হারানো পেশা-১ ॥ সোনালী ইসলাম

ঠিক দুপ্পুর বেলা, সাত ছাতারে পাখিরা যখন খ্যাচম্যাচ করছে আর গাছের ডালে বসে ঘুঘু পাখি মন কেমন করা সুরে ডাকছে ঘুউউউ ঘুউউউ ঠিক তেমন সময়ে দূর থেকে সুর ভেসে আসতো
… কুয়োর বালতি তুলাই… কুয়োর বালতি তুলাই….
নানীর পান খাওয়া ভাত ঘুমে চোখটা মাত্রই লেগে এসেছে, কিন্তু ওই সুরে উঠে বসে বলতেন
… সুনু ডাকতো ছোঁড়াকে
নানীর কাছে ছোঁড়া হলেও আমার কাছে দিব্বি একটা লোক। শুকনো দড়ি পাকানো চেহারা, গাল চুপসানো আর পেট গর্তে ঢোকা লোকটার বয়স আন্দাজ করতে পারতাম না। ছেঁড়া গেঞ্জির ফাঁক দিয়ে দেখা যেতো পাঁজরের হাড়।
লোকটার হাতে প্যাঁচানো লম্বা রশি আর একগোছা ছোট বড় বড়শি। একহাঁটু ধুলো পায়ে এসে দাঁড়াতো উঠোনের কোনে। বলত
… চাচী, ডাকিছেন নাকি!
… হ্যাঁরে বাবা দেখ দিনি বালতিটা আবার পড়িছে কুয়োতে…
… তা তো পড়বেই, না পড়লি আমরা কি করে খাব কন দিনি।
বলেই পাতকুয়োর পাড়ে চলে যেতো লোকটা।
হাতের গুটানো বড়শি বাঁধা দড়ি খুলে ঝুল দিয়ে ফেলতো কুয়োর পানিতে। ঝপাৎ…।
তারপর দড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বড়শিতে আটকাতো পড়ে যাওয়া বালতি, ঘটি, পিতলের চামচ আরও কত কি। চামচ দেখে নানী খুব অবাক হয়ে বলতেন
… ও মা! আমি তো ভাবিলাম ইডারে চোরে নেছে।
… না গো চাচী, আপনার ঘরে চোর ঢোকবে কেমন করে, পাপের কামাই নাই যে।
নানী বিছানার তোষকের তলা থেকে একটা আধুলি এনে দিতেন লোকটার হাতে আর কাজের মেয়েটাকে বলতেন, কুলসুম, ওরে খাতি দে।
বলে নানী আবার ফিরে যেতেন ভাত ঘুমে।
লোকটা বালতি দড়িতে শক্ত করে বেঁধে পানি তুলত ঝপাঝপ, তারপর হাত পা মুখ ধুয়ে বাবু হয়ে বসতো কুয়োর চাতালে।
কুলসুম খুব বিরক্তি দেখিয়ে কলাই করা বড় থালায় একথালা ভাত, ডাল আর সবজীর তরকারি এনে দিতো। কিন্তু মাছ বা মাংস থাকলেও দিতো না।
লোকটা খাবার সময় কুলসুম দাঁড়িয়ে থাকতো, লোকটা বলতো, একখান মরিচ দিবা।
… ইস্ সি রে, রঙ কতো!
বলেও, দুটো মরিচ আর একফালি পেঁয়াজ এনে দিতো।
খাওয়া শেষে লোকটা একঘটি পানি খেয়ে আমাকেই একটা সালাম দিয়ে চলে যেতো।
সুর ভাসতো
… কুয়োর বালতি তোলাই…
নাম না জানা লোকটার পেশা হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে লোকটাও… পাতকুয়ো আর নেই যে!