাঃ। ভাগ কৈলাম। ভাগ বদমায়েশ’।
ভীমরু ল্যাজ গুটিয়ে যেতে যেতে নিজেকেই নিজে বলে উঠল,‘ ঘেউ ঘেউ। শালার মানুষরে বুঝনই দায়।’