হারানো পেশা-১০॥ সোনালী ইসলাম


একটা ব্যাপারে নানী কক্ষনও বাধা দিতেন না। বরং নিজেই পয়সা দিয়ে দিতেন। লোকটার ঘুংগুরের শব্দ শুনলেই আমরা সবাই দৌড় দিতাম সামনের খোলা মাঠে। তেপায়া একটা কাঠের স্ট্যান্ড কাঁধে, আর মাথার উপর একটা বিচিত্র গোল বাক্স নিয়ে লোকটা ঝম্ ঝম্ করতে করতে আসত।

আমরা ছোটরা খুশিতে চেঁচাতাম,
-“বায়স্কোপ বায়স্কোপ… ও বায়স্কোপ ওয়ালা” বলে আর লোকটা আরও দুএকবার ঘুরপাক খেয়ে ঝুমঝুমিয়ে নেচে নিতো তারপর সুর করে বলত,
-“বায়স্কোপ দেখবে… হাতি আছে ঘোড়া আছে গাড়ি আছে বাড়ি আছে পরি আছে সাহেব আছে দেশ বিদেশের ছবি আছে… হুইইইইই হুররর… পয়সা ফেল বায়স্কোপ দেখ, মজার মজার ছবিইইই দেখ, পয়সা নেই তো ছবি নেই, হুইইইই হুর্রররর।”

ছানাপোনা যারা জুটেছিলো সবাই এ ওকে খোঁচায় ও তাকে ঠ্যালে… কিন্তু সব্বাই জানে এই অসাধারণ রোমাঞ্চকর জিনিসটা দেখতে হলে হাতে পয়সা থাকতেই হবে। এ কিন্তু বানর খেলা দেখাতে আসেনি, যে একজন পয়সা দিলে সবাই মিলে দেখা যাবে।

লোকটা তেপায়া স্ট্যান্ডটা নামিয়ে দাঁড় করালো তারপর রাখল গোল বাক্সটা। উপরে একটা হাতল আর সারা গায়ে গোল গোল ফুটো। মোট আটটা ফুটো কিন্তু সেগুলো আবার ঢাকনি দিয়ে ঢাকা। এরই মধ্যে চারপাঁচজন মা বা বড় কারো কাছ থেকে কেঁদে কেটে পয়সা নিয়ে এসেছে। কেউবা ফিরেছে মুখ হাড়ি করে, কারো চোখে টলমল করছে অভিমানী অশ্রু। কিন্তু লোকটার কোন দয়ামায়া নেই। উদাস মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে কান চুলকাচ্ছে। না আটজনের পয়সা মেলেনি। মোট ছয়জন আমরা দুই আনির চৌক পয়সাটা তার হাতে দিলাম, সে ঠিকঠাক গুনে নিয়ে যারা পয়সা দিয়েছে তাদেরকে আলাদা করে লাইনে দাঁড়া করালো। তারপর এক একজন এর ঘেঁটি ধরে ধরে গোল ফুটোয় চোখসহ মাথা ঢুকিয়ে দিলো।

প্রথমে খুব অন্ধকার, তারপর আলো জ্বলে উঠল। একটার পরে একটা ছবি দুলে দুলে চলতে শুরু করল আর লোকটা পায়ের ঘুংগুরে তাল দিয়ে উঁচু গলায় গান শুরু করল,
-হুররররর্ররররর হুউইইইইইইইইই
দেখ দেখ দেখ দেখ
হাতি দেখ ঘোড়া দেখ
ময়ূর পংখি পাখি দেখ
চিড়িয়ার খানা দেখ

হুইইই হুইইই হুইইই
দেখ দেখ দেখ দেখ
পথ দেখ রাস্তা দেখা
ঢাকা বড় শহর দেখ
হাইকোর্টের দালান দেখ
বড় লাটের বাড়ি দেখ
আহসান মঞ্জিল দেখ।

হুইইইই হুইইইই হুইইই
এই বারেতে সালাম দাও বাচ্চারা
মক্কার কাবা দেখ
মদিনার মসজিদ দেখ
দুলদুল ঘোড়া দেখ……

চোখের সামনে আবছা আবছা ছবি সরে সরে যাচ্ছে আর আমরা নিঃশব্দে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ওই উদ্ভট গান শুনছি আর ছবি দেখছি। হঠাৎ পাঁজরে খোঁচা দিয়ে প্রাণের বন্ধু বেবী বলল,
-আমাকে একটু দেখতে দে না।
আমি মাথা অল্প সরিয়ে ওর একটা চোখ রাখার ব্যাবস্থা করলাম। এই ভাবে আরও পাঁচ সাত মিনিট দেখলাম সেই বিচিত্র বায়োস্কপ। লোকটা পা আছড়ে ঘুংগুর বাজিয়ে বলল,
– আমিন আমিন বল সবাই শেষ হলো বায়োস্কপ, বাচ্চালোক হাততালি লাগাও।

আমরা সবাই ফটাফট হাতে তালি দিতে লাগলাম। সেই শব্দে আকৃষ্ট হয়ে আরও বাচ্চা ছুটে আসতে লাগলো। কারো হাতে পয়সা আছে কারও হাতে নেই।

আমি আর বেবী উঠে দাঁড়াতেই লোকটা বলল,
– এই, তোমরা দুজনে দেখেছ, আরও দুআনা দাও।

আমি ঘাবড়ে গেলাম, কিন্তু বেবী ছিলো খুব বুদ্ধিমান, সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
-সুনু আর আমি দুজনে একচোখ দিয়ে দেখেছি। দুই চোখের জন্য দু আনা, বেশী কথা বললে আব্বুকে ডাকব কিন্তু।

লোকটা আর কিছু না বলে পিচিক করে থুতু ফেলে অন্যদের হাত থেকে পয়সা নিতে লাগলো।

বেবী বলল,
– ধুর.. এটা একটা বায়স্কোপ হলো। সে দেখতে হয় হলে গিয়ে। কিন্তু সে জন্য তো বড় হতে হবে।
আসলেই তখনো ছোটদের সিনেমা হলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো

আমি ভাবলাম, বেবীর কি বুদ্ধি। সত্যিই, বড় হয়ে বেবী সচিব না কি যেন একটা হয়েছিলো। আমি কিন্তু আগের মতই ভেবলি হাবা আছি।