যুদ্ধস্মৃতি ॥ ফিরোজ ভুঁইয়া


মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার স্বাধীনতার ডঙ্কা বাজিয়ে দিলে সে সময়ের তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া ছিল গর্বের। গর্বিত সেই যুবকদের আমিও একজন। আমাদের পরিবােরর পাঁচ সদস্যের সবাই ছিল স্বাধীকার আন্দোলনের সমর্থক। আমার গর্ব, আমরা দুই ভাই অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি।

আমি মো. ফিরোজ ভুঁইয়া, জন্ম- ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি। বাবা আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া ছিলেন ব্যবসায়ী। মা আঞ্জুমা খাতুন, গৃহিণী। সিরাজগঞ্জ সদরের পৌর এলাকার আব্দুল্লা আল-মাহমুদ সড়েক আমাদের বাড়ি। তিন ভাইবোনের মধ্যে আমি ছোট। আমার বড় ভাই মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সদস্য হন। তাকে অনুসরণ করে আমিও ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলের ছাত্র থাকার সময়েই ছাত্র রাজনীতি তথা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। তখন ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল ছিল সিরাজগঞ্জের ছাত্ররাজনীতির সূতিকাগার। এখান থেকেই মহড়া দিতে দিতে অনেকেই সিরাজগঞ্জের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। এদের মধ্যে আমির হোসেন ভুলু, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন, মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম, গোলাম কিবরিয়া, এমএ রউফ পাতা, ইসহাক আলী, মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া অন্যতম।

আমার বড় বোন সালেহা বেগম টগর আপা স্কুল জীবনেই ছাত্রলীগের সদস্য হন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্ব-মূহুর্তে তিনি ছিলেন সিরাজগঞ্জ কলেজের ছাত্রী এবং ছাত্রলীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। তাদের সকলের সংস্পর্শে এসে ‘রাজনীতির পোকা’ আমার মাথায় ঢোকে সেই স্কুল জীবনেই। ১৯৭০ সালে এসএসসি পাশ করে সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই। তার আগে থেকেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিটি কর্মীসভা, জনসভা, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করি।
ষাটের দশকে ছাত্রলীগ মানেই আওয়ামী লীগ। তাই মিছিল মিটিং ছাড়াও কর্মী হিসেবে সকল কাজেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হতো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমাদের এলাকায় এমএনএ পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী। এর মধ্যে সৈয়দ হায়দার আলী ছিলেন আমার প্রতিবেশী। নির্বাচনে ঘুম-নাওয়া-খাওয়া ভুলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নেমে পড়ি। ফলও পাওয়া যায় হাতে হাতে। সারাদেশের মতো সিরাজগঞ্জেও আমাদের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হন। জাতীয় পরিষদে ১শ’ ৬৮ আসন পেয়ে পুরো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ। বাঙালি জাতি স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে, এবার সমগ্র পাকিস্তানকে শাসন করবে আওয়ামী লীগ। অবশ্য ছাত্রলীগের কারো কারো মনে সন্দেহ উঁকি দেয় যে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বাঙালিদের হাতে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা তুলে দেবে তো?

আমরা ছাত্রলীগ কর্মীরা একরোখা হয়ে উঠতে থাকি, কোনও ষড়যন্ত্র হলে উড়িয়ে দেবো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা।
ঢাকায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ। এজন্য আওয়ামী লীগ দলীয় এমএনএ’রা ঢাকায় পৌঁছতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহকর্মীদের নিয়ে পাকিস্তানের জন্য প্রস্তুত করছিলেন ৬ দফা ও ১১ দফা ভিত্তিক সংবিধান। কিন্তু ১ মার্চ দুপুরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান আচমকা অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন স্থগিত করে। সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে ছাত্রলীগ শ খানেক ছাত্রের মিছিল বের হয়। সে মিছিলে অংশ নেই আমিও। শহর ঘুরে আসতে আসতে মিছিল হয়ে ওঠে হাজারো জনতার মিছিল। যে স্বাধীনতার কথা ফিসফিস করে ছাত্রদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল, তা এবার জনতার মিছিলে শ্লোগান হয়ে আসে। মিছিলে শ্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশে স্বাধীন করো’। মিছিল কলেজ মাঠে ফিরে এলে আমাদের নেতারা ঘোষণা করেন, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাবো না। এ ভাবেই পাকিস্তানের রাজনীতি সম্পূর্ণ ঘুরে যায়।
বঙ্গবন্ধু সামরিক জান্তাকে অসহযোগিতার ডাক দেন। ঢাকায় গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ৩ মার্চ পল্টনে ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। আর ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানান। তার স্পষ্ট ইঙ্গিতে সারাদেশের মতো সিরাজগঞ্জেও শুরু হয় ‘দুর্গ গড়ে তোলা’র উদ্যোগ।

সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। আমরা শ খানেক ছাত্রলীগ কর্মী সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে নাম লেখাই। শুরু হয় প্রশিক্ষণ। প্রথমে লাঠি, তারপর রোভার্স স্কাউটের ডামি রাইফেল। এক সময় তৎকালীন মহকুমা এসডিও একে শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার লস্কর প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকটি সত্যিকার রাইফেল দেন। পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন জনের কাছে থেকে গাদা বন্দুক আর টুটু বোর রাইফেলও সংগ্রহ করতে থাকি। এসডিও শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার লস্কর নিয়মিত কলেজ ছাত্র-সংসদ অফিসে এসে প্রশিক্ষণের খোঁজ-খবর নেন এবং প্রশিক্ষাণার্থীদের সঙ্গে দেখা করে উৎসাহ দেন।

এগিয়ে আসে ভয়াল ২৫ মার্চ। ঢাকাসহ সারাদেশে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালায় পাকসেনারা। পুলিশের অয়ারলেসের মাধ্যমে সে খবর এবং তার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চলে আসে সিরাজগঞ্জেও। এখানে পাকসেনাদের কোনও ক্যাম্প না থাকায় খুব সহজেই মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ।

এরপর প্রশ্ন ওঠে, সিরাজগঞ্জকে কিভাবে মুক্ত রাখা যাবে? পাকিস্তানিদের সম্ভাব্য আক্রমণের দুটি পথ চিহ্নিত হয়। ব্যবস্থা করা হয় যমুনা নদী পাহারার আর বাঘাবাড়িতে প্রতিরোধের জন্য পাঠানো হয় একদল মুক্তিযোদ্ধা। আমার বড় ভাই মঞ্জু ভুঁইয়া বাঘাবাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে বাসায় থাকার নির্দেশ দেন আমাকে। আমি পৌর মিলনায়তনে স্থাপিত আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদের অফিস, শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি বাসায় বাবা-মা-বোনের সঙ্গে থেকে যাই।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাকসেনাদের তাড়া খেয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তাদের মাধ্যমে পাকসেনাদের গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের খবর পৌঁছে যায় গ্রামে গ্রামে। ফলে জনগণের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি যেটুকু মোহ ছিল তা-ও শেষ হয়ে যায়। এদিকে, সিরাজগঞ্জেও পাকসেনারা এগিয়ে আসছে, এ খবর প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়তে থাকে, নানান গুজবও জোরদার হতে শুরু করে। শহরের মানুষ প্রাণ ভয়ে সহায় সম্পদ বাড়িঘর রেখে গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা ২৩ এপ্রিলের দিকে বাঘাবাড়ি ডিফেন্স ছেড়ে উল্লাপাড়ার ঘাইটনা ব্রিজে ডিফেন্স গড়ে। এ সময় বড় ভাই মঞ্জু ভুঁইয়া কয়েকজন সহযোদ্ধাসহ চলে আসেন শহরে। তিনি আমাকে বাবা-মা আর বোনকে নিয়ে আত্মীয়বাড়ি মেছড়ায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি চলে যান অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। বাবাকে এ কথা জানালে তিনি মা আর বুবুকে নিয়ে সেখানে চলে যেতে বলেন। বাবাকে কোনভাবেই তখন গ্রামে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তিনি আমাদের মেছড়ায় যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজে থেকে যান শহরেই। ২৭ এপ্রিল ভোররাতে পাকসেনারা সিরাজগঞ্জ আসে। সেদিনই আমাদের বাড়িঘর, তিনটি রেশনসপ, সিগারেট এজেন্সির অফিস, আটার মিলসহ সিরাজগঞ্জ শহরের অধিকাংশ এলাকা পুড়িয়ে দেয়। বাবা সর্বস্ব হারিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। পরে জানতে পারি, আমাদের ওই সব ব্যবসাপাতি, সহায় সম্পদসহ বিপুল পরিমান নগদ অর্থ ছেড়ে তিনি গ্রামে যেতে চাননি। পরে তাকে নিঃস্ব হয়ে গ্রামের পথে পা বাড়াতেই হয়।

