সাহিত্যিক আজহারউদ্দিন খানের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ ॥ আবু রাইহান




বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আজাহার উদ্দিন খান কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে প্রথম আকরগ্রন্থ ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ পুস্তকটি লেখেন। যা তাকে নজরুল গবেষকের স্বীকৃতি এনে দেয় এবং সাহিত্যিক হিসাবে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। ১৯৫৪ সালের ২৬ মে প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ক প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’। ১৯৪৮ সালে কলেজের প্রথম বর্ষে পড়াশোনার সময়ে তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তথ্য তালাশ করতে উৎসাহিত হন। এতে করে তার কলেজের পড়াশোনায় ছেদ ঘটলেও কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজে নিজেকে উন্মাদের মতো নিয়োজিত করেন। তার সেই পরিশ্রমের ফসল ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ পুস্তক। সাহিত্যিক কৌতুহল থেকে অসুস্থ কবি নজরুল ইসলামকে তার বাড়িতে প্রত্যক্ষ দর্শনের অনুভূতি থেকে লিখেছিলেন কবিকে নিয়ে প্রথম আবেগপ্রবণ লেখা কবি দর্শনে। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে যুগান্তর সাময়িকীতে। লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর নিজেকে লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার আত্মপ্রত্যয় তৈরি হয়।

সাহিত্যিক এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আজহার উদ্দিন খানের লেখা প্রবন্ধগুলি বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের সম্পদ। সাহিত্যিক আজহারউদ্দিন খানের উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ পুস্তকটি। এখনো পর্যন্ত এই পুস্তকটির আটটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম সংস্করণে নজরুল বিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যা ছিল সাতটি। আর শেষ সংস্করণে এই প্রবন্ধের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১টিতে। প্রায় সাড়ে আটশ পৃষ্টার ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে দু বাংলাতেই নজরুল বিষয়ক গ্রন্থ রচনার আগ্রহ তৈরি হয়। এই মুহূর্তে নজরুল বিষয়ক পুস্তকের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক হলেও আলোচনার গভীরতা ও তথ্যের ব্যাপকতায় সাহিত্যিক আজহারউদ্দিন খানের রচিত নজরুল বিষয়ক গ্রন্থটি সাহিত্য সমালোচকদের কাছে আকর গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে।

এক সাক্ষাৎকারে আজহারউদ্দিন খান বলেছিলেন, তিনি গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক তৃপ্তি পেয়েছেন নজরুল ইসলাম এবং আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদকে নিয়ে লিখে। বাংলা সাহিত্যে নজরুল গবেষণা গ্রন্থের জন্য ২০৩ সালে তিনি পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নজরুল সাহিত্য পুরস্কার। কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, মুহম্মদ আব্দুল হাই, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ এর জীবন ও সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আজহারউদ্দিন খান প্রথম গ্রন্থ রচনা করেছেন। মুসলিম সাহিত্য ব্যক্তিত্বদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, এস ওয়াজেদ আলী, শাহাদত হোসেন এবং জসিম উদদীনের জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের মধ্যে আজহারউদ্দিন প্রথম আলোচনার সূত্রপাত ঘটান।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অসম্পূর্ণতা মোচনে পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাহিত্যিক আজহার উদ্দিন খান এ ধরনের মুসলিম প্রতিভাধর সাহিত্য ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ২৬ টিরও বেশি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল ফজল, হুমায়ুন কবির, বন্দে আলী মিয়া, আব্দুল কাদির এর পত্রালাপ প্রসঙ্গ এবং এদের প্রত্যেকের গ্রন্থপঞ্জি নিয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। শুধু তাই নয় বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী হুমায়ুন কবিরের সাহিত্য কীর্তি এবং তার সাহিত্য চর্চার বিষয়টি বিস্তৃতভাবে এ বাংলায় জানার সুযোগ হয়েছে আজহারউদ্দিন খানের লেখা গবেষণাধর্মী পুস্তক প্রণয়নের কারণে। বিলুপ্ত হৃদয় নামে গবেষণা গ্রন্থে আজহার উদ্দিন খান- মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, এস ওয়াজেদ আলী, শাহাদাত হোসেন, গোলাম মোস্তফা এবং জসিম উদ্দিন এর জীবন ও সাহিত্য সৃষ্টি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। গ্রন্থকার গভীর যন্ত্রণায় উপলব্ধি করেছেন এবং এর সাহিত্য সমালোচকদের আলোচনায় মুসলিম লেখকদের প্রতি স্বাভাবিক উপেক্ষার মনোভাব। এদের বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের আলোচনা অসম্পূর্ণ।

বাংলা সাহিত্যে নজরুল গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ এর ভূমিকায় সাহিত্যিক আজহার উদ্দিন খান লিখেছিলেন, ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবাকাশে কাজী নজরুল ইসলাম একটি জ্যোতিস্ক বিশেষ। এই জ্যোতিস্কের উজ্জ্বলতার যথার্থ বিচার এখনো পর্যন্ত হয়নি। তার জীবন ও সাহিত্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করা যে অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে এ কথা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন। নিজের যোগ্যতার প্রতি সন্দিহান হয়েও এই প্রয়োজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে চার-পাঁচ বছর ধরে নানা সাময়িক পত্রে নজরুল প্রতিভার বিভিন্ন দিক নিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড ভাবে অনেকগুলি প্রবন্ধ লিখেছিলুম। তবে সেগুলি যে শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ও পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় এর নিরন্তর তাগাদায় দীর্ঘ পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে বাংলা বইয়ের আসরে নামাতে হবে তা ছিল আমার কল্পনার বাইরে। বাংলার পাঠকসমাজে এ বইকে কেমন ভাবে গ্রহণ করবেন তা জানি না, এ বইয়ে আমার যদি সামান্যতম কৃতিত্ব থাকে তা তাদের জন্যই পেয়েছি বলে মনে করব। কেননা তারা আমাকে স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তাদের স্নেহ ভালবাসায় আমাকে লেখার কাজে বিরক্তি, অবসাদ ও নৈরাশ্যের মধ্যে উৎসাহ দিয়েছে। আমাকে প্রেরণা জুগিয়ে আমার লেখাকে শেষ করিয়েছে। নজরুল সম্পর্কে এ বইটি প্রথম বই এমন কথা বলবো না। আমার আগে জনা তিনেক নজরুল সম্পর্কে বই লিখেছেন। তবে আমার দিক থেকে বলতে পারি যে নানা দিক দিয়ে নজরুল প্রতিভার বিচার হয়তো এই প্রথম। কবির জীবন সম্পর্কে নানা রকম গুজব আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। সেই গুজবকে বিশ্বাস করে আজও অনেক মহলে কবির বিরুদ্ধে বিকৃত প্রচার চলে। অনেকে আবার নিজের স্মৃতির মাধ্যমে কবিকে দেখতে চেষ্টা করেছেন। সেগুলি আরো বিপদজনক। কেননা তাতে কবির চেয়ে লেখকই নিজের মোড়ল গিরি করেছেন বেশি। এদের সত্যতা সব সময় গ্রহণ করতে বাধো বাধো ঠেকছে। তাই তার সম্পর্কে সত্য মিথ্যা ঘটনা এমন জট পাকিয়ে রয়েছে যে, সত্য মিথ্যা বেঁচে একটা পাকা নির্ভরযোগ্য জীবনী লেখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

কবির জীবনের যে সব ঘটনা দীর্ঘ চার পাঁচ বছর ধরে আমি উদ্ধার করেছিলুম নানা জনের নানা লেখা থেকে, নানা পত্র পত্রিকা ঘেটে এবং সাধ্যমত অনুসন্ধান করে সে সব তথ্য একত্রিত করে যতদূর সম্ভব প্রামানিক জীবনী লিখতে চেষ্টা করেছি। এতে যে কতদূর ক্লেশ স্বীকার করতে হয়েছে তা মফস্বলের সাহিত্যসেবী মাত্রেই উপলব্ধি করবেন। তথ্য সংগ্রহে যেখানে আমার সংশয়ের উদয় হয়েছে সেখানেই শ্রদ্ধেয় পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এর গোচরে এনেছি। তিনি আমার অনেক সংশয় এর মীমাংসা করে দিয়ে জীবনীকে প্রামানিক করে তুলতে সাহায্য করেছেন। তবু লেখার শেষে বার বার মনে হয়েছে সব কথা বলা হয়নি। কেননা সত্য সন্ধানীর কাছে শেষ কথা বলে কোন কথা নেই। তাই কবির সম্পূর্ণ জীবনী এখনো রচিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। আমাদের নিষ্ক্রিয়তার জন্য অনেক তথ্য লোপ পেয়ে গেছে। আরও অনেক তথ্য লোপ পেতে বসেছে। তার বন্ধু সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো অনেকে জীবিত ও কর্মক্ষম আছেন। সময় থাকতে থাকতে সেগুলি সংগৃহীত না হলে আর কখনো হবার সম্ভাবনা থাকবে না। তাই হারিয়ে যাবার ভয়ে যৎসামান্য উপকরণ সংগ্রহ করে দিয়ে গেলুম ভাবীকালের জীবন চরিতকার এর কাছে। যিনি এই জীবনীর খসড়া থেকে পাথেয় নিতান্ত কম পাবেন না। নজরুল সাহিত্যের ভূমিকা কবির দোষ-গুণ সম্পর্কিত তন্নতন্ন বিচার নয়। তার কাব্যের প্রাথমিক পরিচয় প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যে কবির প্রকৃত স্থান কোথায় এবং তার রচনার বৈশিষ্ট্য কি আলোচনায় তারই ইঙ্গিত স্পষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। মোটামুটি ভাবে গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয় হল তাই।’

‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ গবেষণা গ্রন্থের জন্য আজাহারউদ্দিন খানকে ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নজরুল পুরস্কারে সম্মানিত করে। এজন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় অর্ধ শতকেরও বেশি সময়। দুই বাংলায় নজরুল গবেষণায় তিনি পুরোধা পুরুষ হলেও জাতীয় স্তরের কোন সাহিত্য পুরস্কার আজীবন সাহিত্য সাধনার জন্য ৮০ ঊর্ধ্ব এই মানুষটির জোটেনি। আমাদের মানসিক দীনতা ও সঙ্কীর্ণতা এই যে, প্রকৃত সাহিত্য সাধকদের জীবন দর্শন ও সাহিত্য কর্ম নিয়ে আমরা সচেতনভাবেই নিরুৎসাহী। কখনো-সখনো কোনাে সৎ সমালোচক অনালোচিত-অবহেলিত সাহিত্যিককে আলোচনায় নিয়ে এলে তখন তাদের সাহিত্য কর্ম ও জীবন দর্শন নিয়ে কিছু লেখালেখি নজরে পড়ে। অন্যথায় তারা জীবিত অবস্থায় খুবই কম ক্ষেত্রেই যথার্থ মর্যাদা পান। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আজহারউদ্দিন খানের ক্ষেত্রেও এর বাত্যয় ঘটেনি।