শরীফ আস্-সাবেরের কবিতা


অবজ্ঞা

নদীর অথৈ জলে মাছেদের ঘরবাড়ি থাকে,
পাহাড়ের কোল জুড়ে সবুজের অপরূপ ঢেউ;
আকাশের আঙ্গিনায় আলুথালু মেঘেদের নাচ,
বিরান আমার ঘর, শুনশান, জানলো না কেউ।

চাঁদের জোছনা মাখে সোনারঙ ফসলের মাঠ,
তক্ষক ডেকে যায়, কেঁপে উঠে রাতের শরীর;
তোমার রূপের শিখা আগুনের রোশনি ছড়ায়-
আমি জ্বলে পুড়ে ছাই, তুমি হাসি হাসো পাতকীর।


কবিতা ও ছন্দ

ছন্দের ঝংকারে ভাবের উদয়,
ছন্দ কবিতা ধারা করে প্রাণময়।

কবিতা মনের কথা সকপটে কয়,
ছন্দের ঘোরে কাটে কবিতা সময়।

কবিতা ছন্দে খোঁজে সুর, তাল, লয়,
কবিতার শুঁক-সারি বাঁধা তাতে রয়।

বৃষ্টির এলো জলে সোঁদা মৃন্ময়,
ছন্দে কবিতা ভনে বাণী চিন্ময়।

ছন্দে উছল সদা কবির আলয়,
কবিতা ছন্দহীনা? তা কি করে হয়?

কবিতা শরীর হলে ছন্দ হৃদয়,
ছন্দ-মাধুরী আনে কবিতার পয়।

ছন্দ কবিতা কথা করে বাঙময়,
ছন্দেই কবিতার জয় পরাজয়।


প্রিয়তমাসু

কত যে বসন্ত গেলো সময়ের রথে,
স্মৃতি আছে জেগে সোঁদা জীবনের পথে।
আজো পাখি গান গায়, ফোটে ফুল বনে,
মধুপেরা মেতে উঠে মধু আহরণে।

জোছনায় ভরা নদী সাজে নিশিরাতে,
বাজে শাঁখ, উলুধ্বনি মদির প্রভাতে।
শিশির জড়িয়ে ধরে মাধবীর লতা –
চুপিসারে বলে দেয় হৃদয়ের কথা।

বাতাসে পাতারা ঝরে, করে কানাকানি,
দূরের পাহাড় ডাকে দিয়ে হাতছানি।
আকাশ বিথারে গুরু মেঘের বারতা-
বাদলের ধারা হয়ে ছড়ায় মমতা।

শুঁক সারি প্রণয়ের গান যায় গেয়ে,
তুমি আমি স্বপনের তরী যাই বেয়ে।
থাকো পাশে প্রিয়তমা হাত রেখে হাতে,
এ জীবন কেটে যাক দোঁহে, এক সাথে।


জল কুমারী

শেষ বিকেলের ঢেউ তির তির ঝিলের জলে-
পা ডুবিয়ে ভাবছো কি গো, সোনার মেয়ে?
জল সায়রে আলতা তোমার পড়ছে গলে,
সূর্য ধীরে অস্তাচলে যাচ্ছে ধেয়ে।

নলখাগড়া ধিনাক নাচে জলের তালে,
ফিঙে, টিয়ে গানের সুরে ভুবন মাতায়;
লাগলে হাওয়া পানসী নাওয়ের রঙীন পালে –
কাঁপন জাগে লজ্জাবতী পদ্ম পাতায়।

ঝিলের বুকে তোমার মোহন ছবি এঁকে –
উর্মিমালা দোল খেয়ে যায়, ছড়ায় বিভাস;
মাছগুলো সব ভীড় করেছে তোমায় দেখে,-
ভাবছে তুমি জল কুমারী, জলেই নিবাস।

অভ্রমালার মাতামাতি আকাশ জুড়ে,
চড়ুই পাখির আনাগোনা কাশের বনে;
শ্যামল বরণ একটি ছেলে একটু দূরে-
ভাবছে শুধু তোমার কথা আপন মনে।

সেই ছেলেটা তোমার রূপের কসম দিয়ে –
ডাকছে তোমায় প্রণয়কাতর চোখের ঠারে;
জলের সাথে খেলছো তুমি চুল ভিজিয়ে –
জলের নেশায় বিভোর হয়ে জলের ধারে।


হাতছানি

এক দিন এই আমি সব ছেড়ে চলে যাবো দূরে,
স্মৃতি কিছু রেখে যাবো শিশিরের আল্পনা জুড়ে।
কুড়াবো না ফুল আর তপোবনে হয়ে বনমালি,
মালা আর গাঁথবো না, সাজাবো না প্রণয়ের ডালি।

তোমার নেশার টানে যাবো না তো সোনাদিয়া ঘাটে,
যাবো না তোমাকে নিয়ে টিয়ারঙ ফসলের মাঠে।
তোমার বাহুর ডোরে আমি আর আসবো না ফিরে,
মিশে যাবো ছকে বাঁধা উদাসীন সময়ের ভিড়ে।

ফাগুনের সন্ধ্যায় রাখালেরা ফিরে গেলে ঘরে-
হাতে হাত রেখে আর হাঁটবো না মেঠো পথ ধরে।
‘কাছে এসো’ বলে আমি ডাকবো না আর চুপিসারে,
বসবো না মুখোমুখি হাড়িধোয়া নদীটির পারে।

মিহি রোদ গায়ে মেখে মনকাড়া শরতের প্রাতে-
গান আর গাইবো না লেজঝোলা পাখিটার সাথে।
জ্যোৎস্নার রাতে তুমি তবু পথ চেয়ে রবে, জানি,
আকাশের তারা হয়ে আমি শুধু দেবো হাতছানি।