যুদ্ধস্মৃতি ॥ আব্দুল হাই তালুকদার



রাজনীতি একটি অভিজ্ঞতা। আর সে রাজনীতি যদি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায় তাহলে অভিজ্ঞতা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭১ সালের বাঙালি তরুণ-তরুণীরা দ্রুত অভিজ্ঞ হয়ে উঠছিল। প্রাথমিক অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিতে যে তরুণ-তরুণীরা ছিল ভীতসন্ত্রস্থ, তারা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। প্রথমে তারা হাতে নেয় লাঠি, তীর-ধনুক, তারপর ডামি রাইফেল, বন্দুক, টুটু বোর রাইফেল, পরে থ্রিনটথ্রি, চাইনিজ রাইফেল, স্টেনগান, এলএমজি, মর্টারগান পর্যন্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দ্রুত বদলে যাওয়া সেই তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আমিও একজন। মুক্তিযুদ্ধ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। সে সময়ের মেধা ও সাহস অনুযায়ী যথাযথ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থেকেছি, বদলে নিয়েছি নিজেকে- এজন্য আমি গর্বিত।
আমি আব্দুল হাই তালুকদার। জন্ম ১৯৫০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। বাবা মফিজউদ্দিন তালুকদার, কৃষক আর মা কাজুলি বেগম, গৃহিণী। আমাদের বািড় সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়েনর চিলগাছা গ্রামে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। আমাদের প্রধান বাড়ি চিলগাছা হলেও আমার বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক তালুকদার বাগবাটী ইউনিয়নের লাগোয়া রতনকান্দি ইউনিয়নের পিপুলবাড়িয়া গ্রামে বাড়ি করেন। পড়াশোনার সুযোগ থাকায় আমি সে বাড়িতেই থাকতাম। ভর্তি হয়েছিলাম হরিণা বাগবাটী হাই স্কুলে। ওই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করি ১৯৬৬ সালে। সে বছরই সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই বিজ্ঞান বিভাগে।

সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার মামাতো বোন সালেহা খাতুনের ১ নম্বর খলিফাপট্টির বাসায় থাকতে শুরু করি। সেখানকার সবাই ছাত্র ইউনিয়ন মেনন ও মতিয়া গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। সহজেই ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব তৈরি হয়। সে সময়ে সাধারণত শহরের ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়ন এবং গ্রামের ছেলেরা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তো। এছাড়াও আমার নিকটাত্মীয় আমাদের পাশ্ববর্তী বাহুকা গ্রামের আমিনুল ইসলাম চৌধুরী তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সিরাজগঞ্জ মহুকুমা কমিটির বড় নেতা এবং সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস। তিনি আমাকে ছাত্রলীগের সদস্য করে নেন।

