মিথিলার সম্পাদনা ॥ আনোয়ারা আজাদ


দুটো বই আলোচনা অনুষ্ঠানের শেষে চা খেতে খেতে জাফর শামসকে সামনাসামনি পেয়ে প্রস্তাবটা দেয় মিথিলা। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে অনুষ্ঠানটা শুরু হয়, যদিও সময় দেয়া ছিল পাঁচটায়। খুব সাদামাটা ভাবেই অনুষ্ঠানের আয়োজন। মিথিলা মনে করে এরকমই হওয়া উচিৎ। আলোচনা অনুষ্ঠানটিতে মানুষ জড়ো হয়েছিল বাইশজন। দুই লেখকের পাঁচজন করে বন্ধু মানুষ, দুজন আলোচক, একজন উপস্থাপক, দুজন ক্যামেরাম্যান, বাকি পাঁচজন বোদ্ধা পাঠক। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আধঘন্টা পর একজনকে দেখা গেল পাশের জনকে কেনো একটা কাজের কথা বলে উঠে যেতে। সাজানো কোনো মঞ্চ না থাকলেও দুটো সোফা রাখা ছিল। মাঝখানে একটা ছোট্ট টেবিল তার ওপরে কতগুলো তাজা গোলাপ আর অনেকগুলো রজনীগন্ধার স্টিকসহ একটা ফ্লাওয়ারভাস। রজনীগন্ধাগুলো দেশিই হবে কারণ বিকেলের আলো কমে আসতেই বেশ সুবাস বের হলো। ফুলগুলো যে কিনে এনেছে তার প্রশংসা করতেই হয় কারণ সে মোটা মোটা রজনীগন্ধাগুলো আনেনি, যেগুলো দেখতে ভালো হলেও কোনো সুবাস নেই। দেশি রজনীগন্ধার সুবাস পরিবেশটায় একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল।

যাই হোক, যার যখন বই আলোচনা হলো তখন তিনি একটি সোফায় গিয়ে বসলেন, তার বইয়ের আলোচক অন্য সোফায়। এভাবেই একসময় বইয়ের বিষয়বস্তুর আলোচনা ও লেখক সম্পর্কে কিছু ভালো ভালো কথা বলে অনুষ্ঠান শেষ হলো। একজন আলোচনা করতে যেয়ে মাত্রাজ্ঞান সামান্য একটু ছাড়িয়ে গেলে দুএকজন কাশি দিলেন। অতোটা বেশি না বললেও চলতো। বইয়ের অসঙ্গতিপূর্ণ কোনো বিষয় বা সমালোচনা করার মতো হীণমন্যতা অবশ্য কারও ছিলনা। কিন্তু তাই বলে মাত্রাজ্ঞান ছাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা। বিষয়টা লেখকের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে হলেও সব কিছু মিলিয়ে মিথিলা বেশ উপভোগ করেছিল।

জাফর শামস বলার চেষ্টা করে যে আর কারা কারা থাকছে মানে কাদের লেখা নেয়া হচ্ছে বইটিতে। মিথিলার কটাস করে বিস্কুটে কামড় দিয়ে সুড়ুৎ করে চায়ে চুমুকের শব্দে চমকিত হয়ে নিজের চায়ের কাপটা টেবিলে রাখে। একটু হলেই ছলাৎ করে পড়েছিল আর কি। গায়ে ধবধবে সাদা সার্ট। বিস্কুটে যে এমন কামড়ও দেয়া হয় এই প্রথম দেখে জাফর শামস। দেখে ক্লু’টা মাথায় রাখে। ‘কটাস করে বিস্কুটে কামড়’!। গল্পকারদের এরকম সব ক্লু মাথায় রাখতে হয়, নইলে অত সহজ নয় একজন গল্পকার হয়ে ওঠা।
মিথিলা ঘাড়ের চুল সরিয়ে চেহারায় বসন্ত আনার চেষ্টা করা সত্ত্বেও অহংকারী একটা ভাব চলে আসে চোখেমুখে, কাপটা টেবিলে রেখে একটা চোখ সরু করে বলে, হ্যাঁ, কি যেন বলছিলেন আপনি?
না তেমন কিছুনা। বলছিলাম বের করবে কে? কি ধরনের বই। সম্পাদনা তো আপনিই করবেন কিন্তু কোন প্রকাশনা থেকে বের হবে, ইত্যাদি।

