শূন্যতার কথকতা ॥ অনসূয়া যূথিকা


একাকিত্ব শব্দটাই এমন যে, উচ্চারিত হতেই এর ভার অনুভূত হয়। যেন এক পৃথিবীর সমান ওজন ভর করে মনে। যদিও মানুষ জন্মায় একা, একাকীত্ব তার সঙ্গেরই দোসর, তবু যেন তা কখনো কাম্য নয়।
জন্মের পর সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ বড় হয় নানান সম্পর্কে জড়িয়ে। সে ভুলে থাকতে চায় যে, সে একা। নানান রকমের সম্পর্ক, আর সঙ্গী, বন্ধু, স্বজন থাকার পরেও মনের এমন কোণে অস্তিত্বের এমন বোধ থাকেই যেখানে সে মূলত একাই। বস্তুত অনেকেই নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব গুলিয়ে ফেলেন। তবে আমার কাছে এ দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন ৷সঙ্গী থাকা স্বত্বেও একজন মানুষ একাকিত্ব অনুভব করতে পারেন। এই যে একাকিত্বের বোধ তা অনেকে যেমন উপভোগ করেন, তেমনি আবার অনেকেই এর থেকে মুক্তি পেতে হন্যে হয়ে দিগ্বিদিক ছোটেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা রোজ রমরমিয়ে বাড়ছে। লোকে একে একাকিত্ব ঘোচাবার এক জাদুরকাঠি বলে মানছে। রোজকার থোড়বড়ি খাড়ার প্রাত্যহিক জীবনে পর্যুদস্ত হয়ে মানুষ একটু স্বস্তি পেতে ফেসবুকে ছুটে আসে। অচেনা, অজানা কাউকেও বড় আপন বলে মনে হতেই পারে। মনে হয় যেন এই মানুষটার সঙ্গে বন্ধুত্বে তৈরি হতে পারে সেই জাদুকরী সম্পর্ক যা তাকে মুক্তি দেবে একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে।

মানুষের জীবনে চল্লিশ পরবর্তী সময় অনেক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। আর নানান কারণেই আমাদের শহুরে নারীদের জন্য এটা একটা টার্নিং পয়েন্টও বলা সম্ভব। পারিবারিক জীবনের একঘেয়েমি আঁকড়ে ধরে পুরুষের মতো নারীর মনকেও। গোছানো সংসার, স্বামী সন্তানের প্রতি নেহাত কর্তব্য পালন ছাড়া আর কোনাে আগ্রহ কাজ করে না অনেকেরই। নিজেকে মনে হয় বড় একা।

তাছাড়া নারী শরীরে কৈশোর কাল থেকে চলতে থাকা হরমনের ওঠাপড়া এই সময়ে চরম আকার ধারণ করে। চল্লিশের পরের বয়স নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে একটা কঠিন অবস্থায় এনে দাঁড় করায়। নারী এই সময় সবচেয়ে বেশি যে মানসিক বিকারে আক্রান্ত হয়, মনোবিজ্ঞান তাকে বলে এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম।
একাকিত্বের বোধ একজন নারীকে এমন একটা অবস্থায় এনে ফেলে যেখানে সে আক্রান্ত হয় শূন্যতার বোধে। পুরো জীবনটাকেই মনে হয় অর্থহীন।

আজ জীবনের এই সময় এসে ফেসবুকে, অফিসে, নিজের পরিবারের নারীদের দেখে তাদের একাকিত্বের গল্প জেনে আমার একটা কথাই মনে হয় জীবনের আর সব প্রতিকূলতার মতো একাকীত্বের যন্ত্রণাও একটা নারীকে বারবার মোকাবেলা করতে হয়। কাউকে কাউকে অবশ্য দেখেছি নানাভাবে একাকিত্বকে উপভোগ্য করে তুলতে। গ্রুপ বা একাই বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ানো, নিজের দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন, সিনেমা দেখা বা নিজের কাজে ডুবে যাওয়া একাকিত্ব বিমোচনের সেরা উপায় হতেই পারে।

আমার বরাবরই মনে হয়, মানুষ স্বভাবতই একা। একা একাকিত্ব কাটাতে তাই কেউ করে নন্দনত্বত্তের চর্চা। কেউ হন লেখক তো কেউ চিত্রকর। আবার কেউবা সম্পর্ক থেকে সম্পর্কে জড়ায়, মানুষ থেকে মানুষে খুঁজে ফেরে একাকিত্ব থেকে মুক্তির উপায়। তাই আমাদের চারপাশে আজ এতো সম্পর্ক ভাঙার গল্প, সঙ্গী বদলের গল্প। নিজের একাকিত্বের ভার সইতে না পেরে, নিজেকেই নিজের বন্ধু না মেনে এই যে সঙ্গী খোঁজা একে আমার আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই বলতে ইচ্ছা করেনা। আর এই আত্মপ্রবঞ্চনায় বিড়ম্বনা ছাড়া এক্ষেত্রে কিই-বা মিলতে পারে, জানি না। একাকিত্ব কাটাতে চারপাশ হাতড়ে, বন্ধু খুঁজেও শেষতক মুঠি খুললে কেবল আর কেবলমাত্র শূন্যতাই উঠে আসে।