লাল টিপ ॥ রাশেদ রহমান


আতুড়ঘরে ঠাঁই হওয়ার পর থেকেই স্বপ্নটি বন্যার ওপর জেঁকে বসেছে। কেবল রাতের ঘুমের মধ্যেই যে স্বপ্নটি সে দেখে তা নয়, দিনের বেলায়ও, একটু তন্দ্রার মতো এলেও একই স্বপ্ন দেখে বন্যা দাই। চোখে ঘুম কি তন্দ্রা ভর করলেই মানুষ স্বপ্ন দেখে কিনা, তাও আবার প্রতিদিনই একই স্বপ্ন; বন্যার তা জানা নাই। দিন সাতেক হলো বন্যা দাই আতুড়ঘরে উঠেছে; এর মধ্যে রাতে কি দিনে কতোবার যে সে স্বপ্নটি দেখেছে, দড়িতে গেরাে দিয়ে হিসাব রাখলে তা হয়তো একশ’ ছাড়িয়ে যেতো। বন্যা দাই সে-হিসাব রাখেনি। তবে চোখ বুজলেই একই স্বপ্ন ভর করে চোখে, আর একই স্বপ্ন দেখতে দেখতে বন্যা ভয়ে এবং দুশ্চিন্তায় ফাঁদে আটকা-পড়া ইঁদুরের মতো মুষড়ে পড়েছে…।

প্রথম দু’দিন, রাতে কি দিনে একই স্বপ্ন দেখার পরও বন্যা দাই স্বপ্নের এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। স্বপ্নের আয়ুষ্কালও ছিল খুব কম। জন্ম নিতে নিতেই মৃত্যু! ঘুম বা তন্দ্রা কেটে যাওয়ার পর বুঝতে পারতো তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কিন্তু স্বপ্নে সে কী দেখলো তা আর ঠিকঠাক মনে করতে পারতো না। আবছা আবছা মনে পড়তো- তাদের বাড়ির মাদি বিড়ালটা বাচ্চা দিয়েছে, বাচ্চাটাও মাদি, দেখতে খুব সুন্দর, শরীরে হলুদ-সাদা ডোরাকাটা সাজ, কিন্তু বিড়াল-ছানাটির কপালের মাঝ-বরাবর একটা বড়োসড়ো গর্তের মতো, যেন গুলির চিহ্ন…।

তৃতীয় দিন থেকেই স্বপ্নের আয়ুষ্কাল অল্প অল্প করে বাড়ছে। জন্ম নিতে-নিতেই সে আর মারা যায় না। বন্যা যেন সারারাত একই স্বপ্ন দেখে। ঘুম ভাঙার পর স্বপ্নটিকে আবছা আবছাও মনে হয় না। মনে হয় ঘুমের মধ্যে যা সে দেখেছে তা স্বপ্ন নয়, জীবন্ত ঘটনা; তার চোখের সামনে, টলটলে জলভরা পুকুরের মাঝখানে একগুচ্ছ কচুরিপানা যেভাবে ভাসে, স্বপ্নটি সেভাবেই যেন ভাসে…।
সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙার পর বন্যা টের পেলো- ভয়ে তার শরীর কাঁপছে। শীতের রাত, তারপরেও ঘামজলে চপচপ করছে শরীরের কাপড়। তাদের বাড়িতে কোনো মাদি-বিড়াল নাই, তবুও কেন সে এরকম স্বপ্ন দেখছে! সে নিজের পোয়াতি। সন্তান প্রসবের সময় হয়ে এসেছে। ব্যথা উঠতে পারে যে-কোনো মুহূর্তে। এই সময়ে এ-ধরনের স্বপ্ন দেখা কোনো বিপদ-সংকেত কিনা, কে জানে! বুকে ক্রসচিহ্ন আঁকে বন্যা দাই। মাকে স্বপ্নবৃত্তান্ত জানানো দরকার। স্বামীকেও ফোন করে জানাতে হবে…।

বাড়ির দক্ষিণ-দুয়ারি দোচালা ঘরটি বন্যার মা-বাবার। ঝুপড়ির মতো রান্নাঘরটি ছাড়া বাড়তি ঘর নাই বাড়িতে। এই ঘর ঘেঁষেই কামরাঙা গাছের নিচে মেয়ের জন্য ছনে-ছাওয়া আতুড়ঘর তুলেছে বন্যার মা ঝর্ণা দাই। বন্যার বাবা পঙ্গু। শয্যাশায়ী। তার কোনো ভাই নাই। বড়ো দুইবোন স্বামীর বাড়ি। বন্যার মাকেই সবকিছু সামাল দিতে হয়। এতোদিন বন্যা মা-বাবার ঘরেই থেকেছে। বন্যার মা খেজুরপাতার পাটি বানিয়ে দিয়েছিল। বন্যারা খৃস্ট ধর্মে দীক্ষিত হলেও কিছু কিছু হিন্দুরীতি এখনো মেনে চলে। তাতেই আতুড়ঘরের ব্যবস্থা…।

