যুদ্ধস্মৃতি ॥ সামছুল আলম


তারুণ্যের সঙ্গে যদি আপামর জনসাধারণ যুক্ত হয়, তবে সে আন্দোলন হয়ে ওঠে দুর্বার। অনিবার্য হয় জনতার বিজয়। ১৯৭১ সালে বাঙালির জাতীয় জীবনে এসেছিল তেমনি এক মহেন্দ্রক্ষণ। জনতা আর তারুণ্য চলে আসে এক কাতারে। বাঙালি জাতির বিজয় হয়ে ওঠে অনিবার্য। ১৯৭১ সালে বাঙালিদের সেই তরুণ শক্তির আমিও এক গর্বিত সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা। এ আমার জীবনের গর্ব।

আমি সামছুল আলম, জন্ম: ১৯৫৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। বাবা আবুল কাশেম, মা সামসুন্নাহার। সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার পূর্ণিমাগাঁতি ইউনিয়নের বেতুয়া গ্রামে আমাদের বাড়ি। দশ ভাইবোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ১৯৬৯ সালে আমি উল্লাপাড়া বণিক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। এ সময়েই জড়িয়ে পড়ি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে। যোগ দেই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন আব্দুল লতিফ মির্জা, শ.ম আব্দুল ওয়াহাব, জয়দেব সাহা সহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা। স্কুলে আমি ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গোলাম হোসেন গোলাপ সে সময় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতাম। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন রেজা কাদের, তিনি ছিলেন খুব কড়া শিক্ষক। তিনি কখনোই স্কুল ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকতে দিতেন না। এছাড়াও আমরা জানতাম, তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একজন বড় মাপের নেতা ছিলেন। পরে জানতে পারি, তিনিই কিংবদন্তীতুল্য রাজনীতিবিদ সিরাজুল আলম খানকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন।

গণ আন্দোলনের ফলে সামরিক জান্তা আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হয়, ক্ষমতায় আসে পাকিস্তানের আরেক সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। নতুন সামরিক শাসনের ছাত্র আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লেও আমার ও গোলাপের সঙ্গে মহকুমা ও থানা ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকে। সে যোগাযোগেই আমি ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখি। আমাদের এলাকায় এমএনএ পদে আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ও এমপিএ পদে অ্যাড. গোলাম হাসনায়েন আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হন। সারাদেশে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে জনগণ মনে করতে থাকে, এবার বাঙালিরাই শাসন করবে পাকিস্তান। ক্ষমতায় বসবে বাঙালিদের দল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাক-প্রেসিডেন্টের সংসদ অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা ঘুরিয়ে দেয় এই এলাকার রাজনীতির। পরের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ উড়িয়ে দেয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা। ৩ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। তিনি বাংলার ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

আমরা বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাকে স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে নেই। শুরু হয়ে যায় আকবর আলী কলেজ মাঠে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। এগিয়ে আসেন থানা আনসার কর্মকর্তা। তিনি ডামি রাইফেল সরবরাহ করেন প্রশিক্ষণের জন্য। এগিয়ে আসেন বাকুয়ার আব্দুস সামাদ ভাই ও উল্লাপাড়ার জিন্নাহ ভাই। তারা দুজনেই সেনাবাহিনীতে চাকুরি করতেন, ছুটি নিয়ে এসময় বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাপে তারা যুক্ত হয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলেনের সঙ্গে। আমরা প্রায় কুড়ি জন প্রশিক্ষণে অংশ নেই্। সেই সঙ্গে যাদের কাছে বন্দুক ও টুটু বোর রাইফেল আছে তাদের কাছে থেকে তা সংগ্রহ করতে শুরু করি। ২৫ মার্চের কালোরাতে পাকবাহিনী জনতার ওপর আক্রমণের পর পাকিস্তানি প্রশাসন সম্পূর্ণই ভেঙ্গে পড়ে। উল্লাপাড়া থানা পুলিশের রাইফেলও চলে আসে আমাদের কাছে। তা দিয়ে আমরা ও পুলিশ সদস্যরা উল্লাপাড়ার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এক সঙ্গে নেমে পড়ি।

একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ দুটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদে থাকেন- গোলাম হাসনায়েন এমপিএ, পুন্নু চেয়ারম্যান (নেওরগাছা), জয়নাল আবেদীন, ডা. মফিজউদ্দিন (মোহনপুর), আছমত আলী (উল্লাপাড়া), জাকারিয়া প্রফেসর, রবি ভুত, মাহফুজ প্রফেসর প্রমুখ। ছাত্রলীগ সংগ্রাম পরিষদের থাকি- আমি, আজাদ (উল্লাপাড়া), আব্দুল জলিল (উল্লাপাড়া), আব্দুস সামাদ (বাকুয়া), গোলাম মোস্তফা (বেতুয়া), গোলাম মোস্তফা (পুকুরপার), আলতাফ (কালীগঞ্জ), গিয়াসউদ্দিন (কালীগঞ্জ), দুলাল সাহা (ঝিকিড়া), জয়দেব সাহা (উল্লাপাড়া) প্রমুখ।

উল্লাপাড়ায় খবর আসে, বগুড়ার আড়িয়াবাজার আর্মস ডিপোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ করেছে, তারা সে ডিপো দখলে নিয়ে সব অস্ত্রশস্ত্র বিলিয়ে দিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। সেখান থেকে কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করা যায় কিনা, এ চিন্তায় একটি জিপ গাড়িতে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাডভোকেট হাসনায়েন এমপিএ এবং একটি ট্রাকে আমরা ১০/১২ জন রওনা হই। কিন্তু প্রচণ্ড গোলাগুলির মাঝে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় না। সবাই ফিরে আসতে বাধ্য হই। কিন্তু মির্জাপুরের পরে জিপগাড়িটি দুর্ঘটনায় পড়ে। আমাদের কয়েকজন আহত হন। এর কয়েক দিন পর, সম্ভবত এপ্রিলের দশ তারিখের দিকে উল্লাপাড়ায় খবর আসে, নগরবাড়ি-পাবনা সড়কসহ পাবনা জেলা শহর দখল করে নিয়েছে পাকসেনারা। এই সময় নওগাঁ-বগুড়া এলাকা থেকে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের একটি গ্রুপ উল্লাপাড়া আসে। তারা জানায়, পাবনার দিকে থেকে পাকবাহিনী যেন সিরাজগঞ্জ-বগুড়া-নওগাঁয় ঢুকতে না পারে এজন্য তারা কাশীনাথপুরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যাচ্ছে। আমরা উল্লাপাড়ার কয়েকজন ছাত্র ও পুলিশ সদস্য সে প্রতিরোধ যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং ওদের সঙ্গে রওনা হই কাশীনাথপুর। এ সময় লতিফ মির্জারা বাঙ্কার করে অবস্থান করছিলেন বাঘাবাড়িতে। আমরা বাঘাবাড়ি গিয়ে লতিফ মির্জার সঙ্গে দেখা করি, বাঘাবাড়ি ঘাট পার হয়ে বেড়া গিয়ে সেখানকার সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে দেখা করি। তারা সেদিনের মতো আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরের দিন আমরা চলে আসি ডাববাগান, এখানে ট্রেঞ্চ করে অবস্থান নেই। কিছুক্ষণ পরই আমাদের ওপর বিমান হামলা শুরু হয়। আমাদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি করে বিমান চলে যায়। বিমান হামলার কিছুক্ষণ পর সেখানে এক পাগলকে পাওয়া যায়। সন্দেহবশত তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তার কাছে অয়্যারলেসও পাওয়া যায়। সন্দেহ আরো ঘণীভূত হয়। সম্ভবত সে পাকিস্তানিদের কাছে আমাদের অবস্থানের খবরাখবর দিচ্ছিল। পরে সে পাগলকে তুলে দেওয়া হয় কমান্ডারের হাতে।

১৯ এপ্রিল ডাববাগানে আমাদের অবস্থানের ওপর সরাসরি হামলা চালায় পাকবাহিনী। আমি আর বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক সৈনিক, নাম যতদূর মনে পড়ে, আব্দুল জলিল, বাড়ি সম্ভবত বরিশালে। আমরা একই ট্রেঞ্চে অবস্থান নেই। আমার কাছে ছিল থ্রিনটথ্রি রাইফেল, তার কাছে চাইনিজ এসএসজি। তুমুল যুদ্ধ হয়। থ্রিনটথ্রির গুলি লোড করতে করতে আমার হাত ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। পরে ওই সৈনিকের ম্যাগজিনে গুলি ভরে তাকে সহযোগিতা করতে থাকি। দূর্ভাগ্যবশত, কিছুক্ষণের মধ্যেই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সৈনিক আব্দুল জলিল গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এতে আমি ভীত হয়ে পড়ি এবং ট্রেঞ্চ ছেড়ে ক্রলিং করে পিছিয়ে আসি। একসময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই সরে আসি। পিছিয়ে এসে দেখতে পাই, আমার মতো অনেকেই সরে এসেছে। উল্লাপাড়ার পুলিশ সদস্যদের ৬/৭ জনকে খুঁজে পাই এবং তাদের সঙ্গে চলে আসি বাঘাবাড়ি ঘাটে। এপারে এসে লতিফ মির্জার সঙ্গে দেখা হয়, আমি লতিফ মির্জার দলের সঙ্গে বাঘাবাড়িতে থেকে যাই। পুলিশ সদস্যরা চলে আসেন উল্লাপাড়া।

