স্মৃতিমেদুর আমার শাশুড়িমা ও চাঁদের এক অনন্ত পাহাড় ॥ দিলারা হাফিজ




নিজে সুখে থাকা, জীবনের চরম সার্থকতা নয় বরং কাউকে সুখে রাখতে পারাটাই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় ধর্ম—এমন একটি বিশ্বাসকে তিনি মনে প্রাণে ধারণ করে জীবনেরপথকে আবিষ্কার করেছেন নিজস্ব মেধার আলোকে।
অসাধারণ মানুষ তিনি। আম-দুধের মতোই স্বাদু তার ব্যবহার। আমার শাশুড়িমার নাম রাবেয়া খাতুন। কিন্তু চারপাশের পাড়াপ্রতিবেশীরা তাকে ডাকতো কবি পুত্রের ডাক নাম অনুসারে ‘জীবনের মা’ বলে।
ব্যক্তি জীবনেও তিনি খুবই ধার্মিক মানুষ ছিলেন, তাঁর এলাকার অধিকাংশ ছেলে মেয়ে তাঁর কাছে আরবী ভাষায় ধর্মীয় শিক্ষালাভ করেছে। তবে ধর্মের নামে অন্ধতার সানগ্লাস পরিয়ে দেননি কারও চোখে।

ব্যক্তিগত জীবন ধর্মেও ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞাময়ী, কল্পনা-প্রবণ, কৌতুহলী এবং একই সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে ততোধিকযুক্তবাদী। অশ্রুতপূর্ব,অসাধারণ একটি জীবন জিজ্ঞাসাময় ডায়লগ শুনেছিলাম তার মুখেই প্রথম। ‘বৌমাকে ভালোবাসলে তবেই না ছেলেকে পাবো। ছেলের মনের মধ্যে যে বাস করে সেই বৌমনিকে গালমন্দ করলে কি আর ছেলের মন পাওয়া যায়? যায় না’।

এই রকম বৌদ্ধিক অনুপ্রেরণাদায়ী একজন শাশুড়িমায়ের বৌমা হবার সৌভাগ্য হয় আমার। সন্তানের কাছে যার কোনো প্রত্যাশাই ছিলো না। একটাই চাওয়া ছিলো তার, সন্তানের মুখে গালভরা ‘মা’ ডাক শুনে শ্রবণ সার্থক করা। রবীন্দ্রনাথের লেখা দুটো চরণ প্রায়ই আওড়াতে শুনেছি তার মুখে।
‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান/ চোখে আসে জল ভরে’।
এমন একজন শাশুড়িমাকে বুঝতে ও বোঝাতে হলে সামান্য একটু অতীত পথের আলদিঘীতে ঘুরে তো আসতেই হয়।
আমি তখন ইডেন কলেজ পুরোনো হোস্টেলের সহকারি হোস্টল সুপার। শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাঠদানের বাইরে বাড়তি এই কর্মসূত্রে ছাত্রীদের হলসংলগ্ন দুই কামরার আবাসিক সুবিধা পেয়েছিলাম চাকুরি জীবনের প্রায় শুরু থেকেই।সোনার হরিণ সদৃশ্য ঢাকা শহরের এই আবাসিক সুবিধার সদ্ব্যবহার করতেই ছোটভাই-বোন দু’জনকে গ্রাম থেকে এনে ভর্তি করেছিলাম তাদের শিক্ষা-জীবনের অধিক উন্নয়নের কথা ভেবে।
সব থেকে ছোটবোন শেলিকে আজিমপুর গার্লস হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণীতে। শীতল ইউনিভারসিটি ল্যাবরেটরী স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। সঙ্গে আমাদেরই গ্রাম থেকে আনা সার্বক্ষণিক কাজের সহায়ককর্মী সালেহা। এভাবেই একজন চিরকুমারী প্রভাষকের মনে সংসার-জীবনের রূপকল্প গড়ে ওঠে। এমন কি বাস্তবের পালে হাওয়াও বইতে শুরু করেছিলো বড্ড নিভৃত নিরালোকে। কিন্তু বিধাতার মনে যে অন্য কিছু ছিলো, তা তো বুঝিনি তখন। হ্যাজাকের ঝলমলে শাদা আলোর মতো এখনো মনজুড়ে আছে জীবন-ইতিহাসের প্রথম পাতাটি। সেখানে কর্মকেই পরম একধর্মশালার খাদেম মনে করেছি।

