সারল্যের মৃত্যু ও অপরাধবোধ ॥ তটিনী দত্ত



শেষ কবে কেঁদেছো তুমি কবি, মনে কি পরে? শেষ কবে তোমায় কাঁদতে দেখেছে ঝরাপাতা কিংবা বিষণ্ন বিকেল? শেষবার কবে নিজের চোখের জল নিজে হাতে মুছেছিলে, মনে কি আছে? হয়তো নেই। সুদূর অতীতের মতো সেই কান্নার স্মৃতিও অস্পষ্ট, কাঁদতে ভুলে গেছো- সে তো অনেকদিন। যবে থেকে অন্যের দুঃখ তোমায় ভাবায় না, যবে থেকে চিনে নিয়েছো উপরে ওঠার সহজ পথ, যবে থেকে অন্যের সারল্য তোমায় মুগ্ধ করে না, অকারণ মন কেমন করা বন্ধ হয়েছে যেদিন থেকে- তোমার একার কান্নাও তো বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেদিন থেকেই। স্পষ্ট করে বলতে গেলে ভেতরের অপরাধবোধটাই যে মরে গেছে। কান্না আসবে কার হাত ধরে?

যতদিন তোমার প্রকৃত কবিজন্ম ছিল, ততদিন সারল্য ছিল ভাবনায়, ক্রমশঃ জটিল হলে তুমি। সাফল্যের অভব্য ঔদ্ধত্যে নষ্ট হয়ে গেল সারল্য। মনে আছে সেই যে কথা দিয়েছিলে মেয়েটিকে আস্ত একটা জীবন পাশে থাকবার, স্বপ্নের নামে নাম হবে বাড়ীর… অনেকটা পথ হেঁটে নীরবে সরে গেল কেন মেয়েটি, মনে হয়নি? আসলে মেয়েটি বুঝে গিয়েছিল সে না থাকলেও কষ্ট হবে না তোমার- তারপরে কি আর থাকা যায়? কিন্তু এতটুকু অপরাধ বোধের যন্ত্রণা হয়নি তোমার কবি, খ্যাতির অতিশয্য তোমার সব রকম বোধকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

সেই যে বছর সাতাশের মফস্বলের ছেলেটি, যার দু/তিনটি কবিতাই বুঝিয়ে দিয়েছিল তোমার নামের পাশে খুব তাড়াতাড়ি আরেকটি নাম উচ্চারিত হতে শুরু করবে, কি চমৎকার ভাবে সরিয়ে ছিলে তাকে, না সেদিনের পরও তেমনভাবে কোন অপরাধবোধ ছায়া ফেলেনি তোমার মধ্যে। যখন যেভাবে যার পশে দাঁড়ান উচিত ছিল, অথচ দাঁড়ালে না- যেখানে তোমার একটা কবিতার লাইনই হয়ে উঠতে পারতো আস্ত একটা স্লোগান কিংবা প্রতিবাদের ভাষা… সেখানে কি ভীষণ নীরব শান্তিপূর্ণ অবস্থান তোমার। তারপরেও নেই কোথাও অপরাধবোধ।

কবি, কি অসামান্য তোমার কবিতা, কবিতার প্রতিটা লাইন, কি অসম্ভব জনপ্রিয়তা তোমার। কিন্তু আমি দেখতে পাই প্রতিটি শব্দের ভেতরকার ফাঁকি, প্রতিটি লাইনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা চালাকি, তাই আমার প্রিয় কবির তালিকা থেকে কবেই বাতিল করেছি তোমায়। যেদিন থেকে অপরাধবোধ হারিয়ে ফেলেছ তুমি, কবিতাও হারিয়ে গেছে- তোমার থেকে। আর এখানেই তোমার হেরে যাওয়া। কবি রণজিৎ দাশের মতো আমিও বিশ্বাস করি, ‘জীবনের অপরাধ ঢাকতে শিল্পের সাফাই হয় না’। শুধু তোমাকে নয়, চারপাশের যত অপরাধ বোধহীন মানুষ আছে, সবাইকে একে একে বাতিল করবো আমি, আমার কাছে অপরাধ বোধহীনতা মনুষত্বহীনতারই নামান্তর।

সেই কত বছর আগে এক দুপুরে জুতোয় পেরেক লাগিয়ে দুটাকা বেশি চেয়েছিল বলে বিশ্রীভাবে ঝগড়া করেছিলাম মুচি ভাইয়ের সাথে, তেমন কোন কারণ ছাড়াই ভুল বুঝে নষ্ট করেছিলাম বহু বছরের বন্ধুত্ব। স্থির জীবনের আশায় এক ভীষণ অস্থিরতায় সরিয়ে নিয়েছিলাম হাতের পাশ থেকে হাত… এ সব কিছুর জন্য আমার অপরাধবোধ। এসব কিছুর জন্য আমার একার গোপন চোখের জল দিনের পর দিন। ব্যাংকে টাকা জমা দেয়ার লাইনে দাঁড়ান আমার কয়েক হাজার টাকার পাশে একশো টাকার একটি নোট হাতে রঙ চটা শাড়ি, ছেড়া চটি বৌটি, মনে হল ওর পাশে নির্লজ্জের মতো বড়লোকি দেখাচ্ছি আমি। এ অপরাধ বোধ কাকে জানাই? সহজে কিংবা অল্প পরিশ্রমে বেশি রোজগার হয়ে গেলে বড্ড অপরাধী লাগে নিজেকে, মনে হয় অন্যকে ঠকিয়ে ফেললাম নাতো? খুব সাধারণ শাড়ীর পাশে আমার দামি সিল্কের শাড়ি গালে চড় মেরে মনে করিয়ে দেয় সাধারণ থেকে আমার আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা। আমার অপরাধ বোধ জানান দেয় দামী চকচকে শাড়ীটা আমার বড়লোকি স্পর্দ্ধা।

হয়তো একটু বেশিই ভেবে নেয়া, তবু মনে হয়- থাক না হয়। যতদিন এই অপরাধবোধ থাকবে ততদিনই হয়তো মানুষ থাকবো আমি। ততদিন পর্যন্তই হয়তো থাকবে চোখের জল। তাই সযত্নে বাঁচিয়ে রাখি নিজের এই বোধকে। যা আমাকে প্রতিটি অসর্তক মুহূর্তে সতর্ক করে, যা আমার ভেতরের আমিটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। চারপাশে এত জটিলতার মধ্যেও এই অপরাধবোধ কিছুটা হলেও সরল রেখেছে, দৃঢ় রেখেছে এতটা বয়েস পার হয়ে আসা আমাকে।