বাবা গ্রামে আসার পর আমি খুঁজতে শুরু করি মুক্তিযোদ্ধাদের। তারা তখন বিভিন্ন গ্রামে আত্মগোপন করে আছে। খবর পাই, মক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ রয়েছে চিলগাছায় ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলামের বাড়িতে। ছুটে যাই সেখানে। সেখানেই মঞ্জু ভাইকে পাওয়া যায়, আরো পাওয়া যায় আব্দুল লতিফ মির্জা, লুৎফর রহমান অরুণ (গাইবান্ধা), লুৎফর রহমান দুদু (কাজীপুর), খ ম আখতার (হোসেনপুর), রেজাউল হক জিন্নাহ (মাড়োয়ারি পট্টি)সহ অনেককে। ওই গ্রামের হাবিবুল্লাহকেও পাওয়া যায় এদের সঙ্গেই। সিদ্ধান্ত হয় ভারতে যাওয়ার। আমার ভারতে যাওয়ার ব্যপারে রাজী হন মঞ্জু ভাইও। পরে মেছড়ায় এসে বাবা-মা আর বুবুর কাছে থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাই চিলগাছায়। সেখানে থেকে অন্তত ১০ জনের টিম করে রওনা হই ভারত সীমান্ত পাড়ি দিতে।

প্রথমে আমরা সিরাজগঞ্জ কলেজের ছাত্রলীগ কর্মী সবার পরিচিত নুরু মামাদের ধুনটের ভবানীপুরে এক রাত অবস্থান করি। এরপর পা বাড়াতে হয় সম্পূর্ণ অচেনা পথে। আমাদের জন্য সুবিধাজনক পথ তখন ওয়াপদা বাঁধ। সে পথ চলে গেছে চিলমারী পর্যন্ত। আমরা সে পথ ধরেই চলতে থাকি। রাত হলে সুবিধাজনক কোনও বাড়িতে বা স্কুলঘরে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাই। সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে, আমরা চলেছি ভারত সীমান্তের উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। বেশিরভাগ মানুষই আমাদের পথ দেখিয়ে সহযোগিতা করে। প্রায় ৫/৬দিন পায়ে হেঁটে, কখনো নৌকায় ছোটবড় নদী, সব শেষে ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছাই ভারতের মাইনকার চরে। সেখানে আমাদের নামধাম লিখে নিয়ে এলাকা না ছাড়ার জন্য বলা হয়। এখানে খুঁজে পাই সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবুল কাশেম নূরে এলাহীকে। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজগঞ্জের ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী তাকে রেখে গেছেন। তিনি দ্রুতই আসবেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন মনসুর সাহেবের আসার দেরি হওয়ায় আমাদের মাঝের একজনের হাত ঘড়ি বিক্রি করে আমরা বালুরঘাট রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। অনেক কষ্টে নানা দৌড়ঝাঁপ করে পাওয়া যায় মাইনকারচর ছাড়ার অনুমতি। নূরে এলাহী ভাই আমাদের নিয়ে আসেন বালুরঘাট, সেখান থেকে কামারপাড়া ট্রানিজট ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পের পরিচালক সিরাজগঞ্জের এমপিএ সৈয়দা হায়দার আলী, পাবনার বেড়া অঞ্চলের এমএনএ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও ক্যাপ্টেন আনোয়ার। এখানে ভর্তি করা হয় আমাদের, বলা হয় কয়েকদিন পরই উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। আমাদের থাকা খাওয়া এবং শরীর চর্চার পাশাপাশি হালকা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

কামারপাড়া ক্যাম্পে পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জের অনেককেই। এদের মধ্যে রয়েছেন- আব্দুল লতিফ মির্জা, মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম (হোসেনপুর), ইসহাক আলী (দত্তবাড়ি), গোলাম কিবরিয়া (ভিক্টোরিয়া রোড), আমির হোসেন খান (ভেন্নাবাড়ি), আব্দুল আজিজ ব্যারিস্টার (রতনকান্দি), বড় ভাই মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া (আল মাহমুদ এভিনিউ), আব্দুল আজিজ মির্জা (বংকিরহাট), বিমল কুমার দাস (জামতৈল), আব্দুল বাকী মির্জা (শাহজাদপুর), ইফতেখার মোবিন পান্না (সলপ), ফজলুল মতিন মুক্তা (মাড়োয়ারি পট্টি)সহ আরো অনেককে। এদের সঙ্গে যুক্ত হই লুৎফর রহমান অরুণ (গাইবান্ধা), লুৎফর রহমান দুদু (কাজীপুর), খ ম আখতার (হোসেনপুর), রেজাউল হক জিন্নাহ (মাড়োয়ারি পট্টি) এবং আমি সহ আরো কয়েকজন।