সম্ভবত ২১/২২ এপ্রিল, বাঘাবাড়ির পূর্ব পাড়ে এসে আমাদের ওপর হামলা চালায় পাকসেনারা। সে অবস্থায় নদীপথেও হামলার আশঙ্কা করতে থাকেন নেতৃবৃন্দ। এ সময় লতিফ মির্জা আমাদের নির্দেশ দেন উইথড্র করার। তিনি যার যার এলাকায় অবস্থান নিতে বলেন এবং সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে বলে জানান। আমি চলে আসি উল্লাপাড়ায় নিজ গ্রামে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, উল্লাপাড়া মাতৃসদন হাসপাতালে আব্দুস সামাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের কয়েক জন অবস্থান করছে, সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করি। তখনো উল্লাপাড়ায় পাকসেনারা আসেনি, তবে পাকসেনা আসতে পারে এমন আতঙ্কে অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে, বাড়িতে বাড়িতে উড়তে শুরু করেছে পাকিস্তানি পতাকা। মুসলিম লীগাররা উঁকিঝুকি দিচ্ছে, কখন আসে তাদের মিত্ররা। জানতে পারি, থানায় বেশ কিছু অস্ত্র আছে তখনো। আমি সবার ছোট বলে আমাকে পাঠানো হয় থানার খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য।

আমি আর কয়ড়ার শামসু রওনা হই থানার দিকে, পথে সাত্তার হাজীর সঙ্গে দেখা হয়, তার বন্দুক জমা আছে থানায়, সেই বন্দুক উদ্ধার করতেই তিনি থানায় যাচ্ছেন। তাকে সঙ্গে থানায় গিয়ে দেখা হয় ইপিআরের এক সদস্যের সঙ্গে, তিনি থানার অয়্যারলেসের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। তার কাছেই খবর পাই, লতিফ মির্জারা অবস্থান করছেন ঘাইটনা রেল ব্রিজের ওপারে, সেখানেই প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকসেনাদের প্রতিরোধের। সাত্তার হাজীর বন্দুক খুঁজে পেয়ে তার কাছে দিয়ে দেই, নিজে কিছু গুলি আর কয়েকটি থ্রিনটথ্রি- যা বহন করা সম্ভব- তা কাঁধে তুলে নেই। রওনা হই ঘাইটনার দিকে। রাস্তায় মুসলিম লীগের কয়েক জন নেতার সঙ্গে দেখা হয়। মুসলিম লীগ নেতারা আমাকে অস্ত্র নিতে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে। অবশেষে তাদের কাছে- আমি অস্ত্র নিয়ে যাচ্ছি, এর দায়দায়িত্ব আমার- এমন একটি লেখায় সাক্ষর করে অস্ত্রগুলো নিয়ে চলে আসি।

নদী পার হয়ে ঘাইটনা গিয়ে সহজেই খুঁজে পাই লতিফ ভাইদের। তারা কয়েক জন ট্রেঞ্চ খুঁড়ে রাইফেল তাক করে আছেন ঘাইটনা রেলব্রিজের দিকে। আমিও যুক্ত হই তাদের সঙ্গে। সম্ভবত ২৪ এপ্রিল দিনের বেলা পাকসেনারা ট্রেন নিয়ে এসে অবস্থান নেয় ঘাইটনা ব্রিজের অপর পাড়ে। ট্রেন রেখে তারা হেঁটে পার হওয়ার চেষ্টা করে, হয়তো মুক্তিযোদ্ধারা রেলব্রিজের কোনও ক্ষতি করেছে কিনা, তা পরীক্ষা করতেই এ ব্যবস্থা। ওরা ব্রিজের মাঝামাঝি আসার পর আমরা ওদের লক্ষ্য করে গুলি চালাই। কয়েক জন পাকসেনা ব্রিজের ওপর থেকে নদীর মধ্যে পড়ে যায়, তখন পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকসেনারা। পরের দিন বিমান হামলা চালানো হয় ঘাইটনায় ও তার আশপাশ এলাকায়। এতে আমাদের নেতারা বুঝতে পারেন যে, এর পরের আক্রমণ হবে আরো তীব্র, তখন এ সামান্য অস্ত্র নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। তাই নেতারা সিদ্ধান্ত নেন উইথড্র করার। লতিফ মির্জা, লুৎফর রহমান অরুণদার নেতৃত্বে আমরা ৮/১০ জন রাতের বেলা ফিরে আসি সিরাজগঞ্জ শহরে, তখন শহর জনশূন্য, বাড়িতে বাড়িতে উড়ছে পাকিস্তানি পতাকা। আশ্রয় নেই সিরাজগঞ্জ কলেজ হোস্টেলে, কাউকেই পাওয়া যায় না সেখানে। তখন ন্যাশনাল ব্যাংক লুট করার পায়তারা করছিল কতিপয় লুটেরা গ্রুপ। আমরা তাদের ঠেকানোর উদ্যোগ নেই, কিন্তু একদিকে পাকসেনারা যে কোনও সময়ে ঢুকে পড়বে সিরাজগঞ্জ শহরে। তাতে আমাদের বিপদ বাড়তে পারে, এ ধারনা থেকে শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই আমরা।

শহর থেকে বের হয়ে আমরা খোকসাবাড়ি দিয়ে চলে যাই পাকিস্তানের হাট (বর্তমান বাংলা বাজার) এলাকায়। সেখান থেকে খোঁজখবর নিয়ে চলে যাই চিলগাছা গ্রামের ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলামের বাড়িতে। আসেন আরো কয়েক জন ছাত্রনেতা। তারা সিদ্ধান্ত নেন, আমাদের হাতে আসা অস্ত্রগুলো লুকিয়ে রাখা হবে ওই গ্রামেই। আপাতত যার যার মতো চলে যাবো নিরাপদ আশ্রয়ে, কিছুদিন পর আবার সংগঠিত হবো আমরা। আমার কাছে থাকা অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয় ওই গ্রামেই, আমি চলে আসি আমার এলাকায়। নিজের বাড়িতে থাকার সাহস হয় না, কারণ ততদিনে উল্লাপাড়ায় পাকবাহিনী এসে পড়েছে, গঠন করা হয়েছে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী। তৎপর হয়ে উঠেছে পাকিস্তানপন্থীরা। বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপন করে থাকি আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে। খোঁজ করতে থাকি সহযোদ্ধাদের।

খবর পাই, গয়টায় সিরাজগঞ্জের ছাত্রনেতা আব্দুল হামিদ তালুকদার এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে খুঁজে বের করে দেখা করি। তিনি চেষ্টা করছেন ভারতে যাওয়ার। তখন আমাদের সামনে যাওয়ার পথ জয়পুরহাটের হিলি বর্ডারের নামই শোনা যেতে থাকে। আমরা প্রায় ১৫ জন এক জোট হই এবং হামিদ তালুকদারের সঙ্গে রওনা হই। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর জানা যায়, বর্ডার এলাকায় তৎপর হয়ে উঠেছে পাকসেনারা। কাউকেই বর্ডার পার হতে দেওয়া হচ্ছে না। আবার ফিরে আসি এলাকায়। ভারতে যাওয়ার জন্য যে দল গঠন করা সম্ভব হয়েছিল তা ভেঙ্গে যায়। আবারো একা হয়ে পড়ি।

একজনের মাধ্যমে খবর পাই, কয়ড়ার খোরশেদ ভাইয়ের বাড়িকে ঘিরে নিয়মিত যোগাযোগ করছে কয়েকজন। আমিও যোগাযোগ করি সেখানে। তার বাড়িকে ঘিরে আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করি কয়েকজন ছাত্র-তরুণ। বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করতাম, সেখানে যেতাম নিয়মিত। সেখানে সংগঠিত হতে পেরেছিলাম ১০/১২ জন। তাদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলাম- আমি, খোরশেদ ভাই, সেনা সদস্য সামাদ ভাই, ময়েন (কয়ড়া), গোলাম মোস্তফা (পুকুরপার), গোলাম হোসেন গোলাপ (বেতুয়া) প্রমুখ। সেখানে আলোচনা হয়, এভাবে ঘোরাফেরা করার চেয়ে যা পারি একটা কিছু দিয়ে শুরু করা দরকার। সিদ্ধান্ত হয়, স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার।
জল্পনা কল্পনা শেষে একদিন সিদ্ধান্ত হয় চৌবিলায় এক স্বাধীনতা বিরোধীর বাড়িতে অভিযান চালানোর। এক রাতে আমরা কয়েক জন অভিযান চালাই সে গ্রামে। সহজেই সেই স্বাধীনাত বিরোধীকে ধরে ফেলি এবং শাস্তি দেই। এরপর একদিন প্যাঁচোরপাড়ায় এক স্বাধীনতা বিরোধীর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানেও সফল হই আমরা। এভাবে ছোটখাট অভিযানের মধ্যে দিয়ে আমাদের সাহসও যেমন বাড়তে থাকে তেমনি যুদ্ধের কৌশলও খুঁজে পেতে থাকি। এলাকায়ও প্রচার হতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবর। তাতে জনগণের মধ্যেও আশার প্রদীপ জ্বলতে শুরু করে। এর মধ্যে খবর পাওয়া যেতে থাকে আমাদের ছাত্রনেতা আব্দুল লতিফ মির্জা ভারত থেকে এলাকায় ফিরেছেন। তাকেও খুঁজতে থাকি। খবর পাই, ভদ্রঘাটে লতিফ মির্জা, মনিরুল কবীর, লুৎফর রহমান অরুণ, সোহরাব আলী সরকার, আব্দুল আজিজ সরকার, শফিকুল ইসলাম শফিসহ বেশ কয়েক জন আমাদের মতোই সংগঠিত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন তারা। খবর পেয়েই আমরা যে কয় জন সংগঠিত হতে পেরেছিলাম, সে ১০/১২ জন চলে যাই ভদ্রঘাটের জাঙ্গালিয়াগাঁতীতে। দুটি গ্রুপ এক সঙ্গে হতে পেরে সাহস বাড়ে আমাদের।

পরের দিন রাতেই সবার উপস্থিতিতে দীর্ঘ বৈঠক হয় স্থানীয় একটি স্কুলঘরে। বৈঠকে পলাশডাঙ্গার পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয় যা পরবর্তীতে ‘হেড কোয়ার্টার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরিচালক নির্বাচিত হন আব্দুল লতিফ মির্জা, কমান্ডার-ইন-চিফ হন সিরাজগঞ্জ কলেজ ছাত্র-সংসদের ভিপি সোহরাব আলী সরকার। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে দুটি সেকশন গঠন করা হয় যার কমান্ডার নিযুক্ত হন দুই সেনা সদস্য লুৎফর রহমান অরুণ ও আব্দুস সামাদ। কিন্তু এর দুই দিন পরেই অর্থাৎ জুনের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করে বসে পাকসেনারা। জানা যায়, এ আক্রমণে পথ দেখিয়ে দেয় শিয়ালকোল ইউনিয়নের জগৎগাঁতী গ্রামের মজিবর রহমান। তখন আমরা ছিলাম একেবারেই প্রাথমিক অবস্থা, তারপরে ওদের ছিল ভারি অস্ত্র, ফলে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজেই ভেঙ্গে পড়ে। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি আমরা। তবে আমাদের পলাশডাঙ্গার তেমন কোনও ক্ষতি হয় না, আমরা ওদের ঘেরাও থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হই। আর আমরা যারা উল্লাপাড়া থেকে এক সঙ্গে গিয়েছিলাম তাদেরও সবারই এক সঙ্গে থাকা সম্ভব হয়। তাছাড়াও আমাদের সঙ্গে থাকে হেডকোয়ার্টারের সবাই। আমরা চলে আসি রাজাপুরের হবিবর রহমান তালুকদারের বাড়িতে। সেখানে এসে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় নৌকা নেওয়ার, কারণ ততদিন বন্যা শুরু হয়ে গেছে। হুড়াসাগর নদীতে নৌকা ঠিক করা হয়, আমরা সবাই সে নৌকায় উঠে পড়ি। বিভিন্ন স্থানে ছোটখাট অপারেশন করতে করতে আমরা ধীরে ধীরে চলে আসি চলনবিল এলাকায়। সেটাই হয়ে ওঠে আমাদের নিরাপদ বিচরণভূমি।

ভদ্রঘাটে আক্রান্ত হওয়ার পর লোকজনের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতির খবর, ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্রসহ বিভিন্ন জন আমাদের খুঁজে বের করে যোগ দিতে শুরু করে পলাশডাঙ্গায়। খালেক, মোজাহার, আব্দুর রহমান সহ অনেকেই এসে যুক্ত হন আমাদের সঙ্গে। বেড়া, সাঁথিয়া, আটঘরিয়া, চাটমোহর, গুরুদাসপুর সহ বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারাও এসে যোগ দেন পলাশডাঙ্গায়। ধীরে ধীরে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনে পরিণত হয় পলাশডাঙ্গা যুব শিবির। ছোট বড় প্রায় সত্তুরটি যুদ্ধ করতে হয় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের। এসব যুদ্ধের অনেকগুলোতে আমার অংশগ্রহণ রয়েছে। ইতিমধ্যেই অনেকেই সে সব যুদ্ধের কথা আলোচনা করেছেন, আগামীতেও পলাশডাঙ্গার আরো মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে সেসব যুদ্ধের কথা উঠে আসবে। একই ঘটনার বার বার আলোচনা না করাই শ্রেয়। তবে আমার অংশ নেওয়া একটি যুদ্ধের কথা আমার আলোচনা না করলেই নয়, কারণ এ যুদ্ধে আমি রাজাকারদের নিক্ষেপ করা এসিডে আহত হই। যুদ্ধটি হচ্ছে সলঙ্গার রাজাকার ক্যাম্পে অভিযান।

তখন পলাশডাঙ্গার বিভিন্ন নৌকায় অবস্থান করতো চার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। এক একদিন একাধিক স্থানে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ আমরা অভিযান চালাতাম। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ। আমাদের কাছে খবর আসে, রাজাকারেরা সুযোগ পেলেই তাদের সলঙ্গা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে বিভিন্ন গ্রামে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। পরিচালক মণ্ডলী রাজাকারদের শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন। এক রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী নৌকা থেকে নেমে বের হই বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা। পথে আমরা তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হই, আমাদের দলকে পাঠানো হয় সলঙ্গা রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণের জন্য। আমরা ওদের ক্যাম্পে হানা দিয়ে হাবিবুর রহমান সহ ৪ রাজাকারকে খতম করি। যুদ্ধ চলাকালে রাজাকারদের নিক্ষেপ করা এসিডে আমি দগ্ধ হয়ে আহত হই।

নওগাঁ যুদ্ধ পলাশডাঙ্গার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ, এ যুদ্ধে আমার গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ ছিল। যাইহোক আগে থেকেই পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারছিলেন, বর্ষাকাল চলে যাওয়ায় খাল-বিল, নদী-নালার নাব্য কমে আসছে; আমাদের নৌকায় চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে আসছে। চলনবিলের জায়গাও কমে আসছে, ফলে আমাদের নৌকার বহর খুব সহজেই শত্রুদের নজরে চলে আসছে। শত্রুরাও আমাদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারছে। তাই নওগাঁ যুদ্ধের পর নৌকা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পলাশডাঙ্গার কমান্ডারেরা। আমরা পা রাখি মাটিতে।

হাণ্ডিয়াল-নওগাঁ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমাদের হাতে গুলি খুবই কমে যায়। ফলে প্রয়োজন দেখা দেয় অস্ত্র ও গুলির। এ পরিস্থিতিতে পলাশডাঙ্গা সিদ্ধান্ত নেয় কুড়িগ্রামের মুক্ত এলাকা রৌমারীতে যাওয়ার। নানা পথ ঘুরে আমরা চলে আসি রতনকান্দি-শুভগাছা এলাকায়। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে কাজীপুরের টেংলাহাটার যমুনার ঘাটে উঠে পড়ি নৌকায়। যাত্রা শুরু হয় রৌমারীর দিকে।

পথে জামালপুরের চেঙ্গানিয়ার চরে পাকিস্তানি বিমান হামলা শিকার হই আমরা, কিন্তু তা-ও সাহসের সাথে প্রতিহত করা সম্ভব হয়। তিন থেকে চারদিন যুমুনা ব্রহ্মপুত্রের উজান ঠেলে আমরা চলে যাই মুক্ত এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। নেতারা ছুটে যান প্রবাসী সরকারের কাছে গুলির সন্ধানে। তারা গুলি নিয়ে ফিরে এলেই আবার আমরা দেশে ফিরবো, মেতে উঠবো শত্রু হননে।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম