যুদ্ধস্মৃতি ॥ আনিসুর রহমান


আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধকে বলা হয় জনযুদ্ধ। সে হিসেবে এদেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা, তবুও সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা না বলে কাউকে কাউকে বলা হয় মুক্তিযোদ্ধা। এ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবার আলাদা করে তালিকাও করা হয়েছে। আমি সেই তালিকা ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।

আমি মো. আনিসুর রহমান, জন্ম- ১৯৫৪ সালের ৩ মার্চ। বাবা আজিজুর রহমান, ব্যবসা করতেন। মা হালিমা খাতুন গৃহিণী। ৪ ভাই ৪ বোনের মধ্যে আমিই প্রথম। বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর থানার ছোনগাছা ইউনিয়নের চর ছোনগাছা গ্রামে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাশ করে ভর্তি হই ভাটপিয়ারী হাই স্কুলে। স্কুলে আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সিরাজগঞ্জ মহকুমার নেতা আমাদের গ্রামের পাশ্ববর্তী বাহুকা গ্রামের আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি হয়। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের এক সম্মেলনে আমরা বেশ কয়েকজন ছাত্র ঢাকায় ছাত্রলীগের সম্মেলনেও অংশ নেই। যদিও এ সবই রাজনীতি না বুঝে রাজনীতি করা। এভাবেই যুক্ত হই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সঙ্গে।

১৯৬৯ সালে ভাটপিয়ারী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ আইআই কলেজে। শহরের বাহিরগোলায় আমার খালু শমশের মির্জার বাড়িতে থাকতাম। সিরাজগঞ্জ ছাত্রলীগের নেতা আমিনুল চৌধুরী ছাড়াও কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমির হোসেন ভুলু, সিরাজুল ইসলাম খান, গোলাম কিবরিয়া, এমএ রউফ পাতা, আজিজুল হক বকুলসহ অন্যান্য ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এভাবে আমিও নিয়মিত বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিতে শুরু করি।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আমাদের আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার, এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী। মুসলিম লীগের এমএনএ পদে প্রার্থী ছিলেন আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। ন্যাপ কুড়েঘর মার্কার প্রার্থী হন এমএএ পদে সাইফুল ইসলাম এবং এমপিএ পদে শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন। আমরা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে পাড়াপ্রতিবেশী ছাড়াও আশপাশের গ্রামগুলিতে ভোট চেয়ে বেড়াই। নির্বাচনে আমাদের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হন। একই ভাবে সারাদেশে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা সহজেই জয়ী হয়। এ ভাবেই আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের ১ মার্চে ইয়াহিয়া খানের একটি ঘোষণা এ অঞ্চলের রাজনীতির মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। ওই দিন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। প্রতিবাদে সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্ররা মিছিল বের করে। মিছিলে শ্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চে বাঙালিদের নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে’ তুলে শত্রু মোকাবেলার আহ্বান জানান। সিরাজগঞ্জে কলেজ মাঠ, স্টেডিয়ামসহ বিভিন্নস্থানে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। তার দেখাদেখি আমাদের পাশ্ববর্তী গুপিরপাড়া স্কুল মাঠেও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসেন ঘোড়াচড়া গ্রামের জামাতা এক অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। আমি, আব্দুস সালাম, আবুল কালাম, আকবর আলী, হবিবর রহমান, হোসেন আলীসহ ৩৫/৪০ জন তরুণ সে প্রশিক্ষণে অংশ নেই। যদিও সে প্রশিক্ষণে বাঁশের লাঠিই ছিল প্রধান অস্ত্র, প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ ছিল শরীরচর্চায়। প্রশিক্ষণে একটি ডামি রাইফেল আনা হয়েছিল দেখানোর জন্য। তবে এই প্রশিক্ষণ সাধারণের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়।

