রক্তের বোতাম ॥ রফিকুজ্জামান রণি



সময়টা হঠাৎ পেসেন্ট বেডের কার্নিশে আটকে গেলো। হাসপাতালে ঢোকার পর ঘড়ির কাঁটাও যেন কয়েক ধাপ পিছিয়ে পড়েছে। অথচ বাইরের জগৎটা কতো গতিশীল। কেবিনে শুয়ে শুয়ে শুনতে পাই রাস্তায় যানবাহনের হর্ন, রিক্শা-ভ্যানের টুংটাং শব্দ, বেল। শহরের অলিতে-গলিতে রাতদিন সুখ-দুঃখের ঝাঁপি নিয়ে নিবিঘ্নে হেঁটে বেড়ায় কতো মানুষ-শিস দেয়, খিস্তি-ঝাড়ে, ইয়ার্কি তামাশা করে। কিন্তু হাসপাতালের আবহাওয়া একেবারেই বিপরীত। উদ্বিগ্ন এবং উৎকণ্ঠার প্রচ্ছায়া ভিন্ন আর কিছু চোখে পড়ে না এখানে। ফলে, এখানকার মানুষের চোখে বাইরের সুস্থ-সবল মানুষগুলোকে ভীনগ্রহের আজব প্রাণি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

না। তারা কোনো ভীনগ্রহের প্রাণি নয়, মানুষই। তফাৎ, তারা সুস্থ আর আমরা অসুস্থ। তারা বাইরে, আমরা ভেতরে। তারা চোখ মেললে আকাশ দেখে, আমরা চোখ মেললে দেখি রক্ত, বমি এবং অশ্রু। মানুষের অসহাত্বের এক সরব প্রতিকৃতির নাম-হসপিটাল-বেড। রোগাক্রান্ত মানুষের কাছে পৃথিবী একটা বড়োসড়ো ফুটবল, সুযোগ পেলে সজোরে লাত্থি মেরে পালিয়ে যেতে একপায়ে খাড়া।
ওভার ব্রীজ উপেক্ষা করে রাস্তা পারাপারের সিদ্ধান্তটা যে ঐতিহাসিক ভুল ছিলো তা হাসপাতালের দরজায় পা রাখার আগমুহূর্ত পর্যন্ত টের পাইনি। একবারও না। অপদার্থ গাড়িটা কোত্থেকে যে এলো। ধাক্কা মেরেই হাওয়া। বাম পায়ের হাঁটুতে পাঁচ-পাঁচটা সেলাই। ঘাড় ফুলে চীনাঝোঁক। ভাবতেই গা শির শির করে ওঠে। কোমরের যে বারোটা বাজিয়েছে তা ইহ-জিন্দেগিতেও সেরে উঠবে কিনা আল্লাহ মালুম।

যাইহোক, ডাক্তারের কথায় অনুমান করলাম অন্তত দুএক সপ্তায় রিলিজ পাওয়া যাবে না। ডায়াবেটিকের মতো আনকোরা রোগ যার দেহের পাটাতনে ঘুমায়, জীবদ্দশায় সে আর ঘুমের আশা করতে পারে না। দুর্ঘটনার কবলে পড়ার প্রবল-বাসনা নিয়েই বোধহয় জ্বর-ব্যামোটা এতদিন অপেক্ষায় ছিলো। গতিহারা ডায়েবেটিক, জ্বর-সর্দি, মাথা ব্যথা ও গাড়ির গুতো, সব মিলিয়ে নিয়তি আমার সঙ্গে পলিটিক্স করতে শুরু করেছে। নেতিয়ে পড়লাম ভীষণ। জন্মের পর এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে কখনও পড়নি। বদলিযোগ্য চাকরির সুবাদে ঢাকার মতো জনবহুল শহরে স্থানান্তরিত হওয়ায় প্রথম প্রথম আনন্দের যেই খৈ ফুটেছিলো, কয়েক মাসের ধাক্কায় তা চতুর্থ আসমানে গিয়ে আসন গেড়েছে।

রোগশয্যায় সময় পার করার জন্যে অফিস-কলিগ ফয়েজ আহমেদ চমৎকার একটা বই দিয়ে গেছেন। সাহিত্যপাগল ফয়েজ ভাইয়ের দেয়া উপহার ‘শৈশবের পোড়া মাটি’ বইখানাকে গত দুদিনে খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। একটুক্ষণ উল্টিয়ে পাল্টিয়ে, কখনোবা দু’চার স্তবক পড়ে রেখে দিতাম। ভেবে অবাক হই, ঢাউস আকারের সে বইখানা আজ কীভাবে যে পড়ে শেষ করে ফেললাম। বইটা যে এতো চমৎকার হবে ভাবতেই পারিনি। আমাকে ছেলেবেলার দিকে টেনে নিয়ে গেলো। মনে হলো, ‘শৈশবের পোড়া মাটি’তে আমারই জীবনকথা মলাটবন্দি করেছেন লেখক। অচেনা লেখক, অথচ কী দারুণ লিখনশৈলি, কী চমৎকার বলার ঢং। আমাদের দৃষ্টি অগোচরে যে কত মণিরত্ন লুকিয়ে থাকে, কে রাখে তার খোঁজ। গল্পের পরতে পরতে আমার জীবনচিত্র খুঁজে পেলাম। ফেলে আসে শৈশব, কলাইক্ষেত, অন্ধকারাচ্ছন্ন বাঁশঝাড়, সাঁকো ওপর থেকে লাফিয়ে পরা, হাস সেজে প্যাক প্যাক করে ছোটাছুটি করা, বর্ষায় নতুন জলে হাবুডুবু খেতে খেতে শুশুকের মতো একবার তলিয়ে যাওয়া আবার ভেসে ওঠা, শানবাঁধানো পুকুর ঘাট, বুনোলতার নাকফুল, ঝিঁঝিঁ পোকার দাপুটে সুরের মূর্ছনা, ব্যাঙের নান্দনিক কোরাস, কুটুম চাঁদের স্নিগ্ধতা, গাছখাটাশ ও সজারুর লুকোচুরি, বজ্রনিনাদে শিলাখণ্ড কুড়ানোর স্মৃতি, গাইয়ের লোভনীয় ওলানপ্রীতি, ঝিনুক কিংবা শামুক-নুড়ির পদাবলি কি চাইলেই ভোলা যায়।

অনেকদিন পর চমৎকার একটা বই পেয়ে মনটা ভালো হয়ে গেলো। বইটার প্রতি আন্তরিকতা বেড়ে গেলো। বারবার নেড়েচেড়ে সুন্দর সুন্দর অংশগুলোতে চোখ বুলাচ্ছি। পড়ার পর অর্হনিশ শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলো চোখের পর্দায় ভেসে উঠতে শুরু করেছে।
কেবিনে ঠিকমতো দিনরাত্রি বোঝার উপায় নেই। মানুষের গতিবিধি ও সময়ের ইঙ্গিত-ইশারায় অনুমান করছি, এতক্ষণে সন্ধের পাখিগুলো নীড়ের দিকে ডানা মেলেছে। মায়ের গন্ধমাথা বাড়ির উঠোনটিতে অন্ধকার এসে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বাবার অতি যত্নে রোপণ করা কড়ই গাছটিতে বসে আপন মনে গান গেয়ে ওঠা পাখিটির করুণ আর্তনাদও থেমে গেছে। সায়লা হয়তো এতোক্ষণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে, ঘনঘন তাগাদা দিচ্ছে। তারা কি আদৌ টের পেয়েছে, তাদেরই এক স্বজন কতদিন ধরে শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে? একাকিত্বের প্রশ্রয়ে ক্ষুদ্র জীবনে সংগঠিত অনেক পাপ-পূণ্যের খতিয়ান চোখে সামনে শনৈঃশনৈ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।

