মামুন, বন্ধনের অটুট সুতো ॥ গৌতম গুহ রায়



এমনি শীত ভাঙ্গা বসন্তের এক সকালে টেলিফোনের অন্য প্রান্ত থেকে মা কথা বললেন। মামুনের মা। আমি আমার জন্মদাত্রীর স্বর শুনতে পেলাম। মামুন মুস্তাফা, বাংলাদেশের মাগুরার ছেলে, কবি, এই পরিচয়ে তাঁর সঙ্গে প্রথম আলাপ। প্রায় দেড় দশক আগে বন্ধু-কবি সম্পাদক ওবায়েদ আকাশের সঙ্গে মনিরুজ্জামান মিন্টু-সহ সেও এসেছিলো তিস্তার জলেভেজা আমাদের এই আধা মফঃস্বল শহরে। আমাদের আড্ডা শিবির বসেছিলো আমাদের বাসাতেই। সেই প্রথম সাক্ষাৎ। একটু চেপে থাকা, একটু আড়ালে থাকা ছেলেটি ক্রমশ আত্মপরিচয়ে আমার সহোদর হয়ে ওঠে। দুই সহোদরের একজন হিমালয় সন্নিহিত জলপাইগুড়ি, অন্যজন বঙ্গোপসাগর সন্নিহিত বাগেরহাট, ভাগ করে রাখা একই বাংলার দুই প্রান্তের মাঝে এক নৃশংস কাঁটাতার। এই প্রান্ত থেকে সন্তান কথা বলছে অন্য প্রান্তের জননীর সঙ্গে, সেদিন, বহুদিন। আমার কাছে, বড়ভাইয়ের কাছে সে আছে জানলে স্নেহময়ি মা, মামুনের, শান্তি পেতেন। সেই মা যেদিন চিরবিদায় নিলেন উত্তরের সন্তান অলঙ্ঘিত কাঁটাতারের এপাড় থেকে দুমূঠো মাটি দিতে যেতে পারেনি, স্বজন হারানো আত্মজের দুঃখের ভাগ নিতে পারেনি সেই দিন! এই যন্ত্রণা শুধু দুই আত্মার নাকি দেশেরও?

মামুন মুস্তাফার দুটি বই একসঙ্গে হাতে পাই প্রথম আলাপে। ‘কুহকের প্রত্নলিপি’ এবং ‘একাত্তরের এলিজি’। ‘একাত্তরের এলিজি’ মুক্তিযুদ্ধের রক্তমাখা অক্ষর শিল্প, আমি এক জাতীয়তাবাদী বাংলাভাষী ভাইকে সেখানে ছটফট করতে দেখি। কিন্তু আমাকে মামুনের আরো নিকটস্থ করে তাঁর ‘কুহকের প্রত্নলিপি’।

‘ওই দ্যাখো আকাশে এখন ঋতুমতী মেঘ/ অথচ দহন শূধু ঘরময়’ অথবা ‘আমারও ফসিল নিয়ে খেলা করে/ আমারই প্রতি-আমি’। এমন নানা পঙক্তিতে মামুনের আত্মরতী দেখি, তাঁর একক চেহারাটার ক্ষুধা ও কামকে দেখি। যে মামুন কোনোদিন মুখোমুখি কলহে লিপ্ত হয় না, বৃথা তর্কে সময় তপ্ত করে না। যাবতীয় ঝগড়া থেকে শতহস্ত দূরে থাকাতেই তার আনন্দ। প্রেমের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এককেন্দ্রিক, সেই কেন্দ্রের অধিশ্বরী এক নারী, আমি যাকে বোন বলে ডাকি, আমিনা খাতুন, আমাদের…।
আমার প্রয়াত মা বিশ্বাস করতেন, আমার পরিবারের একজন সীমান্তের অন্যদিকে রয়েছে, সেখানে আমার একটি দেহাংশ আছে, আমার আত্মার আত্মীয় আছে। তাঁর স্ত্রী আমার নিজেরই বোন, তাঁর দুই সন্তান আমার সন্তানসম।

মামুন মুস্তাফা মূলত কবি, কিন্তু সাংবাদিকের পেশা ও সংস্কৃতি সংগঠনের নেশা তাঁর। আমি এখানে, তাঁর কর্মতৎপরতায় নিজেকে খুঁজে পাই। তাঁর সাহিত্যপত্র ‘লেখমালা’ নিয়ে সে খুব আন্তরিক। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার বা প্রখ্যাত কবি ও গদ্যশিল্পী আবুবকর সিদ্দিকের খুব প্রিয়, স্নেহভাজন মামুনের অন্তরের একটি বড় গুণ অগ্রজদের শ্রদ্ধা ও সম্মান দেওয়ায় কোনো কার্পট্য বা কার্পণ্য রাখে না। মামুনের পিতা একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ গোলাম রসূল, এই সংস্কার সে এমন গুরুজনের থেকেই পেয়েছে। ‘লেখমালা’র আড্ডা অনেক নতুন নতুন লেখককে নিয়ে আসে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে অগ্রজদের সেতুবন্ধন সমাজের ভিতকে দৃঢ় করে। এই কাজটা নিঃস্বার্থ ভাবে মামুন করে চলেছে। তাঁর এই আনন্দযাত্রা আমাদের আশাবাদী করে।

আমার পূর্বপুরুষ বিক্রমপুরের মালখানগর থেকে দেশভাগের সময় এই উত্তরবাংলায় চলে আসে। আজ যা ভিন্ন দেশ। মামুনের পিতা ও পূর্বপুরুষের ভিটা আজকের মাগুরা জেলার পারনান্দুয়ালী গ্রাম। জীবন ও জীবিকার জন্য সে কয়েক দশকের ঢাকা নিবাসী। সেই অর্থে দুজনেই ভিটাচ্যুত, শেকড়চ্যুত। তবুও সে তাঁর শেকড়ের কাছে যেতে পারে, দেশভাগ আমাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে চিরতরে। এখানেই তাঁকে আমার ঈর্ষা, কিন্তু বস্তুত আমরাও, বর্তমানের সবাই আমরা শেকড়চ্যুত মানুষ। তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো এই প্রশ্নটাই যে, আমরা কোন পথে? কোন স্বপ্নে? কোন সমাজের দিকে চলবো, চলছি? এই স্বপ্ন আমাদের কি কাছাকাছি আনছে? এই রোগাক্রান্ত বিশ্বে সুস্থ মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। মানুষের জন্য আজ মানুষ কাঁদতে ভুলে যাচ্ছে। শোক, কান্না যাবতীয়টাই নিজস্ব, নিজের জন্য। এই সময় একজন কবি, একজন সাহিত্য সম্পাদক একদম ভিন্ন স্বরে কথা বলে, ভিন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপনের কথা বলে। আমাদের মামুন সেই বিরলতমদের একজন।

কবি মামুনের আড়ালে কিছুটা ঢাকা পড়ে আছে প্রাবন্ধিক গদ্যকার মামুন মুস্তাফা। তাঁর ‘অন্য আলোর রেখা’ ও ‘মননের লেখমালা’ খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবনার উপস্থাপনা রেখেছে। সাহিত্য নিয়ে তাঁর নানা প্রবন্ধ ও আলোচনা বিভিন্ন কাগজে প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই ক্ষেত্রে তাঁকে পরিচিতি ঘটিয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বদেশ-ভাবনার লেখাগুলোও আলাদা মনোযোগ প্রত্যাশা করে। একুশের বইমেলা নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে মামুন মুস্তাফার উচ্চারণ পাঠকদের সঙ্গে আবার ভাগ করে নিতে চাইছি, “বাঙালি জাতি বিশ্বাস করেছিল একুশে ফেব্রুয়ারির ফলশ্রুত স্বাধীনতা অবশ্যই অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ এনে দেবে। …কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। বিশ্বব্যাপী কলোনিয়াল যুগ তিরোহিত হলেও, নতুন সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় পুঁজিবাদের আগ্রাসনে তৃতীয় বিশ্বের তৃতীয় দেশগুলোর অস্তিত্বই এখন হুমকির সম্মুখিন। সুতরাং দাতাদেশসমূহের তৈরি প্রেস্ক্রিপশানে অর্থনৈতিক ভঙ্গুর রাষ্ট্রের আমজনতার কাছে সৎ সাহিত্য সুদূর কল্পনামাত্র। … কিন্তু এ থেকে জাতিকে উদ্ধারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে বিপজ্জনক বুদ্ধিজীবী, বিবেকবর্জিত রাজনীতিবিদ ও আত্মমত্ত প্রশাসন।..”।

