মায়াদেবীর গলন্ত শিখা ও অন্যান্য ॥ মাহবুব মিত্র



মায়াদেবীর গলন্ত শিখা

আছো নাকি ঘুম জ্যামিতিক ক্যানভাসে। কম্পাসে-কম্পাসে পীথাগোরাসের গোঙানি; নাকি ভুলে গেছো-অ্যাকোয়ারিয়ামের গ্লাসের ছোঁয়া-রঙিন প্রচ্ছদের ইশারা। শিশুগন্ধা দৃষ্টিতে দুলতে থাকে-মায়াদেবীর গলন্ত শিখা… কিছুক্ষণ আগে উড়ে গেলো-ভৈরবী হাওয়া। শূন্যতায় ঝুলে আছে-জাদুকরের পেন্ডুলাম।

এমনই দিনরাত্রির ঢেউয়ানো কম্পন-মায়াবী কাব্যকন্যার মঙ্গলারতি। মুহুর্মুহু গলতে থাকে জীবনের ফেনা; বজ্রবিলাসে ভাঙতে থাকে পাঁজরের মানচিত্র। এমনই বয়ে-চলা নদীর ডাক। এইভাবেই হিসেবের খাতায় শুয়ে থাকে-জীবনবাবুর কনফিউজড রিমিক রাইম। রিমিকিঝিমিকি ছায়ায় বসে হাসে-মহাবিদ্যালয়ের দাঁড়কাকবাসনা।

গ্লোবাল সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে থাকে-অপূর্ণ গ্লাসের জলমানবী। দেয়ালে ঠেস দিয়ে ফুঁসে ওঠে মোমবাতিশিখা। আপেল আর আম্বাগানে দেখি-আম্বানির পুতুল-পুতুল খেলা; যখন আত্মজা-তার বাথটাবে লুটোপুটি খেলে-আর পারুল-পারুল গাইতে থাকে দরদী কণ্ঠে।

আমাদের করতলভরা যে-মায়াদেবীর আসর-যোগিনী ভেবে যারা ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যায়-সেখান থেকেও বেজে ওঠে-নতুন পৃথিবীর সাইরেন। শুরু-শেষ খেলতে-খেলতে অন্তিম-লগনে এসে-মাথানত করে সাপলুডু ব্লাস্টার। প্লাস্টিকভাবনারা গলে-গলে মিশে-হারিয়ে যায় গ্লাসভর্তি আঁধারে।


বিভোর চোখে পুতুলজগত

চোখে টলমল করছে-অনাগত ও বিগত সময়ের-ছায়া-ছায়া উল্লাস-আর হারিয়ে যাওয়া চড়ুইপাখি। বাঁধভাঙা উষ্ণতায় মশা-মাছির হইচই। যে-মমতায় জড়িয়ে রাখো কোলবালিশ-অধিক ব্যথিত হৃদয়ে ফিরে যায় মায়াঘোড়া।

কী ভীষণ মমতায় গড়িয়ে যাচ্ছে-রাশি-রাশি ভয়ঙ্কর ঘুমনিশিতের-অদেখা রাতের কার্নিশ-হাওয়া। হাওয়া-কার্নিশ চুঁয়ে-চুঁয়ে পড়ছে-তোমার মায়াবী চোখের জাদু। মায়াকোভস্কির মায়াটুকু ছড়িয়ে দিলেই-পৃথিবী ফিরে পাবে প্রেমের গন্দম।

তুমি কিন্তু যেয়ো না-অজানা পথের পিচ্ছিল পাটাতনে; তখন আর দেখতে পাবে না-ময়ূর কিভাবে সমুদ্রে নামে।
একগ্লাস অন্ধকার ধরে বসে আছো; অথচ পুকুর-পুকুর আগুনের স্তূপ মাথার ভেতর-ভনভন প্রহরে লাটিমকুমারীর মাটিমাখা ক্রনিক্যাল ক্রন্দন। তুমি কি পাহাড়ের ডাক শুনেছো কখনো?

চারদিকে খুঁজে যাচ্ছো অহল্যার অকল্যান্ড, কিন্তু একবার চোখ বন্ধ করে গন্ধ নাও করতলে; দেখো-দ্যাখো… কী চমৎকার নেচে যাচ্ছে-প্রজাপতির কোলাহল। কুসুম-কুসুম অপুষ্ট-কাঁচা প্রেম মেখো না~গতরের ভাঁজে-ভাঁজে; দিকশূন্যপুর হৃদয়ে বাজাতে থাকো ক্যামেলিয়ার বাঁশি।

যতোটুকু আলো ছুঁয়েছে কুসুমিত প্রান্তর-ভোর হলেও লুকিয়ে থাকে-আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। হারানো সংলাপগুলো ভেসে বেড়ায়-এয়ার ড্রপলেটের মতো। তোমার চোখ ফেরারি হলেও-আমি হয়ে যাই শার্লক গোয়েন্দা নায়ক।

মাঠ-মাঠ বাতাবিলেবুর আঁধার পেরিয়ে-একদিন মানুষ পেয়ে যাবে-শার্লক হোমসের রহস্যোদ্যান। তারপর… তারপর তোমার পলকহীন দৃষ্টির মাঝে খেলা করবে- তোমার নতুন পুতুলজগত। তোমার চোখে ঝরে-ঝরে পড়ে-বিভোর ভোর…


বিবাহগন্ধা রাত্রি সতীদাহ চিতায়

এইভাবে অতঃপর জাদু-জাদু খেলা; জাদুকর যায় না কখনো যাদুঘরে আপন খেয়ালে-নেশার ঘোরে ঘুরে-ঘুরে হারায় নেশাচরে… কখনো উষ্ণতায় ফিরে আসে- কম্বোডিয়ান কম্বলের মায়ায়। কম্বলের ভিতর ঢুকে পড়ছে-তোমার অট্টহাসি মাতলামি। ঘনঘোর নেশায় ঝরছে-কপোত-কপোত ঘ্রাণ। ঝরনার গা-বেয়ে নামছে- ভালোবাসার মায়াশক্তি।

এইতো মায়াদেবীর মায়া-মায়া খেলা। এইতো মায়াবী জীবন। এইতো মায়াবতী প্রেম। এইতো ভালোবাসায় হারিয়ে যাওয়া। করোনার মতো ঢুকে যাচ্ছি-তোমার চোখের জাদুমায়ায়-সারাদেহে গড়ছি নেশার জ্বালা-জ্বালা তারাবাতি উৎসব। মায়ানেশা ফুরিয়ে গেলে- আকাশের আয়েসি কামরার-আর কোনো মানেই থাকে না।

চোখে ধরেছে সাত আসমানের নেশা। বুকে পাহাড়ি ঢলের নাচ। কথায় উড়ছে চোখ-চোখ খেলার দেহমন-বাসনা। নেশা আঙুলের ডগায় বসিয়েছে বেনারসিপল্লী। তারপর… তারপর আমি হয়ে গেছি-তোমার স্বপ্নের নেশাজীবী পল্লীকুমার; আর তুমি হয়ে গেছো-চায়না ভাইরাসের ভ্যাকসিন। কিন্তু তুমিই আমার আয়নাবিবি; দরোজার আড়ালে বিম্বিত হয়-যার দু’টি অগ্নিতীর চোখ।

লবণাক্ত জলে ভাসিয়েছি জীবনের সাম্পান। সিগারেট-সিগারেট খেলায়-নেশা উড়াচ্ছে রাজকুমার। রাজকন্যা প্রাসাদকামরায় কামড়ায় বিভোর নেশায় কামরাঙা। কার্টুন আঁকা হয়-প্রেমসওদাগরের কার্টন-কার্টন হাওয়ায়। চার্জার হারালেও-স্যামসাং কখনো আপেল হবে না। আমি তোমাকে বানাবো কুমারীজননী-বিবাহগন্ধা রাত্রি হারাবে সতীদাহ চিতায়।


ইন্টার-ইন্টার গোলাপফুল

তোমার হাসি… আঁতুড়বেলার পুকুর; শৈশবের দুপুর; রূপালি আয়নায় পাকুড়; ওগো নিতম্বিনী সুহাসিনী, তুমিই আমার-ইন্টার-ইন্টার গোলাপফুল… একটা বল ঘুরছে- সারা মাঠেজুড়ে… আমি তাকিয়ে আছি শূন্যে-মহাশূন্যে; আর ঐদিকে বইছে-বাতাস শনশন-মূর্খালয়ে গুহাদর্শন-বাতাস শনশন।

খুশি-খুশি দুধসাপ উৎসব… এই দ্যাখো ফাঁকা-ফাঁকা বেলুন ওড়ে-চারদিকে রঙিন জলে ভিজে যাচ্ছে কুয়াশাঁখিমুখ। গল্পে-গল্পে এঁকে-বেঁকে দুলাচ্ছে কোমর-আমার মধুরানী পিয়ানোবাদক। দেখো-দ্যাখো তবকী ঠোঁট যেনো-মুছে-যাওয়া দুঃখগীত; দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে-নাটক-ফিল্মের ঠাঠা রোদ্দুর-ডায়ালগ।

ট্যালকম পাউডার… ওলে-ওলে গলে-গলে পলে-পলে গড়ি-আমাদের বিদ্যালয়প্রেম… দিন চলে যায়-রাত চলে যায়-গড়িয়ে যায় প্রহরছানা-পাশাপাশি গড়াগড়ি যায় হাওয়াখেলা-দরোজা বন্ধ করে নিতম্ব দোলে। খুলে দিই গোলাপবাগান। তারা তাকিয়ে থাকে-কারাবন্দী তারাবনের দিকে।

গহীন নীরবতায় সনদবিহীন হাহাকার। লাশ-লাশ গন্ধে ভরে ওঠে সমুদ্রসোপান। শৈশবের সোনালি মাঠের কিনারে~শুয়ে আছে-একঝাঁক ঝিনুকসন্ধ্যা। সর্পরঙা বলটি~উড়ে যাচ্ছে-হাওয়ার খামারে। অগণিত হরিণশাবক-হা-করে তাকিয়ে দেখছে-রক্তবর্ণা মাঠ; লালে-লাল হচ্ছে মহাকাল। জীবনের মধ্যাকর্ষণ থেকে- ডেকে ওঠে-রয়েল বেঙ্গল টাইগার; কেশর দুলিয়ে-দুলিয়ে-ঘুমিয়ে যাচ্ছে-ক্লান্ত সিংহরাজ।