শুভ জন্মদিন রাজীব ভাই ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক



পড়েছি আইনে। হওয়ার কথা ছিল আইনজীবী। বেশ কিছুদিন শিক্ষানবিস আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিসও করেছি। তবে, আইনজীবী হতে পারিনি। বলা যায় হতে চাইনি। হতে যে চাইনি, তার পেছনে আমার আলস্য যতটুকু, তারও চেয়ে বেশি রয়েছে অগ্রজ দুই কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকের প্রভাব। তাদেরই প্রেরণায় ওকালতি পেশাকে ‘না’ করে দিয়ে বেছে নিয়েছি সাংবাদিকতা। যে দুজনের অনুপ্রেরণায় আদালতপাড়া থেকে গণমাধ্যমে ঢুকেছি, তাদের একজন কথাশিল্পী-সাংবাদিক রাজীব নূর। মূলত তার অনুপ্রেরণা ও প্রশ্রয়েই দিন দিন সাংবাদিকতাকে একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হই। কথা ছিল রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় কাজ করবো। কিন্তু ঘটনাক্রমে জাতীয় দৈনিকে আমার প্রথম চাকরি শাহরিয়ার ভাইয়ের (আবু হাসান শাহরিয়ার) সঙ্গে দৈনিক আমাদের সময়ে। সেই ঘটনা অনেক দীর্ঘ ও জটিল। অন্যসময় বলা যাবে। আজ রাজীব ভাইয়ের প্রসঙ্গে বলি।

রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ-পরিচয় সুখকর নয়। তার শুরু চরম তিক্ততায়। একদিন শাহবাগে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ নাজিব ভাইয়ের (কথাশিল্পী নাজিব ওয়াদুদ) ফোন, ‘নূরুল হক, আপনি কই?’ বললাম, জাদুঘরের সামনে। ফোনে কথা শেষ হতে না হতেই, নাজিব ভাই এসে হাজির। বললেন, চলুন। কোথায় যাবো, জানতে চাইতেই বললেন, ইত্তেফাকে। আর কোনো কথা না বলেই নাজিব ভাইয়ের সঙ্গে উঠলাম সিএনজিতে। ইত্তেফাকের সাহিত্যবিভাগ তখন সম্ভবত ৪০ কাওরানবাজারের সাততলায়। সেখানে গিয়ে হাজির হলাম আমরা। নাজিব ভাই-রাজীব ভাই দুজনেই সাহিত্যের নানা বিষয়ে কথা বলছিলেন। তারা এত সব ভারী বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন, আমি ওই আলোচনায় অংশ নেওয়ার সাহসই পেলাম না।

একপর্যায়ে নাজিব ভাইকে রাজীব ভাই বললেন, ভাই ভালো প্রবন্ধ পাই না। কী করি বলুন তো? নাজিব ভাই প্রবন্ধের কেন আকাল, এসব বিষয় নিয়ে দুই-একটি কথা বলার পর বললেন, আমার কাছে একজনের দুই তিনটি প্রবন্ধ আছে। আমি আপনাকে ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছি। পড়ে দেখুন পছন্দ হয় কি না। (এখানে বলি রাখি, ২০০৭/৮ সালের দিকে আমি কোনো প্রবন্ধ/গল্প লিখলে প্রথমেই নাজিব ওয়াদুদকে পাঠাতাম। তার পরামর্শ নিয়ে পরে সংশোধন করে চূড়ান্ত করতাম।) রাজীব ভাই মেইল খুলে পড়া শুরু করলেন। একটি প্রবন্ধ পড়ার পর রাজীব ভাই তাকালেন নাজিব ভাইয়ের দিকে। বললেন, এই লেখকের নাম তো শুনিনি। জবাবে নাজিব ভাই বললেন, ও তো যুগান্তর, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজে নিয়মিত লেখে। এই সপ্তাহেও লেখা গেছে।

রাজীব কিছুক্ষণ ভাবলেন। আবার পড়া শুরু। মাঝখানে পড়া থামিয়ে বললেন, কে এই মোহাম্মদ নূরুল হক? নাজিব ভাই আমার দিকে তাকাতেই, আমি সালাম দিলাম। এবার আমাকে জেরা শুরু করলেন রাজীব ভাই।
—আপনি কি বাংলার ছাত্র? কোন ভার্সিটিতে পড়েছেন?
—না, বাংলার না। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি।
—আপনি বাংলার ছাত্র না? তাহলে এই প্রবন্ধ আপনি লিখেছেন?
—কেন? আমি লিখেছি কি না, এ নিয়ে আপনার সন্দেহ হচ্ছে কেন?
—কেন লিখেছেন? কেউ এসাইনমেন্ট দিয়েছে?
—না।
—আচ্ছা।

আমি তখন চরম অপমান বোধ করছি। বললাম, আমার তাড়া আছে। তখনই বের হতে চাইলাম। নাজিব ভাই থামালেন। কিছুক্ষণ বসেই বেরিয়ে এলাম। রাতে নাজিব ভাই ফোন করে বললেন, মনে কষ্ট নেবেন না। বিষয়টি পজিটিভলি নিন। রাজীব নূর আপনাকে ফোন করবেন। লেখা চাইতে পারেন। আপনি সম্ভব হলে রাজি হবেন। বললাম, আচ্ছা। পরদিন কোর্ট শেষে বাসায় ফিরেছি মাত্র। একটা কল এলো। রিসিভ করলাম।
—হ্যালো।
—আমি রাজীব নূর।
—আচ্ছা ভাই।
—আপনাকে একটি কাজে ফোন দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য নিয়ে একটি প্রবন্ধ দিন। সময় তিন দিন।
—আচ্ছা।

যথাসময়ে প্রবন্ধ পাঠিয়ে দিলাম। ছাপা হলো ষোলোই ডিসেম্বরের আশেপাশে কোনো শুক্রবারে। তার আগেই (৩ ডিসেম্বর ২০১০) ছাপা হলো, ‘কবিতার হয়ে ওঠাই কবির তপস্যা’ শিরোনামের প্রবন্ধটি। আয়োজনটির শিরোনাম ছিল ‘কবিতার হয়ে ওঠা।’ আমার গদ্যটি ছিল লিড স্টোরি। একই বিষয়ে সাইড স্টোরি লিখেছিলেন, মহাদেব সাহা, তুষার দাশ, মারুফ রায়হান, ফেরদৌস নাহার, কামরুল হাসান, তুষার গায়েন, আলফ্রেড খোকন ও টোকন ঠাকুর। লেখার সঙ্গে প্রত্যেকের ছবি ছাপা হলো।

আমার ছবি নেই। বিষয়টি নিয়ে রাজীব ভাই বললেন, এখানে যারা সাইড স্টোরি লিখেছেন সবাই সিনিয়র। খ্যাতিমান। আপনি জুনিয়র। অনেকেই আপনাকে চেনেন না। আপনার ছবি দেখলে কেউ কেউ মাইন্ড করতে পারেন। তাই দিলাম না।
বললাম, ঠিক আছে।

এরপর কেটে গেছে বছর খানেক। রাজীব ভাইয়ের অনুরোধে-আদেশে ইত্তেফাকে বহু বিশেষ সংখ্যা সম্পাদনায় অংশ নিয়েছে। একসময় রাজীব ভাই বললেন, ইত্তেফাকে কাজ করবেন? বললাম, করতে তো ইচ্ছা করে, কিন্তু কোর্টে আমার যে ইনকাম, সেটা কি ইত্তেফাক দেবে? বললেন, তা তো দেবে না। তবে, কাজে আনন্দ পাবেন। এরপর ইত্তেফাকে জয়েন করতে করতেও আর হলো না। এর আগেই শাহরিয়ার ভাইয়ের ডাকে আমাদের সময়ে জয়েন করলাম। বছর ঘুরতেই রাজীব ভাই জানালেন, তিনি ইত্তেফাক ছাড়ছেন, প্রথম আলোতে যাচ্ছেন। আমি যেন ইত্তেফাকে জয়েন করি। জয়েন করলাম।

এই হচ্ছেন ‘আমার রাজীব ভাই’। যিনি আমাকে আমার বিপদে, সংকটে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন বারবার। তিনি সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে একজন অনুজ লেখককে দিয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান। আমি সবার সঙ্গে যেমন স্বতঃস্ফূর্ত কথা বলতে পারি, তেমনি রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে পারি না। কেন-যেন আজন্ম গ্রাম্য স্বভাব এসে আমাকে গ্রাস করে। স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে পারি না। আমার মধ্যে জড়তা কাজ করে। তাই সবাই যখন তার বিপদে দৌড়ে গিয়ে পাশে দাঁড়ায়, আমি থাকি অনেক দূরে। যেমনটি গ্রামে রাগী বড় ভাইকে দেখলে কথা বলতে ইচ্ছা করে, কিন্তু সামনে যেতে ভয়, ঠিক তেমনই।

৮ নভেম্বর রাজীব ভাইয়ের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন রাজীব ভাই। শতায়ু হোন।