সে আমাকে নাম ধরে ডাকে ও অন্যান্য ॥ শাহনাজ পারভীন



সে আমাকে নাম ধরে ডাকে

সে আমাকে রোজ রোজ নাম ধরে ডাকে
তাই আমার নামটি এখনও জীবিত আছে মহাকালে…
অথচ এমন ভাবে ডাকে
যেন অবৈধ প্রেম।
অস্পষ্ট লুকোচুরি খেলা…
আমি কান খাড়া রাখি-
কখন সে একবার ডেকে উঠে চুপ হয়ে যায়।
নিজের প্রয়োজনে কাঙ্ক্ষিত হায়-
ঢেকে রাখা খাবার সে একা তুলে খায়
জগের পানিও ঢালে নিজ হাতে রোজ
ঔষধ রুটিন মাফিক মুখস্থ তাহার।
কোন কাজেই সে আমাকে ডাকে না বারবার-
এমন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ আমার।
ও কখনও মুখ ফুটে বলেনি সে কথা-ভালবাসি তোমাকে আমি।
ভালবাসি, ভালবাসি।
অথচ আগলে রাখে নিজেরও অধিক।
পাতাঝরা পাখিদের গানে
শিরিষের প্রাণে
যেমন প্রাণ থাকে প্রাণ ততোধিক
জোয়ারের জলে যেমন উন্মাদনা
মেঘেদের গানে যেমন উন্মত্ততা
উন্মুক্ত যেমন থাকে খোলা প্রান্তর
প্রান্তিক রজনীতে ভোরের রশ্মি
তেমনই সে আমাকে চোখে চোখে রাখে
অস্ফুট নাম ধরে ডাকে-
কিন্তু কখনও মুখ ফুটে বলেনি সে ভালবাসি, ভালবাসি।


আমার ঈদের চাঁদ উঠবে না এ বছর

শাওয়ালের চাঁদ জুড়ে আকাশ হাসবে কিন্তু
আমার ঈদের চাঁদ উঠবে না এ বছর

শুধুই কি আমার ঘরে এমন দৃশ্য হবে?

তা তো নয়, ঘরে ঘরে, দেশে দেশে, আকাশে বাতাসে,
চারিদিকে, মা,বাবার বিলাপে সে বিরহের ঢেউ আছড়ায়।

হু হু কান্নার ধ্বনি, শব্দ রোল হাওয়ার বেদনা মিশে
প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে এক পায়ে খাড়া।

কেনাকাটা করিনি, হাসি নেই, আনন্দ উচ্ছ্বাস কোনো;

রঙিন ঝলমলে, জাফরান, নাশপাতি, এলাচির ঘ্রাণ
মেহেদির লাল রং কিবা নখ জুড়ে রংয়ের পালিশ।

ঠোঁটের কোনায় নেই ঝলমলে হাসি, মনের শান্তিও
বিদুরিত আজ, উদাত্ত হাত নেই জড়িয়ে ধরার

তবুও ভুবন জুড়ে আনন্দ রাশি, গোপন হাসি।

উপচে পড়ছে যেন আজ চাঁদ রাত-
অপেক্ষায় উন্মুখ কখন হবে সে কাঙ্ক্ষিত সকাল।


ভুলি নি সাঁতরাতে

চাতকের জল চাইবার মতো উষর মরুভূমিতে
জল চেয়েছিলাম,
তুমি দিয়েছিলে বালুঝড়।

মাঘের বাঘ কাঁপা শীতে উষ্ণতা চাইলে
ঠাণ্ডা ঝড়ের গতি
আছড়ে দিলে আমার ওপর।

ভেসে যাওয়া সমুদ্রে খড়কুটো ভেবে যেই ধরেছিলাম তোমাকে
তুমি এক ঝটকায় ঠেলে দিলে
আজদাহা ঢেউয়ের স্রোতের ওপার।

ভুলি নি আঁচড়াতে, ভুলি নি সাঁতরাতে
তাই বুকে হেঁটে, হামা দিয়ে,
ছুঁয়ে দিলাম স্বপ্নের আকাঙ্ক্ষিত পাড়।


অনেক কথা বলার ছিলো সূর্য

অনেক কথা বলার ছিলো তোমাকে,
অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলাম।
তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম স্নিগ্ধ সৌরভ আর মুগ্ধতায়,
বলতে চেয়েছিলাম বেলী আর মাধবীলতার মতো
প্রস্ফুটিত হাওয়ার দোদুল দুলনে, অকপটে।

তারা যেমন মাটি ছেড়ে একটু একটু বেড়ে ওঠে ক্রমশঃ
তারপর মাটি রেখে আকাশে ছড়িয়ে দেয় দেওয়ালের ওপার।
বাতাসের শরীরে, তেমনি আমিও।
আমার কথারা তেমন ফেনিল উচ্ছ্বাসে জলরাশির মতো
হত-বিহবল ছড়িয়ে পড়ে এদিক সেদিক; সাগরময়।

আমি বলতে চেয়েছিলাম সব, তুমিও উন্মুখ ছিলে চিরকাল।
কিন্তু তিথিতে মেলেনি আমাদের, পাখা মেলে উড়ে গেছে সমূহ লগন।
তবুও কথারা হারায় নি কোনদিন। হারাবে না আর।
তারা ধীরে ধীরে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বেড়ে ওঠে
দিন দিন মাধবীলতার মতো ছড়িয়ে আকাশ।
না বলা কথাগুলো গুমরে কেঁদে ওঠে মাঝরাতে
বেলীর থোকার মতো সৌরভে এবং মাধবীলতার মতো সৌন্দর্যের অধিক।

জানো তো সূর্য, সুখ শুধু তাই, রাত শেষে কথাগুলো
বেলীর থোকার মতো সুগন্ধি হারায় না তার,
ঝরে ঝরে পড়ে না সকালের রোদে কোনদিন।
তারা শুধু ফেনিয়ে ফেনিয়ে ওঠে,
পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওঠে ফনা তোলা সাপের মতোন।
তারা শুধু দংশন দংশনে ফালা ফালা করে বিষ দাঁতে যখন তখন।
আমি নীল হই। বিষ দাঁতে ঘষে দেই দংশানো শির।
মাথা উঁচু করি, পায়ে পায়ে ভর তুলি মাধবীর মতো।
দুলে দুলে ফুলে ফুলে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে নীলকন্ঠ হই।
আমিও ফোটাতে থাকি থোঁকায় থোঁকায় কত কথাদের ঝাঁড়।
তবু জানো, কথারা মরে না, তারা যেন একেকটা নীলকণ্ঠ বিষ।
শুষে নেয়, চেটে নেয় বিষেরও অধিক।

তোমাকে বলেছি অনেক, রাখ ঢাক, লুকোচুরি জানি না তেমন।
অথচ বলিনি কতো, তাও যা বলেছি, তারও অধিক।
বলতে চেয়েছি কথা বেনী দোলা কিশোরীর মতো,
যেন রাজহংস মৈথুনে ভাসা মাতাল দুপুর
বলতে চেয়েছি কথা দূরবন ঘেঁষা কোন সড়কের পাশে
সান্ধ্যকালীন বাঁশি বেজে যায় দূরে
হুইসেল বাজিয়ে যাওয়া ট্রেনলাইন ধরে
যেখানে নিস্তব্ধতা ঝিঁঝি পোকা বেজে যায় সন্ধ্যার সুরে
বলতে চেয়েছি কথা বাদামের থোকা থোকা গুচ্ছের মতো
অথচ মিলিয়ে গেছে প্রতিবারই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোন বহুদূরে
পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় জমে গেছে কথা।

কান্নার জন্য যেমন কাঁধ লাগে কারো, কিংবা কখনো লাগে বিছানা,
বালিশ; লাগে নিঃসীম ঘর।
তেমনি কথায় লাগে কিছুটা সময় এবং কিছু লাগে ঝড়।
ঝড়টা আমারই শুধু ভেতর বাহির আর উথাল পাথাল ঢেউ বহে অবিরাম।
তোমারও যে কম ছিলো তাও কিছু নয়।
সময়টা অসময় শুধু থেকে যায়।
না ঘর, না বাহির, না রেষ্টুরেন্ট, না পার্ক কোথাও
এতটুকু সময় আর হয় নি আমার।
তাই তুমি অভিমানে, অভিযোগে আজীবন নীলকণ্ঠ হও।

চারিদিকে শত চোখ হা করে আছে, তুমি যে সূর্য তাই তুমিই একক
তেমনি আকাশ বৃক্ষ লতা সমূহ দিগন্ত পৃথিবী জড়ায়।
তারা দেখিছে আমায়। আর দেখিছে তোমায়।
তাতে কি এসে যায়? বলো সূর্য, তাতে কি এসে যায়?

ভেতরটা ফুটে থাকে টালমাটাল। ভেতরটা গন্ধ ছড়ায় বেলীর অধিক,
অন্তর সুস্মিত মাধবীর ঝাড়।
ভালো থেকো সূর্য আজীবন আমার।
আমিও পৃথিবী এক সূর্যের আকাশ।