১৯৮১ সালের অরিন্দম সেই সময়ের অকালপ্রবাহে উৎকীর্ণ হয়ে আছে ২৮ অক্টোবরের তারিখটি। এইদিনে বিসিএস সাধারণশিক্ষা ক্যাডারের অধীনে আমি সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে চাকুরিতে প্রথম যোগদান করি টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজে। প্রিয় ঢাকা ছেড়ে বেশিদিন অবশ্য সেখানে থাকতে হয়নি আমাকে। বিজয়দিবসের একদিন আগে বদলি হয়ে ১৫ ডিসেম্বরেই ইডেন মহিলা কলেজের মতো স্বর্গোদ্যানে যোগদান করেছিলাম নেহাইত ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো বলে। আর কী করে যেন তৎকালীন অধ্যক্ষ আবেদা হাফিজের নজর কেড়েছিলাম। সম্ভবত শ্রেণীকক্ষে ভালো পাঠদানের সুনামসূত্রে। এরপর তিনি আমাকে ডেকে ডেকে একটার পর একটা দায়িত্ব দিতে থাকেন। হোস্টেলের পরের দায়িত্ব ছিলো ছাত্রীদের নিয়ে বিএনসিসি করা এবং কলেজের সাংস্কৃতিক সব অনুষ্ঠানের সমূহ উপস্থাপনার কাজ আমাকেই করতে হতো ততোধিক সরস চিত্তে। পাশাপাশি আমার কাব্যচর্চার স্রোতধারাও গতি পেলো তুমুল অনুরাগে। কবিতা লেখা ও কবির সঙ্গে প্রণয়-সরোবরের আরক্তিম জলদেশে, অলৌকিক এক শ্যাওলা-সবুজ সময় যাপন করছি নিভৃত যতনে।

শত কাঁটায় কণ্টকিত এইপথ, দুরূহ ও বন্ধুর। সব কিছু ছাপিয়ে আমাদের প্রেম ছিলো লিবিয়া অঞ্চলের সাহারা মরুভূমিতে গড়ে তোলা পরম কাঙ্ক্ষিত হিরন্ময় সে এক অনন্যমরুদ্যান। এই মরুদ্যানে ফুল ফোঁটাবার সংকল্প নিয়েই অনাড়ম্বর এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় শিমুল তুলোর মতো সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব আকাশ পানে উড়িয়ে আমাদের বিয়ে হলো, ১৯৮৩ সালের মে মাসের ১২ তারিখে। আমি চেয়েছিলাম মা ফাতেমার মতো আড়াইটাকা দেন-মোহরে বিয়ে হোক আমার। কিন্তু কাজী সাহেবও তাতে রাজি হলেন না বলে, দশ হাজার টাকায় নিকাহনামা সিদ্ধ হলো দু’জন কবির। বাস্তব জীবনে দু’জন কবির বিয়ে মানে—শমীবৃক্ষ আর খজ্জুরবৃক্ষের বিবাহকর্মশালা।

সত্যিকারের কবিপ্রাণ তো বিহঙ্গ-প্রবণ। বিয়ের ক’দিন বাদেই যদি হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি—যদি মনে হয়, ‘হেথা নয় হেথা নয়, অন্যকোথা অন্য কোনোখানে’। যদি এই বন্ধনকে ভুলেও মনে হয় সোনার শেকল—তাহলে দু’জন কবির যে কেউ —-বিশেষ ভাবে গরীব পুরুষ কবি বেচারা যেন দেনমোহরের দায় থেকে সহজে মুক্ত হতে পারেন—সেই জন্যেই আমি তাঁকে অর্থের দণ্ডে বাঁধতে চাইনি। সকল ঝক্কি পেরিয়ে বিয়ে তো হলো, হোস্টেলে তো আর থাকা যায় না। আমি ছাত্রীদের প্রেমের অনুপ্রেরণা, আমাকে ঘিরে তাদের অপরিসীম কৌতুহল। চোখের পলকে কখনো আমি শর্ষেফুল, কখনো আবার বাঁধনছাড়া প্রণয়-ব্যাকুল অর্ধমরণ।

দুই.

অবশেষে জুন মাসের শেষদিকে আজিমপুরের সরকারি আবাসন ‘পার্টি হাউস’-এ উঠে আক্ষরিক অর্থে আমাদের বিবাহিতজীবন শুরু। তবে এই ফ্রি কস্টের আবাসন সুবিধা ফেলে যাবার বেলায় আমার পোষা বেড়াল নিধিকে রেখে যেতে হলো।কেননা, আমার নতুন জীবনসঙ্গী কবি সাহেব বেড়াল একদম পছন্দ করেন না।কবির অপছন্দের মূল্য দিতে নিধির জন্যে আমার হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে। নিধি আমার চারপাশে ঘুরে মিউ মিউ করে মা ডাকছে। ওর দিকে তাকালেই চোখ ভরে যাচ্ছে জলে। তবু আমি নির্বাক।

