হারানো পেশা-২ ॥ সোনালী ইসলাম


মাসের পয়লা দিনেই সদরের দরজায় ঠেলা গাড়িটা এসে দাঁড়াতো। লোকটার নাম মনে নেই। সালাম কিংবা কসিরউদ্দিন হয়তো।
এসেই হাঁক পাড়তো
… অ চাচি, কাঠ আনিলাম… নামায় থোব।
নানি আঁচলে হলুদ মাখা হাত মুছতে মুছতে বলতেন,
… ওরে হতচ্ছাড়া, ঘোড়ায় কি জিন লাগায়ে আইছ! থাম, আগে কাঠ দেইখে নিই… গতমাসে কি যে ছাই ছাতাড়ে দিয়ে গিইলে।
তারপর গাড়ির দিকে তাকিয়েই নানির মেজাজ আর গলা সপ্তমে উঠে গেলো।
… ও রে ও অনামুখো! তোরে না তেঁতুল কাঠ আনতি কইলাম, এই আম কাঠের পাঁজা দিয়ে আমি কি করবানে। এইতে তো আমার মাস যাবে না নে, আম কাঠ ফসফসায়ে জ্বলে। এতি কি রেইন্দে পুষায়। তোগো কাছ থে আর কাঠ নিয়া যাবে না দেখতিছি।
… অ চাচি, সবগুলো আম কাঠ না, গরান আর সুন্দরী কাঠও আছে। কি করব কন, তেঁতুল গাছ আর তেমন পাওয়া যায় না যে। এট্টা তেঁতুল গাছ বড় হতি কদ্দিন লাগে নিজেই বুইঝে কন।
নানি মোটেই খুশী হলেন না। এবারে আলমারি খুলে দুটো পাঁচ টাকা আর তিনটে একটাকার নোট দিলেন লোকটার হাতে।
…অ চাচি, আর দুটো টাকা দেবেননা, ঠকা হয়ে যাবেনে।
… আম কাঠের গাড়ির দাম পনের টাকা চাচ্ছ কোন মুখি। জ্বালায়ে না তো, কাঠ নামায়ে থুয়ে যাও, আর কালকে মনসুররে পাঠায়ে দিবা।
লোকটা গাড়ি থেকে দুমদাম করে গুঁড়িগুলোন সামনের মাঠে ফেলে চলে গেলো।
পরদিন সকালে আমার এমন পেটে ব্যথা করতে লাগল যে আর স্কুলে যেতেই পারলাম না। আর বেলা দশটার মধ্যেই মনসুর এসে হাজির হলো তার কুড়োল ঘাড়ে করে।
আর আমি ফ্রক দিয়ে হাঁটু ঢেকে বাইরের বারান্দায় গিয়ে বসেছি। হাঁটু আলগা করে বাইরের বারান্দায় দেখলে নানির পাংখার ডাঁটির বাড়ি কপালে, কিন্তু কাঠ ফাঁড়াই করার মতোন এমন একটা উত্তেজক কাজ কাছে থেকে না দেখে থাকা যায়?
মনসুর মাথায় বাঁধা গামছাটা কষে কোমরে বেঁধে নিলো। তারপর একটা মোটা দেখে গুঁড়ির উপরে অন্য গুঁড়ি রেখে কুড়োল চালালো ধপাদ্ধপ। বাপরে, রোগা মনসুরের শুকনো হাতে কি জোর। এক একটা কোপ মারে আর দুফলা হয়ে যায় কাঠের মোটামোটা গুঁড়িগুলো। চ্যালাকাঠ ছিটকে পড়ে দুপাশে।
আমি তখন ভাবছি… রাশিয়ান বইতে পড়া স্তেপের বরফে কাঠ কাটছে ইভানুশকা। কাঠ স্লেজ গাড়িতে চড়ে যাবে ছোট্ট কুটিরে। ইভানুশকার মা জ্বালাবেন উনুন… ঠান্ডা হাতপা শেকবে ইভানুশকা আর চুমুক দেবে গরম বাঁধাকপির স্যুপে… কি রোমাঞ্চকর সেই কল্পনা।
কাঠ কাটা চলল প্রায় মাঝ দুপুর পর্যন্ত। চারপাশে স্তুপ হয়ে উঠল চ্যালাকাঠ। নানি বারান্দায় এসে দেখে গেলেন কাঠের ফালিগুলো সমান হয়েছে কি না।
মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়ে নানি বলতেন,
… ও মনসুর, হ্যাদায়ে গেছিস বাপ, মুখ হাত ধুয়ে খেইয়ে নে আগে।
মনসুর গামছা মাথা থেকে খুলে কুয়োর পাড়ে গিয়ে হাত মুখ পা ডলে ধুয়ে বারান্দায় বসত। নানি নিজেই ভাতের থালা আর তরকারির বাটি এনে দিতেন। কুলসুম আনত একটা পিরিচে নুন কাঁচামরিচ আর দুই ফালি পেঁয়াজ।
খুব যত্ন করে গুছিয়ে খেতো মনসুর। ডালের বাটি তরকারির বাটি থেকে ডাল ঝোল আঙুল দিয়ে মুছে নিতো। থালায় এককুচি ভাতও ফেলে রাখত না। সারাদিনের পরিশ্রম।
তারপর সে কাঠ গুছিয়ে পাঁজা করে রাখত। একটার পরে একটা কাঠ সাজিয়ে চৌখুপি ঘরের মতোন সেই পাঁজা, যাতে সারাদিনের রোদ লেগে শুকিয়ে ওঠে ভিজে রসালো কাঠগুলো। সারামাস নানি রান্না করবেন এই কাঠ দিয়ে।
কাঠ সাজিয়ে মনসুর ডাক দিতো,
… ও চাচি, দেখেন এইসে।
নানি মনসুরকে দুইটা টাকা দিতেন। ঝকঝকে একতা হাসি দিতো সে। চাল ডাল আর মাছও কিনতে পারবে। চালের সের তখন দুই আনা।