শিউল মনজুরের কবিতা

পৃথিবীটা আজ জেলিফিসের মতো

এইসব কৃতকর্মে দর্শনে জলবায়ুও বিষণ্ন হয়ে পড়েছে। নদী ও সমুদ্র আজ আমাদের বিপক্ষে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। পাহাড় পর্বতের বিপন্ন প্রাণীকুল অবিরাম অভিশাপ দিচ্ছে। ঘরের চড়ুই সেও আজ দূর নির্বাসনে। সুরে সুরে প্রার্থনায় ঘুমভাঙ্গানো দোয়েল কোয়েল বুলবুলি টিয়া টুনটুনিরা যে আজ কোথায়, জানি না, চোখে পড়ে না। অভিমানে তারাও আসে না ছায়াহীন লোকালয়ে।

অরুণ্যছাড়া বৃষ্টি কি ভালো লাগে। ধূলোবালির শহরে, চাকার কর্ষণে ঘর্ষণে, নির্মাণে শিল্পের দূষণে, বায়ু ও জলে ঘাতক জীবাণু উড়ছে ঘুরছে মহানন্দে, আমাদের এই রন্ধনশালায় আর রক্তমাংসেরপাঠশালায় তাদেরও জগৎ সংসার গড়ে নিয়েছে আরামে আয়েশে।

তুমি এখন খুঁজে পাবে না অরুণ্য, তুমি পাবে ক্লিনিক হাসপাতাল, তুমি এখন খুঁজে পাবে না নদী জলের কোলাহল তুমি পাবে ঝড় ও ভূমিকম্প। তুমি অরুণ্যকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বেদনায় ভাসিয়েছো। নদীকে করেছো প্রতিদিন নিঃস্ব। এমনকি জান্নাতিঝর্ণার প্রসবণকে তুমি গলাটিপে থামিয়ে দিয়েছো অবলীলায়। তুমি নিজেই সৃষ্টি করেছো নিজের মৃত্যকুপ।

এইসব কৃতকর্মে দর্শনে হারিয়ে যাচ্ছে, জীবনানন্দের শৈশব কৈশোরের মাঠ, হারিয়ে যাচ্ছে অঘ্রাণের শাদাশাদা কুয়াশামাখা ভালোবাসার গ্রাম, সবুজঘাসের স্বর্ণালিশিশির বিন্দু, কৃষকের সোনালি স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা সোনারাঙা ধানের মাঠ, হারিয়ে যাচ্ছে কাদা জলের বর্ষারবিল। বুকের ভেতরে বেড়েই চলেছে ব্যথা, স্বপ্ন হারানোর হাহাকার নিয়ে যুবক হাঁটছে একা একা।

এই পৃথিবীটা আজ জেলিফিসের মতো! সে যেনো দুঃখে অভিমানে রাগে গোস্বায় নীল থেকে নীল হতে হতে এখন সে কখনো লাল কখনো হলুদ। দেখতে দেখতে ফুঁসে ওঠে ভূমিকম্পে, দেখতে দেখতে ফুঁসে ওঠে ঝড় জলোচ্ছ্বাসে, দেখতে দেখতে ফুঁসে ওঠে অগ্নিধ্বংসে, দেখতে দেখতে ফুঁসে ওঠে মহামারিতে, সুনামিতে!

এইসব কৃতকর্মে ছায়া ডাকা, মায়া মাখা বিশ্বভুবন তার রঙ বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেউ কি আছে ফিরিয়ে দেবে অরুণ্য? কেউ কি আছে ফিরিয়ে দেবে নদীর হারানো জলস্রোত? কেউ কি আছে ফিরিয়ে দেবে আমাদের সোনারাঙাধানের মাঠ? অভিমানী পাখিরা ফিরবে, ঝাঁকে ঝাঁকে মাছেরা আসবে, ঘরে ঘরে পিঠা উৎসেব প্রাণ ফিরে পাবে সবুজগ্রাম- এমন সম্ভবনার অসম্ভব আশা নিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছেই মুনাজাত ধরি, মাবুদ, আমাদেরকে মাফ করে দাও, মানুষের মতো মানুষ বানিয়ে দাও। পৃথিবীটা আবারো ভালোবাসায় পূর্ণহোক।


তুমি অপেক্ষা ও সুন্দরের

দূরের আকাশ থেকে রচনা করেছি রোদ ও বসন্ত
তুমি অপেক্ষা ও সুন্দরের

দিন যাচ্ছে, যাবেই তো…
মেঘে ডেকে আছে রোদ, ডেকে আছে বসন্ত
লতাপাতারাও বৃষ্টির প্রার্থনায় মগ্ন

দিন যাচ্ছে, যাবেই তো…

দূরের বনে পাখি ডাকছে,
সবুজগ্রামের কৃষক ভোরের আলোয় মাঠের দিকে যাচ্ছে
ঘাটেবাধা খেয়ানৌকার দড়ি খুলছে মাঝি
পুকুরঘাটে গোমটা খুলছে পল্লীবধু

দূরের আকাশ জানান দিয়েছে আজ বৃষ্টি হবে

তুমি অপেক্ষা ও সুন্দরের
আলো ছড়িয়ে রোদ ও বসন্ত আবারো জেগে উঠছে

বারান্দায় লতাপাতারা বাতাসের তীব্রতায় দুলছে


কবিতার গেস্টহাউসগুলো

একদিন, তোমার জন্যে আমি বেরিয়েছিলাম ভাঙ্গাচোরা দীর্ঘতম এক রাস্তায়
একদিন, তোমার জন্যে ঝড়ের রাত্রিতে একা একা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম দূরের রেঁস্তোরায়।

কেউ দেখেনি, জোনাকিরা পাঠ করেছিলো এই নিঃসঙ্গতাবোধের একশ এক পঙক্তি
কেউ দেখেনি, ঝিঁঝিঁ পোকারা প্রতিদিন গোধূলি বেলায় কেঁদেছিলো পুরো একটা মৌসুম।

কেউ বলেনি, তবু তোমার জন্যে প্রিয় হয়ে উঠেছিলো ওমর খৈয়াম থেকে জীবনানন্দ দাশ
কেউ বলেনি, তবু তোমার জন্যে রক্তমাংসের ববিতা হয়ে উঠেছিলো প্রিয় কবিতা।

কেউ ডাকেনি, পোস্ট অফিসের লালবাক্স পাঠ করেছিলো আমার প্রেমপত্রের ঠিকানা
কেউ ডাকেনি, কবিতার গেস্ট হাউসগুলো হয়ে উঠেছিলো আমার প্রতিদিনের সংসার।

কেউ দেখেনি, কেউ বলেনি, একদিন তুমি আমার হাত ধরেছিলে বসন্ত কোলাহলের সকালে
কেউ দেখেনি, কেউ বলেনি, একদিন তুমি আমার হাত ছিন্ন করেছিলে মেঘবিরহের সন্ধ্যায়।