শহিদ মিনার ও বাংলাদেশের কবিতা : প্রেক্ষিত একুশে ফেব্রুয়ারি॥ প্রতাপ ব্যাপারী


মানুষের আবেগ-অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক প্রকাশ মাতৃভাষার মাধ্যমে। সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সবাই আন্তরিক। বাংলাদেশের মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে তারা কেবল ভাষাকে ভালোইবাসেনি, ভাষার সম্মান রক্ষার্থে শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলা ভাষার মর্যাদা।

আধুনিককালে ভাষার প্রশ্নে বাঙালির সংগ্রামের শুরু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই।
মহম্মদ আলী জিন্নাহ্ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রথমে উর্দুর কথা ঘোষণা করেন। ঢাকায় তিনি যেদিন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার কথা বলেন সেদিন সেখানে উপস্থিতি বাঙালিরা সমবেত কণ্ঠে ‘না না’ ধ্বনির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। বাঙালির এই ‘না’ শব্দটিই ছিল ভাষা-আন্দোলনের সূচকশব্দ যার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি। এদিন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য শহিদ হন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, আব্দুস সালাম, শফিউর রহমান, অহিউল্লাহ, আব্দুল আওয়াল এবং এক অজ্ঞাত বালক।

১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন একদিকে রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করেছে তেমনি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভাষা-সংস্কৃতির এই প্রভাব অনিবার্যভাবেই সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। তবে কবিতায় এর প্রকাশ সর্বাধিক।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে অসংখ্য কবিতা রচিত হয়েছে। হয়েছে একাধিক সংকলন। একুশের রক্তে বাংলাদেশের রাজপথ কেবল রক্তাক্ত হয়নি, বাঙালির হৃদয়ও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। তাই একুশ-কেন্দ্রিক কবিতায় সুপ্ত হয়ে আছে বাঙালির রক্তক্ষরণের ইতিহাস। এ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘একুশ নিয়ে আমাদের দেশে যত কবিতা লেখা হয়েছে আর কোন একক ঘটনা নিয়ে তত কবিতা রচিত হয়নি, একুশে ফেব্রুয়ারি যত গভীরভাবে আমাদের কবিতাকে আলোড়িত করেছে আর কোনো বিষয় তা করতে পারেনি। একুশের কবিতায় তাৎক্ষণিক এবং সুদূর প্রতিক্রিয়া ও অনুপ্রেরণার সঞ্চার করেছে’।

একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম কবিতা রচিত হয় চট্টগ্রামে। ভাষা-আন্দোলনের শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে ঐদিন সন্ধ্যায় মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচনা করেন ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি। কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করে। আলোচ্য কবিতার প্রতিটি লাইনে কবি নিজের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। কবিতার প্রতিটি শব্দেই কবি প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়েছেন। বাংলা ভাষার দাবিতে যাঁরা প্রাণ দিয়েছে, যাঁদের প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ, তাঁদের মৃত্যুতে কবি কাঁদতে আসেননি। যারা বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় কবি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছেন—
যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে
চেয়েছে তাদের জন্য
আমি ফাঁসির দাবি করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্য
ফাঁসির দাবি করছি’
(কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি)
একুশে ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ড কবির অন্তরে যে ক্রোধের আগুন জ্বালিয়েছিল তারই কাব্যিক প্রতিবাদ আলোচিত কবিতাটি। শাসকের বর্বরতা সে-দিনের মানুষকে কতটা আলোড়িত করেছিল তার আভাস কবির কলমে ফুটে উঠেছে। একুশে ফেব্রুয়ারির একবছর পর ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম কবিতা-সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’। আলোচ্য সংকলনে যাঁরা কবিতা লিখেছেন তাঁদের মাঝে রয়েছেন, শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান প্রমুখ।

এঁদের প্রত্যেকের কবিতা ‘একুশের কবিতা’ নামে সংকলিত হয়েছিল। একুশের চেতনা সে-দিনের বাঙালি মননকে কতটা গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল তার প্রমাণ এই নামকরণ। ভাষা-আন্দোলন যেমন পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল তেমনি এই কবিতা-সংকলনটিও পরবর্তী কাব্যধারার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ-সম্পর্কে সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান সংকলনের ভূমিকাতেই বলেছেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাকিস্তানে শুধু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি করেনি, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এনেছে দিগন্ত-বিস্তারী প্লাবন। …ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি এই দরদ পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের নতুন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে—আপামর মানুষের মনে আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিকে নতুন সম্ভবানার পথে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে’।

১৯৫৩ সালের পরেও একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে একাধিক সংকলন। সবক্ষেত্রেই একুশের তাৎপর্যকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতায় তুলে ধরেছেন কবিরা। তবে একুশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যত কবিতা রচিত হয়েছে তার মধ্যে শহিদ মিনার উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। শহিদ মিনার সেদিনের জনগণ ও কবিদের কতটা আলোড়িত করেছিল তাই এখানে আলোচ্য।
১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি শহিদদের মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি আত্মোৎসর্গকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে শহিদ মিনার নির্মাণ শুরু করেন। এক রাত্রির অমানুষিক পরিশ্রমে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা হোস্টেলের বারো নম্বর শেডের পূর্বপ্রান্তে দশ ফুট উচ্চতা ও ছয় ফুট চওড়া মিনার প্রস্তুত করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে এই মিনারের উদ্বোধন করেন শহিদ শফিউর রহমানের পিতা। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটায় পুনরায় এই মিনারের উদ্বোধন করেন ‘আজাদ’পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। কিন্তু শহিদদের স্মৃতি শহিদ মিনারের মধ্যে দিয়ে বাঙালির হৃদয়ে যাতে চিরস্থায়ী না হতে পারে সেজন্য ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনাবাহিনী মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল ঘিরে ফেলে শহিদ মিনারটি ধ্বংস করে দেয়। এ সম্পর্কে কবি, রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক বলেন, ‘জনমনে সৃষ্ট আবেগের ব্যাপকতায় ভয় পেয়ে গেল সরকার। তাই শহীদ শফিউর রহমানের পিতা আনুষ্ঠানিকভাবে মিনার উদ্বোধনের এক দিন পর শেষ বিকেলে তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো পুলিশ। শেষ ইটখানা পর্যন্ত ওরা ট্রাকে তুলে নিয়ে গেল। কিন্তু শহীদ মিনার মরেনি’। শহিদ মিনার ধ্বংসে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সরকারি প্রচেষ্টার ফল হয় উল্টো। শহিদদের রক্তমাখা আন্দোলনের স্মৃতি মিনারের মধ্যে দিয়ে আগেই জনমানসে স্থান লাভ করেছিল। কিন্তু মিনারের ধ্বংস জনগণের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে আন্দোলনের ইতিহাসকে চিরস্থায়ী আসন দান করে। কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক নয় সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নির্মাণেও এই স্থাপত্যকীর্তি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। সাহিত্য, বিশেষত কবিতায় বারবার এই সৌধস্মারকের উপস্থিতিই তার প্রমাণ।

১৯৫২ পরবর্তী সময়ে ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যত কবিতা রচিত হয়েছে তার একটা বড় অংশ জুড়েই রয়েছে এই মিনার নির্মাণ ও ধ্বংসের কাহিনি। ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনার ধ্বংসের প্রতিক্রিয়ায় ঐ রাতে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ রচনা করেন ঐতিহাসিক ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতাটি। বাস্তবের মিনার ধ্বংস হলেও চারকোটি বাঙালির একতা যে অদৃশ্য মেলবন্ধনস্বরূপ মিনার হৃদয়-মধ্যে রচনা করেছে, তাকে মুছে ফেলা যাবে না। সে-জন্য পাকিস্তানি শাসকের প্রতি শুরুতেই কবি জানিয়েছেন,
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু,আমরা এখনো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো!…
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নামে।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্রশিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর।
(স্মৃতিস্তম্ভ)
শব্দমালার সংহত বন্ধনে গাঁথা কবিতাটি স্মৃতিস্তম্ভের মতোই বলিষ্ঠ স্থাপত্যেরই প্রতীক। প্রতিটি শব্দবন্ধেই শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। বাস্তবের স্থাপত্যকীর্তি ধ্বংস হলেও তার অনুরণন সহজেই বাঙালির চেতনায় স্থান করে নিয়েছে। ভাষা শহিদ ও শহিদদের স্মৃতিতে নির্মিত মিনার উভয়ই স্থান করে নিয়েছে কবির চেতনার গভীরে। তারই পরিশীলিত প্রকাশ ঘটেছে বেহালার সুরে, প্রেমের ফেনিল শিলায়। পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে কবি রক্তমাখা আত্মদানের স্মৃতিকে অনুভব করতে চেয়েছেন। তাই প্রতিটি হৃৎস্পন্দনে তিনি অনুভব করেছেন ভাষা-শহিদদের উপস্থিতি। সেই অনুভবকে বাস্তবের মধ্যেও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তাই হাজার মুষ্টিবদ্ধ হাত কবির মানসচক্ষে মিনারের স্মৃতিসৌধ রচনা করেছে। যেখানে হাজার হাজার হাত সূর্যকণার মতো অগ্নিময় উপস্থিতি নিয়ে হাজির হয়েছে, রচনা করেছে প্রতিজ্ঞার সৌধ।
মিনারের প্রতিটি ধ্বংসকণাই মানুষের চেতনার প্রতিটি স্তরে নতুন বাসনার জন্ম দিয়েছে, সেই বাসনার রূপায়ণে বারবার সংঘবদ্ধ হয়েছেন বাংলার মানুষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়, বিবর্তিত হয় মানুষের চিন্তা-চেতনাও, কবিদের কাব্যভাবনাও। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষা শহিদদের স্মৃতিতে নির্মিত মিনার ষাটের দশকে এসে নতুন মাত্রা লাভ করে। বায়ান্নর আন্দোলন ছিল মূলত ভাষা-কেন্দ্রিক কিন্তু ভাষার দাবি জানাতে গিয়েই পূর্ব-বাংলার মানুষ উপলব্ধি করে স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করলেও তাঁরা আসলে পরাধীন। পরাধীনতার বেদনা তাঁদের মনে যে ক্ষোভের সঞ্চার করে তার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রক্তের বিনিময়ে বাংলা ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। এই ঘটনা পূর্ব-বাংলার জনগণকে এই মন্ত্রে শিক্ষা দেয় যে এইরকম রক্তক্ষয়ী আন্দোলনই পারে তাঁদের স্বাধীনতা এনে দিতে। সে-জন্য দেখা যায় ভাষা-আন্দোলনের আবহেই ষাটের দশকে সংগঠিত হয়েছে একাধিক আন্দোলন। আর সবক্ষেত্রেই অনুপ্রেরণার শক্তি হিসাবে কাজ করেছে শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের রক্তমাখা স্মৃতি আর শহিদ মিনার। এই সময়ের প্রেক্ষাপটে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে শহিদ মিনারের চিত্রকল্পে নতুন মাত্রা আনে বেলাল চৌধুরীর কবিতায়। কবি বলেন,
জীবপঞ্জির পাশে ফুটেছে খই-য়ের মতো অজস্র মা-ফুল
মানে শহিদ জননী-
সোনার ছেলেরা যে পড়ে পড়ে ঘুমোয় তাদেরই বুক জুড়ে,
মাতা বসুন্ধরার বুকে মুখ গুঁজে ঘুমোয় তারা মৌন মূক এক
মহা ঘুমে
খড়কুটো মুখে অস্থির পাখিরা ব্যস্ত নখর আর চঞ্চু খুঁটে-
নীড় রচনায়,
চতুষ্পার্শ্বে ভাষা জননীর আঁচল ওড়া প্রবল হাওয়া
গোটা দেশ জুড়ে মাথা তুলে দাঁড়ায় শতসহস্র শহিদ মিনার।
(গোটা দেশই শহীদ মিনার)
উপরের কবিতাগুলি ১৯৫২ সালে যে মিনার নির্মিত হয়েছিল এবং ধ্বংস করা হয়েছিল তাকে কেন্দ্র করেই রচিত। ফলে এই ধরনের কবিতায় একধরনের দুঃখজাত অনুভূতি প্রধান হয়ে উঠেছে। কবির চোখে স্মৃতির মিনার ও এর ধ্বংসই কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। শহিদ মিনারের ধ্বংসাবশেষ তাঁদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা এই মিনার-কেন্দ্রিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য।

১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভের পর পুনরায় মিনার গড়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে মিনারের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৬২ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল আজম খান অসমাপ্ত মিনারের কাজ সম্পন্ন করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাহমুদ হোসেনকে সভাপতি করে চৌদ্দ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ এই অসমাপ্ত মিনারের মধ্যে দিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন দিনের আন্দোলনে শপথ নিয়েছে। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম শহিদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম নবনির্মিত শহিদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত নয় বছর দেশের মানুষের কাছে এই শহিদ মিনার ছয়-দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণার উৎসস্থল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী এই শহিদ মিনার ভেঙে দেয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে শহিদ মিনার পুনর্নির্মিত হয়। ইতিহাসের এই ধারাক্রম থেকে দেখা যায় শাসক শক্তি বারবার মিনার ধ্বংস করে পূর্ব-বাংলা তথা পূর্ব-পাকিস্তানের আন্দোলনের ভিত্তিভূমিকে দুর্বল করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিবার মিনার পুনর্নির্মাণ করে জনগণ নিজেদের দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। শহিদ মিনারের মধ্যে দিয়ে বাঙালির প্রতিবাদের একটি অধ্যায় রচিত হয়েছে। দেশ স্বাধীন হলেও মানুষ অতীতকে ভোলেননি। নতুন দিনের শপথ নিতে, আগামীর পথে এগিয়ে চলার প্রেরণা পেতে বারবার বাংলাদেশের জনগণ মিনারের পাদদেশে জড়ো হন।

বারবার শহিদ মিনার ভাঙা-গড়ার মধ্যেই বাঙালির প্রতিবাদ-প্রতিরোধ প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। কারণ মিনারের ধ্বংস, বাঙালির প্রত্যয়ে ধস নামাতে পারেনি। এই অজেয় সত্তার কথাই উঠে এসেছে জাহিদ হায়দারের কবিতায়। কবিসত্তা আর মিনার মিলেমিশে এক হয়ে গেছে,
আর আমি দাঁড়ালাম
এখনো দাঁড়াই
এবং দাঁড়াবো,
হে উত্থান
ঘোর অন্ধকারে
আমার সত্তার আলোজ্বলা প্রাণ
তোমার সম্মুখে;
(শহীদ মিনার)
শহিদের চিরজীবী হয়ে থাকার স্মারক মিনার। কারণ শহিদের রক্তমাখা স্মৃতি নিয়েই মিনার দাঁড়িয়ে। ফররুখ আহমদের কবিতায় তেমনই মিনারের কথা উঠে এসেছে। এই মিনার শহিদদের রক্তঝরা ইতিহাসের একমাত্র প্রতীক,
যাদের বুকের রক্তে মাতৃভাষা পেয়েছে সম্মান,
সঙ্গিনের মুখে যারা দাঁড়ায়েছে নিষ্কম্প, অম্লান,
মানে নাই কোনো বাধা, মৃত্যুভয় মানে নাই যারা
তাদের স্মরণচিত্র এ মিনার—কালের পাহারা!
এখানে দাঁড়াও এসে মনে করো তাদের সে-দান
যাদের বুকের রক্তে মাতৃভাষা পেয়েছে সম্মান।
(ভাষা-আন্দোলনে নিহত শহীদ আত্মার প্রতি)
একুশের কালচেতনা কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কালের সীমা অতিক্রম করে একুশের ভাবনা আজ কালোত্তীর্ণ। তাই শহিদ মিনারের নির্মাণ কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রবাসীদের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের মাটিতে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের এডিনবার্গের ওল্ডহ্যামে এবং ১৯৯৯ সালে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে শহিদ মিনার নির্মিত হয়। শুধু তাই নয়, একুশের এই ভাষা-আন্দোলনকে সম্মান জানিয়েছে জাতিসংঘও। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন শুরু হয়। এই ঘটনা একথাই প্রমাণ করে যে দিন যত গড়িয়েছে বাঙালির ভাষা আন্দোলন এবং শহিদ মিনারের ইতিহাস ততই বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। অতীতের ঘটনার সূত্র ধরে সেই ইতিহাসের কথা জানিয়েছেন কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ—
একুশের পথ ধরে একাত্তরে এলো স্বাধীনতা
অর্জিত যা’ মুক্তিযুদ্ধে, ইতিহাসে আছে তার কথা;
আপনার আত্মদান, ত্রিশ লক্ষ শহীদের স্মৃতি
রয়ে যাবে সমুজ্জ্বল, কত গান, কত গীতি-গাথা,
শহীদ মিনার আর স্মৃতিসৌধ রেখে উঁচু মাথা
স্বাধীন-স্বদেশে পেল ‘একুশ’ যে বিশ্বের স্বীকৃতি
(অমর একুশের গান)
ভাষা আন্দোলন এবং শহিদ মিনার—‘ছয় দফা’ আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা। শহিদ মিনারের প্রতিটি স্তরে স্তরে সেই রঞ্জিত ইতিহাস মূর্ত হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলন এবং শহিদ মিনার যে বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটেও আলোড়ন তুলেছিল তার প্রমাণ শহিদ মিনার-কেন্দ্রিক অসংখ্য কবিতা। এসব কবিতার পংক্তিতে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের ইতিহাসের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে শহিদদের প্রতি ভালোবাসা। তাই সব কিছুকে ছাপিয়ে আজও শহিদ মিনার স্ব-মহিমায় আসীন।