রন্তির দেশ ॥ সাত্যকি হালদার




রন্তি বলেছিল, ওদের দেশে নাকি বছরে এক বার করে নৌকো ঠাকুরের পুজো হয়। শীত কালের শেষ দিকে পড়ে সেই পুজো। তখন ওকে তিন দিনের জন্য ছেড়ে দিতে হবে। দুর্গাপুজো বা কালিপুজোয় তেমন ছুটি চাই না ওর।
কথাগুলো পীযুষকে বলেনি ও। পীযুষের সঙ্গে কথা হওয়ার সুযোগও তেমন নেই। যা বলার ও বলেছিল সুপর্ণাকে। সকাল সাতটা নাগাদ ফ্ল্যাটে আসে রন্তি। ঢুকে থেকে প্রায় ঝড়ের বেগে টানা দেড় ঘন্টা কাজ করে যায়। সুপর্ণাদের ফ্ল্যাটে রান্নার কাজ ওর। প্রথম আধ ঘন্টায় সকালের চা জলখাবার। মাঝে সবজি কাটে, মাছ ধোয়, রান্নার জিনিসপত্র গোছায়। শেষে এক টানা রান্না। ওর কাজের মাঝে সুপর্ণা কিচেনে আসে যায়। টুকটাক কথা হয়, কথা জুড়ে গল্প, সুপর্ণা কখনও রান্নার নির্দেশ দেয়। কখনও আবার বলে, গ্যাসটা এক বারে অতখানি বাড়িয়ে দিও না রন্তি। তোমার হয়ত সময় বাঁচে, কিন্তু তেল গ্যাস দুইই বেশি লাগে আর মাছ পোড়াটে হয়ে যায়।

রন্তি প্রতিবাদ করে না সে সব কথায়। ও বরং নির্দেশ শোনে। গ্যাস কমিয়ে দেয়। বলে, বুঝলেন বউদি ছেলেটাকে নিয়ে পড়েছি ঝামেলায়। সন্ধ্যেবেলা পাশে আমি না থাকলে পড়তে বসবে না। আবার ছুটির দিনেও সঙ্গে না থাকলে মুশকিল।
সুপর্ণা অনেক সময়ই শুধু মাত্র শ্রোতা। রন্তি নিজের ছেলে, সংসার, বরের অটো ড্রাইভারি, এ সব নিয়ে নানা কথা বলে যায়। সুন্দরবনে যেদিকে ওরা এক সময় পাকাপাকি ভাবে থাকত সেই দুলদুলি আর নেয়ামতপুর গ্রামের কথা বলে। ওদের গ্রাম থেকে আরও যারা এয়ারপোর্টের আশেপাশে বাগুইআটি বা কেষ্টপুরে কাজে চলে এসেছে তাদের কথাও। সুপর্ণা নিজস্ব কাজকর্মের ভেতর শুনে যায়। ছোট প্রশ্ন করে এক দু বার।

সুপর্ণা এক বার জানতে চাইল, নৌকো ঠাকুরের পুজো কেমন রন্তি? নৌকোকে সাজিয়ে পুজো করা হয়?
রন্তি আদা ছাড়াতে ছাড়াতে বলেছিল, ঠাকুর পুজোর তিথি আছে ও দিকে। সারা সুন্দরবনের মানুষ সেই তিথি জানে। এ দিকে যখন পৌষ সংক্রান্তি আর পিঠে পাবন, কাছাকাছি সময়ে নৌকো পুজোর দিন পড়ে ও দেশে।
তারপর রন্তি মাথা নামিয়ে আরও কীসের খোসা ছাড়াচ্ছিল আর বলছিল নানা কথা। সুপর্ণা কিচেনে আছে কি নেই দেখেনি। ও বলে, পুজোর দিন যখন আসে দক্ষিণের মানুষ তখন একজনও পড়ে থাকে না এ দিকে। এই আপনাদের নিউটাউন বলেন আর সল্টলেক বা বাইপাস, যেখানে যত জনা আছে সব চলে যাবে ধর্মতলায়, ধামাখালি বা রায়চকের বাস ধরবে বলে। নতুবা শিয়ালদা টেশান। হয় ক্যানিং বা নামখানা, নয় হাসনাবাদ লোকাল।

সুপর্ণাদের ফ্ল্যাটে কাজে আসার আগে সকালে রন্তি আরও দুটো কাজ করে। হলদিরামের কাছটায় মারোয়াড়ি বুড়ো-বুড়ির ফ্ল্যাট। সাত সকালে তাদের ঘর গুছিয়ে বাসন মেজে দিয়ে আসে। তারপর সিটি-সেন্টার নামে নিউটাউনে নতুন যে মাল্টিপ্লেক্সটা হয়েছে তাতে সোয়াব্ দেয় দু তিনটে দোকানে। তারপর সুপর্ণাদের ফ্ল্যাটে কাজ। প্রথম দুটো কাজে রন্তি কথা বলার সময় বা বিষয় কোনওটাই পায় না। জোড়াতালির হিন্দিতে কাজ চালায় বুড়ো-বুড়ির সঙ্গে। এটা-ওটা কাজের কথাই হয়। দোকান পরিষ্কারের কাজে কথা বলার মানুষই নেই। সিকিওরিটির লোক চাবি খুলে দিয়ে যায়। রন্তি ব্যস্ততার সঙ্গে সোয়াব্ চালায়। কাজ শেষ হলে আবার আসে সিকিওরিটি, শাটার টেনে নামিয়ে দিয়ে যায়।
রন্তি বলল, নৌকো ঠাকুরের পুজোর দিন সকালে যদি নেয়ামতপুরের ঘাটে দাঁড়ান তো মাথা ঘুরে যাবে বউদি। চারপাশে শুধু নৌকো আর নৌকো। কত রকমে আর কত কায়দার যে নৌকো তা না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। দূরের আর ভেতরের যত বাদাবন আর জঙ্গল, গায়ে গায়ে গ্রাম, সে সব থেকে আসবে সবাই।

সুপর্ণা সুন্দরবনে গেছে এক বারই। বছর দুয়েক আগের এক শীত কালে। লঞ্চে বাবুঘাট হয়ে। লঞ্চ ছেড়েছিল কোনও এক শুক্রবারে। সেদিন রাতেই পৌঁছে গিয়েছিল পাখিরালয়। শনিবারেও নদীর মাঝখানে লঞ্চে রাত্রিবাস। রবিবার ফিরেছিল।
ওদের সেই ভ্রমণ অবশ্য অন্য রকমের এক বেড়ানো। লঞ্চ তো নয়, বলতে গেলে বিলাসবহুল ভাসমান এক হোটেল ওদের নিয়ে গিয়েছিল সুন্দরবনে। পীযুষের অফিস থেকে করা হয়েছিল ট্যুরটা। যত জন গিয়েছিল সকলেরই মন ছিল কুমির হরিণ বাঘ দেখার চেষ্টায়। আর মোবাইলে এটা-ওটা ছবি তোলা, সে ছবি পাঠানোয়। সুন্দরবনের ভেতরে যে গ্রাম আছে, সে সব গ্রামে লোক থাকে, সুপর্ণাদের সুন্দরবন বেড়ানোতে তেমন প্রায় বোঝাই যায়নি।

সুপর্ণা বলল, নৌকা ঠাকুর দেখতে কেমন? নৌকায় বসানো এক দেবতা নাকি?
রন্তি উৎসাহ পায়। বলে, নৌকো ঠাকুরের নৌকো নেই গো বউদি। মূর্তিও নেই। রয়েছে পাড়ের উপরে এক মস্ত গরান গাছ। গরান কাঠেই তো নৌকো হয় ও দেশে। তাই পুজো বলতে ওই গরান গাছের পুজো। তার গোড়ায় সবাই নৈবেদ্য চড়ায়, দুধ ঢালে, আবার পরের বারের জন্য মানতও করে যায়।
তারপর রন্তি বলে, আর পুজো দেন নেয়ামতপুরের যিনি পির-ঠাকুর তিনি নিজে। সেদিন কোনও কথা বলেন না তিনি। সেদিন তেনার ভর। বসে বসে তিনি শুধু একেক জায়গার কথা বলে যান। কখনও বলেন ঝড়খালি বা নদীর ও দিকে জলপাইবার মসজিদের কথা।
এ ভাবে কথার মধ্যে এক-এক দিন কাজ শেষ হয়ে যায় রন্তির। কাজ ফুরোয় কিন্তু গল্প অসমাপ্ত রয়ে যায়। নৌকো যেসব জায়গা থেকে আসে সেই গ্রামের কথা হয় একটু একটু। পির-ঠাকুরের কথা হয়।
রন্তি এক বার বলে, তবে এই বার বউদি আমাদের আড়াই কেজি দুধের মানত। সকাল সকাল যাব। নৌকো ঠাকুরের পা ধুইয়ে দিয়ে আসব।

সুপর্ণা বলে, তার মানে ক-দিনের ছুটি নিতে চাও? শীতের ওই সময় আমাদেরও তো এখানে ওখানে যাওয়া থাকে।
রন্তি বলে, সে আপনি আমারে ছাড়বেন তিন দিন। তাতেই হয়ে যাবে। দু দিনে যাওয়া, পুজো, পর দিন ফেরা, সব কমপিলিট।
রন্তির ইংরেজি শব্দের ব্যবহার আছে নানা রকম। শহরের ফ্ল্যাটে কাজ করছে দশ বছর। ইংরেজি শব্দ মাঝেমাঝে আসে-যায়।
ও বলে, আমাদের ছিল অটোর মানত। খোকার বাপ তো জানেন অটো চালায় এক নম্বর থেকে দমদম গোরাবাজারের রুটে। মালিকের গাড়ি। তবে মালিক হলেও লোক ভালো। কিন্তু ওই… ডিজেল অটো দিচ্ছিল না হাতে। পেট্রোলের গাড়িতে ড্রাইভারের পরতা কম। আমরা তাই নৌকো ঠাকুরের কাছে ডিজেল অটোর মানত করেছিলাম।
ডিজেল অটো হল? সুপর্ণা প্রশ্ন রেখে কিচেন থেকে চলে যায়।

রন্তি আলুর খোসা ছাড়িয়ে আলু ধোয়। কড়াই চাপিয়ে গ্যাসের চাবি ঘোরায়। সঙ্গে কথা চলে তার। বলে, গত মাসে মালিক নিজেই ডেকে বলল, এই নাও তোতন ডিজেল গাড়ির চাবি। একজন ছেড়ে দিল। আমার এ অটোটা এখন তুমিই চালাও। …বাড়ি ফিরে ও আমারে বলল। আমাদের তখন কী অবস্থা। আনন্দ পাব কী… দুই জনায়ই কেঁদে ফেললাম। তখন দেখি ছেলেটাও কাঁদছে। এই না হলে নৌকো ঠাকুর! বলেন…
বলার জন্য কেউ অবশ্য ঘরে নেই। রন্তি তখন তেলে পেঁয়াজ-আদা বাটা দেয়। ঝাঁঝ ওঠে। সেই ঝাঁঝে অথবা ডিজেল অটোর কথায় রন্তির আবারও চোখে জল আসে।