মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষণায় সমস্যা ॥ সাইফুল ইসলাম


বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। এই অধ্যায় বাঙালি জাতিকে বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সুযোগ এনে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা, আলোচনা, ইতিহাস সংরক্ষণের প্রবণতা এখন বেড়েছে, এটি সুসংবাদ। তবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা বাড়লেও তা উঁচুতলার কোঠাঘরেই আটকে আছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যা কিছু পাওয়া যায় তা প্রধানত কেন্দ্রীয় রাজনীতি, তারকা তারকা মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধ, পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ, নারী নির্যাতন, গণহত্যা ইত্যাদি। এবং তা ধীরে ধীরে তা আরো নির্দিষ্ট যুদ্ধগুলোতে আটকে যাচ্ছে। একটি জেলা বা মহকুমায় যে যুদ্ধটি বড় যুদ্ধ তা নিয়েই আলোচনা করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে সবাই, ফলে সংকুচিত হয়ে আসছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হয়ে উঠছে ফরমায়েশী। অথচ মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় জনযুদ্ধ।

মহাফেজখানার ইতিহাসেও নানা ত্রুটির ছাপ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধারণাপত্রে যা বলা হয়েছে, মনে করা হচ্ছে যে, বাস্তবে তার প্রয়োগ হয়েছে, সে অনুযায়ী চলছে গবেষণা। আসলে তা মাঠে প্রয়োগ হয়েছে কিনা, না হয়ে থাকলে কেন হয়নি- তারও যে গবেষণা প্রয়োজন, সে বিষয়ে গবেষকদের ধারণাই গড়ে উঠছে না। যেমন- এফএফ, মুক্তিফৌজ, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী- এদের বিষয়ে ধারণাপত্রে যা বলা হয় তার প্রতিফলন কি যুদ্ধক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে?

যেমন এফএফ; এরা মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। প্রবাসী সরকার আদর করে এদের নাম রাখে ‘গণবাহিনী’। এফএফকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো চার সপ্তাহ, পরে তিন সপ্তাহ করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ এদের উদ্দেশ্যে বলতেন, ‘আমরা তোমাদের প্রশিক্ষণ দিতে পারিনি, শুধু অস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। তোমরা যুদ্ধ শিখবে যুদ্ধক্ষেত্রে, যুদ্ধ করতে করতে।’ এই গেরিলা যোদ্ধাদের কোথায় যুদ্ধ করার কথা? অবশ্যই গেরিলারা তাদের নিজের পরিচিত এলাকায় পরিচিত জনদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করবে? কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেছে কি? মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এফএফ প্রথম ব্যাচের চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তা শেষ হয়। এভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় ৮৫,০০০ এফএফ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেয়। অস্ত্র সরবরাহসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে আসার সুযোগ পায়। কিন্তু কোন যুদ্ধক্ষেত্র? সাধারণ এফএফ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে এদের প্রধানত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হয়। সেখানে তাদের মুক্তিফৌজ বা বিএসএফের অধীনে ‘ডিফেন্সে’ যুদ্ধ করে ‘যুদ্ধের সাহস’ অর্জন করতে হয়। এভাবে প্রথম দিকে প্রশিক্ষণ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা সরাসরি নিজ এলাকায় আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা অক্টোবর থেকে দেশের ভেতরে আসতে শুরু করে। পাশাপাশি এ সময়ে প্রশিক্ষণ শেষ হওয়া এফএফদের সরাসরি দেশের ভিতরে পাঠানো শুরু হয়। কিছু এফএফ মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ যারা দেশের ভেতরে আসার সুযোগ পেয়েছে, তারা এ সুযোগ পেয়েছে মূলত ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠতে পারে ভেবে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা দেশ মুক্ত হওয়ার আগে অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ নিজের পরিচিত এলাকায় পা-ই রাখতে পারেনি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালিদের নিয়ে গঠন করা হয় মুক্তিফৌজ। প্রয়োজনের তুলনায় সংখ্যা কম হওয়ায় এদের সঙ্গে যুক্ত করা হয় ইপিআর, পুলিশ, আনসার এমনকি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদেরও। ইপিআরের ১২ হাজারসহ এদের সংখ্যা প্রায় কুড়ি হাজার। প্রবাসী সরকারের কাছে থেকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পায় তারা। সেক্টর প্রধানও হন এরাই। এদের অধীনে এফএফ মুক্তিযোদ্ধারাও পরিচালিত। মুক্তিফৌজের এ কর্মকর্তারা মূলত প্রথাগত যুদ্ধের ধারণা নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে আসে এবং সে কৌশলই মুক্তিযুদ্ধে প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়। মুক্তিফৌজ মনে করতো, নিয়মিত বাহিনীকে শক্তিশালী করে একসময় দখলমুক্ত করা হবে বাংলাদেশকে। এরা সীমান্ত এলাকায় ঘাঁটি করে ওই এলাকার পনের মাইল অভ্যন্তরে পাকবাহিনীর ওপর হামলা পরিচালনা করতো। এবং এফএফ মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের ভেতরে পাঠানোর সময় আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করতো। অক্টোবরে এসে মুক্তিফৌজ প্রধান কর্নেল ওসমানী তার বাহিনী নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি নিজে তার বাহিনীকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে দেশের ভেতরে গিয়ে গেরিলা যুদ্ধ করার পরামর্শ দেন। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে মুক্তিফৌজ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। অবশেষে মিত্র বাহিনীর সহায়তায় মুক্ত হয় বাংলাদেশ।

আমরা জানি যে, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের মধ্যে পাকসেনারা বাংলাদেশকে পুনর্দখল করে। তাড়া খাওয়া বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এমনকি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতারাও সীমান্তের ওপারে চলে যায়। এ সময় নানা কারণে নানা ভাবে কেউ কেউ আত্মগোপন করে দেশের ভেতরেই। এ মানুষগুলোর মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার সদস্যরা। প্রাথমিক অবস্থায় এদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে জন্য গড়ে উঠতে থাকে ছোট ছোট গ্রুপ। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের যুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এই গ্রুপগুলো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ওপর। এরা রাজনীতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ, ফলে এই গ্রুপগুলোও পরিচালিত হতে থাকে প্রায় নিয়মিত বাহিনীর মতো করে। গেরিলা গ্রুপের পরিবর্তে এরা পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে স্থানীয় বাহিনী হিসেবে। টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, সিরাজগঞ্জের পলাশডাঙ্গা যুব শিবির, মাগুরার আকবার বাহিনী এসব স্থানীয় বাহিনীর অন্যতম উদাহরণ। এক সময়ে এসে এরা সহজেই চিহ্নিত হয়ে পাকবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হতে শুরু করে। ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে এসব বাহিনী। আবারো গড়ে উঠতে শুরু করে ছোট ছোট গেরিলা দল। সারাদেশে স্থানীয় ভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা প্রায় সত্তুর হাজার।

আসা যাক বিএলএফ প্রসঙ্গে, যারা নিজেদের পরিচিত করে মুজিব বাহিনী হিসেবে। বলা হয়, এরা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনী। দেশের ভেতরে যুদ্ধ করার জন্য এ বাহিনী গড়ে ওঠে। এ বাহিনী সম্পর্কে ঢালাও ভাবে দুটি অভিযোগ ওঠে। এক. এরা ‘বামপন্থী’দের নিধনের জন্য প্রতিষ্ঠিত; দুই, এরা কোনও যুদ্ধে অংশ নেয়নি। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, পূর্ব বিরোধের জের ধরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কোথাও কোথাও কোথাও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও তা সর্বত্র নয়। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে পাবনা সদর মহকুমার। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে নক্সালপন্থীরা হত্যা করে আওয়ামী লীগ নেতা সদ্য নির্বাচিত এমপিএ আহমেদ রফিককে। যার জের চলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল জুড়ে। আবার অনেক স্থানেই ঐক্যবদ্ধ ভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ঘটনাও পাওয়া যায়, যেমন চাঁদপুর। তাই ঢালাও মূল্যায়ন এখানে কার্যকর নয়। দ্বিতীয় অভিযোগও ব্যাপক গবেষণার দাবি করে। কারণ দেখা যায়, বিভিন্ন জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রধান মুক্তিযোদ্ধারা বিএলএফ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া, কিন্তু এদের যে রাজনৈতিক কৌশলে যুদ্ধ করার কথা তা না করে সাধারণ কৌশলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ফলে তাদের যুদ্ধ আর বিএলএফের যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। যেমন সিরাজগঞ্জের আব্দুল লতিফ মির্জা, পাবনার রফিকুল ইসলাম বকুল ও ইকবাল আহমেদ, কুষ্টিয়ার আব্দুল হাদী, খুলনার কামরুজ্জামান টুকু, মাদারীপুরের শাজাহান খান। এরা সবাই বিএলএফ ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা স্ব স্ব এলাকার প্রধানতম যোদ্ধাও। তাই বিএলএফ-এর যুদ্ধ না করার অভিযোগটি সঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে বিএলএফের রাজনীতি ও যুদ্ধ কৌশল আলোচনা হওয়া খুবই জরুরী।

সবশেষে গবেষকদের যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনা জরুরী তা হলো, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের জটিল রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের গবেষণাকে অনেক জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের উত্থান সঠিক তথ্য সংগ্রহকেও জটিল করে তুলেছে। ফলে এখন শুধু কিছু প্রশ্নপত্র ছেড়ে দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা পদ্ধতিটি আর কার্যকর নেই বলেই মনে হয়। এ জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির একটি আন্দোলন, যা জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়ার সাহস জোগাবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাহসী হয়ে উঠবে সঠিক তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে।