সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ ॥ আবু সাইদ শেখ



একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বয়স কম হলেও আমি দেখেছি, পাকসেনা ও রাজাকারের নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই, সর্বোপরি বাঙালির বিজয়। কষ্ট আর আনন্দ মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে, তাই ওই সময়ের ঘটনা এখনো জ্বলজ্বল করে আমার মনের মনিকোঠায়।

আমি আবু সাইদ শেখ (৬৪), একাত্তরে বয়স প্রায় চৌদ্দ বছর। পিতা : বাবর আলী শেখ, কৃষিকাজ করতেন। মা গৃহিণী। গ্রাম: পশ্চিম গুপিরপাড়ার, ইউনিয়ন: ছোনগাছা, থানা ও মহুকুমা : সিরাজগঞ্জ। মহুকুমা সদর থেকে আমাদের গ্রামটি প্রায় ছয় মাইল দূরে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আমাদের গ্রামেও মুক্তিযুদ্ধের ঢেউ এসে লাগে মার্চ মাসে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুতি হিসেবে লাঠি নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে এলাকার যুবকেরা। ২৫ মার্চের পর প্রশিক্ষণ বন্ধ হয়ে যায়, এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি। এপ্রিল মাসের শেষ দিকে শহরের মানুষ নিরাপত্তার প্রয়োজনে ছুটতে থাকে গ্রামে দিকে। আমাদের গ্রামেও অনেকে এসে আশ্রয় নেয়। শহরের পাকসেনা আসার পর শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক, আহমদ মাস্টার শান্তি কমিটিতে যোগ দেন। গ্রামের আব্দুল গফুর, আব্দুস সামাদ যোগ দেয় রাজাকার বাহিনীতে। গ্রামের আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা পালিয়ে থাকতে শুরু করে। এ সময় গোপনে সংগঠিত হতে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধারা। গ্রামেরও কেউ যোগ দেয় মুক্তি বাহিনীতে। গোপনে গ্রামেও মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ তাদের সামর্থ অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতো।

মাস খানেক পর থেকে সাধারণ মানুষ ভয়ে ভয়ে চলাচল শুরু করে। যারা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল তারা ফিরে যেতে থাকে শহরে বা অন্য কোথাও। আগস্ট মাসের দিকে রাজাকারদের সাথে নিয়ে আসে পাকবাহিনী। সেদিন তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া সেনা সদস্য শুকুর মুন্সীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। পাকসেনা বা রাজাকার আসার খবরে গ্রামের মানুষ পালিয়ে যেত পাশ্ববর্তী খ্যাতার চর গ্রামে। গ্রামের সবার সাথে আমিও পালিয়ে যেতাম সে গ্রামেই। এরপর মাঝে মাঝেই পাকসেনা ও রাজাকারেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরার জন্য গ্রামে আসতো। একদিন এসে গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার ময়নালকে ধরে। সেদিন পাকসেনাদের সঙ্গে গ্রামের এবং পাশের গ্রামের রাজাকারেরা ছিল। ময়নালকে ধরার পর, তার কাঁধে চড়ে পাকসেনারা ছোনগাছার নদী পাড় হয়। পরে রাজাকারেরা তাকে হত্যা করে ফেলে রেখে যায় নদীর ধারেই। আরো একদিন এক দল রাজাকার এসে গ্রামের ময়দান সরকারের ছেলে মজিবর, কালাচান ও হাকিম এবং আসাদের এক ছেলেকে ধরে বাজারের দিকে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার। সেখানে তাদের এক শ’ টাকা করে জরিমানা করা হয় এবং পরে সে জরিমানার টাকা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এভাবে জনগণের ওপর অত্যাচার করতে শুরু করে রাজাকারেরা।

ততদিনে সাধারণ মানুষ ভয়ে ভয়ে যেতে শুরু করেছে শহরেও। একদিন কোনও কাজে শহরে যায় গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াকুব সরকার। সে আর ফিরে আসেনি গ্রামে। তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন অনেক সন্ধান করেও আর ফিরে পায়নি। পরে বিভিন্ন জনের মুখে জানা যায় যে, তাকে বাহিরগোলা থেকে পরিচিত রাজাকারেরা ধরে নিয়ে যায়। দু’একদিন ক্যাম্পে রাখার পর তাকে জেলখানার সামনের বধ্যভূমিতে হত্যা করে যমুনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য, তাহলো গ্রামের পাশে যাওয়া একটি ঘটনা। সে রাতে গ্রামে অবস্থান করছিল একদল মুক্তিযোদ্ধা। তারা যেদিন গ্রামে থাকতো সেদিন তাদের মতো করে গ্রাম পাহারা দিত। সে রাতেও তারা পাহারা বসিয়েছিল গ্রামের চারপাশে। তখন অন্য একদল মুক্তিযোদ্ধা ঘোড়ার ওপরে বস্তায় ভরে গুলি নিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে আমাদের গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পরে বুঝতে পারেন যে, দুই পক্ষই মুক্তিযোদ্ধা। অবসান হয় ভুল বোঝাবুঝির।

মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতায় স্বাধীনতা বিরোধীরা এলাকা ছাড়তে শুরু করে। আমাদের কয়েক গ্রাম পরে শৈলাবাড়িতে ছিল পাকসেনা ও তার সহযোগিদের ক্যাম্প। সেখানে পর পর দুই দিন হামলা চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। সে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায় গ্রাম থেকে। সে গোলাগোলার আওয়াজ আমাদের জিতে যাওয়ার খুশি বয়ে আনে। এর কয়েকদিন পরেই স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

দেশ মুক্ত হওয়ার আগেই মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় প্রকাশ্যে এলাকায় চলাচল করতে শুরু করে। খুঁজতে শুরু করে স্বাধীনতা বিরোধীদের। এক সময় অন্য এক গ্রাম থেকে ধরা পড়ে গ্রামের স্বাধীনতা বিরোধী আহমদ মাস্টার। তাকে এলাকায় নিয়ে আসা হয়। তাকে শাস্তি দেওয়ার দাবিও ওঠে। কিন্তু দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই তার সরাসরি ছাত্র। তারা মিনমিন করে লঘু শাস্তির আবেদন জানাতে থাকে। আহমদ মাস্টার নিজেও তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। এলাকাবাসী ও কোনও কোনও মুক্তিযোদ্ধার অনুরোধে শাস্তি থেকে রেহাই পায় স্বাধীনতা বিরোধী আহমদ মাস্টার।

আবু সাইদ শেখ (৬৪)। পেশা: কৃষিকাজ। বিয়ে করেন- ১৯৮২ সালে। চার সন্তানের জনক। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৬ জুন ২০২১, দুপুর। সিরাজগঞ্জ শহরের চৌরাস্তায় বাসদ কার্যালয়ে।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম