লুফাইয়্যা শাম্মী’র কবিতা




শরীর

লোমকূপ ফেটে বেরিয়ে আসছে মেঘ, মেঘেরা বৃষ্টি খোঁজে, খোঁজে অনিবার্য পরিণতির শরীররং। শরীর চুপচাপ যাত্রা সাজায়, রংসজ্জার পাশবালিশ দুঃখমাখা গন্ধ নিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ ছড়ায়- ছড়িয়ে পরে কোনায় কোনায়, মাকড়সার জালে। সুতোয় বোনা ফাঁদ, প্রাণের টানে প্রাণ কাড়ে। স্বাদ-গন্ধ-রং পেপারে মুড়িয়ে শরীরের ফাঁদে আটকে কাঁদে চাতক হৃদয়, হুহু বুক। বুকের কোষে কোষে জীবিত শরীর, শরীরেরা মুক্তি চায়, আকাশজোড়া সীমানায় উড়ে উড়ে পাখির দলে ঝরতে চায় মেঘের উচ্চতায়, ব্যর্থ তরুণের আর্তচিৎকারে তিতাস ভেসে যায়, সম্ভোগ ভেসে যায়, মহব্বত-আদর-আহ্লাদ সব ভেসে যায়।

নিয়ম ঘেরা এই বস্তি শহরে ভেঙে যায় দালানের মেলাঘর। মেঘেরা আকাশছোঁয়া অধিকারের আন্দোলনে মত্ত থাকে, পাতালফেরা পাইপের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাজে মাটির চিৎকার। আন্দোলন কিংবা চিৎকার বটবৃক্ষের মতো ঝড়ো হাওয়াও উপর-নিচ দোলায়, শোনায় মেঘের অধিকার নেই তারা ছোঁয়ার। তারারা ঝরে যায়, ঝরে সাগরে আগুন ঢালে। আগুনে আগুনে ভেসে আসে সব ফেনার স্তূপ, কিছু রক্তবীজ, আর প্রবালের শরীর। শরীর ভেঙে শরীরের গল্প শোনায়।



প্রাণ

আগুনে জন্মানো ঘুমফুল সময়দানীতে ফুটে, ফুটে অসুখে অনিয়মিত। রূপার পেয়ালায় হুল ডুবিয়ে প্রাণ চুষে উড়াল দেয় ঘুমমাছি। ধীরে বহে ঘুম, ধীরে বহে ছটফটানি রক্ত। সবুজ পেয়ালা শূন্য হতে হতে নীল হয়। যত খালি স্থান তত পাপগ্রহের টান। পূণ্যের খাতায় মা চান একশ পাই। সুরার নহরে ডুবেও পরিত্যাজ্য হয়না কেউ।

মৃত্যুফুল আগুন থেকে বারবার জন্মায়। নীল আগুনে হেঁটে কবর এগিয়ে আসে। কবরে চাঁদের বুড়ি নেই। চরকায় সুতা নেই। নদীর শুকনো কাদা সমুদ্রে গড়ালে, সমুদ্র হাওয়ায় মিলায়। তখন কবরের মাটি সরে যেয়ে প্রাণ ডাকে- যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব বিলীন। প্রাণ ছুটে বেড়ায় পৃথিবীর আনাচকানাচ। পাছে পৃথিবীর কোণা ধরে ঝুলে যায়, সতর্ক পাহারায় কবর ডাকে, ফুঁসে ফুঁসে ডাকে, ইনিয়েবিনিয়ে ডাকে, আহ্লাদ-মায়াছলে ডাকে। প্রাণ পায়ে পায়ে এগোয়। এগুতেই থাকে।



শীত

নিশ্চিত মেনে নিতে পারি শীত সবুজ পাতায় ভর দিয়ে আসে, হলদে পাতারা আদিম শোকে বিছানা পাতে। ন্যাড়া মাথা নিয়ে যে বৃক্ষ দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে তাতে ফুটে রঙিন ফুল, লাল লাল আগুনের প্রাণ।
সে আগুন পাখিরে ডাকে, সে আগুন ফড়িংয়েরে ডাকে। পাতা হারিয়ে যে আগুন পাই তাতে বুক পুড়ে যায়, বুকের খাড়া লোম পুড়ে যায়, সেই পোড়া গন্ধ থেকে আরেক পৃথিবী জন্মায়।

নিশ্চিত জানি, মৃত আত্মারা ফিরে ফিরে আসে। যদি কামিনী ডালে বসা প্রজাপতি কিংবা মেহগনির শালিক, দুই-ই ক্লান্ত হয় তবে শ্রান্ত থ্যাতলানো পা নিয়ে উঠে আসে তারা সবুজের নেশায়। পৃথিবীরা চক্রাকারে ঘুরে, ডিম ফুটায়, ঘর্ষণে জন্মায় মানবের মন। মন শীতে পুড়ে, শীত বছর জুড়ে ন্যাড়া গাছের চোখ হয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। রুক্ষ মাটি সরিয়ে দখলদার কবরপ্রেমী ঠ্যাং ঢুকিয়ে বসে ঠিকই, ন্যাড়া গাছ শীত ব্যাপ্তিতে আরাম পায়। হাজার চোখ নিয়ে তখন কবর পাহারায় থাকে বেতের ঝার। একটা জীবিত প্রাণ টেনে নিলে মৃত প্রাণে সঞ্চিত হয় বিশুদ্ধ শ্বাস, তখন জীবনরে ভালোবাসতে যেয়ে শোক করে পৃথিবীর জারুল-শিমুল।