প্রথমদিন চলে যাবার সময় সব মালামাল নিতে পারিনি। পরের দিন আমি একাই বাকী মালপত্র নিতে এসে যখনই তালা খুলে বাসায় ঢুকেছি, সঙ্গে সঙ্গে ছাদের কার্নিস থেকে লাফিয়ে পড়ে নিধি মা মা করে আমার কাছে এলো। আক্ষরিক অর্থেই আমার পায় দুটো সেদিন সে জড়িয়ে ধরেছিলো মানুষের মতোই। এমন কাকুতি মিনতি করে কেঁদেছিলো যেন কিছুতেই ওকে আমি ফেলে না যাই। আজো সেই এক টুকরো স্মৃতি হৃদয়ের খুব গভীর তলদেশে লালন করি। তখন মনে হয়েছিলো ভালোবাসা প্রকাশে প্রাণী ও প্রাণের তফাৎ নেই কোনো।

উঠানের বেলগাছ, স্যাঁতস্যাঁতে সীমান দেয়াল ঘেষে মানকচুর ঝাড়, সন্ধ্যামালতী ও দোপাটি ফুলের হাসিকে বিদায় জানিয়ে পুরোনোকে ছেড়ে চলে যেতে হলো জীবনের নতুন পরিবর্তনের ডাকে। আজিমপুর কলোনীকে ঘিরে এখানে দীর্ঘ সবুজের দুরন্ত মাঠ, প্রাচীন রেইনট্রি গাছের ছায়ঘন চাতাল, কিছুদূর যেতেই থমকে দাঁড়ানো পুকুর, সেই সব পুকুরে শ্যাওলা সবুজ নির্বাক জলের আয়না পড়ে আছে রৌদ্রের নিচে। কলোনীর বহুতল দালানের পশ্চিম পাশে ঠিক কবরস্থান ঘেঁষে সারি সারি ছোট্ট এক ফালি বারান্দাসহ এক কামরার বাড়ি, মাঝখানে চৌকোন উঠোন শেষে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো রান্নাঘর একখানা। দিনে রান্নাঘর, রাতে ছোটবোন শেলির শোবার ঘর। টু-ইন-ওয়ান।
ফলে সেই ঘরে একখানা খাটও জুড়ে দিয়েছিলাম শেলির রাত্রি যাপনের জন্যে। সম্মুখ বারান্দায় ছোটভাই শীতলের জন্যে অনুরূপ একই ব্যবস্থা করতে হয়েছিলো। মাঝখানের ঘরটাতে শুধু আমরা দু’জন হরিহর আত্মায় চিরভাস্বর এবং প্রণয়ে অন্তর্লীন। বৈষ্ণব পদকর্তাদের মতো তখন আমাদেরও ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’। এ এক অনন্য স্বর্ণাভ রাত্রিদিন ছুঁয়ে থাকা। মনে হয় ঈশ্বরের কাছাকাছি বেঁধেছি ঘর—তার দেখা পাই, সারাক্ষণ তার অলৌকিক আলোতে ভাসি। রাগে-অনুরাগে গায়কী-জীবন কত যে মধুর সুর-তাল-লয়ে বাজন তোলে, একাকী সঙ্গীহীন জীবনে তা ধারণা করাও সম্ভব ছিলো না আমার জন্যে। ক্ষণে ক্ষণে অন্তরাত্মায় দোলা দিয়ে যায় চণ্ডীদাসের প্রেম বৈচিত্রের সেই শাশ্বত উক্তি-
‘এমন পিরীতি কভু দেখি নাই শুনি
পরাণে পরান বান্ধা আপনা আপনি
দুঁহু কোরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া’।
আমাদের তখন এমনই অবস্থা, আধ তিল না দেখলে কেউ বাঁচি না। মিলনের মধ্যেও বিরহের ছায়াপাত অনুভব করে শিউরে উঠি। তখন সমস্বরে দু’জনেই গেয়ে ওঠি সেই অমৃত সঙ্গীত—‘ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে/আমার নামটি লিখো– তোমারমনের মন্দিরে’।

ঘুরে ফিরে আমাদের ঘরের ছোট্ট ক্যাসেটে বাজে এই একটি মাত্র গান। কত হাজার বার শুনি, তবু তার আবেদন শেষ হতো না কখনো। মনে হয়—খুব বেশি কিছুর দরকার হয় না, দুজন মানুষের শরীর আঁটে—-এমন একটি শোবার চৌকি অথবা খাট হলেই যেন চলে, বালিশ নেই তাতে কি? বই আছে সিথানে রাখার। এই তো এতটুকু জীবন, কী এমন প্রয়োজন? বাকী সবই তো বাহুল্য-লতার কাঞ্চন-কামিনী। এই একটি মাত্র ঘরেই আমাদের ড্রইংরুম কাম বেডরুম। দুইয়ে মিলেই ‘ঘর কৈনু বাহির, বাহির কৈনু ঘর’।
শাদা-কালো প্লাস্টিক বেতে বোনানো চারটি গার্ডেন চেয়ার, একটি টেবিল, আমার বিভাগীয় প্রধান সালমা আপা থেকে সম্প্রদানকারকে পাওয়া একটা হোয়াটনট, একখানা খাট—-সর্বসাকুল্যে এই হলো আমাদের আসবাবপত্র, আমরা দু’জন ছাড়া।

এক কামরার এই বাসায় ওঠার পরের দিনেই আমরা দু’জনে গিয়ে মহাখালি থেকে মন দরে কেরোসিন কাঠ কিনে এনে, ফ্লোর-টু-সিলিং অবধি দেয়াল জুড়ে শেলফ বানিয়েছিলাম বাড়িতে মিস্ত্রী ডেকে। সে এক এলাহি কাণ্ড, মাসখানেক ব্যেপে করাতের শব্দ, হাতুড়ি পেরেকের শ্রম, আরো পনের দিন রঙ বার্নিশে মাখামাখি হলে, তবে তৈরী হলো ছয় খণ্ডের সমষ্টিগত—-অনিন্দ্য সেই বুকশেলফ।

কেরোসিন কাঠে তৈরী এই শেলফের ডিজাইন করে দিয়েছিলেন শিল্পী কাজী হাসান হাবীব। তখন তিনি ‘সাপ্তাহিক রোববার’-এ কবির সঙ্গে কাজ করতেন। ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে আর পেরে উঠলেন না, ফলে খুব অকালে আমরা হারিয়েছি এই অসামান্য শিল্পীকে।
—শেলফের অভাবে এতোদিন অযত্নে পড়ে থাকা বইগুলোর জন্য কবির মনের গভীরে যে কষ্ট ছিলো, অনাদরে ক্ষত-বিক্ষত যে কেঁচোময় যাপনে আটকে ছিলেন, গ্রন্থাবলির তড়িৎ এই ব্যবস্থায় তার মনোবেদনা কিছুটা দূর হলো। গভীর গহন থেকে কবির একটা অন্তর্নিহিত দীর্ঘশ্বাস যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো দ্রুত। সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের ছোট্ট ঘরটিকে সৌন্দর্য ও জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করেছিলো এইবুক শেলফ ও তার হৃদয় কন্দরে রাখা শব্দ-ভাস্কর্য। আর কোনো আসবাবের প্রয়োজন আছে বলে আমাদের কারুর মনেই হয়নি। জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র আছে কিনা, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসুর কাব্য সমগ্র, শার্ল বোদলেয়ারের অনুবাদ যথাযথ আছে কিনা এটাই ছিলো আমাদের পরস্পরের প্রতি জিজ্ঞাসা।

তিন.

যা বলছিলাম, পাকিস্থান আমলে এই পার্টি হাউস তৈরি করা হয়েছিলো পূর্ব পাকিস্তান অংশের দীনহীন মাননীয় সংসদ সদস্যদের জন্যে। কাজেই তার চেহারা যা হবার সেভাবেই গড়ে উঠেছিলো এই পার্টি হাউস এক কামরার বাসগৃহ।বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে তারা আর থাকেননি বলে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে এগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়। ৩৩ নম্বরের বাড়িটি পেয়েছিলাম আমি। এইটুকু বাড়ি পেতেও মাথার ঘাম পায়ে করতে হয়েছিলো আমাদের দু’জনকেই। পদাবলী ছেড়ে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তখন কৃষিমন্ত্রী। তাঁর কাছেও তদবির করতেই তিনি আমার দরখাস্তখানির উপর বাসা বরাদ্দের জন্যে জোড় সুপারিশ করেছিলেন। তারপরেও বছর খানেক দৌঁড়ঝাপের পরে এই বাসাটি পেয়েছিলাম।

আমাদের পার্টি হাউসের বাসায় গৃহ প্রবেশের মাস খানেক পরেই একদিন আমার ভাসুরের বড় ছেলে (জাহাঙ্গীর নগরবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) ফারুক এলো কাকার খোঁজ নিতে এবং আমাকে দেখতে। ঠিকানা বদল করে ওর কাকা কোথায় আছে, কেমন আছে, কার সঙ্গে আছে এসব খোঁজ খবরের উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিলো।ধারণা করি, আমার আন্তরিক ব্যবহার এবং তার কাকার উজ্জীবন উচ্ছ্বলতায় প্রীত হয়ে সম্ভবত সে বাড়িতে তার মা বাবা দাদা দাদীর সঙ্গে পজেটিভ কিছু আলোচনা করেছে।

সেই সময়ে আমার একমাত্র ভাসুর নূরুল ইসলাম খানের বড় কন্যা নীরু শামসুন্নাহার লাকী ও তার স্বামী আবু সাঈদ খান মিন্টু তখন মোহাম্মদপুরের বাস করছে। চল্লিশ দিনের এক কন্যা সন্তান বিভুকে নিয়ে নব্য জনক-জননী হিসেবে তাদের স্বপ্নযাত্রা কেবলি পাখা মেলেছে। তখনো তাদের দেখিনি আমি। কবির পারিবারিক ডাক নাম জীবন। তার পরিবারের সকলেই এই নামে তাকে ডাকে।সেদিন অফিস থেকে ফিরে এসেই আমাকে জানালেন তিনি, ‘শোন মুমু, একটা ভালো সংবাদ আছে আমাদের জন্যে’।
কিসের ভালো সংবাদ?
ভাতিজা ফারুক আজ অফিসে ফোন করেছিলো, আমাকে দেখার জন্যে নাকি মা পাগলপ্রায় হয়ে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় লাকীর বাসায় এসে উঠেছে। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে দেখা করতে বলেছেন মা।
শোনা মাত্রই আমার ভেতরে বইছে বৈশাখের এক কৃষ্ণকালো মেঘের তরু-ঝড়।অশরীরী ভয়ে দুরু দুরু কাঁপন শুরু হলো বুকে। না জানি কি দেখতে হবে আমাকে, কে জানে?
প্রথম শাশুড়ির মুখ দেখবো—এই ভয়ে, ভালোবাসায়, উত্তেজনা, কৌতুহল সব ঠাসাঠাসি করে এক নৌকায় উঠেছে যেন। পালহীন তরীখানি এখন ঘাটে ভীড়লেই হলো।
হুটখোলা রিকশায় বসে যাচ্ছি মোহাম্মদপুরের দিকে। মৃদু বাতাসে আমার লম্বা চুলগুলোর অনেকটাই জীবনের গায়ে এসে পড়ছে বার বার। জীবন আমার বাম হাতটি ওর হাতের মধ্যে নিয়ে সাহস দিচ্ছে। ‘চিন্তা করো না মুমু। আমার মা খুব উদার হৃদয়ের মানুষ, দেখবে, তোমাকে খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করবে সে। আমার মাকে তো চিনি আমি, সন্তান অন্তপ্রাণ। সন্তানের মুখে মা ডাক শোনা ছাড়া সন্তানের প্রতি আর কোনো চাওয়া নেই তার। এমন মহিয়সী মহিলা সারা জীবনে এই একজনকেই দেখেছি আমি’।

সন্ধ্যার কিছু আগে লাকীর বাসায় পৌঁছে যাই দু’জনে। প্রথমে ছেলেকে দেখেই বুকের মধ্যে ঠেসে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলেন মুখ। ‘ওহ, জীবন ওহ, জীবন তুই কেমন আছোস বাবা। তোর চিন্তায় গুণী গাঁয়ে আর তো টিকতে পারলাম না।তোর মুখটা একবার দেখার জন্যে চইলা আইলাম লাকীর বাসায়’।
মাতা-পুত্রের অভূতপূর্ব এই মিলন দৃশ্যে আমি তাকিয়ে আছি অপলক। গায়ে-পায়ে-বয়সে মস্ত এই সন্তানের প্রতি এভাবে মায়ের আদর ও ভালোবাসার প্রকাশ আগে কখনো দেখিনি আমি। কাজেই সেই বিস্ময়ভারানত চোখের ঘোর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি একটু দূরেই।
শাশুড়ির মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেই তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। আলোকলতার মতো আমিও তার স্নেহকাতর নরম বুকে নুয়ে পড়লাম। এরপর আমার দুটো হাত ধরে টেনে তার খাটের পাশে বসিয়ে বললেন, ‘শোন মা, আমার পাগল ছেলে, কবি মানুষ। ওর দায়িত্ব যখন তুমি সাহস করে নিয়েছো, ওকে দেখে রাইখো। ডাক্তারের কথা জানি শোনে, নিয়ম মাইনা চলে সেই ব্যবস্থা কইরো। আমার মন বলছে, তুমি সেই আইয়ুব নবী (আ.)-এর স্ত্রী রহিমা বিবির মতোই। জানাতো, আইয়ুব নবী (আ.)এর সমস্ত শরীরে ঘা হয়ে গেছিলো, এক সময় সেই ঘা থেকে নানান পদের পোকা জন্মাইতো।সামান্য মাংস আর হাড্ডিছাড়া তার শরীরে কিছুই ছিলো না। এই অবস্থায় তার অন্য বিবি তাকে অনেক আগেই ছাইড়া গেছে। একমাত্র রহিমা বিবি তারে ছাড়ে নাই। ১৮ বছর তার সেবা কইরা ভালো করে তুলছিলো। জানো তো সে কাহিনী’।
জ্বি মা, আমার মায়ের মুখে অনেকবার শুনেছি। আপনি দোয়া করবেন আমাকে।
শাশুড়িমা তার ছেলে জীবনের জন্যে টাঙ্গাইল থেকে রোটপিঠা বানিয়ে এনেছেন।লাকী সেই পিঠা স্লাইস করে কেটে শুকনো তাওয়ায় গরম করে খেতে দিলো। সঙ্গে চা।
মায়ের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে এলাম আজিমপুরের পার্টি হাউসে বাসায়।আমার শ্বশুরকে বাড়িতে একা রেখে এসেছেন বলে পরের দিন গুণী গ্রামে চলে গেলেন শাশুড়িমা।

চার.

খুব বিমর্ষ মুখে অফিস থেকে ফিরলেন কবি। শাশুড়িমা বাড়ি চলে গেছেন সপ্তাহ দুই আগে। এর মধ্যে ওদের তরফের কেউ আর আসেনি। আমার মা বাবা এসে দুদিন থেকে মেয়ে-জামাইর কাব্য-সংসার দেখে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেছেন উভয়েই।
যাক, চিরকুমারীর ব্রত ভেঙে মেয়েটা শেষ পর্যন্ত বিয়ে তবু করেছে, যেমনই করুক।আমার মায়ের চোখ-মুখ যেন এমনই একটা প্রশান্তির প্রলেপে ঢাকা ছিলো সর্বক্ষণ।সম্ভবত তার প্রথম কন্যা সন্তানের চোখে মুখেও তিনি সুখানুভূতির বিভা এবং তার সমুজ্জ্বল কিছু সংকেত লক্ষ করেছিলেন তার জননী ইন্দ্রিয় দিয়ে।
জীবন অফিস থেকে ফিরেছে ঘন্টাখানেক আগে, কিন্তু তার মেজাজটি কেমন যেন এক অনুজ্জ্বল ছায়ায় ঢাকা। জীবনকে উপুর্যপুরি মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ভাতিজা ফারুক আজ অফিসে ফোন করে জানিয়েছে যে, বাবা খুব অসুস্থ। তিনি তোমাকে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।
কাজেই ফারুক আজ অভিভাবকের মতো করে বললো, কাকীকে নিয়ে আপনি যতদ্রুত সম্ভব দাদুকে দেখে আসেন। আপনাদের দু’জনকেই দেখার জন্য দাদু খুব উতলা হয়ে পড়েছেন। বাঁচে কি মরে তার তো ঠিক নেই। দেরী করবেন না কাকা।
পরেরদিন নিউমার্কেট থেকে রোগীর জন্য কিছু ফল এবং শাশুড়ির জন্যে শাড়ি, শ্বশুরের জন্যে দামী লুঙ্গি দুটো আর দুটো ফতুয়া কিনলাম। তাদের ছেলে জীবনের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে আগেই শুনে নিয়েছিলাম তাদের খাদ্যরুচি ও পোশাক রুচিসম্পর্কে। বাসায় এসে পোশাকগুলো জীবনকে দেখাতেই বললেন, ‘মার জন্যে শাড়ি কিনেছো কেন, মাকে আবার শাড়ি দিতে হয় নাকি’?
তাদের জন্যে আমি তো জীবনে প্রায় কিছুই কিনিনি। আমার মা বাবা তো আমাকে কাছে পেলেই মহাখুশি। তাদের আবার কিছুদিতে হয় নাকি? জানতাম না তো।
আমিও একটু বিস্মিত হয়ে বললাম, কী যে বলো তুমি। কেন দেবে না, তারা কষ্ট করে সন্তান বড় করেছেন, এখন সন্তানেরই তো দায়িত্ব তাদের দেখা-ভাল করা। কখন কি প্রয়োজন তার খোঁজ রাখা।
ঠিক আছে এবার থেকে তুমি দেইখো।
সেদিন গুণী গ্রাম পৌঁছতে প্রায় পড়ন্ত বিকেল হয়ে গেলো। দেউড়ি বেড়া ছাড়িয়ে ভেতর বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই আমার শাশুড়িমাকে পেলাম। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন আমাকে বরণ করতে। আমি তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে উঠে দাঁড়াতেই বুকে নিলেন এবং আমার হাতে দুশো টাকা দিয়ে বললেন, এই টাকায় তুমি নাকফুল কিনে নাকে পড়বে।
কথাটা শুনে একটু ধাক্কা খেলাম। মেয়েদের দাসত্ব শৃঙ্খল মার্কা এই প্রথার ঘোর বিরোধী ছিলাম বলে আমি নাক ফুটো করার কথা ভাবিনি কখনো। কিন্তু আমার দূরদৃষ্টি সম্পন্ন শাশুড়িমা নিশ্চয় প্রথম দেখায় বুঝতে পেরেছেন, আমার নাকে কোনো ফুটো নেই। তারপরও নাকফুলের জন্যে টাকা উপহার মানে এটা আমার শাশুড়ি মায়ের অব্যক্ত আদেশ। তথাস্ত বলে আমিও তা মনে মনে মেনে নিয়ে পরের যাত্রায় নাকফুল পরে তবেই তার সামনে হাজির হয়েছিলাম।
এল প্যাটার্নের ঘরের প্রথম ও প্রধান কামরায় আমার গৌড়বর্ণের শ্বশুর মহাশয় দক্ষিণ জানালার দিকে মাথা রেখে অনেকগুলো বালিশ পর পর সাজিয়ে উঁচু করে সেখানে মাথা রেখে শুয়ে আছেন নিঃসার হয়ে। ঘরের ভেতরটা বেশ আলো-আঁধারি। প্রাচীন সভ্যতার গন্ধমাখা। শোয়া অবস্থায় তার পায়ে হাত রেখে সালাম করে আমি তার পাশেই বসলাম। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। সেই সময়ে বিড়বিড় করা শব্দে তার চিকন ঠোঁটজোড়া আচমকা নড়ে উঠলো। আর এক হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, বাবা জীবন…।
জীবনও বাবার কাছে খানিকক্ষণ হাত ধরে বসে থাকলো। তারপর উঠে পাশের কামরায় চলে গেলো পোশাক পাল্টাতে। শ্বাসকষ্টের রোগী বাবা, একটু জ্বর আছে গায়ে। কাজেই আমি তার বুকের ত্বকে গরম সরিষার তেল মালিশ করে দিতে থাকলাম। হাত-পায়ের জড়তা ভাঙতে হাতে পায়েও সেই রসুন দেয়া গরম তেল মালিশ করে দিতেই তিনিও কিছুটা ভালো বোধ করে বালিশে ঠেসান দিয়ে উঠে বসলেন। আমার শাশুড়িমাকে ডেকে আমাকে কিছু খেতে দিতে বললেন খুব নরম কণ্ঠে।
এরমধ্যে শরিক বাড়িসহ পাড়া প্রতিবেশিরা ছুটে এসেছে, জীবনের নতুন বৌ দেখতে। দরোজার দুইপাশে, কেউবা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে কেবলি উঁকিঝুঁকি দিয়ে চলছে। প্রতিবেশিদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠলো, নতুন বউ তো বালাই, শ্বশুরের সেবাযত্ন করতাছে মেলা। এরমধ্যে বাতাসে আমার ঘোমটা খুলে পড়ে গেছে, অপরজন বলে উঠলেন, হেইগ্গো, বউজির মাতায় দেকি লম্বা লম্বা চুল…।
আমার শ্বশুর গলা উঁচু করে একটা ধমক দিতেই, সবাই তখন দরোজা ছেড়ে চলে গেলো দূরে।
রাতের খাবারের জন্যে শাশুড়িমা তার প্রিয় জীবনের জন্যে ডিম পাড়ার উপযুক্ত ঢেকি মুরগী রান্না করেছেন, বেত গাছের নরমকুশিসহ মাথাগুলো সিদ্ধ করে ‘বেতাগা ভর্তা’ করেছেন। টাঙ্গাইলে উৎপাদিত এক ধরণের কচু স্লাইস করে কেটে ভেজে তার সঙ্গে কৈ মাছের দোপিয়াজা করেছেন। টাঙ্গাইলের জনপ্রিয় রোটপিঠা বানিয়ে রেখেছিলেন আগেই। (চালের গুড়া শুকনো খোলায় একটু ভেজে তার সঙ্গে মাংশ ও ঝোল মিলিয়ে ময়ান তৈরি করে কলাপাতায় বেঁধে কয়লার আগুনে চুলায় পোড়াতে হয়)। এছাড়া আমাদের দুজনের জন্যে ঠাসা দুই গ্লাস সরপড়া ঘনদুধের ব্যবস্থা তো রয়েছে।

আমার শাশুড়ি মায়ের হাতের এই রান্নাগুলো জীবনে প্রথম খেলাম। তার ছেলে তো আহারে/উহারে করে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুললো। বাবার পাশের কামরায় আমাদের জন্যে পরিপাটি করে বিছানা করা ছিলো। সেখানে শুয়ে আমার তো আর ঘুম আসে না। বার বার চমকে উঠি, জীবনের একটা হাত আমাকে জড়িয়ে রেখেছে।
আমি কি তবে শেষ পর্যন্ত আমার শ্বশুরবাড়িতে আছি? কেমন যেন এক অচেনা ও অনাস্বাদিতপূর্ব এক অপরূপ অভিজ্ঞতা। যেখানে ভয়, ভালোবাসা শঙ্কা একই সঙ্গে অনুভূতির সরোবরের জলে এসে ঘূর্ণি তোলে, ধাক্কা খায়। মেয়েদের এভাবেই সব আপন করে নিতে হয়।
সেদিন সকালে আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমার শাশুড়িমার হাতে তৈরি শর্ষেফুল দিয়ে চিতুই ও মুরগীর মাংস টেবিলেরেডি। নাস্তা শেষ করে জীবন আরেক দফা ঘুমাতে গেলো। গ্রামে এলে তার নাকি সবচেয়ে ভালো ঘুম হয়, কাজেই পড়ে পড়ে সে ঘুমাতেই থাকে নিশ্চিন্তে যেমন মায়ের কোলে শিশুরা।

আমি চুলার পারে শাশুড়িমাকে সঙ্গ দিচ্ছি, এই সময় আমার এক চাচীশাশুড়ি এলেন, পাশের বাড়ির এক মেয়ে কার হাত ধরে পালিয়ে গেছে, সেইসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাটাঘাটি করে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যর্থ চেষ্টা করে ফিরে গেলেন তিনি।আমার শাশুড়িমা ধৈর্য ধরে এতোক্ষণ শুধু শুনেছেন, হা হু কিচ্ছু বলেননি তখন। চাচীশাশুড়ি চলে যাবার পরে তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, শোন মা, মেয়েটা কিন্তু খারাপ নয়, খুবই গুণী মেয়ে, বুঝতে না পেরে হয়তো একটা ভুল করেছে। সেটি যদি পাপ হয়, তবে সেকথা জনে জনে বলে আমি তার পাপকে টাইনা আনবো ক্যান, বলো? জানা থাকলে আমি তার ভালো গুণের কথাই বলবো, পাপের কথা নয়। সেদিনই আমি তার ইতিবাচক মনের পরিচয় পেয়ে ধন্য মেনেছিলাম নিজেকে।
এরপর কত বার এসেছি এই বাড়িতে, ততোদিনে আপন করে নিয়েছি তাদের ভাষা, জীবনাচরণের নানা প্রথা। সব, স-ব। টাঙ্গাইল, মধুপুর অঞ্চলের ভাষায় ক্রিয়পদগুলো একটু টেনে দীর্ঘ করে বলে সবাই। কিছুদিনের মধ্যে আমিও তার কিছুটা রপ্ত করেছিলাম গ্রামের সাধারণ লোকজনের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনে। এতে আমার শাশুড়িমা খুব খুশি হয়েছিলেন এবং পাড়া প্রতিবেশিরাও আমাকে তাদের আপনজন হিসেবে ভাবতে পেরেছিলেন।
আমিও তাদের মতো করে বলতে চেষ্টা করেছি, খাইছুন গো চাচিম্মা? পান খিলাইবেননি এট্টু? বহুইন জ্যে, আম্মা এহনই আয়া পড়বোনে। যাবাইন না জানি।
জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় এই উপলব্ধি হয়েছে যে, জীবনসঙ্গীকে আপন মনে হলে, তার সব আত্মীয়-স্বজনকেই আপন মনে হয়।

একবার পাঁচ মাস বয়েসী আমার প্রথম সন্তান অভিন্নকে নিয়ে প্রায় মাসখানেক গুণী গাঁয়ে ছিলাম শাশুড়িমার সঙ্গে। তখন একদিন খালি একটা স্নোর কৌটা বের করে দিয়ে বললেন, মাগো, আমার পিয়ারা ভাইয়ের (অভিন্নকে তিনি এই নামে ডাকতেন) গায়ে মাখার তেলটা এই কৌটায় রাখো। এটা তোমার খুকি আপার স্নোর কৌটা ছিলো। তার স্মৃতি হিসেবে এতদিন রেখে দিয়েছিলাম নিজের কাছে। আজ তোমার হাতে দিলাম, যত্ন কইরা রাইখো।
আহারে মা, পঞ্চাশ বছর আগে মৃত প্রথম কন্যা সন্তানের স্মৃতি তিনি এভাবেই চোখের জলে ভিজিয়ে রেখেছিলেন নিজের বেদনাসিন্দুকে। আজ তা আমার হাতে হস্তান্তর করে যেন নিশ্চিন্ত হলেন।

একইভাবে মওলা নামে পাঁচ বছরের অপর এক পুত্র সন্তানকে হারিয়ে জন্ম দিয়েছিলেন জীবন নামের কবি সন্তানকে। তাকেও আমার হাতে সঁপে দিয়ে তিনিও অনন্তবাসে চলে গেছেন ১৯৯৭ সালে। নিশ্চয় সেখানে তিনি তার হারানো সন্তানদের ফিরে পেয়ে শান্তিতে আছেন।
পরিশেষে মনে হয়, কবি রফিক আজাদ কবির হবার আগে, তার মা-ই ছিলেন আদি কবি। যিনি এই কবিপুত্রকে গর্ভে ধারণ করে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত প্রতিটি রাতে প্রায়ই স্বপ্নে দেখেছেন চাঁদের এক অনন্ত পাহাড়।

৬/৫/২১
মিউজিক পার্ক, টরন্টো