সৈকতজ্যোৎস্না ॥ আলম শাইন



সূর্যাস্তের সামান্য পরে পূর্ব আকাশ আলোকিত করে মস্ত এক গোলাকার চাঁদের আবির্ভাব ঘটল। অন্যরাতের চাঁদের চেয়ে আজকের চাঁদ যেমন পরিপুষ্ট তেমনি ঝকঝকে উজ্জ্বলও। মুহূর্তেই আলোক জ্যোতিতে চারপাশ ফর্সা হয়ে গেল। আঁধার যত ঘনিভূত হচ্ছিল চন্দ্রজ্যোতির উজ্জ্বলতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সৈকতময় এক জাদুকরী রাজ্যে পরিণত হয়েছে; সমুদ্র যেন এখন এক রূপকথার ক্ষীরসাগর। যে সাগরের ক্ষীর পায়েসের প্রলুব্ধতায় আমরা প্রাণবন্ত সময় কাটাচ্ছি।
রাত যত গভীর হচ্ছে, ততই রহস্যময়ী হয়ে উঠছে চন্দ্র। চন্দ্রের রূপে অভিভূত হয়ে মোহগ্রস্তের মতো তাকিয়ে রইলাম আমি। তেমনি মুহূর্তে মহব্বত দয়াল বলল, ‘বড়মিয়া, খাবার দিব? খাবেন এখন?’
বললাম, ‘দাও, খাওয়া যায়’।

আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসা প্যাকেট থেকে মহব্বত দয়াল খাবার বের করে খেতে দিলো। সামান্য জলখাবার শেষে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম; তার সঙ্গে উপভোগ করতে লাগলাম সমুদ্রের গর্জন, শনশন বাতাস আর উঁচুনিচু ঢেউয়ের গড়াগড়ি।
রাত ১১ টা নাগাদ সৈকত ছেড়ে বাংলোর উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম আমরা। এবার আমাদের ভেষজ প্ল্যান্টের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। আধ ঘন্টার মধ্যেই বাংলোয় পৌঁছে যাব আশা করি। তাছাড়া এপথে দূরত্ব কম। নদীর পার ধরে হাঁটা রাতে নিরাপদ নয়, যদিও চলতি পথটাও নিরাপদ নয়, তথাপিও দূরত্ব কমিয়ে আনার প্রয়াসে এই পথ ধরলাম।

চলতি পথের দুধারে গাছ-গাছালি আর লতাজঙ্গল হলেও দেখেশুনে হাঁটলে তেমন একটা অসুবিধা হওয়ার নয়। বরং জ্যোৎস্নাস্নানে সিক্ত হয়ে দুজন পূর্ণিমার বনরূপ অবলোকন করতে পারছি।
বনপ্রান্তরের পূর্ণিমা রহস্যময়ী হয় জানি, কিন্তু এতটা রহস্যময়ী হয় সেটা আগে জানা ছিল না আমার। গাছ-গাছালির বিশাল ছায়া আর লতাগুল্মের ওপর ছড়িয়ে পড়া চাঁদের ঠাণ্ডা আলোর স্রোতের প্রবাহে এক ইন্দ্রজালের সৃষ্টি করেছে যেন। বনময় নীরব নিস্তব্ধ এখন; দুটি পাতার সামান্য সংঘর্ষও কানে পৌঁছে যাচ্ছে অনায়াসেই। দূরের লতাঝোঁপকে পাহাড় সাদৃশ্য লাগছে। মনটা উতাল পাতাল করছে সেই কাল্পনিক মায়াবি পাহাড়টাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে। মনের সংকল্প জানাতে ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে হারিয়ে যাওয়া চন্দ্রমুখীর কথা জানাতে।