আমরা কামারপাড়া ক্যাম্পে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিন পরেই ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন কর্নেল এমএজি ওসমানী ও সিরাজুল আলম খান। তারা আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। এদিকে, সিরাজুল আলম খান কানে কানে কিছু একটা নির্দেশ দেন আব্দুল লতিফ মির্জাকে। তিনি গোপনে রাজনৈতিক বিবেচনায় সিরাজগঞ্জ ছাত্রলীগের কর্মীদের একটি তালিকা করেন। গোপনীয়তা রক্ষা করে ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে আসেন তালিকাভুক্তদের। একটি নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হই আমরা। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোস্তফা মোহসীন মন্টু ও কামরুল ইসলাম খসরু। সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি লরি। সে লরিতে তোলা হয় আমাদের। তারপর আবার নতুন পথে যাত্রা। প্রথমে সমতল তারপর পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ভেঙ্গে উপরের দিকে ওঠা। সে লরিতে আমরা সিরাজগঞ্জের রাজনৈতিক বিবেচনায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এদের মধ্যে রয়েছি- আব্দুল লতিফ মির্জা, মোজাম্মেল হোসেন মোজাম, আব্দুস সামাদ (বেড়া), ইসহাক আলী, গোলাম কিবরিয়া, আব্দুল আজিজ মির্জা, বিমল কুমার দাস, আমির হোসেন খান, আব্দুল আজিজ ব্যারিস্টার, লুৎফর রহমান দুদু, মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া, হাবিবুল্লাহ, আব্দুল বাকি মির্জা, ইফতেখার মোবিন পান্না ও আমি। বিএলএফের এ প্রক্রিয়ায় যাদের যুক্ত করা হয়নি তারা রয়ে যান কামারপাড়া ক্যাম্পেই। ক্যাম্পে থেকে যাওয়া ছাত্রলীগ কর্মীরা হলেন- খ ম আখতার, ফজলুল মতিন মুক্তা, রেজাউল হক জিন্নাহ প্রমুখ। কোন বিবেচনায় তাদের বিএলএফে আনা হলো না তা জানি না, তবে লুৎফর রহমান অরুণকে আনা হলো না হয়তো তিনি ছাত্রলীগ কর্মী নন বলে অথবা তিনি অন্য এলাকার বলে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছাই বিএলএফের ট্রানজিট ক্যাম্প হিসেবে পরিচিত পাঙ্গায়। সেখানে বিএলএফের চার নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ আলোচনা করেন বিভিন্ন সময়ে। তাদের প্রত্যেককেই কথায় কথায় বুঝিয়ে দেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত বিএলএফ রাজনৈতিক গেরিলা যোদ্ধাদের সংগঠন। নেতাদের ধারণা অনুযায়ী এ যুদ্ধ চলবে ৫/৭ বছর। সেজন্য বিএলএফের প্রতিটি কর্মীর মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। নেতারা বলেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক যোদ্ধা হিসেবে দেশের ভেতরে ঢুকবে। সংগঠন গড়ে তুলবে। গ্রাম কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি, থানা কমিটি এমনকি মহকুমা, জেলা কমিটি পর্যন্ত গঠিত হবে। সেখান থেকে বাছাই করা কর্মীদের নিয়ে গঠিত হবে ছোট ছোট গেরিলা গ্রুপ। এ সব গ্রুপ প্রথমে দুর্বল শক্তিকে আঘাত করে শক্তি সঞ্চয় করবে, স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করবে অস্ত্রও। গণ সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেরিলা দলগুলো কাজ করবে। এসব আলোচনায় বারবার ভিয়েতনাম যুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। ধীরে ধীরে গেরিলাদের সাহস, শক্তি এবং জনসমর্থন বাড়বে। এক সময় গেরিলা দলগুলো বড় পরিকল্পনা করে হটিয়ে দেবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে। যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই বদলে যাবে সমাজচিত্রও। প্রতিষ্ঠা হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, শোষণহীন সমাজ।
সাধারণ আলোচনার এক পর্যায়ে সিরাজগঞ্জ মহুকুমার মুক্তিযুদ্ধের কর্মকৌশল নির্দ্ধারণের জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে বসেন সিরাজুল আলম খান। তিনি নির্দিষ্ট করে বৃহত্তর পাবনা জেলার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আলোচনা করেন, কিভাবে সিরাজগঞ্জ মহুকুমায় বিএলএফের কাজের বিস্তৃতি ঘটানো যায়। বিভিন্নজনের আলোচনার প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, প্রথমেই একটি যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। যে কাঠামো জনগণের মধ্যে থাকা এক কর্মীর সঙ্গে আরেকজন কর্মীর যোগাযোগ করিয়ে দেবে। সেই সঙ্গে কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করবে। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেরা বিএলএফের রাজনৈতিক কর্মীরা এই কাঠামো ও যোগাযোগের মধ্যে থেকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে এ দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে দক্ষ ও যোগ্য নেতা হিসেবে আব্দুল লতিফ মির্জাকে মনে করে সবাই। শেষে তাকেই এ কাজের জন্য দেশের ভেতরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় দেরাদুনে।

