রাজপুত্তুর ॥ সাইফুল ইসলাম


একালের ছেলেমেয়েদের মনে কী যে বাসা বাঁধে তা বুঝতে পারেন না ফয়জুনন্নেসা; নাতিনাতনিদের প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যান, আবার ফিরিয়ে আনেন, বাবা-মা’কে তো সারাদিন পায়ই না ওরা; সারাদিন খুনসুঁটি, বায়না-আবদার সব তো তার কাছেই, তবুও ওদের বুঝতে পারেন না তিনি। এই বুঝতে না পারায় নিজেকে মনে হয় দুর্ভাগা, বন্ধুহীন, অসহায়। তবে, তাদের কালের ছোটবেলাকে বুঝতে পারেন তিনি। সেকালে মেয়েদের মনে বাসা বাঁধতো কোনও না কোনও রাজপুত্তুর, যেমন তার মনেও বাসা বেঁধে আছে এক রাজপুত্তুর সেই ছোটবেলা থেকে। সে তাকে ভীষণ কষ্ট দেয় এই ছাপ্পান্ন বছর বয়সেও, শিশুর মতো অভিমান করতে শেখায়, আবার শেখায় অপেক্ষা করতে। তখন নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, নিশ্চয়ই কোনও বিপদ হয়েছে রাজপুত্তুরের, কোনও বামুন রাক্ষস তাকে আটকে রেখেছে বন্দীশালায়, অথবা যাদুবুড়ি মায়াজাল বিছিয়ে ঘোরের মধ্যে রেখেছে কোনও মোমের প্রাসাদে। নইলে আসবে না কেন তার রাজপুত্তুর! এ গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার সময় তার টলটলে জল ভরা চোখ তো বলেনি এমন কথা।

ফয়জুন্নেসার বাবা জাবেদ ডাক্তারকে চেনেন না এমন মানুষ এ তল্লাটে নেই, আর পেঁচিবাড়ির ‘ডাক্তার সাব’ বললে তো পঞ্চাশ গ্রামের মানুষই চেনে। বাবা ঘোড়ায় চড়ে রোগীবাড়ি যেত, সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো বাবার লাফ দিয়ে ঘোড়ায় ওঠা, তারপর সে ঘোড়া ছুটিয়ে টগবগ টগবগ করে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। মা এক জোড়া চটি স্যান্ডেল পড়ে সংসার করতেন। মায়ের সে স্যান্ডেল পড়ে সে-ও কখনো কখনো উঠোনের মধ্যে ঘুর ঘুর করতো, এ নিয়ে কত্ত যে বকুনি খেয়েছে মায়ের, তার কোনও ইয়াত্তা নেই। তবে সে ছিল দাদীর নেওটা, সব সময় তার পিছে পিছে থাকতো, আর তার কাছে রূপকথা, রাক্ষসখোক্কসের গল্প শুনতো। রাজপুত্তরদের বিপদ-আপদ, সৌম্যকান্তি চেহারা, সব তার নখদর্পণে।

কতই বা বয়স তখন ফয়জুনের? সাত সাড়ে সাত? সে সময়েই দেশে লেগে গেল হিড়িক, গণ্ডগোল, যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। রোগশোকও যেন কমে গেল। বড় বিপদে পড়লে মানুষ যেমন ছোট ছোট বিপদ ভুলে যায়, তেমনি ভুলে গেল রোগশোক। সবার মধ্যেই ভয়, কখন পাক-সেনা এসে বাড়িঘরে আগুন দেয়, বাঙালিদের হত্যা করে। এ সময়গুলোতে যেন একঘরে হয়ে পড়লো ফয়জুন আর দাদী। তাদের অকারণ ঘুর ঘুর করা বারণ। বাড়ির পাশের আড়ার মধ্যে খোঁড়া হলো বাঙ্কার। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই যে, এখানে শিয়ালের মতো গর্ত করে মানুষ লুকিয়ে থাকে। সেখানেই চাটাই-শপ পেতে নিল, কাঁথা-বালিশও নিয়ে আসা হলো। ফয়জুন তার খেলনাপাতি নিয়ে এলো সেখানে, সঙ্গে দাদীও। ফয়জুন আর দাদী প্রায় সারাদিনই এখানেই থাকে। বাড়ির সবাই সেখানে আসে গ্রামে ‘আইলো রে’ শোর উঠলে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষও যুদ্ধটা বুঝে উঠতে শুরু করে, তখন কমে যেতে থাকে ভয়। কিভাবে পাক-সেনা আর রাজাকারদের হাত থেকে বেঁচে থাকা যায় তা-ও বুঝে যায় সবাই। কখনো স্বাধীনতা বিরোধীদের আদাব-সালাম দিয়ে, কখনো বা বোকার হাসি হেসে না বোঝার ভান করে টিকে থাকার লড়াই করতে লাগলো। এ সময় কিছু ছাত্র-তরুণ- যাদের পরিচয় মুক্তিযোদ্ধা- গোপনে আসতে থাকে তারা। তারা কখন আসতো আর কখন যেত তা টেরই পেত না ফয়জুন আর দাদী।

গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আসতো ভোর রাতে, কেউ জানতেও পারতো না। গৃহস্থ বাড়ির ভেতরের ঘরে তাদের লুকিয়ে রাখা হতো, কেউ দেখে ফেলে এই ভয়ে বেরই হতো না তারা ঘর থেকে। সন্ধ্যার পরে খাওয়াদাওয়া সেরে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত মুক্তিযোদ্ধারা, বাড়িরই অনেকেই তা জানতোও না। তারা চলে যেত অন্য কোনও গোপন আশ্রয়ে বা হামলা চালাতো স্বাধীনতা বিরোধী কারো বাড়ি বা ব্রিজ-কালভার্ট পাহারায় থাকা রাজাকাদের ওপরে। এ সময়ে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াতো শান্তি কমিটির নেতা ও রাজাকারেরা। সে দাপটে অস্থির থাকতো সাধারণ মানুষ। কখনো কখনো পাকবাহিনীকে নিয়ে এসে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিত, লোকজনকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করতো।

ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ফলে ঘুরতে শুরু করে যুদ্ধের মোড়। শান্তি কমিটির যে নেতাকে মানুষ ভয়ে আদাব-সালাম দিয়ে চলতো, সে নিজেই ভয়ে চলে গেল শহরে। আওয়ামী লীগ না হয় হিন্দু কারো বাড়ি দখলে নিয়ে সেখানেই বাসাবাড়ি করে নিল। পাহারায় বসালো রাজাকারদের। আর পাকসেনা ক্যাম্প তো আছেই শহরে। কখনো গ্রামে এলে এক দঙ্গল রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে আসে, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই চলে যায় শহরে। মুক্তিযোদ্ধারাও তক্কে তক্কে থাকে, সুযোগ পেলেই হামলা চালায় তাদের ওপরে। এভাবেই ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা বের হতে থাকে দিনেও বেলায়ও।

শান্তি কমিটি, রাজাকার আর পাকসেনারা ব্রিজ-কালভার্টগুলোতে শক্ত পাহারা বসায়, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যাম্প করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারাও কম যায় না, তারা হামলা চালাতে শুরু করে পাকসেনা ও তার দালালদের ওপরে। সে সব যুদ্ধে কেউ কেউ শহীদ হন, আহত হন কোনও কোনও মুক্তিযোদ্ধা। শহীদদের কবর দেওয়া হলেও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা হবে কোথায়? মুক্তিযোদ্ধারা খোঁজেন পেঁচিবাড়ির ডাক্তারকে, আবারো ঘোড়ায় ওঠেন তিনি, বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেন, আর যাদের একটু দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসার দরকার তাদের নিয়ে আসেন নিজ বাড়িতে, যাতে তাদের সব সময় সেবা দিতে পারেন। আর এ ভাবেই জাবেদ ডাক্তারের বাড়ি হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতাল।

গ্রামাঞ্চলে রাজাকারদের দাপট কমে যাওয়ায় দাদী আর ফয়জুনও চলে আসেন বাঙ্কার ছেড়ে। দাদীর তেমন কোনও কাজ নেই, মাঝে মধ্যে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পানি খাওয়ানো আর তাদের সাথে গল্প করা ছাড়া। ফয়জুন আগের মতোই দাদীর পিছে ঘুর ঘুর করে আর গল্প শোনে। ফয়জুনের সব গল্প ভালো লাগে না শুধু যুদ্ধের গল্প ছাড়া, তবুও দাদীর সাথে সাথে থাকে সে।
জাবেদ ডাক্তারের মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালে আসে আহত শহীদুল ইসলাম। শৈলাবাড়ি যুদ্ধে আহত হয়েছে সে। দুটি বাঁশের লাঠিতে চাদর বেঁধে স্ট্রেচার বানিয়ে বয়ে আনা হয় তাকে। তাদের গ্রুপের সাইদ আর জয়নাল নামের দুই মুক্তিযোদ্ধা তাকে বয়ে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ওরা চলে যায় যুদ্ধক্ষেত্রে, কারণ যুদ্ধ তখনো চলছে। ব্যথায় ছটফট করছে আহত শহীদ। জাবেদ ডাক্তার তাকে দেখে, কাঁধে গুলি লেগে ক্ষত হয়েছে। ভাগ্য ভালো যে, গুলিটা আর তিন আঙ্গুল নিচ দিয়ে যায়নি, তাহলেই অক্কা পেতে হতো তাকে। ডাক্তার সাব একটি ইনজেকশন দেন। ছটফটানি কমে অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। শহীদের ক্ষতস্থান ডেটল দিয়ে পরিস্কার করেন, যত্ন করে শুইয়ে দেন বিছানায়। আহত মুক্তিযোদ্ধার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখে ফয়জুন, তার মা আর দাদী।

-মা এখানে একটু বসো, একটা ইনজেশন দিয়েছি ঘুমের। ঘুমাক, জাগলে আমাকে ডেকে দিও। জাবেদ ডাক্তার আর তার স্ত্রী চলে যান, দুটো মোড়া পেতে বসে থাকেন দাদী আর ফয়জুন।
কতই বা বয়স আহত এ মুক্তিযোদ্ধার, বড় জোর সতের! মুখে দাড়িগোঁফের অস্পষ্ট রেখা, চেহারায় লাবণ্য। তাকে দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে ফয়জুন। পাশেই একটা বিছানায় তাকে শুইয়ে দেয় দাদী। যখন ফয়জুনের ঘুম ভাঙ্গে তখন সকাল। দাদী আর মুক্তিযোদ্ধা গল্প করছে। ফয়জুন এসে দাদীর পাশে বসতে নিলেও সে ধমক দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আসতে বলে। সে-ও তুর তুর করে চলে যায় বাইরে।
-আপনার নাতনিটা বেশ সুন্দর, পুতুল পুতুল ভাব। বলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল।
-থপ থপ করে হাঁটে তো, তাই ওকে কেউ কেউ পুতুল বলেও ডাকে।
-তাই নাকি! কই আমিতো ওর থপ থপ করে হাঁটা দেখলাম না, কত্ত সুন্দর ছন্দ তুলে হেঁটে গেল।
দাদী আর শহীদ দুজনেই হেসে ওঠে এক সাথে।
শহীদ বলে- আপনার নাতনিকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবো।
-তুমি কি কবিতা লিখতে পারো?
-হ্যাঁ, আমার কবিতা তো স্কুল কলেজের ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। লজ্জা পেলেও নিজের কবিতার কথা দাদীকে জানাতে ভালো লাগে শহীদের।
– যুদ্ধের মধ্যে যখন কাজ থাকে না তখন মানুষের সাথে গল্প করি না হয় কবিতা লিখি।

ফয়জুনের মা সকালে শহীদের খাওয়ার জন্য ভাত আর তরকারি নিয়ে আসে, পিছে পিছে জগ ভরে পানি নিয়ে আসে ফয়জুন। পানি রেখে সে বসে দাদীর পাশে। দাদী একটি গামছা শহীদের সামনে পেতে দেয়। সে গামছার ওপর ভাতের থালা রাখে মা। শহীদ হাত ধুয়ে খেতে বসে। খেতে খেতে সে ফয়জুনকে জিজ্ঞেস করে- কী নাম রাজকন্যার?
ফয়জুন প্রশ্ন শুনে লজ্জায় দাদীর বুকে মুখ লুকায়।
-বল বল, তোকে নিয়ে কবিতা লিখবেন উনি। কবিতা বোঝে না ফয়জুন, তবুও লজ্জায় পেয়ে দাদীকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কোনও কথা বলে না সে।
দুদিন কেটে যায়। এর মধ্যে দুতিনবার শহীদকে দেখে গেছে জাবেদ ডাক্তার। ব্যথা কমানোর যে ইনজেকশন দিয়েছিল তারপর আর তেমন চিকিৎসা নেই। তবে ক্ষত স্থান নিয়মিত পরিস্কার করে দিচ্ছেন তিনি। আর ব্যথা বাড়লে ট্যাবলেট খেতে দিচ্ছেন। যুদ্ধের খবর এনে দিচ্ছেন ডাক্তার সাহেবই। তিনি জানিয়েছেন, শৈলাবাড়ি ক্যাম্প থেকে পাকসেনারা জড় হয়েছে শহরের কালীবাড়িতে। মুক্তিযোদ্ধারা শহরতলীতে অবস্থান নিয়ে কায়দা খুঁজছে ওদের আক্রমণ করার।

সেদিন সকালের শহীদকে দেখে কাচারিঘরে গিয়ে বসেছেন ডাক্তার সাব। খবর শুনতে অনেকেই এসেছে ডাক্তার সাবের কাচারিঘরে। সবাই বুঝতে পারছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। যারা কম আহত, একটু হাঁটাচলা করতে পারছে, তারা হাটখোলা পর্যন্ত যাচ্ছে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে। সময় কাটে না শহীদের। ভাগ্য ভালো, দাদী সব সময় কাছে কাছে থাকেন। তার সাথে গল্প করে সময় বয়ে যায়। ফয়জুনের সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে শহীদ, কিন্তু একটি কথাও বলে না সে। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই লজ্জায় নুয়ে যায়, মুখ লুকায় দাদীর আঁচলে। আবার দাদীর সাথে গল্প করার সময় তা শোনে হা-করে। হঠাৎ শহীদ দেখে, সড়ক থেকে ডাক্তার সাবের বাড়ির দিকে নেমে আসছে একটা ঘোড়াগাড়ি, তাতে বসে আছে মুক্তিযোদ্ধা সাইদ আর জয়নাল। বেশ খুশি খুশি ভাব তাদের। ওরা কাচারিঘরের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামে। ডাক্তার সাবকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে চলে আসে ওরা। ঘরে ঢুকেই জড়িয়ে ধরে শহীদকে।
বলে- কালরাতেই ভেগে গেছে পাকসেনারা, শহর এখন মুক্ত। কমান্ডার বললো, তোকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে।
-আমিও তাই বলেছি, ওখানে বড় ডাক্তার, ওষুধও পাওয়া যাবে। বলেন জাবেদ ডাক্তার।
-এখনই যাবে? খাওয়া দাওয়া করে গেলে হতো না? জিজ্ঞেস করেন ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী।
-যাক, ওর সঙ্গীসাথীরা সবাই আছে ওখানে, সবাইকে পেয়ে মুক্ত পরিবেশে ওরও ভালো লাগবে।

শহীদুল কাপড়চোপড় যা তা তো পরনেই আছে, আর গামছাটা মাজার সঙ্গে বেঁধে নেয়। বিছানা থেকে নামে। দাদী আর ফয়জুনের মাকে কদমবুচি করে। ফয়জুনের বাবড়ি চুলে নাড়া দিয়ে বলে, যাই গো রাজকন্যা। তারপর সাইদ আর জয়নারের কাঁধে হাত রেখে ঘরের বাইরে বের হয়। পরিবারের ওরাও পিছে পিছে বেরিয়ে আসে কাচারিঘরের সামনে। সাইদ আর জয়নাল ধরাধরি করে গাড়িতে তোলে শহীদকে। দাদী আর মায়ের দিকে তাকাতে পারে না শহীদুল। চোখ পড়ে ফয়জুনের চোখে, ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠোট কাঁপছে, এক সময় ফয়জুনের মুখ ফসকে বেড়িয়ে আসে- আপনে আর আইসপেন না আমাগোর বাড়িত?
শহীদের মুখে কোনও কথা ফোটে না, শুধুই ঠোট কাঁপে তিরতির করে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া না দেওয়ার মাঝামাঝিই থেকে যায় সে।