হারানো পেশা- ১১ ॥ সোনালী ইসলাম



নানী আজকে খুবই রেগে আছেন। আমি ঝিম মেরে নানার পাশে বসে আছি। যদিও আমার কোন দোষ নেই। কলসি ভেঙ্গেছে কাজের বুয়া, কিন্তু নানীর মেজাজ খারাপ হলে দূরে থাকাই নিরাপদ। গরমকাল, তাই হাতপাখাও নানীর হাতের কাছেই আছে। মনে মনে ভাবছি, ইস্, লোকটা আসছে না কেন? ও আল্লাহ লোকটা যেন আজকে আসে।

তখন ছোট ছিলাম, ততো পাপ অন্যায় করিনি বলে আল্লাহ দোয়া কবুল করতেন। দুই কাঁধে বাঁশের বাকে বড় দুটো ঝাঁকি নিয়ে লোকটা এসে ডাক দিলো,
-ও চাচী, কনে গেলেন, আইছি। রাস্তার থে শোনলাম আপনার কলসি ভাঙ্গিছে, ময়নার মায়ে কলো।
-ও রে পোড়ারমুখো হতচ্ছাড়া, তুমার দিনির হিসেব থাকে না, দুইমাস পার হয়ে গেইছে এহন আইছো নিকচোতি নিকচোতি ( হাসতে হাসতে, যশোরের আদি ভাষা) তুমি কি মাটির জিনিস দে যাও নাকি লুহার যে সম্বচ্ছর চলতিই থাকপে। ত্যাঁদড়ামি করলি কয়ে যাও আরও অনেক কুমোরের পো’ আছে বাড়ি বইয়ে ঠিলে কলসী দে’ যাবেনে।

-চাচী গো, চেইতেন না, এই মাসে মেয়েডা নাইয়র আইলো তাই ওগো নিয়ে এট্টু ঝামিলায় ছেলাম, সেই লেগেই দেরি হয়ে গেইছে।

মূহুর্তে নানীর রাগ গলে পানি।

-ওমা, লক্ষ্মী আইছিলো নাকি? কেমন আছে ছেমড়িডা? শ্বশুরঘর ভালোতো?
-চাচী, আপনার আশীর্বাদে ভালো আছে মা আমার। তা এহন কি কি লাগবে কন।

বিরাট বাঁশের খাঁচা থেকে সে বের করতে লাগল হাড়ি, মালসা, ঠিলে কলসি, সোরাই, সরা, সানকি, পিঠের ছাঁচ, মাটির পিদিম, দেলকো (পিদিম রাখার মাটির নক্সা করা স্ট্যান্ড) মুরগী ডিমে তা বসানোর মালসা, এই সব আরও কতো ঘরকন্নার জিনিস।

নানী বাছতে শুরু করলেন। কলসি নেয়া হলো দুইটা। নানার জন্য আলাদা পানি রাখার সোরাই। মাছ জিইয়ে রাখার ঠিলে, মালসা, ভাতের হাড়ির মুখের সরা, খান দুয়েক সানকি, গোটা চারেক পিদিম একটা দেলকো পিঠের ছাঁচ আরও কতো কি।

আমি উসখুস করছি কিন্তু কিছু বলছি না। দেখি না শেষ পর্যন্ত কি হয়। না হলে নানাজান তো আছেনই।
কলসি ঠন ঠন করে বাজিয়ে দেখা হলো, মাটির সরা ভাতের হাড়িতে ফিট করে নেয়া হলো। নানী একটা মাটির কড়াইও নিলেন দেখতে সুন্দর বলে।

লোকটা বলল,
-চাচী, চুনো মাছের চচ্চড়ি এই কড়াইতি যা মজবেনে, আমার কথা মনে পড়বেনে আপনার।
নানীর কি সহজে কিছু পছন্দ হয়। তিনি আবার জেরা শুরু করলেন,
-কলসি কি মাটি দে করিছ, ঠিলের মতোন বালি দে গড়ো নি তো! আর এই পিদিম কি এক পোড়ের না দো পোড়ের? এক পোড়ের পিদিম টেঁকবে না কিন্তু।

-চাচী, আজীবন আপনাগো কলসি সরাই দিচ্ছি। কখনো আজেবাজে মাটি দিছি কন আপনি। আমার বাপের হাতের জিনিসপত্রও তো আপনি নেছেন, এখন আমার তা নেচ্ছেন, ভগবানে কপালে রাখলি আমার নিবারণও আপনারে কলসি ঠিলে দে যাবেনে। আপনাগের লেগেই তো আমরা বাইচে আছি, নাকি ভুল কলাম কন?

-হইছে, আর বেতান্ত গাওয়া লাগবি না। কতো দিতি হবে হিসেব কর।

লোকটা কর গোনে আঙুল গোনে, মাথা চুলকায়, কিন্তু হিসাব করে উঠতে পারে না। একবার বলে সাড়ে ছয় টাকা, একবার বলে সাড়ে পাঁচ টাকা।
নানী খানিক ভুরু কুঁচকে থেকে বললেন,
-এই যে শুনতিছেন, একটু হিসেবডা মিলেয় দিয়ে যান দিনি, এই অনামুখো কি কচ্ছে আমার মাথায় ঢুকতিছে না।

নানা মুচকি হেসে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বুঝলেন নানান জিনিসের নানান দামে জট পাকিয়ে গেছে।

নানা বিশেষ ঝামেলায় না গিয়ে বললেন,
– ছয় টাকা দিয়ে দাও।

নানী কথা না বাড়িয়ে ঘরে গেলেন টাকা আনতে। আর লোকটা অন্য একটা কাপড়ের থলে আমার হাতে দিয়ে বলল,
– এইডা তুমার কাকী তুমার লেগে পাঠাইছে। নাও সোনা। তুমার খেলনা বাটি।

ইশ, এই জন্যই আমি এতোক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। থলের মধ্যে ছোট ছোট হাড়ি সরা কলসি মালসা কড়াই এমনকি একটা মাটির চুলা পর্যন্ত আছে। আমার সব কটা দাঁত একসাথে বেরিয়ে গেল। শুধু অনুমোদন এর অপেক্ষায় নানার দিকে চাইলাম।

নানা বললেন,
– নাও সুনু, তোমার কাকিমা ভালোবেসে পাঠিয়েছেন।

আমিতো মহা খুশি।
নানী ছয় টাকা আর একটা নতুন কস্তাপেড়ে শাড়ি দিয়ে বললেন,
-এই নাও, লক্ষ্মীর মায়ের জন্যি রাখিলাম, তার হাতে দিও, আশীর্বাদি দিলাম।

নিবারণের বাপ খুব খুশি হয়ে হাতজোড় করে প্রণাম করল।

নানী বললেন,
-দু মাস না পুরতিই আসবা কিন্তু। ময়নার মা হতচ্ছাড়ির হাত তো না, দাও কুড়োল, হাড়ি কলসি ভাঙ্গার তালেই থাকে।

নিবারণের বাবা মাথা চুলকে দার্শনিক ভাবে বলল,
-ও না ভাঙ্গলি আমি কি গড়ব কন দিনি চাচী, দুনিয়ায় তো শুধু ভাঙ্গা আর গড়া।

এখনকার সংসারে মাটির পিদিম আর মাছ চচ্চড়ির কড়াই এর প্রবেশাধিকার নেই। ঘর সাজানোর সরা হাড়ি পাওয়া যায় বৈশাখী মেলায়।

কে জানে, নিবারণের বাপ কোথায় গেছে, কেমন আছে লক্ষ্মী আর নিবারণ।
হারিয়ে গেছে হাড়ি কলসি তৈরির পেশা।