এভাবেই মোহমুক্ত কথনের বিন্যাসে তিনি লিখেছেন অনেক সংবাদভাষ্যের ভঙ্গিতে সমাজ চিত্র। মামুনের ভাবনার জায়গাটা সামাজিক সুস্থতা, বহুমাত্রিক বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুরক্ষা সেই সুস্থতার জন্য আবশ্যিক। আমাকে মুগ্ধ করেছিলো তাঁর প্রবন্ধ ‘সাম্প্রদায়িক সংঘাতে বাঙালি’। যেখানে তিনি লিখেছেন, “সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির পরিণতিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আর এর প্রয়োজন হয় উচ্চ-মধ্যবিত্তের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বিবিধ কারণেই। বুর্জোয়া শ্রেণিসকল সচেষ্ট হয় নিজের স্বার্থের সাথে সারা দেশের স্বার্থকে এক করে দেখতে। ফলে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবার আশঙ্কা থাকলেই তারা চাতুর্যের সঙ্গেই রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে” । তথ্য সমৃদ্ধ এই আলোচনায় নানা স্তর ও অভিমুখ পাঠকের সামনে উন্মোচিত করেছেন মামুন। এই প্রবন্ধের আর এক যায়গায় তিনি লিখেছেন, “যুগ যুগ ধরে এই ভারতবর্ষে বসবাসকারী দুটি সম্প্রদায় হিন্দু মুসলমান এইভাবে অদৃশ্য ইঙ্গিতে মেতে উঠলো রাজনীতির নামে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষায়, যার পরিণাম রক্তস্নান আর রক্তগঙ্গা। এর সূত্রপাত ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের ভেতরেই নিহিত ছিলো। সম্প্রসারণশীল হিন্দু বুর্জোয়াদের কাছে মনে হলো বঙ্গভঙ্গ নিজ স্বার্থের উপর সুনির্দিষ্ট আক্রমণ। …অন্যদিকে মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ এই বঙ্গভঙ্গের ভিতর দেখতে পেল তাদের মুক্তির পথ, এগিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশিকা”। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিঘাতেই কংগ্রেসের বিপ্রতীপে মুসলিম লিগ বিস্তৃতি পায়, দ্বি-জাতি তত্ত্বের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিরও বিষবৃক্ষের প্রসারণ ঘটে।

একজন মানুষের জীবনে অর্ধশতক অতিক্রম করে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জীবন অভিজ্ঞতায় তিনি সমৃদ্ধ ও পরীক্ষিত মানুষ। মামুন মুস্তাফা তাঁর সাহত্যকর্ম তাঁর সামাজিক ভূমিকায়, তাঁর পারিবারিক দায়িত্বে পরীক্ষিত এক সফল মানুষ। মামুনকে নিয়ে লিখতে গেলে সে লেখা শেষ করা কঠিন, আমাদের দুজনকে পারস্পরিক স্মৃতিতে বেঁধে রেখেছে অজস্র অভিজ্ঞতা ও ঘটনা, একদিন সে-সব লেখা যাবে নিশ্চয়ই। শেষে আমি প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘সংসার সীমান্ত’ নিয়ে লেখা মামুনের একটি গদ্যাংশের উল্লেখ করছি, “‘প্রকৃত প্রেমের হাত শূন্য থাকে। শূন্য থাকা ভাল’। রজনীর অপেক্ষার কাছে বাঁধা পড়ে কয়েকটি দিনের ‘স্মৃতি- শত শূন্যতায় প্রেমের মৃত্যুর কাছে, তবু প্রেম বার বার ফিরে যেতে চায়’। কেরোসিনের ডিবির ধূম্রবহুল শিখাকে শীর্ণ হাতে সযত্নে বৃষ্টির ঝাপটা হতে আড়াল করে সে।…”

কবি মামুন মুস্তাফা এভাবেই তার স্বপ্নকেও আড়াল করে, বাঁচিয়ে রাখে। স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া মানুষ থামতে জানে না, যেমন মামুন, আমার এই আত্মার স্বজন। আমি তাঁর সদা-সক্রিয়তাকে শ্রদ্ধা করি, বহুমুখি কর্মকাণ্ডকে অভিনন্দিত করি । ৫০-এর শুভকামনা। ভালো থেকো মামুন, ভালো রেখো মামুন।