তখনকার রীতি অনুযায়ী ভালো ছাত্ররা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতো। সবার ধারণা, এদের বেশী বেশী পড়াশোনা করতে হয়। তাই তারা সংগঠনিক কাজে সময় দিতে পারে না, ফলে তাদের সাংগঠনিক দায়িত্বও কম দেওয়া হতো। এ কারণে কোনও সাংগঠনিক দায়িত্ব কখনো পাইনি আমি। কিন্তু কর্মীসভা, বিভিন্ন সমাবেশ-মিছিলে অংশ নিতাম নিয়মিত। এ ভাবেই ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে ১৯৬৮ সালে আইএসসি এবং ১৯৭০ সালে বিএসসি পাশ করি। শহর থেকে আমি আর ইয়াকুব আলী বাগবাটী অঞ্চলের ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকি। একই ভাবে সত্তুরের নির্বাচনে এলাকার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি। আমাদের এলাকা থেকে এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী বিপুল ভোটে জয়ী হন। একই ভাবে সারাদেশে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগ এবার পাকিস্তানের ক্ষমতা নেবে ভেবে অনেকেই নিশ্চিত হলেও আমরা ছাত্রলীগ কর্মীরা ছিলাম এ ব্যাপারে সন্দিহান। ফলে স্বাধীনতার কথা বারবার ঘুরেফিরে আসতে শুরু করে আমাদের মধ্যে। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ সংসদ অধিবেশনে যোগদানের প্রস্তুতি নিতে থাকে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ১ মার্চ দুপুরে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আচমকা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন সংসদ অধিবেশন। ছাত্রলীগ সঙ্গে সঙ্গেই কলেজ থেকে এ ঘোষণার প্রতিবাদে মিছিল বের করে। সে মিছিলে শামিল হই শহরে অবস্থানরত সকল ছাত্রলীগ কর্মী। প্রতিবাদ মিছিলের প্রধান শ্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। মিছিলে যোগ দেয় সাধারণ মানুষও। কলেজ থেকে শুরু করা শতাধিক ছাত্রের মিছিল হয়ে ওঠে সহস্রাধিক জনতার মিছিল। স্বাধীনতার শ্লোগান ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে। এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলা স্বাধীনতার কথা চলে আসে প্রকাশ্যে। গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উড়িয়ে দেয় স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা। সে পতাকা হাতে হাতে সারাদেশের মতো সিরাজগঞ্জেও এসে উড়তে থাকে। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু তার রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এরপর আর বাঙালিদের পেছনে তাকাতে হয় না। সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণে নাম লেখাই আমি আর ইয়াকুব আলী। সেখানে প্রশিক্ষক হিসেবে প্রথমে এগিয়ে আসেন দোয়াতবাড়ির মাসুদ নামের একজন। পরে আরো অনেকেই তাতে শামিল হন। প্রথমে লাঠি, তারপর ডামি রাইফেল, পরে কয়েকটি আসল থ্রিনটথ্রি রাইফেল পাওয়া যায় প্রশিক্ষণের জন্য। তা দিয়ে আমরা থ্রিনটথ্রি রাইফেল খোলাজোড়া, তাক করা শিখে নেই। পাশাপাশি হরিণা বাগবাটী স্কুল মাঠেও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেই আমি আর ইয়াকুব। সেখানে স্থানীয় দুই আনসার সদস্য এগিয়ে আসেন প্রশিক্ষক হিসেবে। শতাধিক স্থানীয় তরুণ সে প্রশিক্ষণে অংশ নেন। সে প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ থাকে লাঠি আর কয়েকটি ডামি রাইফেলে। এই প্রশিক্ষণ মূলত এলাকায় মহড়া দিয়ে স্থানীয়দের উজ্জীবীত করার কাজে লাগে।

২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চলে আসে সিরাজগঞ্জে। পাকসেনার কোনও ক্যাম্প না থাকায় সহজেই পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে পড়ে সিরাজগঞ্জ মহুকুমা। সাজ সাজ রব পড়ে যায় এলাকা মুক্ত রাখার। কেউ চলে যায় সিরাজগঞ্জের সীমানা বাঘাবাড়ি এলাকায়। কেউ থাকে সিরাজগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে। বন্ধ হয়ে যায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। আমি সিরাজগঞ্জ শহরে থেকেই নিয়মিত এলাকায় আর সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে থাকি। ঢাকা সহ বড় বড় শহর থেকে নির্যাতিত হয়ে মানুষ ফিরে আসতে শুরু করে নিজ নিজ গ্রামে। তাদের মাধ্যমে প্রচার হয় পাকিস্তানিদের ভয়াবহ নির্যাতনের খবর। এতে ভীত সন্ত্রস্ত্র হতে শুরু করে সাধারণ মানুষ, পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতি যেটুকু মোহ অবশিষ্ট ছিল, তা-ও নিঃশেষ হয়ে যায় জনসাধারণের। এদিকে, সিরাজগঞ্জ শহরে যে কোনও সময় পাকসেনারা চলে আসবে বলে গুজব ছড়াতে শুরু করে। বাঘাবাড়ি থেকে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সরিয়ে এনে ঘাইটনা রেলব্রিজে চলে আসে মুক্তিযোদ্ধারা। শহর ছেড়ে অধিকাংশ মানুষ গ্রামে চলে যায়। অনেকেই তাদের বাড়িঘর যেন পুড়িয়ে ধ্বংস না করে এজন্য যার যার বাড়িতে পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে দিতে শুরু করে। আমি জামতৈল স্টেশনে পাকসেনা পৌঁছার খবর পেয়ে বোনের বাসা থেকে বের হয়ে গ্রামের বাড়ি চলে আসি। পরদিন ভোররাতে অর্থাৎ ২৭ এপ্রিল পাকসেনারা সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নেয়।

আমি আর ইয়াকুব এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টা করি। আমি, ইয়াকুব, ইদ্রিস আলী, সেজাব সহ প্রায় ১০/১২ জন এক সঙ্গেই থাকি, ঘোরাফেরা করি আর খোঁজখবর রাখতে থাকি মুক্তিযুদ্ধের। কিন্তু আমাদের হাতে কোনও অস্ত্র নেই।
সিরাজগঞ্জ শহর বেদখল হওয়ার সপ্তাহ খানেক পরের ঘটনা। আমরা কয়েকজন বসে আছি কুড়াগাছা হাটখোলায়। এসময় পশ্চিম দিক থেকে আসতে দেখা যায় ইপিআরের দুই সদস্যকে। তাদের পরণে ইপিআরের পোশাক, কাঁধে চাইনিজ রাইফেল। কিন্তু তাদের হাঁটাচলায় ক্লান্তির ছাপ। আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করে যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্ঠা করি। তারা পাকসেনাদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে দলছুট হয়ে পড়েছে। তারা আমাদের কাছে দুটো লুঙ্গি জোগাড় করে দেয়ার অনুরোধ জানায়। আমরা দুটো লুঙ্গি জোগাড় করে দেই, তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করি। তারা রাইফেল কাঁধে নিয়ে যাওয়া বিপদজনক মনে করে। আমাদের কাছে রাইফেল আর গুলি দিয়ে যেতে চায়, রাস্তায় ফেলে দিতে পারেনি যে, তাতে ডাকাতের হাতে পড়তে পারে। আমরা হাটখোলা থেকে কয়েকটি টাকা তুলে দেই ওদের। আমাদেরকে তারা চাইনিজ রাইফেল দুটো আর সঙ্গে বেশ কিছু গুলি দিয়ে যায়।
কিন্তু সমস্যা দাঁড়ালো, আমরা চাইনিজ রাইফেল তখনো চালাতে জানি না। আমি আর ইয়াকুব কলেজ মাঠে যে প্রশিক্ষণ নিয়েছি তাতে থ্রিনটথ্রি রাইফেল চালাতে জানি। তাই এটা আমাদের জন্য সমস্যাই হয়ে দাঁড়ায়। কি করবো ভেবে পাই না। আমি আর ইয়াকুব অনেক চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেই, আমিনুল ইসলাম চৌধুরীর ওখানে যাবো। খবর নিয়ে জানা গেল, সেখানে কয়েকজন ছাত্রনেতাও থাকতে পারেন। এক রাতে চাইনিজ রাইফেল দুটি নিয়ে আমি আর ইয়াকুব যাই আমিনুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়িতে। কোনও ছাত্রনেতাকে পাওয়া গেল না, তবে সম্ভবত ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি) তখনো সে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। আমিনুল চৌধুরীকে এলাকার পরিস্থিতি জানাই। তাকে চাইনিজ রাইফেল দুটির কথাও বলি, যে আমরা তো এটা চালাতে জানি না। কি করবো? তিনি চাইনিজ রাইফেল দুটি তার কাছে রেখে একটি থ্রিনটথ্রি রাইফেল দিলেন আমাদের। আমরাও থ্রিনটথ্রি রাইফেলটি আর কয়েক রাউন্ড গুলি নিয়ে চলে আসি এলাকায়।

এদিকে, শহরে পাকসেনারা আসার পর তৎপর হয়ে ওঠে স্বাধীনতা বিরোধীরা। মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার চেয়ারম্যানদের নিয়ে গঠন করা শান্তি কমিটি। সঙ্গে রাজাকার বাহিনীও। দরিদ্র পরিবার ও স্বাধীনতা বিরোধীদের আত্মীয়-স্বজনকে চাকুরি দেওয়ার নাম করে রাজাকার যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের অফিস খুলে স্বাধীনতার পক্ষে তৎপরতাকে দমন করা শুরু হয়। তখন বাগবাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ঘোড়াচড়া গ্রামের মফিজ ভুইয়া, আর শান্তি কমিটির সভাপতি একই গ্রামের মফিজ মওলানা। একদিন মফিজ মওলানা আমাদের ডেকে পাঠায়। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে গিয়ে দেখা করি তার সঙ্গে। তিনি আমাদের ধমক দিয়ে বলেন, তোমরা যতই ষড়যন্ত্র করো, এই পাকিস্তানকে কখনোই ভাঙ্গতে পারবে না। সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে যে কোনও মূল্যে রক্ষা করবেই। তিনি আমাদেরকে দলবদ্ধ ভাবে ঘোরাফেরা না করে যার যার কাজে মনোযোগ দিতে বলেন। আমরাও ঘাড় কাত করে চলে আসি সেখান থেকে। এরপর একটু সাবধানে চলাচল করতে থাকি। আর খোঁজখবর নিতে থাকি কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছে।

এর মধ্যে মে মাসের শেষ সপ্তাহের একদিন বাগবাটীতে গণহত্যা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। গ্রামটি হিন্দুপ্রধান হওয়ায় বিভিন্ন স্থান থেকে আসা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সেখানে অবস্থান করছিলো। সেদিনের গণহত্যায় দেড় শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। ঘটনার দু’একদিন পরই আমরা খবর পাই যে, লতিফ মির্জাসহ কয়েক জন ছাত্রনেতা মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করে ভদ্রঘাট অবস্থান করছে। আমি আর ইয়াকুব দেরী না করে চলে যাই সেখানে। নিরাপত্তার প্রয়োজনে আমাদের প্রথমে দেখা করতে হয় বেলাই গ্রামের এলিজা সিরাজীর বাড়িতে। তিনি আমাদের ছাত্রলীগ নেত্রী। তিনি ছাত্রলীগের প্রায় সকল কর্মীদের চিনতেন। পরিচিত নেতাকর্মীদের পাঠিয়ে দিতেন মূল ঘাঁটিতে। আমরাও একই পদ্ধতিতে পৌঁছে যাই মূল ঘাঁটিতে। সেটির অবস্থান ভদ্রঘাটের বসাকবাড়িতে। আমাদের আশ্রয় দেওয়া হয় মধ্য ভদ্রঘাটের সুকুমারদের বাড়িতে। এলাকায় আব্দুল লতিফ মির্জা, লুৎফর রহমান অরুণ, সোহরাব আলী সরকার, লুৎফর রহমান মাখন, মনিরুল কবীর, শফিকুল ইসলাম শফি, আব্দুল আজিজ সরকারসহ প্রায় কুড়ি জন সেখানে অবস্থান করছিলেন। তখনও সবার হাতে অস্ত্র নেই, গুলির পরিমানও কম, রাইফেল প্রতি ৫/১০টি করে। পাশেই খালের অপর পাড়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য লুৎফর রহমান অরুণকে দিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়। আমরা খাল পাড় হয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের আশ্রয়ে ফিরে আসতাম। আর সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা অরুণদার সঙ্গে সেখানেই অবস্থান করতেন।

