স্পর্শ ও অন্যান্য ॥ ফেরদাউসী কুঈন



স্পর্শ

আমি ছুঁলে,
পথের যে ধুলো
পথচারীর পায়ে উড়তে থাকে অনন্তকাল
সেও নিজেকে দামি ভাবতে শুরু করে।
আমি ছুঁলে,
শুকনো যে পাতা
ভেঙে যায় পায়ের সামান্য আঘাতে
সেও নিজেকে দামি ভাবতে শুরু করে।
আমি ছুঁলে,
শীর্ণ যে ভিখিরি
দু’মুঠো অন্নের জন্য ঘোরে দ্বারে দ্বারে
সেও নিজেকে দামি ভাবতে শুরু করে।
আর আমি না ছুঁলে,
দামি যে রত্ন
যা মুঠোয় পেতে চলে প্রাণান্ত চেষ্টা
সেও নিজেকে বিপন্ন বোধ করে।


শির হয়ে ওঠে আরো উন্নত

তোমার মৃত্যুর পর আমার ভ্রুণ তৈরি হয়েছে
আমি জন্মে জানতে পারিনি কি হারিয়েছি
বুঝাতে পারিনি কতটা পেছনে চললাম আমি
তারপর বহু বছর একটানা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে একটু মেলেছি চোখ
এরপর ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করেছি

এখন আমি জীবন্ত, উদ্যত, উদ্ধত
আমাকে কেউ বলে দেয়নি বাংলাদেশকে ভালোবাসার কথা
আমাকে কেউ চিনিয়ে দেয়নি বাংলার শত্রু মিত্র
তবু আমি ডানে বায়ে সবাইকে চিনতে পারি

বুক জুড়ে এখন
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বিশাল মানচিত্র
সেই মানচিত্রে দীপ্যমান একটি মুখ
যখন সাত মার্চের কালজয়ী ভাষণ শুনি
প্রচণ্ড উদ্দীপনায়, উন্মাদনায় শানিত হয় চেতনা
তখন ভুলে যাই নিজেকে নিজে
সোনার বাংলা ধারণ করে আমি হয়ে উঠি বাংলাদেশ
শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত, অপমানিত, অবহেলিত
মানুষের হাতিয়ার হয়ে
আমার শির হয়ে ওঠে আরও উন্নত
আরও উন্নত, আ-র-ও উন্নত…


আমি তোমাতেই বাঁচি

বঙ্কিমদেহে ঢেউয়ের বাঁকে বাঁকে ভেসে ভেসে
ইছামতির স্বচ্ছ জলে সাঁতার শিখে হিমানী।
বুড়িগঙ্গা বুড়ি হওয়ায় শরীর জুড়ে ঘা,
হিমানী জলে পা ভেজাতেই শুরু হয় রক্তবমি-
বহুক্রোশ বহু বিরুদ্ধ বাঁধা পেরিয়ে শুরু হয় পথচলা;
দক্ষিণেশ্বরে গঙার জলে শুদ্ধ হয়ে শেষে রবি দ্বারে
অপেক্ষায় কাতর ছাতিম তলে রবির দেখা পাবে বলে
জীবন সায়াহ্নের রবি আম্রকুঞ্জের ছায়ে হাঁটে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে
হিমানী বিষ্ময়ভরা চোখে বলে, দাঁড়াও রবি একটু দাঁড়াও
বুকে খাঁ খাঁ রোদ্দুর নিয়ে অপেক্ষায় আছি
তুমি ছত্র ধরো এই বিদেশীনির।
তবু রবি চলতে থাকে কোন কথা না বলে
চিৎকার করে কাঁদে হিমানী, বলে- দাঁড়াও রবি দাঁড়াও
তোমায় পাবো বলে এতটা পথ মাড়িয়ে এসেছি
ফিরে তাকাও; আমায় বর দিয়ে যাও রবি
রবির বুঝি সদয় হল, ফিরে তাকায়, সম্মুখে এসে কয়-
আমি জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা অস্তাচলগামী পাখি
তুমি পথ ভুল করে এসেছো ভুল পথে।
হিমানী বলে; যদি বল ভুল, তবে তাই, ভুলের মায়া জড়িয়েছি আমি
আমি শুধু তোমারেই জানি, তোমারেই চিনি
আমায় শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিওনা রবি
শান্তির অন্বেষায় এসেছি তোমার শান্তির নিকতনে
হাত ধরে নিয়ে চলো রবি, আমি পথহারা ক্লান্ত পথিক
রবির বুঝি এবার একটু মায়া হল
রবি বলে, এসো তবে এসো, এই শান্তির আশ্রমে
বকুল বীথি আম্রকুঞ্জে, শালবীথির ছায়া দেবো
পূণ্য চিত্তে সামনে চলার মন্ত্র দেবো-
বাণী দেবো, ছন্দ দেবো, দেবো সুরের ধ্বনি-
হিমানী বলে, তবে তাই হোক গুরুদেব-
তুমি আরাধ্য আমি রাজি
আমি তোমাতেই বাঁচি।