শেষান্তের পদাবলী এবং অন্যান্য ॥ কিংশুক ভট্টাচার্য



শেষান্তের পদাবলী

বৃদ্ধি মানেই শেষ হতে হতে এগিয়ে যাওয়া
বৃদ্ধি মানেই নিঃশেষিত সময়ের সিগারেট
এলােমেলাে চিন্তার গতিহীন বাস্তব জড়তা
মৃত্যু কাছাকাছি বলেই হয়তাে বৃদ্ধি এতটা।
আজকাল বালিশক্ষেত্রে এলােমেলাে চুলগুলাে
ময়দানে পড়ে থাকা মৃত সৈনিকদের মতাে।
মধ্যপ্রদেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে প্রাণান্ত চেষ্টায়
থাকি আমিষ বর্জনে, চায়ে চিনি ছেড়েছি কবে─
বহু ব্যবহৃত পুরােনাে কাঠের সাঁকোর মতাে
কাঠামােটা মড়মড়, ভেঙেছে এখানে সেখানে
ধারণের লক্ষ্যে টিকে থাকার কি বােকা আকুতি।

বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই হয়তাে ঋদ্ধ হচ্ছি
বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই আসলে বৃদ্ধ হচ্ছি।


অপেক্ষা

পতঙ্গ ফিরে গেলে রতিক্লান্ত ফুলগুলো
ঝরে পড়ে ভোরের উঠোনে
শেষ হাওয়া যায়
সুখ নিরবতায়
উঠবার প্রয়াস যতনে
একে একে পুরনারী হারায় চালচুলো

ভরাকটালের কালে একূলে মাঝি ছিল
এখন ফিরতি টান ঘরে
চোখের জলে হায়
রাধার প্রাণ যায়
কৃষ্ণ চলে যমুনার চরে─
ফুলের প্রতীক্ষা, পতঙ্গ কথা দিয়েছিল।


সাদামাটা বয়ান

পৌষ পূর্ণিমার রেশ এখনাে চাঁদের চোখে
আজ শীতরাতে পার্কের মাথায় চাঁদ বেশ
গর্বিত, নিয়নের ঘুমক্লান্ত পরিনতি দেখে।
পথিমধ্যে হঠাৎ প্রিয়তমা, সাক্ষাৎ প্রশ্ন
‘আমাকে ছাড়া এখন ভালােই আছােতাে তুমি?
পরিবার তিন বছরে তােমার জন্য কি কি’…?
কেমন আছি। আছি হয়তাে আমি ভালাে মন্দে
প্রতিদিন সামনের পথগুলাে খুলে যাচ্ছে।
এগুচ্ছে এক অচেনা অন্ধ গন্তব্যের দিকে
দ্যাখাে প্রাক্তন বলেতাে আর অবজ্ঞা করিনি
সচেতনভাবে এড়িয়ে যাইনি পার্করােড
শুধু এড়িয়ে চলেছি কিছু পরিচিত পথ
অতি ধীরে ধীরে সন্তর্পনে আলােহীন একা।


এক যে ছিলাে

হারাতে হারাতে শেষ সম্বল ভেবেছিলা তালপুকুরের পাড়টাকে
একদিন সকালে তা হারিয়েছে লােকটার, বিস্ময়ে হাপাতে হাপাতে
দেখে জল নেই, জাল নেই, তালগাছ, মাছ নেই, আছে শুধু দু’মুঠো
রােদুর, তাও বড় ছ্যাকা লাগে। আগে কিছু ছাওয়া ছিল, তেষ্টার জল
ছিল, এখনতাে হাসফাস, নিঃশ্বাসে ঘাস নেই, মনে মন্বন্তর আছে
স্মৃতির বসবাস নেই, বাপ ছিল ঠাকুরদা ছিল, সাদা ধুতী আর
লেংটি ছিল এখন পাছার ছাল নেই, ঘাট নেই, ঠাটবাট নেই
এতােকিছু একসাথে হারাবার তাে কথা নয়। জীবনের গােলাঘরে
কখন যে ইদুরের ঘর-গেরস্থালী হলাে, জানার কথা নয়। তবু
যাক। হারিয়েছে সবটাই আর কিছু হারাবার ভয় নেই, অবােধ
জানে না হায়, ফুটো এক থালা, পরনের লালপিন, ছেড়া জামা গায়
এখনাে হারাবার আছে, আছে এক দেহঘড়ি হারাবার অপেক্ষায়।