গেলো দুদিনের তুলনায় শরীরটা আজ পাতলা পাতলা লাগছে। পাছে দুশ্চিন্তায় পড়ে, তাই বাড়ির কারো কাছে দুর্ঘটনার খবর পাঠানো হয়নি। পরিবারের লোকজনের অনুপস্থিতিতে অফিস-কলিগদের আন্তরিকতার কামাই ছিল না। আমার আরোগ্য কামনায় যথেষ্ট পরিশ্রম করছে তারা।

আচমকা টের পেলাম, হাসপাতালের সীমানায় বড় ধরনের গণ্ডগোল বেঁধেছে। মানুষজনের হৈ-চৈ, হাক-চিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠছে এই রুগির আড়ৎ-ঘর। পরমুহূর্তেই দেখি, চারজন পুলিশ এক যুবক ছেলেকে ধরে নিয়ে আসছে। প্রথম দিকে ভাবলাম, সে বোধহয় পুলিশের উর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা অথবা রাজনৈতিক পেশি শক্তিসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি বিশেষের আত্নীয়-টাত্নীয় হবে। পরে শুনি-সে একটা শিশুহন্তারক। প্রকাশ্যে দিবালোকে আট-নয় বছরের এক শিশুকে কুপিয়ে মেরেছে সে। উপস্থিত জনতা হাতেনাতে ধরে গণধোলাইয়ের পর পুলিশে সোপার্দ করেছে।

আমার পূর্বপাশের বেডটা খালি ছিলো। ওখানেই ঠাঁই হলো তার। সকালে বেডটা খালি হয়েছে। ছেলেটার চেহারা-সুরুত দেখে, সন্ত্রাস কিংবা হিংস্র প্রকৃতির মানুষ বলে মনে হলো না। গায়ের রং ফর্সা, শরীরে ভদ্র-শালীন ফ্যান্ট-শার্ট, উসখো-খুশকো চুল, শরীরের ক্ষত স্থানগুলো বেয়ে তিরতির করে রক্ত ঝরছে। রক্তমাখা জামার পকেটে কিছু কাগজপত্র ও উন্নতমানে একটা কলম। এতো পিটুনী খাওয়ার পরেও কলমটা কেমন শক্তভাবে লটকে আছে পকেটে। ঘাম ও রক্তের মিশ্রণে শরীরের জৌলস খুব সহজে ধরা পড়েছে না। বয়স সর্বসাকুল্যে ২৫-এর বেশি নয়। শারীরিক যন্ত্রণায় সে গোঙাচ্ছে। মোটামুটি আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ঢোকানো হলো। শুরু থেকেই ছেলেটার প্রতি সীমাহীন ঘৃণা জন্মেছে আমার। দেখতে ভালো হলেও সে একটা খুনী। একজন নিষ্পাপ শিশু যার হাতে নিরাপদ নয় সে পশুর চেয়ে অধম। একদলা থুতু তার দিকে মারতে ইচ্ছে করছে। ভাবছি, পুলিশ তাকে এতো তাড়াতাড়ি এখানে এনে ঠিক করেনি। গণধোলাইয়ে তাকে মেরে ফেলার পর ময়না তদন্তের জন্যে আনলেই বেশি খুশি হতাম। আর এই আপদ আমার রুমেই বা কেন!

বেশি তাজ্জব হলায় যখন দেখি, ডাক্তার-নার্স তড়িঘড়ি করে, আন্তরিকতার শরাব ঢেলে চিকিৎসা দিতে উঠে-পড়ে লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ লাগানো হলো। শরীরে পুশ করা হলো স্যালাইন। স্যালাইনে ভেতরে কয়েকটা শক্তিবর্ধক ইনজেকশন ঢুকিয়ে দেওয়ার পর সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। বোধহয় সংজ্ঞা হারিয়েছে। একটা খুনির জন্যে চিকিৎসকদের এতো দরদ উত্থলে ওঠার রহস্য আমি উদ্ঘাটন করতে পারিনি। বিরক্ত হলাম, ভালো একজন রুগির জন্যে এর অর্ধেক আন্তরিকতাও যদি দেখানো হতো রুগিরা সব এমনিতেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতো। একেই বলে সরকারি হাসপাতাল।

