শেষ চুম্বন ॥ দিলারা হাফিজ


শেষ চুম্বন


উঠোন বাড়ির নারকোল বীথি ঢেকে দিয়েছিলো
মার্চের মধ্য দুপুরের রোদ, সূর্যের কান্নাকে
আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলো তারা সতীর্থ-সভায়
আগেও অনেক দিন প্রায় বসেছি দু’জনে
এইখানে, ঠিক এইখানেই,
ঝিরিঝিরি রোদের কাঞ্চন চোখে-মুখে শুষে নিয়ে;
তবে এত উদোম আলোর চাতালে বসে
চুম্বন করিনি তাকে ভুলেও,
কখনো যদি টুক করে তার ঠোঁট ছুঁয়ে দিতো
আমার অধরোষ্ঠ—আনত লজ্জায় আমি
চুরি করা গোলাপের মতো লুকিয়ে ফেলতাম মুখ,
আনন্দ হরণের এই উতল হাওয়া
ছুঁয়ে যেতো আমাদের আঙ্গিনার মাটি
সবুজ ঘাসেরা লাফাতো খরগোশের মতো
শাদা মেঘের মতো আমাদের শিশু দুটো
উঁকি দিয়ে সরে যেতো দ্রুত;

আজ অন্য রকম বিষণ্নতার ঘ্রাণ বইছে উঠোনজুড়ে
শুভ্রতায় জড়ানো নিথর তার দেহ থেকে
রক্তপদ্মের মতো ফুটন্ত মুখটি অনন্তের আকর্ষণে
জ্বলজ্বল করছিলো হিরন্ময় আলোর কুন্তলে,
বাতাসেও আজ শেষ বিদায়ের সানাই
করুণ সুরে ভরে তুলেছে রোদের কণা
অপেক্ষাতুর বন্ধু-স্বজনের ম্রিয়মান কথার ডালা
সোমেশ্বরীর বাতাস আর কংসের জল ছুঁয়ে
বিরিশিরি গ্রাম চলে এসেছে ধানমণ্ডি পাড়ায়
শিয়রে দাঁড়ানো আদিবাসী প্রেম অশ্রু-সজল
সকল ভালোবাসা আজ নতমুখ দেবদারু যেন
দাঁড়িয়েছে পাশাপাশি, আকাশের ঘন-মেঘ ছুঁয়ে
এলোমেলো বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়

আমি তখন বিছানায় জ্ঞান হারানো নৈবেদ্য তার
শেষ বিদায়ের পুষ্পার্ঘ্য তবু ধরে আছি শক্ত হাতে
আতর লোবান ছাড়া যেমন শেষ হয় না মুর্দার সৎকার
তেমনি আমি ছাড়া কে দেবে প্রণয়ের বিদায় অঞ্জলি?
ডুকরে ওঠা কণ্ঠ চেপে ধরি নিজেই, শোকের আকাশে
আমি আজ দীপ্তহীন এক চাঁদ, তবু অসংখ্য তারা
আমাকে ঘিরেই যেন ছুটছে সান্ত্বনার এক বাটি জল হাতে
শীতল পা’দুটো তার ছুঁয়ে থাকি কিছুক্ষণ, এই পায়ে তিনি
হেঁটেছেন পৃথিবীর ধুলো-মেশা হাজার নদী পথ,
কখনো বা শেকড়ের খোঁজে পদব্রজে গিয়েছেন সেখানে,
সংসারে-সন্যাসীমন যেদিকে ধায় পরাঙ্মুখ
উত্তর শিয়রে যাই, মুহূর্তেই আমার দেহ ছেড়ে
চোখজোড়া যেন আলাদা হলো,
দেহহীন সেই দু’নয়ন ভরে দেখি তাকে,
চোখের ক্যামেরায় ছবি তুলি দ্রুত,
কপালের ত্বকে হাত রেখে আঁতকে উঠি, একি।
এক রাতের ভূমিকম্পে বরফ শীতলে যেন
ঢাকা পড়ে গেছে তার সকল উষ্ণতা,
কে যেন এবার শ্বাসনালী আমার চেপে ধরে দুইহাতে
খুব আলতো স্পর্শে আমি তবু ঠোঁট রাখি তার
কপালের ঠাণ্ডাত্বকে..
কত দর্শক, কত চোখের লজ্জা, আলোর বন্যা,
আমি তবু সশব্দ চুম্বনে শেষবার এঁকে দিই
তৃষ্ণানার্ত ঠোঁটের মায়া, উদোম আলোর ক্যানভাসে

দু’ফোঁটা চোখের জলে ভাসিয়ে দিই তাকে অনন্তলোকে।

২৬/২/২১
আইসবোট টেরেস, টরন্টো