২৫ মার্চ সারাদেশে গণহত্যা শুরু করে পাকবাহিনী। সিরাজগঞ্জে কোনও পাকসেনা ক্যাম্প ছিল না। এসডিও শামসুদ্দিনসহ সরকারি কর্মচারীরা অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতেই বাংলাদেশের পক্ষ নেয়। ফলে সহজেই মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। মুক্তিযোদ্ধারা তৎপর হয়ে ওঠে, মুক্ত সিরাজগঞ্জে যেন হানাদারেরা দখলে নিতে না পারে। এভাবেই শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এদিকে, পাকবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বিভিন্ন বড় বড় শহর থেকে দলে দলে লোকজন ছুটে আসতে শুরু করে গ্রামের দিকে। তাদের মাধ্যমে পাকবাহিনীর নির্যাতনের খবর চলে আসে প্রত্যন্ত গ্রামেও। পাকিস্তানের প্রতি যেটুকু মোহ সাধারণ মানুষের ছিল তা-ও শেষ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ শহর থেকেও গ্রামের দিকে আসতে শুরু করে মানুষ। এমনকি মুসলিম লীগ নেতারাও শহর ছাড়তে শুরু করে। আমাদের পাশ্ববর্তী ঘোড়াচড়া গ্রামে এসে আশ্রয় নেয় মুসলিম লীগ নেতা তরিকুল ইসলাম লেবু মিয়াও।

২৭ এপ্রিল ভোর রাতে সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নেয় পাকসেনারা। সেদিনই ইসহাক আলীসহ বিভিন্ন ছাত্রনেতা শহর থেকে বের হয়ে আমাদের এলাকার গুপিরপাড়া গ্রামে আসে। তারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে চলে যান আত্মগোপনে। এদিকে পাকসেনারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় শহরের অধিকাংশ বাড়িঘর। আগুন দেয় শহরতলীর বিভিন্ন গ্রামেও। দেখা মাত্র গুলি করে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ কোনও কিছুই বাদ যায় না। এরমধ্যে তারা যোগাযোগ গড়ে তোলে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ ও জামায়াতের সঙ্গে। তাদের এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বারদের নিয়ে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি, গঠিত হয় রাজাকার বাহিনী। তৎপর হয়ে ওঠে স্বাধীনতা বিরোধীরা। এতে আমাদের মতো ছাত্রদের প্রকাশ্যে নড়াচড়াও বন্ধ হয়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। শুনি যে, ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু আমি যাওয়া চেষ্টা করেও যেতে পারি না। এলাকাতেই পালিয়ে থাকি, দুএক জনের সঙ্গে কথা বলি, যদি কোনও বুদ্ধি বের করা যায়। শুনতে পাই, আমার খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন (রহমতগঞ্জ) একটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ করে এলাকায় আছে, তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি, কিন্তু খুঁজে পাই না। এক রাতে হঠাৎ ইসমাইল ভাই আমাদের গ্রামে আসেন তার ১৮/২০ জন সহযোদ্ধা নিয়ে। তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করি গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে। তার দলে আমাকেও ভর্তি করে নেওয়ার জন্য বলি। তিনি রাজী হন না, বলেন- তোমার কিছু হয়ে গেলে আমি খালাখালুর কাছে জবাব দিতে পারবো না। এভাবে মাঝেমধ্যেই ইসমাইল ভাই আসেন আমাদের গ্রামে, তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করি, কিন্তু তাকে বলতেই তিনি জবাব দেন, আমাকে নিতে পারবেন না। এরপর বেশ কিছুদিনের জন্য ইসমাইল ভাই তার গ্রুপ নিয়ে গ্রামে আসছিলেন না। এ সময় যোগাযোগ হয় আমার নিকটাত্মীয় মোজাম্মেল হোসেন মোজাম (কাজীপুর-কুনকুনিয়া), ফরিদুল ইসলাম (রহমতগঞ্জ), মির্জা ফারুক আহমেদ (বাহিরগোলা), আলতাব হোসেন (রহমতগঞ্জ), হাসান খসরু (রহমতগঞ্জ) প্রমুখের সঙ্গে। তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইসমাইল ভাই তার গ্রুপ নিয়ে পলাশডাঙ্গায় যুক্ত হয়েছেন। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম, সেখানে গিয়ে আমরা আমরা নাম লেখাবো মুক্তিযুদ্ধে।

একদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে আমরা উল্লেখিত কয়েকজন রওনা হই উল্লাপাড়ার দিকে। নলকা হয়ে চলে যাই বোয়ালিয়ায়। বেশির ভাগ সময় নৌকায় অবস্থান করা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজতে থাকি এগ্রাম সেগ্রাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া যায় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের। সেখানে ইসমাইল ভাই ৯ ও ১০ নম্বর নৌকায় একটি প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্বে আছেন। আমাকে দেখে তিনি রাগারাগি করলেন মা-বাবাকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায়। তবুও আমাদের সবাইকে ভর্তি করে নেন। পলাশডাঙ্গার সদস্য হিসেবে শুরু হয় আমার মুক্তিযোদ্ধা জীবন।
পলাশডাঙ্গা এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় গ্রুপ। এরা একটি নিয়ম গড়ে তুলেছে, যে নিয়মের মধ্যে দিয়ে সবাইকে চলতে হয়। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হতো। যে গ্রামে রাত্রিতে শেল্টার হতো সে গ্রামের স্কুল বা খোলা মাঠে নেমে প্যারেড-পিটি করতে হতো। সকালের মধ্যেই যার যার সেকশন প্লাটুনের রেশন বা প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে হতো হেডকোয়ার্টার থেকে। সেকশন প্লাটুনের একজন দুজন বাজারঘাট রান্নাবান্নার দায়িত্বে থাকতেন, তিনিই এর সবকিছু করতেন।

প্যারেড-পিটি অস্ত্র প্রশিক্ষণ, মাঝেমাঝে রাজনৈতিক আলোচনা হতো। এর মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া। এ ভাবেই সারাদিন কেটে যেত। সন্ধ্যায় সকল নৌকা একত্রিত হতো, কোন গ্রুপে কতজন মুক্তিযোদ্ধা আছে, কেউ ছুটিতে গেছে কিনা- তার হিসাবনিকাশ হতো। যাত্রা শুরু হতো অন্য কোন শেল্টারের দিকে। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়ার চলনবিল এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ছিল আমাদের শেল্টার। আমরা অবস্থান করতাম নৌকাতেই।
ইসমাইল ভাইয়ের প্লাটুনের আমরা সবাই ছিলাম সিরাজগঞ্জ শহর ও তার আশপাশ এলাকার। প্লাটুনে প্রায়ই আলোচনা হতো আমাদের এলাকার পাকসেনাদের নির্যাতন নিয়ে। কোন গ্রামে হামলা চালিয়েছে, কার বাড়ি পুড়িয়ে দিল, কোথায় গণহত্যা চালানো হলো তা নিয়ে আলোচনা হতো আর আমাদের মন খারাপ হতো। এসব আলোচনায় সবার মন ছুটে যেতো এলাকায়। বাড়ির আশপাশ এলাকায় চেনাজানা পরিবেশে থাকতে চাইতো প্রায় সবাই।

একদিন, সম্ভবত রোজার প্রথম অথবা আগের দিন। সন্ধ্যায় সব নৌকা এক জায়গায় জড় হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের নৌকা দুটো রওনা হয় অন্য দিকে। ধীরে ধীরে বোঝা গেল যে, আমরা পলাশডাঙ্গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এতে অবশ্য সবার মন ভালো হয়ে গেল, কারণ আমরা এলাকায় থেকে চেনাজানা পরিবেশে যুদ্ধ করতে পারবো। নৌকায় উল্লাপাড়ার বোয়ালিয়ার কাছাকাছি চলে এলাম আমরা। তারপর আর যাওয়া সম্ভব নয় বলে নৌকা ছেড়ে দেওয়া হলো। মাঝিদের হিসাবনিকাশ বুঝিয়ে দিয়ে নৌকায় থাকা চালডাল যা ছিল তা-ও মাঝিদের দিয়ে দেওয়া হলো। আমরা নৌকা থেকে নেমে পায়ে হেঁটে রওনা হলাম। তখন আমাদের মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় তিরিশ জন। আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম নলকায়। সেখান থেকে একটি নৌকা ঠিক করে চলে আসি বহুলী এলাকায়। আমাদের গ্রুপের সদস্য টুটুলের বাড়ি মাছিয়াকান্দিতে সেদিন থাকার ব্যবস্থা হয়। আমাদের রেখে ইসমাইল ভাই সঙ্গী নিয়ে ছুটলেন বিএলএফ প্রধান মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম ভাইয়ের খোঁজে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরপর ব্রাহ্মণবয়ড়ার জনৈক বিলাতের বাড়িতে বৈঠকের মাধ্যমে আমরা যুক্ত হলাম মুজিব বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। তবে আমাদের অংশ পরিচালনার দায়িত্ব থাকলো ইসমাইল ভাইয়ের হাতেই।