কখন যে সকাল হয়ে গেলো সঠিকভাবে বল মুশকিল। বিদ্যুতের কল্যাণে পুরো পৃথিবী এখন কৃত্রিম মনে হয়। কে জানে, কত বছর এই তল্লাটে প্রভাত-সূর্য অরুণিমা বা ছায়া ফেলেনি। স্থান-বৈষম্যের মধ্যও এখানে কি একটা পাখির কণ্ঠস্বর অনুমান করতে পারলাম। থেকে থেকে পাখির সুরটা ওঠা-নামা করায় ঠাহর করতে পারছি না, আওয়াজটা কোত্থেকে ভেসে আসছে এবং কোন ধরনের পাখির কলস্বর এটা।

বিস্মিত হলাম দেখে, পুলিশ কনস্টবল আসামি ছেলেটাকে যত্নসহকারে কলা-রুটি খাইয়ে দিচ্ছে। পানিটা পর্যন্ত খাইয়ে দিলো। দৃশ্যটা হতাশ করলো আমাকে। দরদ দেখিয়ে, শরীরে হাত বুলিয়ে পরমাত্মীয়ের মতো এতটা আপ্যায়ন শুধু নতুন বরের জন্যই প্রযোজ্য। শুধু কি তাই। তার পাহারাদার হিসেবেও হাসপাতালে রাত্রিযাপন করেছে সরকারের বেতনভুক্ত বাহিনীর একটা অংশ।
নাস্তা শেষে দুজন পুলিশের গায়ে ভর দিয়ে প্রাকৃতিক কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে বাথরুমের দিকে গেলো সে। একজন পুলিশ তখনও কেবিনে, সদ্য শেষ হওয়া নাস্তার এঁটো-ঝুটা বিছানা থেকে ঝেড়ে ফেলছে।

অনেকটা ভর্ৎসনার সুরে বললাম,
-‘কী ব্যাপার দাদা! খুনীকে এতো জামাই আদর করার মানে তো বুঝলাম না।’
-‘কী করবো ভাই, খুনী হোক আর ভালো মানুষ হোক-সেটা বিচার করবে আদালত। আমাদের কাজ তো আসামীকে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে আদালতে হাজির করা।’
তার অকুণ্ঠ জবাব আমার ক্ষোভের অনলে এক ঘটি জল ঢেলে দিলো। কথার মাঝেখানেই পুলিশদ্বয়ের কাঁধে ভর করে সর্ন্তপণে ছেলেটা কেবিনে ঢুকলো।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার দিকে বারকয়েক চোখ গেলো। রুমে ঢুকেই বিছানায় লুটিয়ে পড়লো। কিছুকাল বাদে উঠে বসলো। অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয় শরীরে প্রচুর যন্ত্রণা। পুলিশ সদস্যরা কেবিনের বাইরে খোলা জায়গায় অবস্থান করছে। কেবিনের ভেতরে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আমার দিকে সে কয়েক দফা চোখ ফেললো। কিছু বলবে বলবে মনে হচ্ছে। হয়তো আমার গম্ভীর ভাবসাবা দেখে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।

সকল নীরবতা ভেঙ্গে আমাকে লক্ষ করে হঠাৎ বলেই ফেললো-
‘স্যার আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। আপনার বাড়ি কোথায়?’
‘স্যার’ বলে সম্বোধন করায়, সৌজন্যভাব দেখানোর কারণেই হয়তো ইতস্তত কথা বললাম।
‘কেন? আমাকেও কি খুন করবে নাকি?’
বোধ হয় লজ্জা পেয়েছে। মাথা নীচু করে হাতের নখের গোড়ালিতে গজিয়ে উঠা বিরক্তিকর চামড়াগুলো টেনেহিচড়ে ছিঁড়তে শুরু করলো। তার শার্টের বোতামে তখন লেগে আছে নিষ্পাপ শিশুটির রক্তকনিকা-
‘আমি পেশাদার খুনী নই, নেশাদার খুনীও নই যে আপনাকে খুন করবো।’
তার কণ্ঠনিঃসৃত শব্দগুলো আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিলো। নাম জিঞ্জেস করলাম। সংক্ষিপ্ত জবাব এলো
‘নামটা তো আপনার সামনেই আছে।’
‘মানে?’ এদিক ওদিক লক্ষ করলাম। বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। তাই প্রসঙ্গ পাল্টালাম।

