শাসক ও শোষিত এবং অন্যান্য কবিতা ॥ সেঁজুতি বড়ুয়া


শাসক ও শোষিত

একটা লক্ষ্মী পেঁচা বারান্দার ওপার থেকে তাচ্ছিল্যভরে আমায় দেখে
আমি ভয়ে ভয়ে গাছের কোটর থেকে সেদিকে তাকাই
সন্ধ্যালগ্নে ঘন পাতার আড়ালে আরও গভীরে লুকাই
অদম্য হাসিতে পেঁচাটা আজগুবি ছড়া কাটে
‘অশুভ মানুষ’ জ্ঞানে সজোরে ঢিল ছোঁড়ে
চুপ মেরে থাকি, শব্দের প্রতিধ্বনিও যেন না
পৌঁছায় ওর কানে

আমরা নিরীহ, অস্পৃশ্য জাতি
থাকি গাছের কোটরে, ঘনজঙ্গলে
উহারা পেচক। উঁচু উঁচু জাত
দালানে বসতি গাড়ে, আমাদের মারে
তাড়ায় নির্বিচারে
আর পূজনীয়দের কল্যাণে প্রাণ দিতে দিতে
আমরা ধ্যানেমগ্ন থাকি

হে পূজ্য, শুভ পূজনীয়
দয়া আর কিছু মার্জনা দিও
আমরা মানুষ…অমৃত বচনে
জন্মজন্মান্তরে, ধারালো নখরে
যেন ধন্য পেচক হয়ে উঠতে পারি।


বিরুই চালের ভাত

পলাতক সূর্যটা শঙ্খ বাজিয়ে দিলে
চারদিকের স্থবিরতা বেসুরো গান গায়
নিস্তেজ শরীর বাড়ি ফেরে তাড়াতাড়ি
তখন কী এক অতিক্রান্ত জ্বর
অমূলক শ্বাসকষ্ট, ব্যথার শূন্যপুরাণ
সুতার এপার-ওপারে তাতানো ঘ্রাণ ছড়ায়

জলের টুপটাপ শব্দপতনে
স্নানঘরে মহাকাল ক্রন্দনধ্বনি
যেন প্রতিদ্বন্দ্বী, শরীর ঠুকরে খায়
পটাপট শুষে নেয় চোখের বুদ্বুদ
বুকের খোঁড়লে কাঁটার শয্যা পেতে
আয়ুর ভরকেন্দ্রে বসে ধ্যানাসনে

টলমল পায়ে স্নানঘরের এপারে দাঁড়ালে
গোপন ওয়াচ-টাওয়ার সপাটে বন্ধ হয়
তালা ঝোলে ব্যক্তিগত সম্পর্কে, দরজায়
অসুখের চেয়েও তখন বিরুই চালের ভাত
ক্ষুধার নাড়িভুঁড়িতে কামড় বসায়

একথালা টাটকা ভাতের জন্যে সে গোঙায়
বুকভরা শ্বাস নিতে সে চেঁচায় আপ্রাণ
অতঃপর শুশ্রূষাহীন পৃথিবীতে—
মৃত্যুগন্ধী চাঁদ ঝলসানো রুটি হলে
সে ঘুমায় গুটিসুটি অসুখের দাঁতের নিচে।


অসুখ পরবর্তী

তুমি ওর ভিখারিপনা দেখছো?
আমি ওর দৈত্যাকার পা-দুটো দেখি
আলপথের শিশির মাড়িয়ে পা দুটো
যখন দাঁড়ায় লকডাউন শহরে
করুণা হয় না, ওর জন্যে যন্ত্রণা হয়
ভালোবাসায়- মন্ত্র পড়ি পথে পথে
নুড়ির বদলে ঝরা পাতা রাখি বিছিয়ে।

কঠিন শপথে মরমব্যথায় যখন পরাই
ওর ঘোরগ্রস্ত পায়ে- নরোম ব্যান্ডেজ
তখনো আবেগে ওকে জ্বলন্ত মানুষই লাগে
শিশির মাড়ানো মানবপিপাসার মতো
সেও সকরুণ হাসে, প্রতিবাদে গর্জে ওঠে

দগ্ধ পা দুটো, ফোস্কা পরা ক্ষত
-পারলে ক্ষমা করে দিস, ভাই।