এটা নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন? ছোট গল্পের সংকলন। দশ পনেরোজন মানসম্মত লেখকের গল্প নিয়েই ভাবনাটা মাথায় রেখেছি। আপনি একটা গল্প দিলে খুশি হবো। দেরি করবেন না যেন, কেমন। আপনি তো জানেনই আমি কেমন চুজি। সেভাবেই দেবেন আশা করি। সামনের বইমেলা ধরার ইচ্ছে। দেখবেন হট কেকের মতো বিক্রি হচ্ছে। মিথিলা রহমান বই করতে চাইলে এদেশের কোনো প্রকাশক না বলতে পারেনা, জানেন তো।
তা অবশ্য জানতাম না। জানলাম। এরকম একটা সংবাদ কেনো যে এতো পরে জানলাম। আমি হলাম গিয়ে মনে প্রাণে একেবারে বিশ শতকের মানুষ, কোনো আপগ্রেড নেই, বুঝলেন তো। নো ফেইসবুক, নো টুইটার। শুধুই হাত আর কলম। হা হা হা।
ওহ্ গড এখনও কলম। যাকগে, যে যেটাতে সাচ্ছন্দ বোধ করে।
ক্রিটিসাইজ করছেন নাকি সন্দেহ প্রকাশ করছেন? সে করতেই পারেন। কিন্তু আপনি ভালই লিখছেন অনেকের চেয়ে, অস্বীকার করি কি করে। আজকাল তো সব যা লেখা। আর মেয়েদের অধিকাংশ লেখাইতো মেয়েলি টাইপের। কবে যে মেয়েরা বের হয়ে আসতে পারবে এই মেয়েলিপনা থেকে। একটা দু’টা বই বের করেই রাতারাতি সাহিত্যিক। বোঝেন। একটা দু’টা গান শিখেই যেমন রাতারাতি টিভি আর্টিস্ট বনে যাওয়া সেরকমই অনেকটা, নাকি বলেন।
টিস্যু দিয়ে লিপিস্টিক বাঁচিয়ে আলতো করে ঠোঁটের আশপাশের জায়গা মোছে মিথিলা। আঙুলের ডগা দিয়ে কপালের টিপের সঠিক উপস্থিতি অনুভব করে নিশ্চিত হয়। বিশ শতকের মানসিকতার মানুষটির সামনে ছোট্ট আয়নাটা বের করতে কিছুটা সংকোচ বোধ করে।

লেখালেখি তো আর কম দিন থেকে করছিনা ম্যাডাম। দু’চারজন ভাগ্যবান লেখক ছাড়া লেখকদের দুনিয়া বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝে মাঝেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। যারা বিখ্যাত হয়েছেন তাদের লেখাগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ি। আবার নিজেকে প্রস্তুত করি। এই সময়ে লিখে বাক্স বন্দি করে রেখে দিলে পঞ্চাশ বছর পর কেউ আর তা খুলে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখাবে না। সে যুগ নেই। এখন সব কিছুই করপোরেট স্টাইলে হয়। নিজের ঢাক বাজানোর জন্য নানা রকম কৌশলের প্রয়োজন হয়। যেমন ধরুন ‘অমুক’ গুড়ো মশলার বিষয়টা। ঐ ব্রান্ডের বিস্কুট আছে বাজারে কিন্তু গুড়ো মশলাটা নতুন। এখন পেপারে কিংবা টিভিতে যত বিজ্ঞাপন যাবে তত প্রচার। মিনিটে মিনিটে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে মানুষ এক সময় না একসময় প্রোডাক্টটা কিনবেই। অন্ততপক্ষে একটা প্যাকেট না কিনে তো এদেশে থাকার উপায় নেই। স্বতঃস্ফুর্তভাবে কোনো জিনিষের প্রশংসার দিন এখন প্রায় শেষ। এখন সব কিছুতেই হিরক রাজার দেশের ফর্মুলা চলছে। মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া। আজকের বইদুটোর খবরটা কোনো দৈনিক পত্রিকায় যখন বের হবে হাজার হাজার মানুষ খবরটা পড়বে। বইদুটোর নাম জানবে, লেখকের নাম জানবে। বইদুটোর বিষয়বস্তু কি, কেমন এবং কোন মানের সেটা পরে বিবেচ্য। আপনি পত্রিকার লোক যোগাড় করে একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে পেরেছেন এবং খবরটা পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছেন এটাতেই চল্লিশ পারসেন্ট সাফল্য। এভাবে দুতিনটে অ্যারেঞ্জমেন্ট যদি করতে পারা যায় তাহলে নামগুলো মানুষের মগজে মোটামুটি লেপ্টে দেওয়া যায়। লেপ্টে যাওয়া জিনিষ মোছা কি কঠিন ব্যাপার সে তো জানেনই।

দুর-ও এতো কথা শোনাতে কে বলেছে আপনাকে। গুড়ো মশলা টশলা দিয়ে বাদশাহী কাবাব বানিয়ে ফেললেন। কাবাবে লেবুর সঠিক প্রপোরশন না হলে মানে বেশি হলে কিন্তু তিতা হয়ে যায় জানেন তো। নেগেটিভ টেনডেন্সি আর হতাশা নিয়ে ড্রামা। পজিটিভলি ভাবুন জাফর সাহেব। দেখবেন সব স্মুথ চলছে।
পজিটিভলি ভাবলেই সব স্মুথ চলে না ম্যাডাম। যাই বলেন নেগেটিভ সাইডটাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। একজন নামকরা লেখকের মুখ থেকেই শোনা, ‘লেখকদের একটুখানি নির্লজ্জ হতে হবে, তা নাহলে যত ভালো কিছুই লিখেন না কেন, নো ভ্যালু’। কথাটা কেমন বিশ্রি শোনায় না? আসলেই কি তাই?
হ্যাঁ, শুনতে খারাপ লাগে কিন্তু এটাও সত্য।
আপনার লেখা কিন্তু চমৎকার। আমি বেশ পছন্দ করি।
নো ডাউট। লোকে বলে, শুনতে ভালো লাগে। আমার এবারের উপন্যাসটা পড়েছেন, না পড়ে থাকলে পড়ে নিবেন প্লিজ, না হলে কিন্তু মিস করবেন। চমৎকার একটা বিষয় নিয়ে লিখেছি।
আবার ঘাড়ের চুল সরায় মিথিলা। অহংকারী ভাবটা আরও একটু গাঢ় হয়ে এলে বলে, আপনি যে সব বলছেন, সবই যুক্তিসংগত। তারপরেও কথা থাকে, যুগের সাথে তাল মেলানো। যাকগে, নতুন কি লিখছেন?

একটা উপন্যাস করার ভাবনা নিয়ে খাতা কলম নিয়ে বসছি কিন্তু তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। বটতলার উপন্যাস লিখতে হলেও ধৈর্য্য সহকারে বিষয়ের গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করতে হয় নাকি বলেন।
একশ ভাগ সত্যি। আজকে যে বইটার ওপর আপনি আলোচনা করলেন সত্যি করে বলুন তো বইটি আপনার কেমন মনে হয়েছে? যদিও আমি বইটি পড়িনি, সব বই পড়ার সময়ও পাইনা, তবে আমার মনে হয়েছে বিষয়বস্তু বেশ নতুন। এখন কথা হলো উপস্থাপন করা নিয়ে। যদি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে এক কথা বার বার উপস্থাপন করা হয়, তাহলে ওটা একেবারেই বাতিল, কি বলেন? এছাড়া লেখার ভেতর যদি হিউমার না থাকে তাহলে লেখা অ্যাট্রাকটিভ হয় না। ছোট গল্পের বিষয়টায় আমি মনে করি বৈচিত্র থাকা চাই ফরমেটের।
সে তো বটেই। আমি একমত। তো, উনি আমার বন্ধু মানুষ। একেবারে খারাপ লেখেন না, আবার এ প্লাসও পেতে পারেন না। চলুন যাওয়া যাক, সবাই প্রায় বের হয়ে গেছে।