বন্যা প্রথমবার পোয়াতি হয়েছে। প্রথম সন্তান প্রসবের সময়, পোয়াতিরা মায়ের কাছে থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। সন্তানের জন্ম দেয়া- এ তো এক নতুন অভিজ্ঞতা। নিদারুণ যন্ত্রণাও ভোগ করতে হয়। প্রসবব্যথা যে কতোটা ভয়াবহ, তা তো শুধু ওই নারীই জানে, যে কিনা সন্তান জন্ম দিয়েছে। প্রসবের সময় হয়ে এলে, গর্ভস্থ সন্তান যখন পৃথিবী দেখার জন্য পোয়াতির গর্ভের ভেতর গুঁতোগুঁতি শুরু করে, তখনই পোয়াতির মনে মৃত্যুভয় জেঁকে বসে। ভীতবিহ্বল পোয়াতি তখন মায়ের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে চায়। বন্যাও তিনমাস আগে থেকেই পীড়াপীড়ি শুরু করেছিল- মায়ের কাছে যাবে। বন্যার স্বামী বকুল দাই, তার শ্বশুর-শাশুড়ি শুরুতে রাজি ছিল না, এতো আগেই বউ কেন বাবার বাড়ি যাবে? তারা নিজেরা গরিব, পোয়াতি বউয়ের তেমন যত্নআত্তি করতে পারে না, কিন্তু বন্যার মা-বাবা যে আরও গরিব। কোনো বিপদ-আপদ হলে, আর পোয়াতি বউদের তো বিপদ লেগেই থাকে; তখন কী দিয়ে কী করবে তারা! বন্যার বাবা পঙ্গু মানুষ, বিপদ হলে ছোটাছুটিই বা করবে কে? কিন্তু বন্যার চোখের জলের কাছে বাড়ির সবাইকে হার মানতে হয়। মায়ের কাছে যাওয়ার অনুমতি মেলে বন্যার। ধীরগঞ্জ থেকে সে ধনুচেংঠি চলে আসে…।

পৌষের রাত। বৃষ্টির মতো শিশির পড়ে আতুড়ঘরের চালে। কিন্তু ছনে-ছাওয়া চাল তো, নিঃশব্দ পতন। ঘরের চালে কিংবা বাইরে কোনো শব্দ নাই। বন্যা অনুমান করতে পারে না, রাত কতো? তার স্বপ্নের ঘোর তখনো কাটেনি। চোখের সামনে ভাসছে সদ্য-ভূমিষ্ঠ মাদি-বিড়ালের ছানা। ছানার কপালে জ্বলজ্বল করছে একটা গর্ত, যেন কপালে গুলি লেগেছিল; পেছনে গর্ত রেখে বুলেট বেরিয়ে গেছে…!

আতুড়ঘরের দরজা খোলে বন্যা। মাকে ডাক দেবে। স্বপ্নবৃত্তান্ত তাকে না-জানানো পর্যন্ত স্বস্তি নাই। স্বপ্নটা ক্রমশ তার গলা টিপে ধরছে। এই আপদ ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে না-পারলে সে দমবন্ধ হয়ে মারা যাবে। সন্তানের মুখ আর দেখা হবে না…।
কিন্তু মাকে ডাকতে হয় না বন্যার। উঠোনে পা রাখতেই বন্যা দেখে কুপি হাতে ঘর থেকে বেরুচ্ছে মা…।
-কী রে মা, ঘুমাস নি! বাইরে যাবি…?
– না, মা…।
– তবে এই শীতের মধ্যে ঘরের বাইরে কেনো মা…?
– ঘরে চলো, বলি…।
মা-মেয়ে আতুড়ঘরের বিছানায় বসলো। বন্যা বললো- ‘মা, আমি না, ঘুম বা তন্দ্রার মতো এলেই একটা স্বপ্ন দেখি। সবসময়ই একই স্বপ্ন…।
– বলিস কী…!
– হ্যাঁ মা। একটা মাদি-বিড়াল ছানা দিয়েছে। ছানার কপালে গর্ত। দেখতে যেন ঠিক গুলির চিহ্ন…।
ঝর্না দাই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মেয়ের কপোলে-কপালে চুমু খেলো। তারপর বললো- ‘ভয় পাসনে মা। বাচ্চা পেটে এলে সবারই এ-রকম হয়। পোয়াতিরা নানা ধরনের স্বপ্ন দেখে। যীশুর নাম করে ঘুমিয়ে পড়। আমি যাই…।’
ঘরের দরজা টেনে দিয়ে ঝর্ণা দাই বেরিয়ে গেলো। সে মেয়েকে বললো না, ঘুম বা তন্দ্রা এলেই সেও এই স্বপ্নটাই দেখে…।

দুই.
বকুল দাইরা ধীরগঞ্জ ঋষি সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু সে চামড়ার কাজ করে না। চামড়ার গন্ধ বকুলের নাকে এলেই বমি আসে। এ-নিয়ে বাবা রতন দাইয়ের কম বকাঝকা তাকে খেতে হয়নি। চামড়া ছেনে-ঘেঁটেই ঋষি পরিবারের ছেলেরা বড়ো হয়, আর দেখো, নবাবপুত্তুর বকুল; সে কিনা চামড়ার গন্ধই সহ্য করতে পারে না। কী করে খাবে নবাবের ব্যাটা…?

চামড়ার কাজ শেখেনি বকুল, শিখেছে ক্ষৌরকর্ম। কাজটা সে ভালোই পারে। ধীরগঞ্জ বাজারে শ্রীদাম শীলের সেলুনে বছর-পাঁচেক নবিশি করেছে সে। শ্রীদাম যত্ন নিয়েই তাকে কাজ শিখিয়েছে। বাজারের বটতলা বকুলের দোকান। তার খুব ইচ্ছে ছিল, বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে বাজারের কারও ঘর ভাড়া করে শ্রীদাম শীলের সেলুনের মতো কাচঘেরা সেলুন দেবে। সেলুনে গদিওয়ালা চেয়ার থাকবে। দেয়ালে ঝোলাবে দামি কাচের বড়োসড়ো আয়না। তাতে খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকবে সেলুনে। কিন্তু সে-সব স্বপ্ন বকুলের অধরাই থেকে গেছে। বেশ অনেকদিন ধরে রতনের চামড়ার ব্যবসায় খুব মন্দা যাচ্ছে, সে ছেলেকে টাকার জোগান দিতে পারেনি, বকুলও সেলুন দিতে পারেনি বাজারে। অগত্যা, নিজের কাছে কিছু টাকা ছিল তাই দিয়ে দু’ফালি টিন কিনে বটতলা ছাপড়ার মতো তুলেছে বকুল। কাজ সে ভালো জানে, চুল কাটুক কি দাড়িমোচ কাটুক, কাটে খুব যত্নসহকারে, বকুলের সেভও খুব আরামদায়ক। কিন্তু তাতে কোনো লাভ নাই। সেলুনের আরাম রেখে কে তার ছাপড়ায় আসে? ছাপড়াঘরে যা গরম…!

বকুলের খদ্দের কম, ফলে, তার আয়রোজগারও কম। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। কিন্তু এখন যে তার বেশকিছু টাকার প্রয়োজন। বউয়ের বাচ্চা হবে। প্রথম বাচ্চা। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিতে হলে টাকা লাগবে অনেক। পাঁচ হাজারও লাগতে পারে। এতো টাকার বাড়ি কোথায়…?
দুপুর সেই কখন গড়িয়ে গেছে। শীতের দিনের দুপুর গড়িয়ে নামলে দিন ফুরাতে আর খুব একটা সময় লাগে না। ধীরগঞ্জের দিনও সেদিন আর কিছুক্ষণ পরই অস্তাচলমুখি হবে, সব আয়োজন প্রায় সমাপ্ত; সীমান্তের ওপারে গেছিল যেসব পাখি, ওপারে পাখিদের খাবারের প্রচুর সমারোহ; প্রত্যেকদিনই সকালে ঘুম থেকে উঠে হরিপুর, ধীরগঞ্জ, বুজরগঞ্জ, নদীগাঁও, ঠাকুরগাঁও, মানপাড়ার অনেক পাখি ওপারে খাবার খেতে চলে যায়; ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরতে শুরু করেছে। বকুল দাই তখন দোকানের বেঞ্চে বসে ঝিমুচ্ছিল। সেদিন খদ্দের পেয়েছে কম, এমনিতেই তার দোকানে খদ্দের খুব একটা আসে না, বাজারে নতুন নতুন সেলুন খুলছে অনেকে, শ্রীদাম শীলের সেলুনের চেয়েও আরামদায়ক সেলুন, ওসব সেলুনে চেয়ারে বসামাত্রই ঘুম ঘুম ভাব আসে শরীর-মনে। শ্রীদাম শীলই যেখানে খাবি খাচ্ছে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে, তো, তার ছাপড়ায় আসবে কে? বকুল দাই সেদিন দুপুরের খাবারও খায়নি। তখন পর্যন্ত কামাই হয়েছে মাত্র ৩৫ টাকা, এর থেকে গোপালের দোকানে সবজি-রুটি খেয়ে ১০ টাকা খরচ করা, যখন, তার যে-কোনো সময় পাঁচহাজার টাকার দরকার, কিন্তু হাতপাত একদম খালি, তখন সবজি-রুটি খেয়ে ১০ টাকা খরচ করবে, সাহসে কুলায়নি বকুলের। ক্ষুধা-পেটে বিড়ি টানছিল বকুল। বিড়ি টানতে টানতেই ঝিমুনি এসে গেছে তার…।

বকুলের খদ্দের যৎসামান্য, তা ঠিক, তবে তার বাঁধা কিছু খদ্দের আছে; এই বাঁধা খদ্দেরদের অধিকাংশই বুড়ো শ্রেণীর, আবার কেউ কেউ আছে, যারা ধীরগঞ্জ কি বুজরগঞ্জের প্রভাবশালী মানুষ। এইসব খদ্দেররা কেন শ্রীদাম শীলের কি বাজারের অন্য কারও শীতল-সেলুনে না-ঢুকে বকুলের ছাপড়াঘরে আসে, একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ তা জানে না…।
আজিমুল্লাহ তাদের একজন…।

ধীরগঞ্জ কি বুজরগঞ্জ; নদীগাঁও কি ঠাকুরগাঁও- সীমান্তবর্তী প্রায় সব এলাকায়ই আজিমুল্লাহ সুপরিচিত। তিন মেয়াদে ১৬ বছর ইউপি সদস্য ছিল। এই কারণে সে সুপরিচিত, এটা একটা দিক; তারচে’ বড়ো, ঘরে তার তিনটি বউ, এটাই তার পরিচিতি বাড়িয়েছে। ঘটনা আরো আছে। যখন ইউপি সদস্য ছিল তখনো যেমন, এখনো সে রাতে গরুর কারবার করে। লোকে তাকে চিনবে না কেন? চেনে তো বটেই, সীমান্তের লোকজন সবাই তাকে সমীহও করে…।
– বকুল ঘুমাইছিস নাকি…?
– ও কাকা! না, ঘুমাই নাই…।
– মনটা যে খুব ভার ভার লাগছে। বউয়ের খবর কী…?
আজিমুল্লাহ রাতে গরুর কারবার করে, তা ঠিক; ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ের বহু মানুষ এই কারবারের সাথে জড়িত; তবে আজিমুল্লাহ সজ্জন মানুষ। এলাকার মানুষের খোঁজখবর রাখে। বকুলের বউ পোয়াতি, মায়ের কাছে গেছে, আজিমুল্লাহ তা জানে…।
– বউ ক্লিনিকে, কাকা…।
– ক্লিনিকে কেন…?
– বাড়িতে হবে না। কি যেন সমস্যা। দুপুরে বউ ফোন করেছিল। ব্যথার চোটে ভাল করে কথাই বলতে পারলো না…।
– তুই যাবি না…?
– বলেছি, যাবো কাল সকালে। কিন্তু কাকা, মেলা টাকার দরকার। পাঁচ হাজারও লাগতে পারে। হাত একদম খালি। কী নিয়া যাবো, কাকা…?
– বকুল…?
– জি, কাকা…।
– তোকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম- তোরা সবাই ধর্মত্যাগ করলি কেন- মনে আছে…?
– জি, কাকা। মনে আছে…।
– তুই কী উত্তর দিয়েছিলি, তাও মনে আছে…?
– মনে আছে, কাকা। বলেছিলাম- আগে পেটরক্ষা, তারপর ধর্মরক্ষা…।
– পেট কি রক্ষা করতে পারছিস…?
বকুলের কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নাই। সে বিড়ি ধরিয়ে টানতে শুরু করলো…।
আজিমুল্লাহ বললো- ‘তোকে কতো করে বললাম- নূরু যায়, আজাদ যায়, সামাদ যায়, কিন্তু তুই কোনোদিন গরু আনতে গেলি না। তোর ধর্ম যাবে। যীশু তোর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এখন দ্যাখ, বউ-বাচ্চা বাঁচাতে টাকার দরকার পড়ে…!

তিন.
পথে নামলো আজিমুল্লাহ। ‘যাইরে বকুল…।’
– সেভ…?
– আজ থাক, তোর মন খারাপ। ক্ষুর গলায় চালিয়ে দিতে পারিস…।
এপারে আজিমুল্লাহ, বরকতুল্লাহ, বাহার, কাদের; ওপারে শ্যামল, কমল, নিখিল- কারবারির অভাব নাই। প্রত্যেক রাতেই গরু আসে। হাতির মতো বিশালাকৃতির ষাঁড়, বলদ। আসে লাল গরু। কালো গরু। ডোরাকাটা গরু। শিং চোখা গরু। শিং বোচা গরু। হরিয়ানা থেকেই বেশি আসে। মূলত মাংসের যোগানদার এইসব গরু। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া আছে। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া কিংবা টহল কখনো গরু পারাপারে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কারবারিরা বাধা ডিঙানোর পথ জানে। সব পথই তাদের মুখস্ত…!

গরু আসে। শ্যামল-কমল কিংবা নিখিলের গরু আসে। ওরা নিজেরা কিংবা ওদের লোকজন কিন্তু গরুর সাথে সীমান্ত পর্যন্ত আসে না। ওদের লোক গরু নিয়ে সীমান্ত পর্যন্ত এলে যে-টাকা তাদেরকে দিতে হয়, তার সিকি টাকায় ধীরগঞ্জ-বুজরগঞ্জ-নদীগাঁওয়ের লোক মেলে। ফলে হয় কি, শ্যামল-কমলরা শর্ত জুড়ে দেয়, গরু নিতে চাইলে লোক পাঠাতে হবে। আমাদের লোক সীমান্ত পর্যন্ত যাবে না। তখন, শর্তানুযায়ী আজিমুল্লাহ-বরকতুল্লাহ’র লোকেরা সীমান্তের ভেতরে একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত ঢোকে। শ্যামল-কমলরা আগে থেকেই সেখানে গরুর চালান নিয়ে অপেক্ষা করে। রাত থাকতে-থাকতেই, ধীরগঞ্জ কি বুজরগঞ্জ থেকে যারা যায়, তারা গরু নিয়ে চলে আসে। তারা যখন সীমান্ত অতিক্রম করে, তখন, কোথাও কাঁটাতারের বেড়া কিংবা টহল তাদের চোখে পড়ে না। অবাক কাণ্ড…!

তবে গোলমাল কিন্তু মাঝে-মধ্যেই ঘটে। যারা গরু আনতে যায় তারাও জানে, গোলমাল ঘটতে পারে, গোলমালের মধ্যে তারাও পড়তে পারে। তারপরও তারা যায়। না-গিয়ে তো উপায় নাই। নুরু-আজাদ-সামাদ দিনমজুরি করে, দিনে খুব জোর ১৩০ টাকা রোজগার; এ দিয়ে সংসার চলে না। ধীরগঞ্জ, বুজরগঞ্জ, নদীগাঁও- সীমান্তবর্তী সব গ্রামেই এরকম দিনমজুর আছে, গোলমালের মধ্যে পড়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও তারা কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে গরু আনতে ভেতরে ঢোকে। তবে, ভাগ্যের ফেরে এই গোলমালের মধ্যে যারা পড়ে, তারা কিন্তু আর ফিরে আসতে পারে না। বিএসএফ-এর গুলি খেয়ে বেঘোরে মরে। কারো কারো লাশটাও তো মেলে না। কেউ কেউ হয়তো জান নিয়ে কোনোমতে ফিরে আসে, কিন্তু হাতে কি পায়ে কিংবা শরীরের অন্য কোথাও, যতোদিন তারা বেঁচে থাকে, গুলির ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়…।

বকুল এটা জানে- গুলির ঘটনা যেদিন ঘটে, ওরা ফাঁকা গুলি ছোড়ে না, গুলি যে-কারো হাতে-পায়ে বুকে-পিঠে, পেটে-কপালে লাগতেই পারে। এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে ওরা। কপালের জোর না-থাকলে জীবিত ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই তো বকুল কোনোদিন গরু আনতে যায় না। পাপ ও যীশুর দোহাই দেয় বটে, আসলে ভয়েই সে এ-পথে পা বাড়ায় না। না-হলে টাকা তো কম না! একরাতেই পাঁচশ’…।

সেদিন বকুল মনে মনে তৈরি হয়েছিল, আজিমুল্লাহ যদি বলে, বকুল, গরুর চালান আসবে আজ, তোর তো টাকার খুব দরকার, নূরুদের সাথে যা; তবে সে যীশুর নাম করে রাজি হয়ে যাবে। আগে পেটরক্ষা।
কিন্তু আজিমুল্লাহ সেদিন এসবের কিছুই না-বলে পথে নামে, বকুলকে বকা দেয়; ক্ষুর গলায় লাগিয়ে দিতে পারিস…।
সীমান্তে তখন সন্ধ্যা নামছে, লালচে সন্ধ্যা; তখন নূরু এলো বকুলের দোকানে। বকুল আজিমুল্লাহ’র সেভ করছিল। লোকটা কই কই যেন ঘুরে আবার বকুলের দোকানে এসেছে। সেভ হচ্ছে। নূরু বেঞ্চে বসলো। সেভ হতে-হতেই আজিমুল্লাহ বললো- নূরু যে…।
– চুল কাটাবো চাচা, তাই এলাম…।
– ভালো। বোস্…।
সেভ হয়ে গেলে আজিমুল্লাহ পকেট থেকে একটা পাঁচশ’ টাকার নোট বের করে বকুলের দিকে বাড়িয়ে দিল- নে…।
– পাঁচশ’ টাকার নোট! ভাংতি নাই কাকা…।
– ফেরত দিতে হবে না। পুরাটাই রাখ। তোর বউ না ক্লিনিকে…।
– কাকা…!
– রেখে দে। আমি যাই। যাইরে নূরু…।
টাকা হাতে গণেশের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো বকুল। নূরু বললো- তোকে একটা কথা বলি বকুল। এর আগেও বলেছি, কান দিসনি…।
বকুলের মুখে কোনো রা-শব্দ নাই। নূরু বললো- তোর বউ ক্লিনিকে। কত টাকা লাগে, কে জানে! আজিমুল্লাহ কাকার গরুর চালান আসবে আজ রাতে। যাবি…?
চোখে জল এসে গেছে বকুলের। হয়তো এখনই ওর কপোল বেয়ে গড়িয়ে নামবে। বকুল বললো- যাবো নূরু ভাই, যাবো…।
– যাবি? সত্যিই যাবি…?
– যাবো। আগে বউ-বাচ্চা রক্ষা…।

চার.
নূরুরা রাত দুটোর দিকে জড়ো হয়। নূরু ও বকুল ধীরগঞ্জের বাসিন্দা। এই দু’জন ছাড়াও বুজরগঞ্জের আজাদ, সামাদ, রাজু; নদীগাঁওয়ের পিন্টু ও কালাম দলে আছে। নূরুই দলনেতা। পৌষের শীত। কাঁটাতারের বেড়ার কাছে, নো-ম্যান্সল্যান্ডে শীত যেন আরো বেশি। ওপার থেকে কনকনে হাওয়া এসে নূরুদের জাপটে ধরছে। ওদের কারো গায়েই তেমন গরম কাপড় নাই। শীতে দাঁতকপাটি লাগার মতো পরিস্থিতি। কিন্তু, পথে যখন বেরিয়েছে, কিছুই আর করার নাই। এখান থেকে সীমান্তের ভেতরে, বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ, ওই পথেই ঢুকতে হবে। সবাই বিড়ি ধরিয়ে গা গরম রাখার চেষ্টা করছে। জোনাকির আলোর মতো টিপটিপ করে বিড়ির আগুন জ্বলছে সবার মুখে। পিলার ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। সবার মুখেই বিড়ির আগুন, কিন্তু মুখে কোনো কথা নাই, কথা বলা নিষেধ, নূরুই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বিড়ির আগুন যে জোনাকির আলোর মতো জ্বলছে-নিভছে, কেউ যদি দেখে তো, তারা এটাকে জোনাকির আলোই ভাববে, কিন্তু কথার আওয়াজ কানে গেলেই তারা সন্দেহ করবে, এই শব্দ নিশ্চয়ই গরু পাচারকারীদের; এই রীতিনীতি নূরুর ভালো করেই জানা; তাই সে তার সঙ্গীদের কথাবার্তা বলা নিষিদ্ধ করেছে। সে একটা সংকেতের অপেক্ষা করছে। শ্যামল বণিকের লোকেরা ওপার থেকে সংকেত পাঠাবে, পথ শত্রুমুক্ত, কোথাও কোনো সমস্যা নাই, ভেতরে ঢুকে পড়ো; সংকেতটি রাজঘুঘুর ডাকের মতো, বহুদূর থেকে এই ডাক ভেসে আসে, রাতের বেলা তো, ডাকটি স্পষ্ট শোনা যায়; ঘঘুর ঘুঘ, ঘু…ঘ। ডাকটি আসলে রাজঘুঘুর নাকি শ্যামল বণিকের নিজের, নাকি তার বাঁধা কোনো লোকের, নূরুর তা জানা নাই। কিন্তু সে জানে, ঘুঘুর এই ডাক শুরু হলেই ভেতরে ঢুকতে হবে…।

নূরু বকুলের নিজের গাঁয়ের লোক, আজাদ-সামাদ-রাজু প্রতিবেশী গাঁ বুজরগঞ্জের; নূরু তো বড়োভাইয়ের মতো, বুজরগঞ্জের ওরাও পরিচিত; নদীগাঁওয়ের লোকদুটোই বকুলের অপরিচিত। তবে, ওরাও যে আজিমুল্লাহ-বরকতুল্লাহ- কারো না কারো গরু আনতে ওপারে যায়, ওদের বিড়িটানা দেখেই বুঝে ফেলেছে বকুল। কী রকম গলগল করে ওরা বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ছে! অথচ দেখো, বেজায় জোরেসোরে বিড়ি টানছে বকুল, কিন্তু বিড়ির ধোঁয়াই বেরুচ্ছে না; নাকে-মুখে বিড়ির ধোঁয়া ঢুকলে শীতের ত্যাঁদরামি কিছুটা হলেও সামাল দেয়া যেতো। নূরু নদীগাঁওয়ের লোকদুটিকে বকুলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, বলে- বকুল, তুই তো আজ প্রথম এসেছিস, সবাইকে চিনবি না, দু’চারবার এলেই সবাই পরিচিত হয়ে যাবে…।
– নূরু ভাই…।
– কীরে বকুল, তুই কাঁপছিস কেন? শীতে না ভয়ে…?
– ভয় করছে নূরু ভাই…।
– কী যে বলিস না তুই, বকুল! ভয়ের কী আছে? তুই আজই প্রথম এসেছিস, ঠিক আছে; আমি তো আছি। আমি সব চিনি। এই যে, এখন, যে-পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছি, শ্যামলদার সংকেত আসবে, সংকেত এলেই যে-পথে ভেতরে যাবো, যে-পথ দিয়ে গরুর চালান নিয়ে ফিরে আসবো, দেশের ভেতরে ঢুকবো, আজিমুল্লাহ চাচাকে চালান বুঝিয়ে দেবো, সব আমার মুখস্ত…!
– কিন্তু…।
– কিন্তু আবার কী…?
– সব ঠিকঠাক আছে তো…?
– কী রকম…?
– আমি গরু আনতে যাই না, কোনোদিন যাইনি, সব ঠিক আছে; কিন্তু তোমরা যে গরু আনো, কীভাবে আনো, কিছু কিছু তো আমাদের কানেও আসে…।
– কী জানিস তুই, বকুল…?
– না, তেমন কিছু না। শুধু জানতে চাইছিলাম, গরু আনতে হলে তো পথ ঠিকঠাক থাকতে হয়, আজ সব ঠিক আছে তো? ওরা যদি সব মিটমাট না করেই গরুর চালান পাঠাতে চায়, শুনে আসছি তো এতোদিন ধরে, তখনই গোলমাল ঘটে, এলোপাতাড়ি গুলি চলে…।
শ্যামলদা বলেছে, আজিমুল্লাহ কাকাও বলেছে, কোনো চিন্তা নাই, সব ঠিকঠাক আছে…।
– এটা কয় নম্বর চালান, নূরু ভাই…?
– পাঁচ নম্বর…।
– পাঁচ নম্বর! বলো কী? চারের ওপরে কি অনুমতি মিলে…?
– মাঝে-মধ্যে মিলে…।
– তারপরও আমার ভয় করছে, নূরু ভাই। মাঝে-মধ্যেই তো বিএসএফ-এর গুলিতে লোকজন মরছে। এই তো সেদিনও…।
– এসেই যখন পড়েছিস, কথা আর বাড়াসনে। তুই তো জানিস, আমরা কীভাবে চলি, কীভাবে বেঁচে আছি; বাড়িতে কারো পেটে ভাত নাই, আমি কোনোভাবেই ভাতের জোগাড় করতে পারছি না। তোর বউ ক্লিনিকে, বাচ্চা হবে, অনেক টাকার দরকার, তোর কাছে টাকা নাই; আমার বউ আবার পোয়াতি, ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না; তুই এবারই প্রথম বাচ্চার বাবা হবি, আমার আরো দু’টো বাচ্চা আছে; ওদের কী কষ্টে যে বড় করছি, বকুল; তোকে বলে বোঝাতে পারবো না। তাহলে, তুইই বল, গরু আনতে ওপার গেলে আমাদের কেন পাপ হবে? যীশু কি আল্লাহ, কারো কি কোনো বিচার নাই? ওরা তো জানে, কেন আমাদের গরু আনতে যেতে হয়? কেন আমার বাবা বিএসএফ-এর গুলি খেয়ে মরে…?
নূরু হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলো। কাঁদতে-কাঁদতেই জড়িয়ে ধরলো বকুলকে…।

দলনেতা এভাবে হঠাৎ কাঁদতে শুরু করবে, তাও আবার নো-ম্যান্সল্যান্ডে পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে, ওপার থেকে গরুর চালান আনতে যাওয়ার সময়, দলের কেউ কিছুই বুঝে উঠতে না-পেরে, কুয়াশাভেজা ঝাপসা চাঁদের আলো নিচে, বকুল ব্যতিরেকে অন্য আর সবাই একজন আরেকজনের চোখ-মুখ খুঁজতে লাগলো, তারা দেখতে চাইলো নূরু সর্দার একাই কাঁদছে, নাকি তারা সবাই কাঁদছে…।
নূরু দেখলো, সবাই কাঁদছে…।
বকুল দেখলো, সবাই কাঁদছে…।
বুজরগঞ্জের আজাদ-সামাদ-রাজুর চোখে জল…।
নদীগাঁওয়ের পিন্টু-কালামের চোখেও জল…।
তখনই ওপার থেকে রাজঘুঘুর ডাক ভেসে আসে; ঘুঘুর ঘুষ, ঘুঘুর ঘুঘ, ঘু…ঘ…।

পাঁচ.
নূরুরা যে-পথে ওপার গেছিল, শ্যামল বণিকের কথামতো গরুর চালান নিয়ে ওই পথেই ফিরে আসছিল। শ্যামল-কারবারি বলেছে- পথ একদম পরিষ্কার। একেবারে কোজাগরী পূর্ণিমার আলো পড়লে পথ যে-রকম ঝকমক করে, পথটি সেরকমই ঝকমক করছে। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নাই। কোথাও কোনো খুঁত নাই। তোমরা নিশ্চিন্তে যাও…।

তখনো ভোরের আজান হয়নি। একটু পরেই হয়তো হবে। ওরা কেবলই পিলারের কাছাকাছি এসেছে, নূরু গরুর পালের সামনে, বকুলও সাথে রয়েছে। বাকিরা পালের পেছনে; তখনই এলোপাতাড়ি গুলি। শ্যামল বণিক বলেছিল- পথঘাট কোজাগরী পূর্ণিমার আলোর মতো ঝকঝকে, আসলে পথে কোনো আলো ছিল না। পথ ডুবে ছিল আলকাতরার মতো কালো অন্ধকারে। গুলির শব্দ শুনেই নূরু বসে পড়ে। বকুলকেও বসিয়ে দেয়। বাকিরাও বসে পড়েছে। তারা সবাই জানে, গুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। দাঁড়িয়ে থাকলে গুলি লাগবে। নূরু মনে মনে বলে- শ্যামল শালা মিথ্যা কথা বলেছে। প্রতারণা করেছে। আসলে সে পঞ্চম-চালান পাঠানোর ব্যাপারে যোগাযোগ করেনি। ফাঁকি দিতে চেয়েছিল…।

অন্ধকার ছিঁড়ে-খুঁড়ে গুলি আসছে। কখনো একটা-দুটো। কখনো কৈ মাছের ঝাঁকের মতো। কতোক্ষণ গুলি চলবে, আল্লাহই মালুম! নূরু বললো, তোরা কেউ দাঁড়াবি না। গরুর দড়ি ছেড়ে দে…।
গুলির শব্দ শুনেই গরুগুলো ভয়ে দাপাদাপি শুরু করেছিল। প্রাণের মায়া কার না-আছে। একটা গুলি লাগলেই তো ভবলীলা সাঙ্গ! দড়ি ছাড়া পেয়ে গরুগুলো দৌড়ে পালাতে শুরু করে। যতো তাড়াতাড়ি পারো গুলির আওতার বাইরে যেতে হবে। কিন্তু দু’টো ষাঁড় বিকট স্বরে হাম্বা রব তুলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। গায়ে গুলি লেগেছে…।
এরপর অনেকক্ষণ গুলি আসছিল না। নূরু ভাবলো- আর গুলি করবে না। এখন, যতোটা সম্ভব দ্রুত নো-ম্যান্সল্যান্ড ত্যাগ করা উচিত। গরু গেছে, যাক। লোকসান হলে আজিমুল্লাহর হবে, আর প্রাণ গেলে যাবে তাদের নিজের। নূরু বললো- ওরা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। আর গুলি করবে না। চল, আমরা দৌড়াই…।

নূরুরা যেই না দৌড় শুরু করেছে, আবার গুলি! মুহুর্মুহু…।
তারপর সম্মিলিত চিৎকার। ও মাগো, ও বাবা গো…।
তারপর দিদ্বিদিক ছোটাছুটি…।
তারপর একক কাতরানি, গোঙানি…।
তারপর চরাচর নিঃস্তব্ধ…।

ছয়.
সীমান্ত এলাকায় সকাল আসে একটু দেরিতে। জনবসতি নাই তো, তাই! কিন্তু সেদিন ধীরগঞ্জ সীমান্তে দ্রুত জেগে ওঠে সকাল। আর সকাল হতে না-হতেই চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে যায় ৩৬৫/১ এস পিলারের কাছে চারটি লাশ পড়ে আছে। দুটো লাশ মানুষের, দুটো গরুর…।
হালিমা জানে- তার স্বামী নূরু রাতে গরু আনতে গেছিল, বাড়ি ফেরেনি…।
রতন জানে- তার ছেলে বকুল রাতে গরু আনতে গেছিল, বাড়ি ফেরেনি…।
৩৬৫/১ এস পিলারের কাছে লাশ পড়ে আছে, খবর শুনে অকুস্থলে বহু মানুষ এসেছে। ভিনভিন করছে মাছির মতো। হালিমা এবং রতনও এসেছে খবর শুনে…।
হালিমার আত্মা ঢিপঢিপ করছিল- দুটো লাশের একটা তার স্বামীর নয় তো…?
রতনের আত্মা ঢিপঢিপ করছিল- দু’টো লাশের একটা তার ছেলের নয় তো…?
নূরুর লাশ শনাক্ত করলো হালিমা- ডান বুকে গুলি লেগেছে…।
বকুলের লাশ শনাক্ত করে রতন- কপালের মাঝ-বরাবর, মেয়েরা যেখানে টিপ পরে, ঠিক সেখানেই গুলি লেগেছে…।
হালিমা বুক চাপড়ে কাঁদছিল- এখন আমার কী হবে গো? এ তুমি কী করলা গো আল্লাহ? আমার কোলে দুই বাচ্চা, পেটে এক বাচ্চা…!
রতন ছেলের লাশ সামনে নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিল। জলটল কিছু নাই তার চোখে। এখন পুলিশ আসবে। বিজিবি-বিএসএফ-ক্যাম্পের লোকজন আসবে। পতাকা বৈঠক হবে। তারপর যদি লাশ হাতে পাওয়া যায়…!

হঠাৎ রতনের ফোন বেজে উঠলো। বন্যা ফোন করেছে…।
– বাবা…।
– হ্যাঁ মা, বলো…।
– তোমার নাতনি এসেছে…।
– খুব ভালো খবর…।
– জানো বাবা, তোমার নাতনি কপালে টিপ নিয়ে এসেছে। লাল টিপ। টিপটা দেখতে যা সন্দুর না…!
– তাই নাকি…!
– হ্যাঁ বাবা। তা, তোমার ছেলের ফোন বন্ধ কেন? ফোন বন্ধ করে ঘুমিয়েছে নাকি! ওকে ডেকে দাও…।

পাদটীকা :
হাজার ডাকাডাকি করলেও বকুলের ঘুম যে আর ভাঙবে না রতন তা তার বউমাকে বলতে পারলো না। তার চোখ পড়লো ছেলের কপালে, যেখানে গুলির চিহ্ন। এ কী! গুলি লেগে যে-গর্ত হয়েছে, রক্তমাখা গর্ত; দেখতে যেন ঠিক টিপের মতোই। বকুলের কপালে জ্বলজ্বল করছে লাল টিপ। নাতনিও টিপ নিয়েই এসেছে। বাহ…!