‘আচ্ছা ৮-৯ বছরের একটা অবুঝ শিশুকে খুন করলে তুমি একটু হাতও কাঁপেনি? কেন এমন করলে? কী অপরাধ ছিলো শিশুটার? কতো টাকা নিয়েছো খুনের বাবদ? যত টাকাই নাও না কেন, তুমি কি জানো কত বড় অন্যায় করেছো?’
‘জ্বি, জানি। তবে এই হত্যা দুঃখজনক হলেও প্রয়োজন ছিল।’
‘কেন?’
‘স্বজনহারা ব্যথা যে কতটা কঠিন তা বুঝিয়ে দেবার জন্যে।’
রহস্যঘেরা কথায় একটু আন্তরিক হয়ে ওঠলাম।
‘এই খুনের জন্যে তোমার কি শাস্তি হতে পারে জানো?’
ওপরে ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখাটা তখনও শব্দ করে ঘুরছে। ওই দিকটায় চোখজোড়া তাক করলো, মৃদু একটু হাসি ছুঁড়লো। নিজেকে একটু গোছিয়ে নিতে নড়ে-চড়ে বসলো। অত্যন্ত শীতলকণ্ঠে-
‘জানি, মৃত্যুদণ্ড।’

‘তোমার এই হত্যার নেপথ্য কারণটা কী, জানতে পারি?’
মুখটা ভার হয়ে গেলো।
‘শুনে কী লাভ হবে বলুন তো? ব্রাত্যশ্রেণির পুঁথিকাহিনি শুনে অযথা মন ভাঙার কী দরকার?’
কথার গন্ধটা আমাকে তার দিকে ঝুঁকিয়ে দিলো আরও।
‘তারপরও বলো, কেন তুমি এমন বোকার মতো কাণ্ড করে বসলে? লাভ লোকসানের প্রশ্ন না হয় বাদই দিলাম। তোমাকে দেখে তো মনে হয় না খারাপ ছেলে।’
স্বভাবতই একটু আবেগ ঢেলে দিয়ে,
‘আমার জীবনটা হচ্ছে সফোক্লিসের আন্তিগোনের মতো ট্র্যাজেডিপূর্ণ। শুনলে কেবল কষ্টই পাবেন।’

ছেলেটার কথার কসরত দেখে তার প্রতি পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়লাম। তার প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মাতে শুরু করলো।
‘সেটা না হয় বুঝলাম। আমার কাছে সমস্যা মনে না করলে বলতে পারো। প্রকাশ করলে কষ্ট লাঘব হয়।’

