মৃত্যু এসেছিল বলে আমরা হেসেছিলাম ॥ অদ্বৈত মারুত



যা ঘটনা ঘটল রে বাবা! অনুমানই করতে পারিনি, নইলে কী আর এত কাণ্ড ঘটে? আল্লাহ রহমান বলেই না আজ রক্ষে পাওয়া গেল।

বিকাল পাঁচটা হয়ে কয়েক মিনিট হবে তখন। মহাব্যস্ত। বিশেষ সংখ্যার কাজ চলছে। শেষ কিস্তি। ছয়টা থেকে ছাপা শুরু হওয়ার কথা। ছাপা শুরুর আগে আরও কয়েক হাত হতে হয়। তখনও কিছুই হয়নি। বারবার প্রেসম্যান তাগাদা দিচ্ছে, রাগারাগি করছে, আজ যে কপালে কী আছে ভাব নিয়ে কম্পিউটার অপারেটর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, টেনশন আর টেনশন তার। দেখে মনে হচ্ছে, এখনই আজরাইল তুলে নিয়ে যাবে। রাত দশটায়ও যে প্রেসে এ সংখ্যা দিতে পারবে না, সে কথাও বলে আমাকে আরও গভীর চিন্তায় ফেলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এর মধ্যেই টেলিফোন বেজে উঠলো। রিংটোন যে এত বিশ্রী হতে পারে, আজকেই জীবনের প্রথম উপলব্ধি করলাম। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ঘ্যার ঘ্যার করতে করতে কানে ভেসে এলো- দোস্ত, আমি মাহমুদ, মোবাইল ফোনটা ধর। কাজের সময় মোবাইল ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখি। বিশেষ সংখ্যার কাজের সময় পুরোই বন্ধ। তো খুললাম। সঙ্গে সঙ্গে ফোন। দোস্ত, আমি এই পাড় আইছি। কেরানীগঞ্জ। সদরঘাট আসতেছি। তুই আধাঘণ্টার মধ্যে আয়, নইলে- এটুকু শোনার পর ওর কথা শুনতে আর ইচ্ছা করলো না। জীবনে বহু বিপদ সামনে এসেছে, ফালি ফালি করে কেটে ফেলেছি। এগিয়ে গেছি। কিন্তু আজ এমন এক অবস্থা যে, সময় আঙুলের কড়ে বাঁধা। ভেবেছি, যে কোনোভাবেই হোক, ছয়টার মধ্যে কম্পিউটার অপারেটরের হাতে সংখ্যা বুঝিয়ে দিয়ে বের হবো। এখন প্রতিটা মুহূর্তই মূল্যবান। ইতোমধ্যে নালিশ সম্পাদক পর্যন্ত চলে গেছে। উপসম্পাদক দুবার ঢুঁ মেরে গেছেন। ঊর্ধ্বতন অন্যরাও আশপাশ দিয়ে ঘুরে গেছেন। প্রতিটি লেখার প্রতিটি শব্দ পড়ে দিতে চাই। পাঠে গভীর মগ্ন বলে আমার সঙ্গে কেউ কথা না বলেই চলে গিয়েছেন বা আশপাশে ঘুরঘুর করছেন। আসলে এটা এমন এক সময়, মৃত্যু এলেও তাকে পাশে বসে থাকার অনুরোধ করতাম। তো এমন এক মুমূর্ষু সময়ে ফোনটা। কিছুটা অশান্ত গলায় বললাম, অফিসে আছি, খুব ব্যস্ত। মরারও সময় নাই, এখন রাখ- বলে প্রায় ধমক দিয়ে কল না কেটেই টেবিলের ওপর ঠাস করে ফেলে দিলাম।

কাজ শেষ করতে করতে তখন বিকাল সাড়ে ছয়টা বেজে গেল। ভাবলাম, বাসে রওনা দিলে নয়টার আগে সদরঘাট পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই উবার নিলাম। বাইক। যেতে যেতে মাহমুদকে ফোন দিলাম। ঢুকল না। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলাম। ফোন বন্ধ। টেনশন তখন থেকে শুরু হলো। যতই ফোন দিই, বন্ধ।
চিপাচাপা গলি ঘুপচির মধ্য দিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে সাতটা। এখন এই সদরঘাটে মাহমুদকে কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব, ভাবতে ভাবতে আবার ফোন দিলাম। ফোন ঢুকলো। রিসিভও করলো কিন্তু কথা শোনা গেল না। যতবার ফোন দিই, ও ততবারই রিসিভ করে কিন্তু কথা হয় না।

রাত তখন আটটা। সদরঘাট। বিআইডব্লিউটিএ’র পাশে গেলাম। হুইসেল বাজিয়ে কোন লঞ্চ যেন ছেড়ে যাবার তাড়া দিচ্ছে তখন। সারাদিন না খাওয়া আর অতিমাত্রায় টেনশনে মাথা দুপুর থেকেই একটু একটু করে ব্যথা করছিল। এখন পুরোই জেঁকে বসলো। বমি বমি ভাব। কত কোটি বার যে আজ আল্লাহকে ডাকছি, তার হিসেব নেই। তবু মাহমুদের দেখা নেই। সব মিলিয়ে খুব বাজে অবস্থা হওয়ায় পাশের এক হোটেলে ঢুকলাম। হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। কিন্তু আর দাঁড়াতে পারছিলাম না।

রাত সাড়ে আটটা। একটা ফোন এলো। কোনোভাবে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই, আপনি মিডফোর্ট হাসপাতালে আসুন, রোগীর অবস্থা ভালো না, বলেই কেটে গেল। তখন অবস্থা আমার এমন যে, কোথায় আছি, তাই বুঝতে পারছি না, মিডফোর্ট হাসপাতালে যেতে হবে শুনে মাথা আর তুলতেই পারছিলাম না।
তবু এক রিকশাওয়ালাকে বলামাত্র রাজি হয়ে গেল। ভাড়া-টাড়া নিয়া কথা বলছি কিনা, মনে নেই। রিকশা চিপাচাপা এ গলি, সে গলি দিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হালকা বাতাস লাগায় কিছুটা ভালো লাগছিল বটে কিন্তু রিকশা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, ওকে জিজ্ঞেস করার মতো অবস্থা ছিল না। দ্রুত রিকশা টান দিতে গিয়ে রিকশাওয়ালা এমন এক কাণ্ড করে ফেলল যে, হাসপাতালে বন্ধুকে খুঁজতে গিয়ে নিজেই রোগী সেজে হাসপাতালে। না, খুব বেশি চোট লাগেনি। বাম হাতে এক ভাঙা, বাম পায়ে সামান্য চোট আর চোখের নিচে একটা গভীর জখম। এটুকু ড্রেসিং আর ওষুধপত্র মিলিয়ে জরুরি বিভাগ থেকে বেরোতে বেরোতে রাত দশটা আটত্রিশ। ফোন বের করে দেখি, বাসা থেকে শতাধিক মিসড কল। আবার টেনশন, মাথাব্যথা, ভয়- সব একবারে পেয়ে বসে। কল ব্যাক করতেই বড়মেয়ের চিৎকার, কই তুমি? এক্ষুনি বাসায় আসো। এরপর মেয়ে আরও কি কি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে, শুনতে পাচ্ছিলাম না। আদৌ মস্তিষ্ক কাজ করছিল বলে মনে হচ্ছিল না।

রাত দশটা পঞ্চান্ন। গেট দিয়ে বেরোবার পথে মাহমুদের সঙ্গে দেখা। আমার এ অবস্থা দেখে সে বিস্মিত। সংক্ষেপে যা বললো তার সারমর্ম এই, চাঁদপুর থেকে বউয়ের সঙ্গে লঞ্চে উঠেছে। বউয়ের সখ হয়েছে, বুড়িগঙ্গার বুকে ডিঙি নৌকায় চড়ে সে ঘুরে বেড়াবে। একটু জলকেলি করবে। রাতের লঞ্চ ধরে আবার ফিরে যাবে চাঁদপুর। মোটামুটি এমন পরিকল্পনা নিয়ে সদরঘাট নেমে ছোট্ট ডিঙি ভাড়া করে কেরানীগঞ্জ যায়। ফেরার পথে জলকেলি করতে গিয়ে বাঁধে বিপত্তি। নৌকা ডুবে যায়। বউয়ের অবস্থা এখন কিছুটা ভালো। ভয় পেয়েছে খুব। ঘুমিয়ে আছে বলে মাহমুদ বাইরে বের হয়েছে জানানোর পর ঘড়িতে দেখি এগারোটা আঠারো। সর্বাঙ্গে ব্যথা তাতিয়ে উঠছে দেখে মাহমুদকে বাসায় যাব বলায় কেমন যেন ফুটো বেলুনের মতো হয়ে গেল মুখ। থাকছিস না আমার পাশে বলেই হনহন করতে করতে হাসপাতালের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা একান্ন। গলির মুখে পুলিশ ভ্যান। কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছেন। কথা বলাবলি করছেন। ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যাপার মনে হলো। বাসার গেটের সামনে আরও কয়েকজন পুলিশ। থামালেন। সাংবাদিক বলায় কত তলায় থাকি, জানতে চাইলেন। বললাম। বড়মেয়ে জেগে আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ফিরতে দেরি হলে পথ চেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা বলে ছোট্ট একটা ডাক দিল। হ্যাঁ, মা বলার পর শান্ত হলো। বাসার গেট খোলা। ঘটনা কী, পুলিশের একজনের কাছে জানতে চাইলে যা বললেন তার সারমর্ম হলো, পুরুষ একজন আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল। তার আগে পাশের বাসায় ঢুকে তাদের ওপর চড়াও হয়েছিল। পুরো পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। আপনি বাসায় যান।
একটা বারো। তখনও ঢুলতেছিলাম। মাথা ছিঁড়ে পড়ে যাবে কিনা, বুঝতে পারছিলাম না। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মনে হলো, একটা অজগর সাপ। ও কখন আমাকে গিলে খেয়েছে, কিছুই টের পাইনি। ওর পেটে ক্রমে চালান হচ্ছি। ক্রমে নাই হয়ে যাচ্ছি, নাই হতে হতে, দম বন্ধ হয়ে আসার আগে হঠাৎ একটা ধ্বনিতে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। কে, কে যেন বাবা বলে ডেকে উঠলো, জাপটে ধরলো, কাঁদতে কাঁদতে আশ্রয় খুঁজে নিল। দরজা খোলা। সামনাসামনি দুই ফ্ল্যাটের। ভদ্রলোক বসে আছে। মাথা নিচু করে আছে। ছোট্ট মেয়ে আছে তারও। কিছু টাকা ধার চেয়েছিল সকালে। দিতে পারিনি। নেই। মানে নিজেরই ত্রাহি ত্রাহি। মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্লান্ত দুর্বল দুচোখ। বড় মায়াময়, বড় আদরের। ভদ্রলোক কথা বলে উঠলেন। মেয়েকে বুকে নিলেন। ছোট করে বললেন, ক্ষমা করে দেবেন। ঘরে যান।

আহা, ঘর। মৃত্যু আলিঙ্গন করে ফিরে আসা এই ঘরে। আধো আলো, আধো অন্ধকারে বাইরে তাকাই। চাঁদ খলখল করে হাসছে, তারাগুলো হাসছে। আহা, জীবন সুন্দর। সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা সৌন্দর্য। পাশের ফ্ল্যাট থেকে বাবা-মেয়ের হাসি ভেসে আসছে চাঁদের আলোর মতো খলখলিয়ে।

২৩ নভেম্বর ২০২০