হতাশা নিয়ে ফিরেছিলাম ॥ রফিকুজ্জামান রণি



প্রথম বইয়ের ভেতরে যে রোদকুয়াশার ছটা জড়ানো আছে তা বলে কিংবা লিখে বোঝানো যাবে না। অতীতের কিছু বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের কথা বাদ দিলে বলবো, আমার প্রথম বইয়ের নাম ‘দুই শহরের জানালা’। বইটি প্রকাশের আগে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন প্রকাশকের দরোজায় দাঁড়িয়েছি। কেউ কথা দেয়নি। অবাক হয়েছি সেদিন, একটা গল্পের বই প্রকাশ করবার আশ্বাস দেয়নি একজন প্রকাশকও। সবাই আকারে ইঙ্গিতে কেবল টাকা আদায়ের ধান্ধায় মত্ত ছিলো। ‘নতুনদের বই চলে না, বইয়ের বাজার মন্দা, কাগজের দাম বাড়তি, আজকাল বই বিক্রি করে বাঁধাই খরচও ওঠে না’-ইত্যাদি আপ্তবাক্য শুনিয়ে আমার উৎসাহটুকু নষ্ট করবার চেষ্টা করেছিলো তারা। কেউ কেউ আবার দুইশ কপি, তিনশ কপি বই কিনে আনার শর্তে রাজি থাকলে বই প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে। স্তম্ভিত হয়ে ভাবতাম, তারা কি আমাকে লেখক না ভেবে বইয়ের দোকানদার ভাবে? আমি কেন দুই-তিনশ কপি বই নিজে নিয়ে বিক্রি করবো? তারপরও বলতাম, ভাই, আমার লেখা বিভিন্ন জাতীয় পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ হয়। আমাকে অনেকেই চেনে, বই করলে অন্তত চালানটুকু হারাতে হবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। টাকা ছাড়া কি বই করা ওতো সহজ।

মন ভেঙ্গে গিয়েছিল। একবার ভাবলাম বইই করবো না কখনও। সব লেখা চুলোয় দেবো। পত্রিকায়ও লেখা পাঠাবো না। অভিমান করে কিছুদিন পত্রপত্রিকায় লেখা পাঠাইনি। লেখা ও পড়া সবই প্রায় থামিয়ে দিয়েছি। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে সাহিত্যের পথ থেকে সরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু রক্তে যার সাহিত্য তোলে ঢেউ, তাকে কি আর সরাতে পারে কেউ?

একদিন ফেসবুকে কবি অচিন্ত্য চয়নের পোস্ট দেখে জানলাম, দেশ পাবলিকেশন্স পাণ্ডুলিপি আহ্বান করেছে। বিজয়ী লেখককে পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ, ক্রেস্ট দেয়ার পাশাপাশি পাণ্ডুলিপিটি বই আকারে প্রকাশ করে দেয়া হবে। লোভ সামলাতে পারলাম না। পূর্বের গুছিয়ে রাখা লেখাগুলো একটু ঠিকঠাক করে পাঠিয়ে দিলাম। পাঠানোর অনেকদিন পরেও কোনো খোঁজ-খবর এলো না। আবারও হতাশার মেঘ ঢাকতে লাগলো প্রত্যাশার সূর্যকিরণ। এরই মধ্যে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন থেকে প্রথমবারের মতো আহ্বান করা হয় পাণ্ডুলিপি। ‘চাঁদপুর জেলা প্রশাসক পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০১৮’ আহ্বানপত্রটি ফেসবুকে দেখে আবারও লেখা পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। এখানে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে নগদ তিরিশ হাজার টাকা। তিরিশ হাজার টাকা হাতে পেলে অন্তত বই প্রকাশের টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না, এই ভাবনা থেকেই পাঠিয়ে দিলাম পাণ্ডুলিপি। পাঠানোর পর এখানেও কোনো সাড়াশব্দ নেই। আমার বই প্রকাশের আশা ক্ষীণ হয়ে এলো।

হঠাৎ একদিন দেশ পুরস্কারের শর্ট লিস্ট প্রকাশ হলো। সংক্ষিপ্ত তালিকায় নিজের নাম দেখে বুকের ভেতরে কইমাছের মতো খলবলিয়ে উঠলো একগুচ্ছ আশা। হয়তোবা পুরস্কারটা পেয়েই যাবো। বইও হয়ে যাবে এবার। ক্রেস্ট আর নগদ অর্থ গোল্লায় যাক, বইটা বেরুলেই বাঁচি। হ্যাঁ, ধারণা সত্য হলো। তরুণ কথাসাহিত্যিক হিসেবে আমি পেলাম দেশ পুরস্কার। পুরস্কার ঘোষণার পর বেশ মাতামাতি শুরু করলাম। আনন্দ আর ধরে রাখতে পারি না। বই তাহলে হচ্ছে এবারই। নতুন স্বপ্নের চর জেগে উঠলো বুকের ভেতরে। জেলার প্রায় সবগুলি পত্রিকা নিউজ প্রকাশ করলো আমার পুরস্কার প্রাপ্তির। নিউজ প্রকাশের একদিন পার না হতেই আবারও এলো খুশির খবর। চাঁদপুর জেলা প্রশাসক পাণ্ডুলিপি পুরস্কারটিও পেয়ে গেলাম। কথাসাহিত্যে। এবার আর আমাকে পায় কে? বইও হবে। টাকাও পাবো। আমার কোনো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নাই। অনেক কষ্ট করে লিখতে হয়, বন্ধুদের দুয়ারে দুয়ারে লেখা কম্পোজের জন্যে হানা দিতে হয় অথবা কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতে হয়। তাই জেলা প্রশাসক পুরস্কার পেয়ে ভেবেছি, তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে একটা ল্যাপটপ বা কম্পিউটার কিনবো। যেহেতু ফ্রিতে বই বেরুচ্ছে দেশ পুরস্কার পেয়ে সুতরাং জেলা প্রশাসক পুরস্কারের টাকায় আমি ল্যাপটপ কিনবোই কিনবো। আমার আর দুর্দিন থাকবে না। লেখালেখিটা অন্তত স্বস্তিতে করতে পারবো। কিন্তু না। জেলা প্রশাসক পুরস্কার কমিটির সঙ্গে আমার বনিবনা হয়নি। ফলে সে পুরস্কার আমি গ্রহণ করিনি। জেদ করে পুরস্কার না নেয়ার ঘোষণা দিলাম।

যেহেতু দেশ পুরস্কার পেয়ে বইটা বের হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেলো, তাই জেলা প্রশাসক পুরস্কার গ্রহণ না করার সাহস আমার আরও বেড়ে গিয়েছিলো। অবশেষে একটু দেরিতে হলেও বইটা প্রকাশ হয়েছিল সে বছর। তবে মজার বিষয় হলো এই, বইটা দ্রুত হাতে পাওয়ার লোভে ভালো করে প্রুফও দেখিনি আমি। প্রুফ দেখে বিলম্ব করার মতো ধৈর্যটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছি তখন। কেবলই বইটা দেখার তৃষ্ণা পেয়ে বসেছিলো। অপার আগ্রহ নিয়ে বসে ছিলাম কখন পাবো জোড়া পুরস্কারে অভিষিক্ত হওয়া আমার গল্পের বই ‘দুই শহরের জানালা।’

এদিকে প্রকাশক আমাকে বারবার হতাশায় ফেলে দিচ্ছেন। আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু- এভাবে সময় ক্ষেপন করতে করতে আমার উৎসাহটুকু বিষাদে পরিণত করছেন। কয়েকবার রাগ করে ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম কিন্তু বইটা যে আমার! এ যে আমারই সম্পদ, অভিমান করলে যে আমারই ক্ষতি, ওকে যে পৃথিবীতে আনা দুষ্কর হয়ে পড়বে। তাই আবারও অভিমান ভেঙে ডায়াল করি ফোনে, আবারও হই হতাশ। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যে বই মেলায় থাকার কথা, সে বই ২০ তারিখও আসেনি। এদিকে নাগরিক বার্তা নামের একটি অনলাইন পত্রিকা পুরস্কারপ্রাপ্তি এবং বই প্রকাশের খবর পেয়ে আমাকে সম্মাননা দেয়ার কথা জানিয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমিসহ ৭জনকে দেয়া হবে সম্মাননা। কিন্তু বইটা তখনও আসেনি। চয়ন ভাইকে সেটাও বললাম। তিনি শুনলেন না। খুব মন খারাপ হয়েছিল তখন। সম্মাননাটুকু অনেকটা ঘুষখোরের মতো চুপিচুপি গ্রহণ করলাম। লজ্জায় এতটুকু হয়ে গিয়েছিলাম অনুষ্ঠানস্থলে। মনে মনে ভাবলাম সম্মাননা তো নিয়ে এলাম, বইটা যদি না বের হয়।

না। আমাকে আর হতাশ হতে হয়নি। ২৫ তারিখ বইটা মেলায় চলে এলো। কষ্টের মধ্যেও খুশিতে নেচে উঠলো মন। দুএকদিনের মধ্যেই ছুটে যাবো মেলায়। উষ্ণ পরশ নেবো আমার বইয়ের। কিন্তু হায় রে বিধি! বই আসার পরের দিন থেকেই সারাদেশে শুরু হলো তুমুল ঝড়-তুফান। মেলার অবস্থাও কাহিল। প্রায় ফেব্রুয়ারি মাস পার করে দিলো এ ঝড়। অবস্থা বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ একদিন মেলা বাড়িয়ে দিলেন। সেদিনই মেলায় গিয়ে হাজির হলাম। বুকে তুলে নিলাম আমার নিজের বই। তারপর ভুলে গেলাম আগে ও পরে কতটা বন্ধুর পথ অতিক্রম করে ছুটে এসেছি। বইটা প্রকাশের কয়েক মাসের মাথায় ‘এবং মানুষ তরুণ পুরস্কার ২০১৯’ পেয়ে পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলাম ফেলে আসা বিষণ্ন মুহূর্তের কথা। এখন তো ভাবতেই অবাক লাগে, এক বছরে আমার প্রায় ৪ খানা বই প্রকাশ হয় কিন্তু এক টাকাও দিতে হয় না প্রকাশকে। একটু দেরিতে হলেও বুঝেছি এদেশে ভালো প্রকাশকও আছে।