একদিন পরিকল্পনা করা হলো ভাটপিয়ারীতে অবস্থিত পাকসেনা ক্যাম্পে হামলা চালানোর। তারিখ নির্ধারণ হয় সম্ভবত ৩১ অক্টোবর। সেখানে অবস্থান করছিল বেশ কিছু রাজাকার ও পাকিস্তানি মিলিশিয়া। তার আগে বিকেলে বাগবাটী হাটখোলা থেকে সিরাজগঞ্জ শহরের মোস্তাক নামের এক চোরকে আটক করা হয়। তাকে পিপুলবাড়িয়া এলাকায় এনে শাস্তি দেওয়া হয়। ভাটপিয়ারী আক্রমণের সময় ঠিক হয়, গভীর রাত। আক্রমণের আগে গুপিরপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান, মিজানুর রহমান, মনিরুজ্জামান ও ভুড়ভুড়িয়া গ্রামের নওশাদ জালাল আমাদের গ্রুপে যোগ দেয়। ওদের কাছে বাড়তি জিনিষপত্র রেখে আমরা চলে যাই যুদ্ধক্ষেত্রে। ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ডিগ্রিপাড়া গ্রামের চড়ার মধ্যে। কারণ নতুনদের প্রথমেই যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হতো না, রেখে দেওয়া হতো সহযোগী হিসেবে।

মুজিব বাহিনী প্রধান মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম অন্যান্য গ্রুপ কমান্ডারকে যুদ্ধের কৌশল পজিশন ঠিক করে দেন। যে কয়টি গ্রুপ এ যুদ্ধে অংশ নেয় তাদের মধ্যে এই মূহুর্তে মনে পড়ছে ধীতপুরের শেখ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ভাইয়ের কথা। এছাড়া এফএফের গ্রুপও অংশ নেয় এ যুদ্ধে। আমাদের ইসমাইল গ্রুপের পজিশন দেওয়া হয় স্কুলের উত্তর পাশে। আমিনুল ইসলাম চৌধুরীরা অবস্থান নেন দক্ষিণে। যথাসময়ে আক্রমণ শুরু হয়। যুদ্ধে বেশ কিছু রাজাকারকে হত্যা করা সম্ভব হয়। নিহত রাজাকারের সংখ্যা কুড়ি জনের কম নয়। ক্যাম্পে থাকা মিলিশিয়া ও পুলিশেরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, আমাদের দখলে চলে আসে ভাটপিয়ারী পাকসেনা ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আহত হন তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী ও আলাউদ্দিন ভাইয়ের গ্রুপের মোতালেব হোসেন (তেলকুপি)। যুদ্ধ শেষে আমরা চলে যাই দত্তবাড়ির ছয়আনি পাড়ায়।
পরে আমরা চলে যাই কাজীপুর অঞ্চলে। এলাকাটি তৎকালীন ছাত্রনেতা ওই অঞ্চলের হোসেন আলী হাসানের। তিনি আমাদের কোন দল কোন গ্রামে, কোন বাড়িতে কতজন করে থাকবো তার ব্যবস্থা তিনি করতেন। একদিনের বেশী সাধারণত কোনও গ্রামে অবস্থান করতাম না মুক্তিযোদ্ধারা। যে গ্রামগুলিতে আমরা অবস্থান করতাম তার মধ্যে মাথাইলচাপর, গান্ধাইল, কাচিহারা, ভানুডাঙ্গা, বরশিভাঙ্গা, চালিতাডাঙ্গা অন্যতম। এর মধ্যে একদিন আমরা আশ্রয় নেই গান্ধাইলের পাশ্ববর্তী বড়ইতলা গ্রামে। তারিখ সম্ভবত ১৩ নভেম্বর। আমাদের আশ্রয় হয় গ্রামের মসজিদের পাশের কয়েকটি বাড়িতে। নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পাহারা বসিয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ভোররাতে (১৪ নভেম্বর) হঠাৎ বাঁশির আওয়াজ। কেউ কেউ ভাবছে, সকালের প্যারেড-পিটির জন্য হুইসেল দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য বিছানা ছাড়তে গড়িমসিও করছে কেউ কেউ। হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। গ্রামের মানুষ শোরগোল তুললো, মাথাইলচাপড়ের দিক থেকে হামলা চালিয়েছে পাকসেনারা। তাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে শহীদ হন অন্তত ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা। কোনও প্রতিরোধ না গড়েই গ্রাম থেকে বের হয়ে আসা ছাড়া আমাদের কোনও উপায়ই রইলো না। আমরা ইসমাইল গ্রুপ এক সঙ্গে বের হয়ে এলেও বাকি গ্রুপের সবাই কে কোন দিকে চলে গেল তার কোনও হদিসই তখনকার মতো পাওয়া গেল না। তবে অন্য গ্রুপ থেকে আমাদের সঙ্গে চলে এলেন শফিকুল ইসলাম শফিসহ আরো কয়েক জন।

বড়ইতলা গ্রাম থেকে বের হয়ে এসে আমরা আশ্রয় নেই রতনকান্দি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে। বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় পেলেও বিশ্রামের সুযোগ নেই, কারণ এ গ্রামেও আসতে পারে পাকসেনারা। এ জন্য ট্রেন্স খুঁড়ে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরমধ্যেই একটি খাসির জোগাড় হয়। তা জবাই করে আমাদের খাওয়া দাওয়ার আয়োজনও হয়। এ সময় আমাদের সঙ্গে দেখা করেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে আগ্রহী ওই গ্রামের মিজানুর রহমান দুদু, সাইফুল ইসলাম ও সোহরাব হোসেন কাবুল। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দলভুক্ত করে নেন প্রথম ওস্তাদ ইসমাইল হোসেন। এরপর আমরা রতনকান্দি, বাগবাটী, ছোনগাছা ও বহুলী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অবস্থান করতে থাকি। শেষের দিকে গ্রামাঞ্চলে স্বাধীনতা বিরোধীদের তৎপরতা কমে যায়। ফলে শহরতলী পর্যন্ত আমাদের যাতায়াত হতে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে, আমরা আমাদের কমান্ডার ইসমাইল হোসেনকে বলতাম প্রথম ওস্তাদ। দ্বিতীয় ওস্তাদ মোহনপুরের অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আব্দুল আজিজ। তৃতীয় ওস্তাদ ছিলেন ইসমাইল ভাইয়ের ছোট ভাই আব্দুস সোবহান তোতা। শফিকুল ইসলাম শফি ভাই আমাদের গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর তার সন্মান মর্যাদার কথা চিন্তা করে তোতা ভাইকে সরিয়ে তার স্থানে নিয়ে আসা হয় শফি ভাইকে।
নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের একদিন আমরা গুপিরপাড়া থেকে বের হয়ে কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা অন্য গ্রামে যাচ্ছিলাম। এ সময় সামনে পড়ে কয়েকজন। আমরা তাদের হল্ট করতে বলি। বিপরীত পক্ষও আমাদের হল্ট করতে বলে। তখন আমাদের গ্রুপের এক আনাড়ি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নির্দেশ না পেয়েও গুলি করে বসে। গুলিটি আমার শরীরে বিদ্ধ হলে সাথে সাথে জ্ঞাণ হারাই। এ সময় আমার পাশেই ছিল আমিনুল ইসলাম (রহমতগঞ্জ)। তার গায়ের চাদরে জড়িয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় নওদা ফুলকোচা মকবুল ডাক্তারের কাছে। তিনি আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। জ্ঞাণ ফিরে এলে আমাকে পাঠানো হয় শহরতলীর কুশাহাটা গ্রামের ডা. আনিসুর রহমানের বাড়িতে। এ সময় ইসমাইল ভাই ছাড়াও আমাকে বহন করে নিয়ে যান ফজলুর রহমান, আবু তাহের, আনোয়ার সাবের ও নুরুদ্দিন। আনিস ডাক্তারের বাড়িতে চিকিৎসা নিলেও নিরাপত্ত্বা কারণে তাঁর বাড়িতে থাকা সম্ভব হয় না। তখন আমাকে রাখা হয় ইসমাইল ওস্তাদের বাড়িতে। আনিস ডাক্তার আমাকে সেখানে নিয়মিত দেখতে যেতেন এবং চিকিৎসা সেবা দিতেন। বেশ কিছুদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে ফিরে আসি গ্রুপে। পরে জানতে পারি, সেদিন একটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গুলি নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের সঙ্গেই আমাদের এ গোলাগুলির ঘটনা। পরে সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারা এসে আমাদের হাতে আটক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যায়।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই মুক্তিযুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায়। ভারতীয় বিমান বাহিনী হামলা চালাতে শুরু করে বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থানরত পাকসেনাদের ওপর। সিরাজগঞ্জ ঘাটেও বিমান হামলা চালিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয় একটি পল্টুন। এতে আমাদের সাহস বেড়ে যায়। ততদিনে এফএফ মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি গ্রুপও সিরাজগঞ্জ এলাকায় ঢুকে পড়েছে। আমাদের গ্রুপ থেকে শৈলাবাড়ি পাকসেনা ক্যাম্পে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। সম্ভবত আরো দুএকটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গেও যোগাযোগও করা হয়। সেদিন ইটালী গ্রাম থেকে আমাদের গ্রুপের প্রায় ৪০ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা রওনা হয় এ হামলার উদ্দেশ্যে। আমাকে হামলা থেকে বাদ রাখা হয়। অন্য কোনও গ্রুপ না এলেও আমাদের গ্রুপ এককভাবে শৈলাবাড়ি ক্যাম্পে হামলা করে। এ যুদ্ধে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে, তাহলো পাকসেনাদের গুলিতে আহত হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ। তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় মাছুয়াকান্দি গ্রামের হযরত ডাক্তারের কাছে। সেখানেই সুলতান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পরে সুলতানকে আমিনপুরের তার এক আত্মীয় বাড়িতে জানাযা পড়ানোর পর রহমতগঞ্জ কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন ভুলু বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আসেন রৌমারী থেকে। বিভিন্ন গ্রুপ পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ১২ ডিসেম্বর সবাই সমবেত হয় ছোনগাছা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। উদ্দেশ্য, শৈলাবাড়িতে অবস্থিত পাকসেনা ক্যাম্পকে তাড়িয়ে দেওয়া বা পরাজিত করা। কমাণ্ডারেরা বসে আক্রমণের ছক আঁকেন। আমাদের ইসমাইল গ্রুপকে পজিশন দেওয়া হয় খোকশাবাড়ির নিস্তারিনী স্কুলের পাশে, যাতে এপথে পাকসেনারা পালিয়ে যেতে বা এগিয়ে আসতে না পারে। যুদ্ধ শুরু হয় বিকেলের দিকে। অন্ধকার নেমে আসার পরেও পাকসেনাদের পরাজিত করা সম্ভব হয়না। ধীরে ধীরে যুদ্ধটা থেমে যায়। আমরাও ব্রহ্মখোলা গ্রামের খয়ের ডাক্তারের বাড়িতে আশ্রয়ে চলে যাই।

ওই রাতেই পাকসেনারা শৈলাবাড়ি থেকে বিদায় নেয়। গ্রামাঞ্চলে প্রচার হয়, হানাদার বাহিনী শহর থেকেও চলে গেছে। এ খবরে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ ছুটতে থাকে শৈলাবাড়ি ক্যাম্প ও শহরের দিকে। আমরা শৈলাবাড়ি ক্যাম্পে গিয়ে ক্যাম্পটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় পাই। সিদ্ধান্ত নেই শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন ভুলু পড়ে আছেন গুনেরগাতী চড়ার মধ্যে। আরো খবর আসে, রাণীগ্রাম-ঘুরকা রেল ক্রসিংয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের অ্যাম্বুশের মধ্যে ঢুকে পড়ায় সেখানে শহিদ হয়েছেন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ফলে স্থগিত রাখা হয় সিরাজগঞ্জ শহরে ঢোকার পরিকল্পনা। বিকেলে ফিরে যাই বহুলী এলাকায়।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। গ্রামে গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে, পাকসেনারা গভীর রাতে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে বিদায় নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে জনগণও ছুটছে মুক্ত সিরাজগঞ্জের দিকে। বাহিরগোলা হয়ে আমরাও ঢুকে পড়ি সিরাজগঞ্জ শহরে। এরপর চলে যাই সিরাজগঞ্জ থানায়, তখনও সে থানা কোনও গ্রুপ দখলে নেয়নি। আমরা প্রথমেই অস্ত্রাগারে ঢুকে অস্ত্রগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেই। আমাদের গ্রুপে সব সময় অস্ত্র আর গুলির সংকট থাকতো, তাই এক একজন তিন চারটে করে রাইফেল কাঁধে তুলে নেই আর যে যা পারি গুলি তুলে নেই কোচড় ভরে। এ সময় শহিদ সুলতানের কথা খুব মনে পড়ে। ও প্রায়ই বলতো, এক সময় আসবে যখন অনেকগুলো রাইফেল হাতের কাছে পাবে, তখন কাঁধে তুলে নেবো তিন/চারটে করে রাইফেল। কোচড় ভরে তুলে নেবো অজস্র গুলি। আজই সেই দিন। অস্ত্র আর গুলি নিয়ে আমরা চলে আসি রহমতগঞ্জ স্পিনিং মিলে। সেটাই হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের ইসমাইল গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম