শরীফ আস্‌-সাবের এর কবিতা

ভালোবাসা নির্মোহ হলে

১.
ভালোবাসা নির্মোহ হলে-
ফুলের সুবাস হতো মূল্যহীন কিছু।
সাগরের মনিমালা হারাতো চমক,
চাঁদ ভুলে যেতো হাসি,
আকাশ হারাতো নীল, মেঘের আদর।

ভালোবাসা নির্মোহ হলে-
নটরাজ ভুলে যেত নাচের ঠমক।
হতো না শ্রীকৃষ্ণ সনে রাঁধার প্রণয়,
মথুরা বিরান হতো,
থেমে যেতো বাঁশরীর সুরের লহর।

ভালোবাসা নির্মোহ হলে-
নদী ধেয়ে যেতো না তো সাগর সীমায়।
বৃষ্টি বিরহে কাবু হতো না চাতক,
জলের তৃষ্ণা বুকে-
হতো না মেঘের সাথে ভালোবাসা তার।

ভালোবাসা নির্মোহ হলে-
বিশ্বমিত্রার বোধি ঘটাতো প্রলয়।
মেনকার রূপ হতো উপেক্ষায় ম্লান,
তপোবন মাতাতো না
শকুন্তলা-দুষ্মন্তের প্রণয় বাসর।

ভালোবাসা নির্মোহ হলে
পাখি ভুলে যেতো তার ঠিকানা নীড়ের।
বাসনা রসনা রতি হতো মুল্যহীন,
ভ্রমর পরশ বিনা-
ফুলের পরাগ হতো বিষণ্ণ মলিন।

ভালোবাসা নির্মোহ হলে
জীবনের পথচলা অর্থহীন হতো।
সাগর, অরন্যলোক, গিরি, সমতল-
নিস্ফলা হয়ে যেতো,
পৃথিবী হারাতো তার রূপ, রঙ, রস।


২.
জেনে রাখো উর্বশী তুমি
নই আমি নির্মোহ, উদাস, অসার।
চাই আমি অনুরাগ মোহমায়াময়।
হৃদয়ের করপুটে শুধু-
ভালোবাসা কামনার মাধুরী ছড়ায়।
বৈরাগ্য মানি না আমি
চারিদিকে হাতছানি প্রণয় মেলার।
আহ্লাদ অনুভবে সুখ শীৎকারে-
কামাতুর সদাশিব মজে
সতী পার্বতী সনে রমন লীলায়।

তোমাকেই ভালোবাসি তাই,
আমার অস্তিত্ব লীন তোমার বিভায়
যে দিকে তাকাই দেখি তোমার প্রকাশ।
বসে থাকি অপেক্ষায়-
পরান বিবরে আঁকি প্রতিমা তোমার।

মোহ মায়া মমতায়
কাকচক্ষু রাত জাগে মোম জোসনায়;
তোমার রূপের চ্ছটা জাগায় শিহর।
এই মধু রাতে এসো
দুজনে হারাই রেখে অধরে অধর।

মিথ্যামিথ্যি
১.
আজকাল তেমন একটা ভালো নেই আমি;
দুঃসহ দিনগুলো নিরিবিলি মিশে যায় কষ্টের ভীড়ে।
ঘুমহীন রাত কাটে যাতনা বিধুর;
আর নিরুপায়, নির্বোধ, অর্বাচীন আমি
ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় নির্বিকার মিথ্যা বলে যাই।

২.
কাকডাকা ভোরে আমি ছুটে যাই রমনার সবুজ মায়ায়,
বটমূলে রোজকার হাঁটার সাথীদের সাথে
দেখা হলেই শুনি – ‘কেমন আছেন, ভাই’?
প্রত্তুত্তরে আমি অপ্রতিভ, নিরুত্তাপ মিথ্যা কথা বলি,
বলি – ‘ভালো, ভালো আছি বেশ!’

ছাত্র হিসাবে মন্দ ছিলাম না তেমন,
চাকুরীও জুটেছিল এক বহুজাতিক সংস্থায়।
একবার মনিরার সঙ্গে লং ড্রাইভে গিয়ে চুটিয়ে প্রেম…
আর সেই সুবাদে অফিস কামাই গেলো গোটা দুই দিন।
পরদিন কাজে এসে বসকে বলেছিলাম
একেবারে নির্জলা সত্যি কথাটাই।
অমনি ঝট করে চলে গেলো চাকুরীটা।

মা আমার শয্যাশায়ী।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় রুটিনমাফিক মায়ের শিয়রে এসে দাঁডালেই মা শুধান –
‘ভালো আছিস বাবা? কাজ কর্ম চলছে কেমন?’
‘ভালো আছি মা, সব ঠিকঠাক’ –
সহাস্য, সকপট ক্ষিপ্রতায় বলে ফেলি আমি;
আর বেমালুম চেপে যাই –
মাস তিন আগে চাকুরীটা হারিয়েছি আমি!

বইমেলায় হঠাৎ পুরনো বন্ধু অহল্যার সাথে দেখা –
হাতে তার টগবগে নতুন প্রেমিক।
কাছে এসে সযতনে বললো –
‘কেমন আছো তুমি? তুমি… আর মনিরা’?
‘ভালো – ভালো আছি আমরা’ –
এই বলে ব্যস্ততার অজুহাতে ফেরাই মুখ,
দ্রুত হেঁটে চলে যাই এলোমেলো পায়ে;
অহল্যাকে অবশ্য বলা হয় না –
চাকুরীটা নেই বলে মনিরার সাথে
আমার ভালোবাসা চুকে বুকে গেছে,
অন্য এক পুরুষের হাত ধরে –
মনিরাটা চলে গেছে অন্য এক গ্রহে!

আমার রিটায়ার্ড বাবা বয়সের ভারে ন্যুব্জ।
প্রতি শুক্রবার জু’মার নামাজে
বাবার হাত কাঁধে করে মসজিদে যাই আমি।
বাবা আমার বিয়ে’থার কথা জানতে চান,
নাতি পুতির মুখ দেখতে চান।
আমি বাবাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলি –
এইতো বাবা, আরেকটা প্রমোশন পেলেই
বিয়েটা সেরে ফেলবো আমি।

আমার খুব বিশ্বস্ত পোষা কুকুর, জেরি।
অনেক দিন ওকে ওর পছন্দের খাবার
কিনে দিতে পারি না বলে
খাবারের প্রতি ওর একটা অনীহা জন্মেছে,
খানিকটা অভিমানও করেছে বোধ করি।
আজ তাকেও চিৎকার করে মিথ্যা বললাম:
‘এখন দয়া করে খেয়ে নে, যাদু –
কাল তোর জন্য হাড় সমেত
পছন্দের খাবার কিনে আনবো।’

৩.
রাত গভীর হলে পর
চারিদিকে নেমে আসে শুনশান স্তব্ধতা;
বারান্দায় জেরি ক্ষুধায় কাতর হয়ে গোঙ্গায় একাকী।
মায়ের বুক-ভাঙ্গা কাশি আর
ডায়াবেটিক বাবার বাথরুমে যাওয়া-আসার শব্দে
থেকে থেকে ভাঙ্গে নীরবতা।
আমি তখন সব কষ্ট ভুলে যেতে চাই,
উন্মূল আশারাজি স্বপ্নের অভ্রমালায় সাজাই যতনে,
অন্তর্জাল ভর করে দেবশিশুর মত
আঁধারের বুক চিড়ে উড়ে যাই
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে;
ফেইসবুক আর ইন্সটাগ্রামে নার্সিসাস হয়ে
হাসিমুখে সেল্‌ফি পোস্ট করি।
আর অনেক যত্ন করে, মনের মাধুরি ঢেলে
দারুন সুন্দর একটা স্ট্যাটাস দিই :
‘বন্ধুরা, আমি ভালো আছি বেশ,
আকাশের তারা আর মেঘেদের সাথে
কাটছে আমার এক অমল সময়;
এই মধু রজনীতে, ঘুম ঘুম আবেশেতে
তোমরা সবাই আজ ভালো আছো তো?’


অবেলা

আমার মাথার উপর খেলা করে বুভুক্ষ শকুনের দল।
আমার পায়ের কাছে উল্লাসে মাতোয়ারা ঘৃণ্য শ্বাপদ।
দুলে উঠে চুপিসারে উৎকট সারি সারি লাশের কাওয়াজ।
কালো মেঘ শোকের মাতম হয়ে নির্বিকার
ঢেকে দেয় আকাশের নীল অবয়ব।

হে ঈশ্বর, বলো তুমি এক বার, এই চরাচরে –
কোন দিকে যাবো আমি, কি আশায়, এই অবেলায়?
দ্রিমি দ্রিমি বেশরম নেচে যায় নপুংসক পিশাচ, পামর।
বাতাসে বারুদ গন্ধ বর্বর জিঘাংসার বারতা ছড়ায়।
আঁধারের বুক চিড়ে সাইরেন বেজে উঠে মুহুর্মুহু আর –
নগরীর রাস্তায় পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যায়
এক ঝাঁক চড়ুইয়ের নরোম শরীর।

হে ঈশ্বর, বলো তুমি এক বার, এ বিষণ্ণলোকে –
কোন দূরে যাবো আমি, কি আশায়, কোন ঠিকানায়?
দূরের কুটির থেকে ভেসে আসে বিষাদের করুণ বিলাপ।
কান্তারের পথে একা অনমন হেঁটে যায় খেয়ালী পথিক।
পিপাসা কাতর আমি খুঁজে ফিরি নির্মল জলের আধার।
মৃত্যু উপত্যকা এক – চারিদিকে সুনসান
বিভিষিকা দ্যুতিহীন বাসা বেঁধে রয়।

হে ঈশ্বর, বলো তুমি এক বার, শুধু এক বার –
কার কাছে যাবো আমি, কি আশায়, এই অবেলায়?