‘যখন সবই হারিয়ে ফেলেছি তখন একটা খুন না করলে আমি মুক্তি পেতাম না। প্রতিশোপরায়ণ হয়েই খুন করতে হয়েছে আমায়। জীবনে আমি যে কাউকে খুন করতে পারবো একদিন আগেও তা কল্পনা করিনি। এ খুনের বদৌলতে যদি আমার বোনের আত্মা শান্তি পায় তাহলে আমি বলবো আমি কোনো পাপ করিনি, অন্যায়ও করিনি। নিষ্পাপ শিশুহত্যা ঠিক হবে না জেনেও স্বজন হারানোর যন্ত্রণা বোঝাতে এমন কাজ আমাকে করতেই হলো। যার প্রতিপত্তির জোরে আমি নিঃস্ব হয়েছি তাকে একটু হলেও ঘা মেরে মুক্ত হতে পেরেছি এই আমার সান্ত্বনা। বাচ্চাটাকে যখন আমি জখম করি তখন তার শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া লাল রক্তের ছটা আমার গায়ে যে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে তা আমার বোনের চোখের পানির মতো বিশুদ্ধ মনে হয়েছিলো। এই খুনের পেছনে একমাত্র কারণ…’
এতটুকু বলেই আর এগোতে পারলো না। শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলো, প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় সে কঁকিয়ে ওঠলো। একটু নীরব থেকে বললো,- ‘এ ব্যাপারে অন্য সময়ে কথা হবে স্যার। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। বুকের পাঁজরগুলো ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম নিই। তবে এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকেন যে আমার উপর যে জুলুম করা হয়েছে তা একটি মাত্র খুন দিয়ে শোধ করা সম্ভব নয়। তারপরও আমি খুশি। আমি স্বীকার করি আমি খুনী, আবার আমিই বুক ফুলিয়ে বলছি আমি নির্দোষ! আজ আমার বলতে ইচ্ছে হয়, মাঝেমধ্যে খুন করলেও অপরাধ হয় না বরং পূণ্য হয়!’

বুকটা চেপে ধরে নিম্নস্বরে কটা কাঁশ ঝাড়তে ঝাড়তে সে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণের জন্যে কেবিনে নীরবতা নেমে এলো। দরজার সামনে খালি জায়গাটায় দুটি চেয়ারে গাদাগাদি করে তখনও বসে আছে দায়িত্বরত সরকারি বাহিনী। তাদের মুখেও রা নেই। কিছুকাল আগে একজন পুলিশ ফোন মারফত এখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতির তথ্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট পাচার করেছে। তারা দায়িত্ব পালনে সর্বদা বদ্ধপরিকর এমন প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছিল তখন। আন্দাজ করলাম, এরই ফাঁকে অচেনা অজানা মানুষজনও এখানে-সেখানে ঢুঁ মেরে মেরে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে। পুলিশদের পাশ কাটিয়ে ছেলেটার দিকে এক নজর চোখ বুলিয়ে আবার চলে যাচ্ছে। বোধহয় খুনী টাইপের লোক দেখার তৃষ্ণা থেকেই তাদের এই কৌতূহল।

আমিও কথা বাড়ালাম না। ভাবলাম বিকেলে ঠাণ্ডা পরিবেশে না হয় বিষয়টা নিয়ে আবার আলাপ করা যাবে।
বেলা সাড়ে এগারোটা। জৈষ্ঠের আম-পাকা গরমে শরীর চুইয়ে লবণপানি খসে পড়ছে। কিছুক্ষণ আগেও লোডশেডিংয়ের প্রকোপে ফুঁসে উঠেছিল জনজীবন। সে সমস্যার সমাধানও হয়েছে। কিন্তু বৈদ্যুতিক পাখা কোনো মতেই প্রশমিত করতে পারছে না জৈষ্ঠের দহনজ্বালা। মধুমাসে আম-কাঁঠানের ম ম গন্ধ দূরে ঠেলে আমরা জীবন্ত দুই প্রাণি পড়ে আছি দিকভ্রান্ত কোন মেরু অঞ্চলে। যেখানে কেবল রুক্ষ্মবালুচর, নেই তৃষ্ণা নিবারণের পবিত্র জল। জৈষ্ঠকে নিয়ে ছেলে বেলার কত কত মধুময় স্মৃতি যে মনের গুদামে জমা পড়ে আছে। বার কয়েক ডাকাডাকি করে অচেনা পাখিটিও এতক্ষণে কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

মৃদুলয়ে জানালা সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাতাসের ঝাপটা বেশ কায়দা করে শরীরের ওপর লাফিয়ে পড়ল। খারাপ লাগছে না। গ্রীলের ছোট ছোট ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায় শহরময় ঝাঁঝালো রোদের বর্ণিল ফানুস। রাস্তাজুড়ে গাড়ি ও মানুষের গিজগিজানী, কোনটা যে জড় কোনো যে জীবন, ঠাওরানো কঠিন।
অদূরেই ছোট্ট একটি গাছ। পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক তারের ওপর ঝাঁক বেঁধে নামছে শত শত কাক। ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত, তবুও তারা স্বাধীন, শঙ্কাহীন। পুরো শহর এখন আজব কংক্রিটের কাছে নতজানু।

বিছানায় নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে ছেলেটি। বোধ করি, শরীরের ব্যথাটা আগের চেয়ে বেড়েছে।
হঠাৎ একজন পুলিশ অফিসার এসে দায়িত্বরতদের নির্দেশ দিলেন তাকে গাড়িতে তুলতে। ডাক্তারের সাথে সব কথা বলেই এসেছেন তিনি। দুপুরের দিকে তাকে আদালতে তোলা হবে। ছেলেটির চেহারায় ভয় কিংবা উদ্বেগের চিহ্নমাত্র দেখলাম না। পুলিশ সদস্যরা তাকে হাতকড়া পরিয়ে তল্পি-তল্পা গোছিয়ে নিলো।
ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর পর আলগোছে সামনের দিকে পা বাড়ালো সে। আমি বিমূর্ত, তাকিয়ে থাকি। জীবনের প্রথম সে কাঠগড়ায় উঠবে। চলার গতিতে সেই ছাপ নেই। আমার দিকে একবার তাকিয়ে কৃত্রিম একটা হাসি ছড়িয়ে দিলো, বললো-
‘স্যার, পৃথিবীতে আমাদের আর দেখা হবে না কখনও। আমি নিশ্চিত আমার ফাঁসি হবে। এটা ঠেকানোর কারো সাধ্য নাই। অনুরোধ রইলো, কেউ যদি নাও আসে যেখানেই থাকেন আপনি অন্তত আমার জানাজায় আসবেন। আপনি ছাড়া পৃথিবীতে কেউ আমার দুঃখ শুনতে চায়নি। আর হ্যাঁ, আপনার সামনের ওই যে বইটা দেখছেন, ওটা আমিই লিখেছি। ফ্ল্যাপে আমার নাম ঠিকানা দেয়া আছে…’
আমি রীতিমতো বিস্মিত। উদ্ভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। অগ্নিকিশোর ক্ষুদিরাম বোধহয় এমনই কোমল আর একরোখা ছিলেন। অজানা একটা বাতাসের ঝাপটায় মনটা বিষণ্ন হয়ে পড়লো। সরল-ভদ্র আর মেধাবী এই নব্য-সন্ত্রাসীর রায় আমার চোখের সামনে ভাসছে। ভারাক্রান্ত চোখজোড়া পড়লো অগোছালো বিছানায় মৃত-যুবকের মতো পড়ে থাকা দুদিনের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী গল্পের বইয়ের দিকে। মনের অজান্তেই বইটা হাতে তুলে নিলাম। পরপর কয়েকটি পাতা উল্টালাম। ফ্ল্যাপ খুললাম। কী আর্শ্চয। আজন্ম পরিচিত বাংলা হরফগুলিও যেন মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেলাম। পুরো বইটিই যেন সফেদ কাফনে পরিণত হয়ে গেলো।

পরক্ষণেই একটা কোমল হাত এসে আমার কাঁধে পড়ল। চকিত ঘাড় ফিরালাম, আমার সম্বিত ফিরলো। সামনে দাঁড়িয়ে হেসে ওঠলো চিরচেনা একটি মুখ। অসীম বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে জিগ্যেস করলাম,
‘সায়লা, তুমি? কীভাবে পেলে আমার খবর।’
মাথার বেপরোয়া কাপড়টা ঠিক করতে করতে সায়লা জবাব দেয়।
‘কয়দিন ধইরা ঘরের পিছনের কড়ি গাছটাতে কাউয়ার চিল্লাচিল্লি হুইন্নাই সন্দহ লাগছিলো তুমি ভালা নাই। হেল্লিগাই…’
পৃথিবীতে এই একটি নারীর কাছে আমি আমার সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে কোনোদিন কুণ্ঠাবোধ করিনি।