ইতোমধ্যে প্রায় মিনিট বিশেক পথ হেঁটেছি আমরা। অমনি কানে এল বুনো কুকুরের গর্জন। খুব কাছাকাছি না হলেও তেমন দূরেও নয় গর্জনের উৎসস্থল। বিপদ সন্নিকটে, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমাদের। তাই সঙ্গে সঙ্গে ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়লাম, আর সামনে অগ্রসর হইনি। ক্রমশ আওয়াজ স্পষ্ট হচ্ছে, তার মানে কুকুরগুলো রাস্তাধরে আমাদের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। সামনে শিকার, সেই উদ্দেশ্যে নয়, চাঁদনি রাতে প্রশস্ত রাস্তাধরে ঘোরাফেরা করছে হয়তো বা। অথবা শিকারের সন্ধানেও বের হতে পারে। ঠিক এমনি মুহূর্তে ওদের চলারপথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হলে পরিস্থতি ভয়াবহ হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। সেটা নির্ভর করবে ওদের সংখ্যার ওপরে। কারণ বুনো কুকুর সংখ্যায় যত বেশি হয়, ততই হিংস্র হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে ওরা সংখ্যায় কয়টা তা আমরা নিশ্চিত নই। অতএব আমরা ঝুঁকি নিতে রাজি নই, নিরাপদে থাকতে চাই।

আওয়াজ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তার মানে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে কুকুরগুলো। উপায়ন্তর না দেখে মহব্বত দয়ালের কাছে জানতে চাইলাম, ‘গুলি কয়টি আছে দয়াল’?
মহব্বত দয়াল জানাল, ‘দুটি’।
তার কথা শুনে আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। দুই গুলি ফুটিয়ে পার পাওয়া যাবে না। তাছাড়া কোনো কারণবশত যদি গুলি ব্যর্থ হয় তাহলে উপায়ই বা কী হবে। বিকল্প কিছু ভাবতে লাগলাম। পেছনে ফিরে যাব সেই ভরসাও পাচ্ছি না। কী করা যায় তাহলে?
কয়েক সেকেন্ড ভেবে চিন্তে স্থির করলাম গাছে চড়তে হবে। মহব্বত দয়ালকে বললাম, ‘জলদি একটা গাছে টর্চের আলো ফেল। দেখ সাপখোপ আছে কিনা গাছে’।

দ্বীপ বনের গাছের ডালপালায় কিংবা ঝোঁপজঙ্গলে প্রচুর সাপের বসতি। যখন তখন সাপের সাক্ষাৎ মিলে এখানে। রাতবিরাতে সাপের উপদ্রব আরও বেড়ে যায় সুতরাং সাবধান হতে হবে।
মহব্বত দয়াল খুব দ্রুত মাঝারি আকৃতির একটি গাছ বাছাই করল, গাছটির ডালপালা নিচের দিকে ঝুলানো। তারপর টর্চের আলো জ্বেলে নিশ্চিত হলো গাছটি নিরাপদ। যখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলো তখন আমাকে গাছে চড়তে তাগিদ দিলো।
আমি গাছে চড়তে অভ্যস্থ নই, তাই মহব্বত দয়াল আমার কোমরে হাত লাগিয়ে গাছে চড়তে সাহায্য করল। তারপর নিজে গাছে চড়ার উদ্যোগ নিতে নিতে বলল, ‘বড়মিয়া, এবার একটা ফাঁকা আওয়াজ করি, আওয়াজ শুনলে আমাদের লোকজন চলে আসবে’।
‘বুদ্ধিটা খারাপ না। গুলি ছুঁড়ে জলদি গাছে চড়। ওয়াকিটকি আমার হাতে দাও, লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমি’।

মহব্বত দয়াল মুহূর্তে বন্দুক ওপরের দিকে তাক করে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ল। বিকট আওয়াজ হয়েছে। সেই আওয়াজে বনপ্রান্তর কাঁপিয়ে ধ্বনি প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল। কিন্তু তাতেও কুকুরের গর্জন থামেনি; বরং ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তার মানে কুকুরগুলো আরও কাছে এসে গেছে, ওরা গুলির আওয়াজে ভীতসন্ত্রস্ত হয়নি। মহব্বত দয়ালকে আর একসেকেন্ডও নিচে থাকতে দিলাম না। দ্রুত তাকে গাছে চড়তে নির্দেশ দিলাম, সে দ্রুত লাফিয়ে গাছে চড়ল।
আমরা দুইজন একই গাছে চড়েছি, শক্ত মজবুত ভিন্ন ভিন্ন ডালে। ইতোমধ্যে ঘটনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৪-৫ মিনিট অতিবাহিত হয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে আমরা নিরাপদে আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়েছি।
কুকুরগুলো ধেয়ে আসছে সামনের দিক থেকে। আমরা চুপচাপ বসে আছি। ওদের গন্তব্যে ওরা চলে যাক আগে তারপর সিদ্ধান্ত নিব কী করার আছে আমাদের।

গাছে চড়ার মিনিটের মাথায় কুকুরগুলো আমাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। ভরা পূর্ণিমার ফর্সা আলোতে স্পষ্ট দেখলাম একপাল বুনো কুকুর চেঁচাতে চেঁচাতে গাছের নিচ দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে চলে যাচ্ছে আমাদের পেছন দিকে অর্থাৎ সৈকত অভিমুখে। ভয়ে আমার শরীরের সমস্ত রোম শিউরে ওঠল। চোখ বন্ধ করে রাখলাম আমি, এই বুঝি নিচে পড়ে গেলাম। আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল সালেহ দেওয়ানের কঙ্কাল আর কুকুরগুলোর তীক্ষ্ম দন্তপাটি।
কুকুরপাল অনেক দূর চলে গেছে, তার পরেও আমরা নিচে নামার সাহস পাইনি। বলা তো যায় না আবার যদি পেছন ফিরে আসে।

গাছের ডালে বসেই ওয়াকিটকির মাধ্যমে অফিসের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না; এতরাতে কেউ রিসিভ করার কথাও নয় অবশ্য। এখন রাত বাজে সাড়ে ১১ টার ওপরে। বনবাদাড়ে সাড়ে ১১ টা মানে হচ্ছে অনেক গভীর রাত। প্রায় ১৫-২০ মিনিটের মতো গাছে কাটিয়ে দিলাম, কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না তখনো। তথাপিও হাল ছাড়েনি। ওয়াকিটকির আওয়াজে কারো না কারো তো ঘুম ভাঙ্গবে নিশ্চয়ই। চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম বারবার। এরই মধ্যে টের পেল প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিনয় ভৌমিক। ঘুম ঘুম চোখে কথা বলছে সে, তাই স্পষ্ট বুঝতে পারছে না কী বলছি। বারবার বলতে লাগলাম, ‘বিপদে পড়েছি, আমাদেরকে উদ্ধার কর’।

‘বিপদ’ শব্দটা কানে যেতেই বিনয় ভৌমিকের হুশ হলো। সে এবার মনোযোগ সহকারে সব কিছু শুনে দ্রুত কয়েকজনকে ঘুম থেকে জাগাল। তারপর সবাই মিলে পরামর্শ করতে লাগল আমাদেরকে কীভাবে উদ্ধার করা যায়। একেকজন একেক রকমের পরামর্শ দিলো; ওয়াকিটকির মাধ্যমেই সব পরামর্শ এল। পরিশেষে তারা মশাল জ্বালিয়ে কয়েকজন মিলে বন্দুক নিয়ে আসার উদ্যোগ নিল। আমি বললাম, তার আর দরকার নেই, কুকুরগুলো চলে গেছে। এখন আমাদের হাতি মায়ারানিকে পাঠালেই আমরা নিরাপদে পৌঁছতে পারব। আমার সিদ্ধান্ত তাদের মনে ধরেছে, সঙ্গে সঙ্গে মাহুতকে জাগিয়ে মায়ারানিকে নিয়ে একজন সশস্র প্রহরীসহ চলে এল আমাদেরকে উদ্ধার করতে।