আরও পনেরজন লেখককে ফোন করে মিথিলা। বই সম্পাদনা করা কি সহজ ব্যাপার। একজন লেখকের চেয়ে একজন সম্পাদকের দায়িত্ব হাজারগুন বেশি। পনেরোজন লেখককে ফোন করার যে অভিজ্ঞতা তা দিয়েই চমৎকার একটা বই হয়ে যেতে পারে ভাবে মিথিলা। বিষয়টা মাথায় রাখে। গতবারের বইটা করতে যেয়ে দারুণ সব অভিজ্ঞতা। এক ভদ্রলোক তার প্রেমে পড়ার জন্য উইগ পড়া শুরু করে দিয়েছিল। মাথার অনেকটা জুড়েই ছিল টাক। ভদ্রলোক ফোন করে করে একেবারে হিপনোটাইজ করে ফেলেছিল তাকে। কোন রঙয়ের শাড়িতে তাকে অপ্সরীর মতো লাগবে, কোন রঙয়ের শাড়িতে ড্যাম স্মার্ট, কোনটাতে বয়স দশবছরের মতো কম মনে হবে ইত্যাদি বলে বলে মিথিলার মাথা বিগড়ে দিয়েছিল প্রায়। মানুষ তো। ভাগ্যিস পাখনা গজানোর আগেই আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল মিথিলার। এই বয়সে অপ্সরীর মতো লাগতে পারে কি না বিষয়টা নিয়ে ভাবতেই খানিকটা গবেষণার মতো অনুসন্ধান শুরু করলে পরিষ্কার হলো। নইলে হয়েছিল আর কি। তার সোনার সংসার তামার বাসন কোসন হয়ে যেত। যদিও ইবলিশ স্বামীটিকে শায়েস্তা করার গোপন একটা ইচ্ছে তার আছে। সুযোগ পেলে করবেও। বয়সটা এখন আর কোনো বিষয় নয়, একটা সংখ্যা মাত্র। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ, পঞ্চাশ থেকে ষাট। এই বয়সেও এখন ধুরধার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে অনেকেই। দু একটা নতুন প্রেম থাকাটাই এখন একটা স্টাটাস মনে করছে অনেকেই। তো, মিথিলা ভেবেছিল সেই সুযোগটা বোধহয় তারও এসে গেছে। কিন্তু ওরে বাবা, ইনি তো আর এক কাঠি সায়ানাইড। সায়ানাইড গেলার আগেই ভাগ্যিস তার হুশ হয়েছিল।
উহ্, মানুষ এতো বেশি কথা বলে কেমন করে। চটর চটর ঘটর ঘটর। ফোন ধরলে আর ছাড়ার নাম নেই। এক লাইনের কথাকে সতেরো লাইনে বলার চেষ্টা। ‘জানেন তো আমার না….’। আরে বাবা লেখা চেয়েছি, লেখা দিবা, এতো প্রশ্ন কেন। একটা উন্নত মানের গ্রন্থে তোমার গল্পটা স্থান পাবে এটা কি কম ভাগ্যের ব্যাপার। সতেরো লাইন কথা শোনা মানে কমপক্ষে দশটাকার ফোন বিল। পনেরোজনের সাথে সতেরো লাইন করে কথা বললে একশ পঞ্চাশ টাকার বিল সন্দেহ নেই। এটা তো কেবল শুরু। এর পর তো আরও ফোনাফুনি গোনাগুনি আছেই। এসব গোনাগুনি কথাশিল্পিদেরও জানতে হবে, লাইনের পর লাইন বাক্য তৈরি করলেই শুধু চলবে না। ‘ওয়ার্ড কাউন্ট’-এর বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

কয়েক বছর একটা লিটল ম্যাগাজিন চালিয়েছে মিথিলা, আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কিন্তু সম্পাদনা বিষয়টায় দুর্বলতাটা রয়ে গেছে। সম্পাদকের জায়গায় নিজের নামটা দেখার প্রবল তাড়না অনুভব করে মাঝে মাঝেই। এর আগে কিছু চিঠিপত্রের একটা সম্পাদনা করেছিল। এবার একটা ছোট গল্পের সংকলনের ভাবনায় মস্তিস্কের নিউরন আন্দোলিত। লেখক হিসেবে মোটামুটি একটা সফলতা তার আছে। আম জনতা না জানলেও সাহিত্য সমাজে তার পরিচিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা অস্বীকার করার চেষ্টা করে তারা কুচুটে টাইপের। তাদের দ্বারা ভালো কোনো কাজ কখনোই হয় না। তো, সেই ভরসাতেই পনেরোজন লেখকের কাছে গল্প চেয়ে ফোন করা। একজন তো বলেই ফেললেন, সম্মানী দেওয়া হবে কিনা। সম্মানী না দিলে গল্প দিতে পারবেন না। অযৌক্তিক নয় বিষয়টা তারপরেও শোনার সাথে সাথে কানে খটাস করে লাগে। লেখকদের বুঝতে হবে, এই যে এরকম একটা বইয়ে তার গল্পটা ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে এর মূল্য কতখানি। পঞ্চাশ বছর পর কোনো গবেষক এরকম একটা বইয়ের গল্পগুলোকে গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিবেন, মিথিলার বিশ্বাস। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গল্প বাছাই করতে হবে। বন্ধুবান্ধবরা গল্প পাঠিয়ে দিলেই হবে না, মানসম্মত হতে হবে। এতে অভিমান করে যদি কেউ বন্ধুত্ব না রাখতে চায় কিচ্ছু করার নেই মিথিলার। মুখে কিছু না বলতে পারলেও সে ইমেইল করে ক্ষমা চেয়ে নিবে। এটুকু ভদ্রতা অবশ্যই সে করবে। সব কথা কি আর মুখে বলা যায়? যায় না।

পনেরোটা গল্প বাছাই করে ফেলে মিথিলা। চারজন দুটো করেও পাঠিয়েছিল। সবগুলো রাখতে পারলে বইয়ের স্বাস্থ্যটা ভালো দেখা যেত, কিন্তু উপায় নেই। ফর্মার ব্যাপার আছে। প্রকাশক ঠিক হয়ে গেছে। বইটি বের করতে পারলে প্রকাশক ধন্য হবেন, এরকমটাই বলেছেন। তবে কথা আছে…।
ফোনে সবাইকে জানায় মিথিলা। গল্প বাছাই হয়ে গেছে। প্রুফ দেখাও শুরু হয়ে গেছে। তার আগে সে নিজে খুব ভালো করে পড়ে দেখেছে, কিছু সংশোধন করতে হয়েছে। খুব সহজ কাজ নয়। এর আগেরটায় কিছু ভুলত্রুটি হয়ে গিয়েছিল এবার আর হতে দেবে না। এবার বেশি পয়সা খরচ করে প্রফেশনাল প্রুুফ রিডারকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিবে। প্রচ্ছদও নামকরা শিল্পীকে দিয়েই করাবে। বই হাতে নিয়ে পাঠক যেন কোনো ত্রুটি খুঁজে বের করতে না পারে, এরকমই ব্যবস্থা নিচ্ছে সে। জাফর শামস ফোনে একদিন বইটির খরচ বিষয়ক একটা কথা বলার চেষ্টা করলে মিথিলা একুশ শতক স্টাইলে মৃদু তিরস্কার করে। জাফর শামস তার বন্ধু মতোন। এটুকু মৃদু তিরষ্কার করা যেতেই পারে।
সে নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন? বলেছি না আপনাকে…। আপনি শুধু ভালো একটা গল্প দেন। ব্যাস। আমারও একটা গল্প থাকছে। অতএব মোট ষোলটা গল্প। আট ফর্মার মতো হবে হয়তো। একেবারে চিকন আকারের নয় কি বলেন। জানেন তো, আমার মোটা বই দেখতে ও পড়তে ভালো লাগে। একটা মোটা আকারের বই হাতে নিলে মনে হয়, হ্যাঁ, পড়ছি একটা বই।
আমারও অবশ্য এরকম একটা ব্যাপার আছে। এখানে বোধহয় আপনার সাথে মিল হয়ে যাচ্ছে কি বলেন। হা হা হা।

আরে কিছু কিছু মিল না থাকলে কি বন্ধুত্ব হয়।
পনেরো জনের সাথে ফোনে কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও প্রায় একশ ত্রিশ টাকার মতো ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায় মিথিলার। এটুকু অবশ্য করতেই হতো। তাওতো সবাই ইমেইল করে লেখা পাঠিয়েছে, নইলে কম্পোজের বিষয়টাও এসে যেত। এই একটা সাংঘাতিক সুবিধা হয়েছে, মেইলে লেখা জোগার হয়ে যাওয়া। সম্পাদনার বিষয়টা সে কারণে অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। তারপরেও একশ ত্রিশ টাকার ফোন বিল ওঠার পরেও যে কথাটা সে ফোনে কাউকে বলতে পারেনি বা বলেনি সেটা ইমেইল করে পাঠায়। এটা না করে উপায় ছিলনা। বিষয়টা আগে থেকেই তাকে এভাবেই ভেবে রাখতে হয়েছে।

ইমেইল- মাননীয় লেখক, সম্পাদিত বইটি অবশ্যই দশটি করে কিনে বন্ধুবান্ধবদের উপহার দিন। আপনার লেখা সম্পর্কে গভীর করে বন্ধুদের জানতে দিন। ধন্যবাদ। মিথিলা রহমান।