দেরাদুনে কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধের কঠিন প্রশিক্ষণ। এর পাশাপাশি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে চলতো রাজনৈতিক আলোচনা বা প্রশিক্ষণ। নেতারা সব সময়ই বলতেন, আমরা রাজনৈতিক যোদ্ধা। যুদ্ধ চলতে পারে ৫/৭ বছর। এ সময়ের মধ্যে জনসংগঠন গড়ে তুলতে হবে। প্রথমে গ্রাম কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি এবং ধারাবাহিক ভাবে থানা কমিটি, মহকুমা কমিটি। এসব কাঠামো গড়ে তুলতে হবে জনগণের দ্বারা। জনগণের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ করতে হবে। গ্রামীণ কাঠামোর কথা বলতে গিয়ে নেতারা কখনো কখনো সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচিনের ‘সোভিয়েত’, ‘কমিউন’এর উদাহরণ দিতেন। তারা আরো বলতেন, এসব কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোনার বাংলার স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছেন, সেই সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব। ৪৫ দিনের রাতদিনের প্রশিক্ষণ শেষ হয় একদিন।

আমাদের ফিরিয়ে আনা হয় পাঙ্গা ক্যাম্পে। সেখানেও বারবার ব্রিফিং দেন সিরাজুল আলম খান তার সহযোগি মনিরুল ইসলাম মার্শাল মনি। আগেই বলা হয়েছে, বিএলএফ দেশের ভেতরে যুদ্ধ করার জন্য গঠন করা হয়। এই দেশের ভেতরে নিয়মিত যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট লোক ঠিক করা হয়, এদের বলা হয় গাইড। তিনি ঝুঁকি নিয়ে বিএলএফ গেরিলাদের দেশের ভেতরে পৌঁছে দিতেন। তারপর আবার ফিরে আসতেন হেডকোয়ার্টারে। দেশের ভেতরের খবর কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে আবার প্রশিক্ষণ পাওয়া বিএলএফ গেরিলাদের নিয়ে যেতেন দেশের ভেতরে। দেশের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের গাইড হন বগুড়ার মমতাজ মাস্টার। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করে গ্রামের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। তারই হাতে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য বিএলএফ সদস্যের সঙ্গে আমাদের সিরাজগঞ্জ বিএলএফ প্রথম ব্যাচের ১২ জনকে তুলে দেওয়া হয়। এই ১২ জন হলাম- মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম, ইসহাক আলী, আব্দুস সামাদ, আব্দুল আজিজ মির্জা, বিমল কুমার দাস, আমির হোসেন খান, আব্দুল আজিজ ব্যারিস্টার, লুৎফর রহমান দুদু, আব্দুল বাকী মির্জা, ইফতেখার মোবিন পান্না, হাবিবুল্লা ও আমি। আমাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ পাওয়া আমার বড় ভাই মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া ও গোলাম কিবরিয়াকে রেখে দেওয়া হয় বিশেষ কিছু কাজের জন্য। আমাদের লিডার করে দেওয়া হয় মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম এবং ডেপুটি লিডার ইসহাক আলী। এরাই সমন্বয় করবেন আমাদের কাজ। আগস্টের প্রথম দিকে আমাদের গাইড মমতাজ মাস্টার সিরাজগঞ্জের ১২ জনসহ অন্যান্য অঞ্চলের আরো বিএলএফ সদস্যদের নিয়ে দিনাজপুরের একটি সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ, এমনকি মুক্তিফৌজের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কারণ, বিএলএফের কথা তখনো জানতো না মুক্তিফৌজ বা প্রবাসী সরকারও।

দীর্ঘ পথ চলার পর ভোর রাতে কোন এক গ্রামে গাইড আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতেন এবং দিনের বেলা তিনি পরবর্তী শেল্টারের ব্যবস্থা করতে বের হতেন। ফিরে এসে সন্ধ্যায় আবার বের হতেন আমাদের নিয়ে পরবর্তী শেল্টারের উদ্দেশ্যে। এভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চলের বিএলএফ সদস্যদের পৌঁছে দিয়ে সর্বশেষ আমাদের পৌঁছে দেন কাজীপুরের এক গ্রামে। তারপর বিদায় নেন মমতাজ মাস্টার। এখানে এসে সিরাজগঞ্জ উত্তরাঞ্চলের আব্দুস সামাদ (বেড়া), আব্দুল আজিজ মির্জা (বংকিরহাট-উল্লাপাড়া), বিমল কুমার দাস (জামতৈল-কামারখন্দ), আব্দুল বাকি মির্জা (শাহজাদপুর) ও ইফতেখার মোবিন পান্না (সলপ-উল্লাপাড়া)কে বিদায় করা হয় তাদের নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার জন্য। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের বিএলএফ সদস্যরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী যারা তখনো এলাকায় রয়ে গেছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদেরকে ডেকে আনে রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়িপাড়ায় আমাদের অবস্থানে। ডেকে আনা হয় তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, আবু ইউসুফ সূর্য ও কেএম হোসেন আলী হাসানসহ আরো কয়েকজনকে। তাদের সঙ্গে বিএলএফের যুদ্ধ-কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। স্ব স্ব এলাকায় জনসংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ, দল গঠন, নিজেকে রক্ষা করে দুর্বল শত্রুকে আঘাত করা, অস্ত্র সংগ্রহ করে সশস্ত্র হওয়ার জন্য বলা হয়। কোনও কোনও আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ কর্মী ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তার পরামর্শও দেওয়া হয়।

আমার বাড়ি যেহেতু সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকায়, তাই আমাকে শহরতলী এলাকায় অবস্থান নিয়ে কাজ শুরু করতে বলা হয়। যে তরুণকে সন্ধ্যায় পৌরসভার রাস্তার বাতি জ্বালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকতে হতো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কোনও আত্মীয় বাড়িতে রাত কাটানোর অভ্যাসই ছিল না তাকেই ছেড়ে দেওয়া হয় একা জনসংগঠন গড়ে মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্র সংগ্রহ করতে। এ পরিস্থিতিতে আমি আমার নেতা আমির হোসেন খানের পরামর্শ নেই। তিনি তখন সিরাজগঞ্জ কলেজের জিএস। অনেক জানাশোনা তার। তিনি অনেক গ্রামের নাম, ছাত্রলীগ কর্মীর নাম বলেন, যারা আবার আমারও পরিচিত। সাহস পাই। চলে আসি ছোনাগাছা ইউনিয়নের ভুড়ভুড়িয়া গ্রামে। খুঁজে বের করি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাত্রলীগ কর্মী জামালউদ্দিনকে। সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উন্মুখ, আমাকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পায়। দুজন পরিকল্পনা করি। শহরে খবর পাঠিয়ে ডেকে নেই আব্দুল লতিফ মাখন, কাজী ফিরোজ, সৈয়দ আলমাস আনোয়ার মোস্তাকসহ আরো কয়েকজনকে।

বিভিন্ন শেল্টারে অবস্থান নিয়ে ওদের অস্ত্রের ব্যবহার শেখাই। দ্রুতই একটি গ্রুপ হয়ে উঠি আমরা। স্বাধীনতা বিরোধী বা ডাকাতদের বাড়িতে রাতের আঁধারে গিয়ে সাবধান হওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসতে থাকি। আমরা রাতে যখন দু’তিন জন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতাম, সে গল্পই জনগণ শতগুণ বাড়িয়ে প্রচার করতো। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে বাড়িয়ে প্রচার হওয়ায় সুবিধাই হতো আমাদের। বিভিন্ন গ্রামে আমাদের উপস্থিতি জনগণের সাহস বাড়ায়, পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

আমার স্মৃতিতে এ সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জমা হয়, যা ‘বাম’ রাজনীতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে স্পষ্ট করবে বলে আমার ধারণা। কখনো কোনও গ্রামে ২৪ ঘন্টার বেশী অবস্থান করা বারণ, বিশেষ কাজ ছাড়া দল বেঁধে ঘোরাফেরা বারণ। এ পরিস্থিতিতে এক রাতে শেল্টার নেওয়ার জন্য যাই এক বাড়িতে, এই বাড়িতে আগেও শেল্টার নিয়েছি। বাড়ির মালিক আমাদের সমর্থক বলেই জানি। কিন্তু সে রাতে তিনি আমাকে আশ্রয় দিতে রাজী হন না। আমি অবাক হই। অতো রাতে যাবোই বা কোথায়? কিন্তু তিনি কোনক্রমেই তিনি থাকতে দিতে রাজি না। তার বাড়ি থেকে বের হয়ে পথে নামি। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, কেন এমন হলো? কিছু দূর যেতেই বাড়িওয়ালা আবার দৌড়ে এলেন। বললেন, চলেন আমার বাড়িতেই থাকবেন, অসুবিধা নাই। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই, কিন্তু এক ধরনের কৌতূহল জাগে আসল কারণ খুঁজে বের করার। তাই ফিরে আসি তার বাড়ি। ঘরে ঢুকেই আমি তো অবাক! সেখানে আশ্রয় পেতেছেন সিরাজগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রবীর কুমার নিয়োগী (পরবর্তীতে সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টির কামাল হায়দার গ্রুপের নেতা, ছদ্মনাম কামাল হায়দার।) আমার সঙ্গে তার অনেক আগে থেকে পরিচয়, বড় ভাই ছোট ভাই সম্পর্ক। তাকে দীর্ঘদিন পরে পেয়ে ভীষণ খুশি আমি। প্রবীর দা জিজ্ঞেস করেন, বিএলএফের পরিকল্পনার কথা। আমি অকপটে বলি গণকমিটি, ইউনিয়ন কমিটি, থানা কমিটি গঠনের মধ্যে দিয়ে জনগণের মধ্যে থেকে শক্তি সঞ্চয়। প্রথমে দুর্বল শক্তিকে আঘাত করা, ধীরে ধীরে নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তোলা, পাকিস্তানের ঘাঁটিকে ঘিরে ফেলা। গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানিদের উচ্ছেদ করা। সেই সঙ্গে দেশীয় শাসক-শোষক গোষ্ঠিকে সমূলে বিনাশ করা। সোনার বাংলা গড়ে তোলা। তিনি মন্তব্য করলেন, তোমাদের কায়দার সঙ্গে আমাদের কৌশলের মিল আছে অনেক। তারপর দুজন পাশাপাশি ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে আর তাকে পাইনি, আমি ঘুমিয়ে পড়ার পড়েই হয়তো চলে যান তিনি।

শহর ও শহরতলীর কাজের পাশাপাশি নিয়মিত যোগাযোগ রাখি লিডার, ডেপুটি লিডারের সঙ্গে। ধীরে ধীরে যুদ্ধ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে। জনগণ চাইছিল, ছলে-বলে-কৌশলে আমরা পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করি। তাই আমাদের বিএলএফও জনগণের সংগঠন গড়ে তোলার চেয়ে যুদ্ধের দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করে। ৩১ অক্টোবর ভাটপিয়ারী পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমণ, ১৪ নভেম্বর বড়ইতলা যুদ্ধ, ৩ ডিসেম্বর কাজীপুর থানা আক্রমণ, ১২ ডিসেম্বর শৈলাবাড়ি পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমণে বিএলএফের সদস্য হিসেবে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অংশ নেই আমিও।

সিরাজগঞ্জ শহর থেকে ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকসেনা ও তার সহযোগিরা পালিয়ে যায়। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপ ১৪ ডিসেম্বর ভোরে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে পড়ি সিরাজগঞ্জ শহরে। আমাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয় স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত মতি তালুকদারের বাসায়। আমিও সেখানে অবস্থান নেই। অপেক্ষায় থাকি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কবে ফিরে আসবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশের মাটিতে পা রাখেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ণতা পায়।


ফিরোজ ভুঁইয়া, সহ-সভাপতি, জেলা আওয়ামী লীগ, সিরাজগঞ্জ
অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম