যেভাবে লেখা হলো তেত্রিশ নম্বর জীবন ॥ সাইফ বরকতুল্লাহ



[সম্পাদকীয় নোট : প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকার সাইফ বরকতুল্লাহ। ২০১৮ সালে একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তেত্রিশ নম্বর জীবন’। এই গ্রন্থটি লিখতে গিয়ে কীরকম প্রস্তুতি নিয়েছিলেন লেখক, কেমন করে লেখা হলো এটি, তারই কিছুটা বিবরণ পাওয়া যাবে এই লেখায়।]


স্কুল জীবনে যখন বিভিন্ন ম্যাগাজিন পড়তাম, তখন প্রায়ই ভাবতাম আহ, আমি যদি এরকম লিখতে পারতাম। একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি পড়ার টেবিলের অর্ধেকজুড়ে থাকত বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর গল্প, উপন্যাস গ্রন্থ। সেই সময় ওসব ম্যাগাজিনের ভেতরে যে গল্পগুলো থাকত, তার ইলাস্ট্রেশন আমাকে খুব টানত। দৈনিক জনকণ্ঠ আর দেশ পত্রিকার গল্প-উপন্যাসে দেখতাম পৃষ্ঠাজুড়ে থাকত ছবি আর ইলাস্ট্রেশন। এক সময় আমিও লেখা শুরু করলাম। স্কুল দেয়ালিকা ও বিভিন্ন পত্রিকার চিঠিপত্র কলামে লেখা ছাপাও হতে লাগল। কিন্তু তখন থেকেই গল্পকার আর ঔপন্যাসিক হওয়ার বাসনায় বুদ ছিলাম (যদিও বাবা চাইতেন কলেজের শিক্ষক হই)।

কর্মজীবনে এসে যখন সাংবাদিকতায় যোগ দিলাম, তখন লেখাটা দুই ক্যাটাগরিতে শুরু করলাম। একটা ক্যাটাগরিতে পেশার জন্য লেখা, আরেকটা নিজের জন্য লেখা। কিন্তু সাংবাদিকতার কাজের চাপে মৌলিক লেখায় সময় বের করা কষ্টসাধ্য হয়ে গেল। একবার সাংবাদিকতা ছেড়েই দিতে চেয়েছিলাম, তখন অবশ্য অনেকটা বছর চলে গেছে। এরই মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে চারটা বইও বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই যে শৈশবের স্বপ্ন গল্পকার আর ঔপন্যাসিক হওয়ার পথে একটু একটু করে লিখতে লিখতে কয়েকটা বছর কেটে গেল। প্রথম গ্রল্পগ্রন্থও বের হয়ে গেল। আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তেত্রিশ নম্বর জীবন’।

দুই.
একদিনের ঘটনা। হঠাৎ বিষণ্ন মন। উসকু খুসকু হৃদয়ে বাসা থেকে বের হয়ে চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। পাশে আরো তিন চারজন যুবক বসে সিগারেট টানছেন। ওদের কথাবার্তা শুনে মনে হলো তারাও উড়ন্ত মনা। উড়ন্ত বলাকার মতো ভাবনা তাদের। দুই তিন কাপ চা খাওয়ার পর তাদের মনের ভাবনা নিয়ে মাথায় আইডিয়া আসল লেখার। রাতে বাসায় গিয়ে শুরু করলাম লেখা। তিন মাসে প্রায় চার হাজার শব্দ লিখে শেষ করলাম। গ্রন্থে গল্পটির নাম ‘বেগুনি রংয়ের মন’। যদিও এই গল্পটি তখন অন্য নামে একটি মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছে। সে সময় ব্যাপক পাঠক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। অনেকেই তখন নিয়মিত লিখতে অনুরোধ করেছেন। অনেকেই আবার ফুলটাইম লেখার পরামর্শ দেন।

তিন.
২০১৫ সাল। তখন ঢাকার মিরপুরে থাকতাম। চলছে লেখালেখি ও সাংবাদিকতা। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় সকাল বেলা যখন বাসা থেকে বের হতাম (কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়) তখন দেখি অসংখ্য পোশাককর্মীরা অফিসে যান। এ সময় দেখি তাদের অনেকের ক্লান্ত মুখ। দুঃখ-দুর্দশার চিত্র যেন তাদের চোখে মুখে। একদিন কথা হয় বাকের (গল্পের নায়ক) নামে একজনের সঙ্গে। তাকে নিয়ে লিখলাম নতুন গল্প ‘দ্বিতীয় বউ-ও চলে গেল’। ঢাকায় নতুন জীবন। নতুন পরিবেশ। শান্ত, প্রকৃতি আর মেঠো পথ গ্রাম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে নানা কৌশল করে বাকের। বিএ পরীক্ষার ফল বেরোল। দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে। খুঁজতে শুরু করে চাকরি। কিছুদিনের মধ্যেই পেয়ে যায় একটি পোশাক কারখানায় স্যাম্পল আনা নেয়ার কাজ। এভাবে একমাস পেরিয়ে গেল। প্রথম মাসের বেতনের টাকা দিয়ে একটা চৌকি কিনল। মেসে এতদিন মেঝেতে ঘুমিয়েছে। বুয়ার হাতের রান্না এই জীবনে আর কোনো দিন খায়নি বাকের। একদিন তরকারিতে লবণ বেশি তো আরেকদিন প্রচণ্ড ঝাল। সকালে বাথরুমের সিরিয়াল। রাত এগারটা বাজতেই লাইট অফ করতে হয় রুমের। এরকম পরিমিত বদ্ধ জীবন বাকেরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। এভাবে এগোতে থাকে তার জীবন। একসময় শুধুই অন্ধকারে হারিয়ে যায়। এভাবেই গল্প চলতে থাকে।

চার.
আমি চলতে-ফিরতে খুঁজি গল্প। আমাদের চারপাশেই ঘটে অনেক ঘটনা। নগরের কোথাও মানুষ নিঃসঙ্গ, কোথাও সুখের উল্লাস করে মানুষ, আবার সবখানে মানুষ একা। অনেকের আবার যাপিত জীবনে নানা ঘটনায় নিষপেশিত। যেন নিত্যদিন মঞ্চে অভিনয় করে সবাই। এই ঘটনাগুলোই আমি বোঝার চেষ্টা করি। অভিজ্ঞতা আর আত্ম-অনুভবে উপলব্ধি করি লেখার। তেত্রিশ নম্বর জীবন-গ্রন্থ মূলত এরকমই একটি গল্প। আপনার আমার জীবনের গল্পই চিত্রায়িত হয়েছে এতে। আরেকটি গল্প দিন আসে দিন ফুরায়। এতে রয়েছে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের উপাখ্যান। নিম্নবৃত্ত, মধ্যবৃত্তের শোষিত, বিপর্যস্ত ও নিগৃহিত জীবনের চিত্র ভেসে ওঠেছে গল্পে।

পাঁচ.
ব্যস্ত শহর। ব্যস্ত মানুষ। এই শহরে কোথাও থেমে নেই কেউ। সবাই ছুটছে। যানজটের কাছে অসহায় হয়ে কয়েক বছর আমি নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াত করতাম। একদিন বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় বসে আসি প্ল্যাটফরমে। হঠাৎ দেখি পাশে একটা মেয়ের গালে একটা ছেলে চর মারছে। মেয়েটা কাঁদছে আর কী যেন বলছে। পাশের প্ল্যাটফরম থেকে পুলিশ বিষয়টি খেয়াল করে কাছে চলে এলো। লোকজনও সবাই দেখছে। আমি বিষয়টি বুঝার চেষ্টার করি। মাথায় আইডিয়া বের করি। বাসায় গিয়ে লেখা শুরু করি। এভাবে গল্প লিখলাম ‘হৃদয় ঘরে হৃদয় পোড়ে’। গল্পটি ব্রাকেটবন্দি প্রেম, ভেঙে পড়া, বিচ্ছেদ আর মধ্যবৃত্ত ঘরের বেকার ছেলেদের টানাপোড়নের চিত্র তুলে ধরেছি।

ছয়.
গত কয়েক বছর বইমেলা কাভার করেছি। ২০১৭ সালে বইমেলায় প্রায় চল্লিশজন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এছাড়া প্রায় দুই শতাধিক বইয়ের নিউজ কাভার করেছি। এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প লিখেছি ‘সুন্দরী লেখিকাগণ’।


সাত.
আমার গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর কয়েকজন প্রিয় মানুষ আমার কাছে পত্রিকার জন্য নতুন গল্প চাইলেন। আরো কয়েকটি নতুন গল্প লিখলাম। আমি আগেই বলেছি অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা আর কিছুটা কল্পনার মিশেলে লিখেছি গল্পগুলো। লেখালেখির সূত্র ধরে ফেসবুকে পরিচয় মাইবম সাধনের। নতুন প্রকাশনা করেছেন। কিছু ভাল বইও বের করেছেন। কবি কাজী জহিরুল ইসলামের একটি কবিতার বই কেনার সূত্র ধরে আমাকে উনি পাণ্ডুলিপি রেডি করতে বললেন। আমি রাত জেগে প্রায় বিশদিনে পাণ্ডুলিপি তৈরি করলাম। পরে তাকে মেইল করলাম। তিউড়ি পাবলিকেশন্স থেকে এটি বের হয়েছে। এটি আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ আর প্রকাশিত হিসেবে পঞ্চম বই। মোট ১২টি গল্প রয়েছে এ গ্রন্থে। ২০১০ সালে একটি, ২০১৫ সালে একটি, ২০১৬ সালে একটি এবং বাকি গল্পগুলো ২০১৭ সালে লেখা। প্রচ্ছদ করেছেন কাব্য কারিম।