সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ ॥ ফজলার রহমান



১৯৭১ সালে কতই বা বয়স আমার, তের বা চৌদ্দ বছর। কিন্তু গ্রামের ছেলে হিসেবে তখন থেকেই অনেক কিছু জানতে হয়, বুঝতে হয়। আমার বাবার নাম সুজাবত আলী, মায়ের নাম আজিরন্নেছা। গ্রাম: দত্তবাড়ি পশ্চিমপাড়া। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে আমাদের গ্রাম প্রায় আট মাইল দূরে। যোগাযোগ বলতে গ্রামের পাশে কাঁচা সড়ক। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। আমার বাবা কৃষিকাজের পাশাপাশি বিকেলে হাটে হাটে গুড় বিক্রি করতেন। আমি কাজ না থাকলে বাবার কৃষিকাজসহ অন্যান্য কাজে সহযোগিতা করি।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে আমাদের গ্রামে। আমরা সবাই গ্রামের বড়দের সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য মিছিল করতে শুরু করি। কিন্তু ২৫ মার্চের পর খেকে পাকিস্তানিদের হামলার নানা গুজব, বর্বর নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামে চলে আসতে থাকে। তাদের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষে মধ্যে পাকসেনাদের নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ভীতসন্ত্রস্থ মানুষ গ্রামে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে মিলিটারি আসার গুজবে অনেকেই আশ্রয় নেয় আমাদের গ্রামেও। হিন্দু প্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত আমাদের পাশ্ববর্তী বাগবাটি এলাকায় আশ্রয় নেয় অনেক হিন্দু পরিবার। আবার গ্রামেরও কেউ কেউ সরে যায় অন্যত্র। মিলিটারি আসার পর স্বাধীনতাপন্থীরা গা ঢাকা দেয়। আমাদের ইউনিয়নে মফিজ ভুঁইয়া, মনু মুন্সী, আজিজল খাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় শান্তি কমিটি। এলাকার কেউ কেউ আত্মীয়তা বা দারিদ্রের কারণে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। এলাকার শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের প্ররোচনায় মে মাসের শেষের দিকে পাকসেনারা এসে বাগবাটীতে গণহত্যা চালায়। সেদিনের গণহত্যায় শতাধিক মানুষ শহীদ হন।

বাগবাটী গণহত্যার দিনে আমি আমার বাবার সাথে মাঠে কাজ করছিলাম। হঠাৎ বাগবাটি এলাকায় আগুন দেখতে পাই এবং গোলাগুলির শব্দ শুনি। আমি সেদিকে যেতে চাইলেই বাবা আমাকে ঠেকিয়ে রাখেন। নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে পাকসেনা ও দোসরদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের গ্রামের রাস্তা দিয়ে চলে যায় ভাটপিয়ারী এলাকায়। মিলিটারি চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন দল বেঁধে বাগবাটির দিকে যেতে শুরু করে। এ সময় আমিও বাবার বারণ না মেনে তাদের দলে ভিড়ে যাই। পিপুলবাড়িয়া পাড় হয়ে সড়ক ধরে যেতে থাকি বাগবাটি হাটখোলার দিকে। আমি যখন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখনো বাড়িঘর পুড়ছিল, নেভানোর কেউ নেই। বিভিন্ন জায়গায় লাশ পড়ে থাকা নিয়ে বিভিন্নজন আলাপ আলোচনা করতে থাকে। আমি হাটখোলার কাছাকাছি মালাকার বাড়ির পশ্চিমে সড়কের পাশে দেখেছি জগাই, মাধাই, কালীপদসহ অন্তত ১১ জনের লাশ পড়ে আছে। তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এতো লাশ দেখে ভয় পেয়ে যাই আমি এবং দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসি। পরে জেনেছি, পাশেই একটি পাগাড়ের মধ্যে শহীদদের লাশ মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

বাগবাটী গণহত্যা চালিয়ে সম্ভবত সেদিনই ভাটপিয়ারী গিয়ে পাকসেনারা ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখান থেকে মাঝেমধ্যেই আমাদের এলাকায় হামলা চালাতো পাকসেনা ও তার দোসরেরা। একদিন এসে হামলা চালায় পিপুলবাড়িয়া গ্রামে। সে গ্রামের ইয়াকুব আলী, ময়নাল হোসেনসহ কয়েকজন তরুণ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন জেনে তারা ওই গ্রামে হামলা চালায় এবং তাদের বাড়িসহ বেশ কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ওই দিন গ্রামবাসীর ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায় পাকসেনা ও তাদের দোসরেরা। পরে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে যায় পাকসেনা ও রাজাকারেরা। সেদিন দেখেছি, আমাদের গ্রামে বার্ষিক কামলা হিসেবে থাকতো বাহেজ নামের একজন, তাকে রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে।

একদিন বাগবাটি হাটে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছিলেন, তারা হাটে মনু মুন্সীর দোকানের সামনে থেকে বিলাত ডাকাতকে ধরে নিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই হাট ভেঙ্গে যায়। পরে বিলাত ডাকাতকে শাস্তি দিয়ে পিপূলবাড়িয়া সড়কের (বর্তমান বাজার) পাশে ফেলে রেখে যায় তার লাশ। আরো একদিন পাকসেনা ও রাজাকারেরা এসেছিল হাটে মুক্তিযোদ্ধা ধরতে, সেদিনও মানুষ দ্রুত সটকে পড়ে হাট থেকে, ভেঙ্গে যায় সেদিনের হাটও।

যেদিন বিলাত ডাকাতকে মুক্তিযোদ্ধারা হাটখোলা থেকে তুলে নিয়ে যায় সেদিনই (৩১ অক্টোবর ১৯৭১) সেদিনই হামলা চালানো হয় ভাটপিয়ারী পাকসেনা ক্যাম্পে। এবং মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হয়। ফলে ভাটপিয়ারী থেকে পাকসেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার হয়। একদিকে, কাজীপুর অন্যদিকে, শৈলাবাড়ির মাঝে কোনও পাকসেনা ক্যাম্প না থাকায় সেদিন থেকে আমাদের এলাকা প্রায় মুক্ত হয়ে পড়ে। শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীর আমাদের এলাকার যারা ছিল তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় বা গা ঢাকা দেয়। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় অবাধ বিচরণ। বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে মুক্তিযোদ্ধারা অস্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করে।

ফজলার রহমান (৬৪)। পেশা: পত্রিকা হকার। গ্রাম: দত্তবাড়ি, ইউনিয়ন: বাগবাটি, উপজেলা ও জেলা। চার সন্তানের জনক। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৩ জুন ২০২১

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম