শহিদের নামে রোপিত কৃষ্ণচূড়ার পথ ধরে ॥ সাইফুল ইসলাম

দাদুর গ্রামে মায়ের সঙ্গে রুম্পা নিয়োগী


একুশ বছর বয়সী রুম্পা নিয়োগী, থাকেন ঢাকা শহরে, পড়েন নটরডম বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএতে। বাবা বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজের সহকারি অধ্যাপক ডা. আশীষ শংকর নিয়োগী ও মা করবী নিয়োগী। রুম্পা নিয়োগী বাবার কাছে শুনেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহিদ তার দাদু প্রিয় শংকর নিয়োগী ওরফে সুধা নিয়োগীর কথা। তাদের গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, শান বাঁধানো ঘাটের গল্প। শুনেছেন, শৈশব-কৈশোরে তার বাবার গ্রাম-জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানোর গল্প। কিন্তু বাবার সে গল্পের গ্রাম কখনো দেখা হয়নি রুম্পা নিয়োগীর। সম্প্রতি তার দাদু শহিদ সুধা নিয়োগীর নামে রোপন করা কৃষ্ণচুড়া গাছ দেখতে এসেছিলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের তেতুলিয়া গ্রামে।

প্রায় ৪০ বছর পর গ্রামে আসেন ডা. আশীষ শংকর নিয়োগী এবং তার স্ত্রী করবী নিয়োগী, সঙ্গে তাদের মেয়ে রুম্পা। শহিদ বাবার নামে রোপন করা কৃষ্ণচুড়া গাছই ডা. আশীষের পরিবারকে টেনে এনেছে তার শৈশব কৈশোরের গ্রাম তেতুলিয়ায়।

গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তীর জন্মভূমি সিরাজগঞ্জের তেতুলিয়া এলাকায় হিন্দু প্রধান গ্রাম হিসেবে পরিচিত। গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের বসবাস, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ। গ্রামের প্রিয় শংকর নিয়োগী ওরফে সুধা নিয়োগী ছিলেন বনবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল পাকসেনারা দখল করে নেয় মহকুমা শহর সিরাজগঞ্জ। গঠিত হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী। এ সময়েও হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই হয়েই বাস করছিল গ্রামে। ১১ মে পাকসেনা ও তার দালালেরা হামলা চালায় তেতুলিয়ায়। সেদিন তেতুলিয়া ও তার আশপাশের গ্রামগুলিতে গুলি করে হত্যা করে স্কুল শিক্ষক প্রিয় শংকর নিয়োগী, হোসেন সিদ্দিকীসহ ১৪ জনকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকারদের ভয়ে গ্রামবাসী এবং শহিদদের স্বজনরা সেদিন কাউকেই যথাযথ ভাবে সমাধিস্থ করতে পারেনি। এই শহিদেরা মিশে আছেন এই মাটিতেই।

একাত্তরের গণহত্যায় নিহতদের শহিদের মর্যাদা দাও- এ দাবিতে সম্প্রতি গঠিত সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে সন্ধ্যায় গণহত্যা ও যুদ্ধস্থান, বিভিন্ন শহিদ মিনারে মোমবাতি প্রোজ্জ্বলন, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা দিবস বিজয় দিবস উপলক্ষে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারকে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ফুল দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের রীতি চালু করে। সংগঠনটি তৃণমূলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং ইতিহাস রক্ষার্থে মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদের নামে নামে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কৃষ্ণচুড়া গাছ রোপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সব গাছ রোপন করা হচ্ছে গ্রামবাসীর উদ্যোগে। গাছ রোপন করতে গিয়ে গ্রামের উদ্যোগী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে উঠছে নানা টানাপোড়েনে গ্রাম ছেড়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের।

গ্রামের শহিদ শিক্ষক হোসেন সিদ্দিকীর ছেলে সাজেদুল ইসলাম পান্না যোগাযোগের উদ্যোগ নেন গ্রামের অনুপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সঙ্গে। শহিদ শিক্ষক প্রিয় শংকর ওরফে সুধা নিয়োগী পরিবার গ্রামে অনুপস্থিত প্রায় চল্লিশ বছর। স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই শহিদের ৪ পুত্র আর ২ কন্যার প্রায় সবাই চলে গেছেন ভারতে। খুঁজতে খুঁজতে যোগাযোগ গড়ে ওঠে শহিদ প্রিয় শংকর নিযোগীর ছেলে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজের সহকারি অধ্যাপক ডা. আশীষ শংকর নিয়োগীর সঙ্গে। অনেক আগে গ্রামের পাঠ চুকিয়ে তিনি স্থায়ী হয়েছেন ঢাকায়। পান্নার যোগাযোগে ভীষণ খুশি হন ডা. আশীষ। তার শহিদ বাবাকে এখনো মনে রেখেছে গ্রামবাসী, দেশবাসী। নিয়মিত যোগাযোগ হতে থাকে গ্রামের সঙ্গে। সেই তেতুলিয়া গ্রামে সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদদের নামে রোপন করা হয় কৃষ্ণচুড়া গাছ।
দাদুকে দেখেনি রুম্পা নিয়োগী, দেখেনি বাবার গ্রামও। বাবার শৈশব কৈশোরে দাপিয়ে বেড়ানো গ্রাম আর শহিদ দাদুর নামে রোপন করা কৃষ্ণচুড়া গাছ দেখার ইচ্ছাই আবার তাদের টেনে আনে গ্রামে। যেন সেই কৃষ্ণচুড়া গাছের মাঝেই দেখবেন তার পূর্ব পুরুষকে। মেলাবেন শষ্যক্ষেত, আমবাগান, পুকুরঘাট, খেলার মাঠে দাপিয়ে বেড়ানো পিতার স্মৃতিকথা।

শারদীয় দূর্গা পুজার ছুটিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে রুম্পা ঢাকা থেকে রওনা হন। পথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয় গ্রামের আরেক শহিদ সন্তান সাজেদুল ইসলাম পান্নার সঙ্গে। সে-ও উত্তেজিত। প্রায় ৪০ বছর পরে গ্রামে আসছেন তাদের প্রিয় কিষাণ (পোষাকী আশীষ শংকর নিয়োগী নামটি তো তারা ভুলেই গিয়েছিলেন)। খবর দেয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রবি নিয়োগীর ছেটাভাই সজল কুমার নিয়োগীকে, সে আশীষ নিয়োগীর নিকটাত্মীয়। অল্প সময়ের মধ্যে খবর রটে যায়, শহিদ প্রিয় শংকর নিয়োগীর ছেলে কিষাণ ওরফে আশীষ নিয়োগী ৪০ বছর পর গ্রামে আসছেন তার স্ত্রী, কন্যা নিয়ে।
রুম্পার মনে সংশয়, যে গ্রামে সে কোনও দিনও যায়নি, বাবাও অনুপস্থিত প্রায় ৪০ বছর, মা তো গ্রামে থাকেনইনি, সে গ্রামের মানুষ তাদের কিভাবে নেবে?

তবুও ভীরু পায়ে আসেন শহিদ দাদু আর বাবার শৈশব-কৈশোরের গ্রামে। দীর্ঘদিন পর মাটির কোলে পা রাখেন কিষাণ ওরফে আশীষ নিয়োগী। শহিদ সন্তান সাজেদুল ইসলাম পান্না, মুক্তিযোদ্ধার ভাই সজল নিয়োগীসহ গ্রামের অনেকেই দাঁড়িয়ে তাদের অপেক্ষায়। করোনার শত্রুতায় তারা বুকে টেনে নিতে না পারলেও অভ্যার্থনায় আন্তরিকতার কমতি ছিল না কারো মাঝে। গ্রামবাসীর আপ্যায়নে অভিভূত রুম্পা নিয়োগী, গ্রামের বধূ করবী নিয়োগীও। দ্রুতই সহজ হয়ে ওঠেন গ্রামবাসীর সঙ্গে, ছুটে বেড়ান ধানক্ষেত, আমবাগান, পুকুরঘাট, বাপদাদার পৈত্রিক ভিটায়। ছবি তোলেন। ভোলেন না, দাদু শহিদ প্রিয় শংকর নিয়োগী ওরফে সুধা নিয়োগীর নামে লাগানো কৃষ্ণচুড়া বৃক্ষের কাছে যেতে, কারণ এ বৃক্ষই তাদের টেনে এনেছে শেকড়ে।

মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বাবা প্রিয় শংকর নিয়োগী’র নামে লাগানো কৃষ্ণচুড়া গাছের কাছে
স্ত্রী করবী নিয়োগী’র সঙ্গে ডা. আশীষ শংকর নিয়োগী