আব্দুল লতিফ মির্জার ভদ্রঘাটে অবস্থান নেওয়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আসতে থাকে। একদিন উল্লাপাড়া থেকে আসেন খোরশেদ আলী, আব্দুস সামাদ, শামসু, গোলাপসহ জনা দশেক মুক্তিযোদ্ধা। আগে তারা উল্লাপাড়ার কয়ড়া এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে শুরু করেছিলেন। লতিফ মির্জার কথা শুনে তারাও চলে আসেন এখানে। যুক্ত হন পলাশডাঙ্গার সঙ্গে। এর দু’এক দিন পরেই আসেন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, গান্ধাইলের ছাত্রনেতা ঘাটু ও শহরের গয়লা গ্রামের আব্দুল মজিদ। তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন দুটি চাইনিজ রাইফেল ও একটি ছাগল। একই দিনে আসেন সুপরিচিত আওয়ামী লীগ কর্মী জহির চাচা।

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যুক্ত হতে থাকায় পলাশডাঙ্গা যেন পূর্ণতা পেতে শুরু করে। আমিনুল চৌধুরী যেদিন যুক্ত হন সেদিন তার আনা ছাগলটি জবাই করে রান্নার আয়োজন করা হয় মূল ঘাঁটিতে। আর আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি ভদ্রঘাটের বিভিন্ন পাড়ার বিভিন্ন বাড়ির বিভিন্ন আশ্রয়ে। সেদিনই (জুনের মাঝামাঝি) ভোর রাতে পাকসেনার আচমকা আক্রমণের শিকার হই। পরে জানতে পারি যে, পাকবাহিনী ও রাজাকারদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল শিয়ালকোল ইউনিয়নের জগৎগাঁতী গ্রামের স্বাধীনতা বিরোধী মজিবর রহমান। যাইহোক, আমরা তখনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠিনি। তার ওপরে অস্ত্র-গুলির স্বল্পতা তো ছিলই। তখন পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান কৌশল হয়ে ওঠে আত্মরক্ষা। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে পাকসেনাদের আক্রমণ এলাকা থেকে যার যার মতো বেরিয়ে আসতে থাকি। আর এই বেরিয়ে আসতে গিয়ে আমরা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি। মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কেউ কেউ। কামারখন্দের বেলাই এলাকায় এসে সমবেত হয়ে দেখা যায়, লতিফ মির্জা, লুৎফর রহমান অরুণ, সোহরাব আলী সরকার, মনিরুল কবীর, লুৎফর রহমান মাখন, আব্দুল আজিজ সরকার, আমি, ইয়াকুব আলী, জহির চাচা এবং উল্লাপাড়া থেকে যুক্ত হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের পুরো গ্রুপটিসহ প্রায় কুড়ি জন মুক্তিযোদ্ধা এক সঙ্গে থাকতে পেরেছি। অপরদিকে, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, শফিকুল ইসলাম শফি, আকতার, বাঘা, দুলু, রহিম সহ ১৫/২০ জন অন্যদিকে সরে গেছে। এ ঘটনায় আমাদের কেউ হতাহত হয়নি।

তখন বর্ষার পানি নদী দিয়ে বইতে শুরু করেছে, ভরতে শুরু করেছে বিল-ঝিল। তখন রান্ধুনিবাড়ি এলাকায় এসে হুড়ার সাগরে দুটি নৌকা ঠিক করে আমরা তাতে উঠে পড়ি। সেখান থেকে শাহজাদপুর হয়ে বিভিন্ন ছোট ছোট শত্রুর ওপর আঘাত করতে করতে চলে আসি চলনবিল অঞ্চলে। তারপর চলনবিল হয়ে ওঠে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের প্রধান আশ্রয় কেন্দ্র।

দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভদ্রঘাট যুদ্ধের খবর। এতে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি যেমন তাদের আশেপাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতির খবরে ভীত হয়ে পড়ে, তেমনি স্বাধীনতার পক্ষ শক্তিও আশাবাদী হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে ইচ্ছুক তরুণেরা খুঁজতে থাকে পলাশডাঙ্গাকে। পাবনার বেড়া, চাটমোহর, নাটোরের গুরুদাসপুর, বগুড়ার নন্দীগ্রাম থেকে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা এসে যুক্ত হতে থাকে পলাশডাঙ্গায়। আর সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা তো আছেই। ধীরে ধীরে পলাশডাঙ্গা বড় হতে থাকে, গড়ে উঠতে থাকে শৃঙ্খলা। পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরকে শৃঙ্খলায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনী থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা। তারা বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীর অভিজ্ঞতা থেকে প্রথমে সেকশন, প্লাটুন পরে কোম্পানি পর্যন্ত গঠন করে বিভিন্ন জন দায়িত্ব নেন। আর এটি পরিচালনার দায়িত্ব পান ছাত্রলীগ নেতারা। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাধান্য থাকে অভিজ্ঞ সৈনিকদের আর নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় রাজনৈতিক কর্মীরা।

ভদ্রঘাট যুদ্ধের প্রায় দেড় মাস পর অর্থাৎ আগস্টের প্রথম দিকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন রাজনৈতিক কর্মীদের মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী হিসেবে পরিচিত বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর দেরাদুন থেকে প্রশিক্ষিত পাঁচ সদস্য। তারা হলেন রাকসুর জিএস আব্দুস সামাদ, আব্দুল আজিজ মির্জা, বিমল কুমার দাস, আব্দুল বাকী মির্জা ও ইফতেখার মোবিন পান্না। তারা যুক্ত হওয়ায় পুনর্গঠন করা হয় পলাশডাঙ্গাকে। পরিচালনা কাঠামো আরো সুশৃঙ্খল হয়। পরিচালক আব্দুল লতিফ মির্জা, সহকারী পরিচালক আব্দস সামাদ (বেড়া) ও মনীরুল কবীর (ঢাকা)। কমান্ডার ইন চিফ সোহরাব আলী সরকার, সহকারী কমান্ডার ইন চিফ বিমল কুমার দাস (জামতৈল) ও আমজাদ হোসেন মিলন (তাড়াশ)। ব্যাটেলিয়ান কমান্ডার লুৎফর রহমান অরুণ (গাইবান্ধা)। অর্থ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় আব্দুল হাই তালুকদার (পিপুলবাড়িয়া) অর্থাৎ আমাকে। আমাকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে ইকতিয়ার মোমিন জিলু। তহবিল সংগ্রহ করতেন আব্দুল আজিজ মির্জা। তাকে সহযোগিতা করতেন লুৎফর রহমান মাখন (বেলকুচি), আব্দুল আজিজ সরকার (ঝাঐল) ও মোসাদ্দেক আলী (হোসেনপুর)। তহবিলে প্রধানত জমা হতো চাল, ডাল আর নগদ টাকা। প্রতিদিন সকালে সেকশন প্লাটুনের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী চাল, ডাল ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হাত খরচের জন্য কিছু নগদ টাকা দেওয়া হতো। নতুন যারা পলাশডাঙ্গায় ভর্তি হতো তাদের কোনও কোম্পানি বা প্লাটুন সেকশন ভুক্ত করার আগে পর্যন্ত হেড কোয়ার্টারে আশ্রয় দেওয়া হতো। এদের অনেকেই বিভিন্ন সময় সাময়িক ভাবে আমাকে সহযোগিতা করেছে।

পলাশডাঙ্গার মধ্যে আমরা কয়েকজন ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ি। এরা হলাম- আমি, শহীদুল্লাহ (বঙ্কিরহাট), আব্দুল মজিদ (বঙ্কিরহাট), আসাদউদ্দিন (চাটমোহর), হাবিবুর রহমান (তাড়াশ) প্রমুখ। আমাদের বৈশিস্ট ছিল আমরা সবাই লেখাপড়া জানা এবং যে কোনও অন্যায় কাজের প্রতিবাদে মুখর।
হেডকোয়ার্টারের সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলিতে অংশ নিতে হতো। পলাশডাঙ্গা যুব শিবির সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, নাটোর, বগুড়া মহুকুমার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় সত্তুরটি ছোটবড় যুদ্ধে অংশ নেয়। এ সব যুদ্ধের অনেকগুলোতেই আমি অংশ নেই। আমার অংশ নেওয়া যুদ্ধগুলির মধ্যে অন্যতম ভদ্রঘাট, পাবনা ফরিদপুর থানা, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থানা, ব্রহ্মগাছা, সিরাজগঞ্জের ঝাঐল-হরিপুর রেলব্রিজ, তাড়াশের নওগাঁ যুদ্ধ। থানা আর রাজাকার ক্যাম্পগুলো আক্রমণ করে আমরা থ্রিনটথ্রি রাইফেল ও গুলি সংগ্রহ করতে পারতাম। এখানে আটক প্রায় সবাইকে ‘বাঙালি’ বলে ছেড়ে দেওয়া হতো। যারা বিশেষভাবে অভিযুক্ত তাদের শাস্তি দেওয়া হতো। এখানে সবগুলো যুদ্ধের বর্ণনা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া পলাশডাঙ্গার অনেকেই এমন স্মৃতিচারণ করবে, যুদ্ধের বর্ণনা দেবে।

আমি আমার নিজ এলাকা ব্রহ্মগাছা যুদ্ধের বর্ণনা দিতেই পারি। আমরা তখন নৌকার আশ্রয়ে। একবার আমাদের নৌকার বহর চলে আসে ইছামতী নদী বেয়ে ব্রহ্মগাছা অঞ্চলে। সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিল মুজিব বাহিনী বা বিএলএফের সঙ্গে যোগাযোগ। তখন মুজিব বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল চর ব্রহ্মগাছায়। তাদের মধ্যেকার মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম ও ইসহাক আলী আমাদের সঙ্গে দেখা করেন। পরে আবার তারা তাদের আশ্রয়ে চলে যান। আমাদের নৌকাগুলো দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান করছে নদীর পশ্চিম পাড় অর্থাৎ ব্রহ্মগাছা হাটখোলার পাশে। পলাশডাঙ্গায় চলছে সকালের নাস্তার আযোজন। হঠাৎ নদীর পূর্ব পার অর্থাৎ সূবর্ণগাঁতী এলাকা থেকে আক্রমণ করে পাকসেনা ও রাজাকারেরা। নদীর যে প্রস্থ তাতে সহজেই বোঝা যায় যে, এ আক্রমণে পাকসেনারা আমাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। তবুও আমরা পাড়ে নেমে পজিশন নিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করি। আমরা টুকটাক গুলি ছুঁড়লেও ওরা গুলি চালায় বেশুমার। আমাদের পাড়ের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ আমাদের খাদ্য যোগান দিয়ে সাহায্য করে। আমরা আক্রান্ত হওয়ায় চর ব্রহ্মগাছায় অবস্থানরত মুজিব বাহিনীও পাকবাহিনীর ওপর গুলি ছোঁড়ে। অবশেষে পাকসেনারা রণে ভঙ্গ দিয়ে বিদায় নেয়। এ যুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ চললেও আমাদের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এখান থেকে আমরা চলনবিল এলাকায় ফিরে যাই।

তাড়াশের নওগাঁ যুদ্ধ পলাশডাঙ্গা তো বটেই, সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেদিন নভেম্বরের ১১ তারিখ। বর্ষা বিদায় নিয়েছে। জলপথে আমাদের চলাচলের সুযোগও কমে এসেছে। অনেক স্থানে নৌকা ঠেকে যাচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে আগের রাতে আমরা অবস্থান নেই নওগাঁ মাজারের কাছে। আমাদের নৌকাগুলো মাজার ও তার আশপাশ এলাকায় অবস্থান করছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ভোর রাতে আমাদের ওপর আক্রমণ চালায় পাকসেনারা। পাকসেনাদের একটি কোম্পানি ও প্রায় দুই শ’ রাজাকার এ আক্রমণে অংশ নেয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা জানপ্রাণ দিয়ে এ যুদ্ধে লড়াই করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, বাংলার প্রকৃতি আর জনগণের সহযোগিতায় এ যুদ্ধ আমাদের অনুকুলে চলে আসে। দুপুরের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পাকসেনাদের এ বিশাল বাহিনী। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সাধারণ মানুষ এমনকি ঘষির মাচা থেকে পাকসেনা সদস্যকে ধরে এনে আমাদের হাতে সোপর্দ করে। এ যুদ্ধে পাকসেনাদের এক ক্যাপ্টেনসহ ১২ জন আমাদের হাতে আটক হয়। সেই সঙ্গে একটি মেশিনগানসহ বিপুল পরিমান অস্ত্র চলে আসে আমাদের হাতে। যুদ্ধে আমাদের ৫/৬ জন মুক্তিযোদ্ধা সামান্য আহত হলেও কারো শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তবে কোনও কোনও গ্রুপ পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিহ্ন হয়ে পড়ে।

নওগাঁর এ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে প্রায় গুলিশুন্য হয়ে পড়ি আমরা। পাশাপাশি এ যুদ্ধে পানিপথকে বিপদজনক মনে হয়, ফলে নৌকা ছেড়ে দিতে হয় পলাশডাঙ্গাকে। অপরদিকে, পাকসেনারা চলনবিলের পাশ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামে ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে। পলাশডাঙ্গার পরিচালকবৃন্দ এ পরিস্থিতিতে গুলি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা সকলে রৌমারীর উদ্দেশ্যে রওনা হই রতনকান্দি কাজীপুরের দিকে। সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের কয়েক সদস্য, যারা ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। রৌমারী যাত্রাপথে কাজীপুরের ছাত্রলীগ নেতা রুহুল আমিনসহ অন্তত ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে যুক্ত করা হয় পলাশডাঙ্গায়। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে কাজীপুরের টেংলাহাটা যমুনা ঘাট থেকে প্রায় দুই শ’ সদস্য নিয়ে আমরা রওনা হই রৌমারীর দিকে। পথে পথে নানা বাধাবিপত্ত্বি, বিমান হামলা মোকাবেলা করে নভেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহের দিকে আমরা পৌঁছাই রৌমারীতে।

রৌমারী তখন প্রায় ভাঙ্গাহাট। নতুন মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট বন্ধ, যারা সেখানে রয়ে গেছে তারাও দ্রুত ভেতরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেখানে ছিল না কোনও পাকসেনা বা স্বাধীনতা বিরোধীদের তৎপরতা। ফলে আমাদের মধ্যেও ছিল না কোনও উত্তেজনা। তবে, রৌমারীতে পলাশডাঙ্গার আরো কিছু সদস্য – যারা বিভিন্ন কারণে পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল- তাদের পাওয়া যায়।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীকে নিয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। ৩ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ভুটান। দ্রুতই স্বীকৃতি দেয় নেপাল ও ভারত। অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে মুক্ত করতে যৌথ বাহিনী ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের ভিতরে। আর পালাতে শুরু করে পাকবাহিনী ও তার দোসরেরা। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকসেনারা ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পনের দলিলে সাক্ষর করতে বাধ্য হয়, হানাদার মুক্ত হয় বাংলাদেশ।



আব্দুল হাই তালুকদার, সিরাজগঞ্জ জেলা জাসদের প্রথম দফতর সম্পাদক। পরে সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি। বর্তমানে জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি।

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম