হারানো পেশা-৩ ॥ সোনালী ইসলাম


আমার নানীর জীবনে দুইটা শখ ছিলো, সেই আমলে এটাকে প্যাশনও বলা যেতে পারে, তা হলো… পামোলিভ সাবান আর পন্ডস ক্রিম। এই দুটো জিনিসে অন্য কেউ হাত দিতে পারতো না। নানা যতদিন জীবিত ছিলেন নানীর জন্য পামোলিভ সাবান বাড়িতে আসতোই। আর বাকি সবার জন্য মান অনুযায়ী লাইফবয় বা তিব্বত সাবান।
কাপড়কাঁচার জন্য বল সাবান আর সোডা।

সারাদিনের সাংসারিক কাজ সেরে নানী তার পামোলিভ সাবান নিয়ে পুকুর ঘাটে গোছল করতে যেতেন, ঘাটে বসে হাত পা ডলে তবে পুকুরে নামবেন এরই মধ্যে ধাঁ করে সাবান উড়ে চলে গেল। হেই হেই…. ধর ধর, …. ছেই ছেই… কতো রকম চেঁচামেচি হলো কিন্তু উত্তরে শুধু শোনা গেল…
‌‍কঃ কঃ
নানী গালাগালি শুরু করলেন,
…. ওরে ও পোড়ারমুখো হারামজাদা সাবান দিয়ে তুই কি করবি? ওতো খাবার জিনিস না। গায়ে মাখলি কি তুই ফরসা হবিএনে?
বোঝা গেল যে, নানীবাড়ির রান্নাঘরের পিছনে যে বোম্বাই আম গাছে দাঁড়কাক দম্পতি বাসা বেঁধে আছে সেই পোড়ারমুখোরই এমন হতচ্ছাড়া মার্কা কাজ।

তা অবশ্য ঠিক, গত দুই বছর ধরে এই দাঁড়কাক দম্পতি গাছে বাসা বেঁধেছেন আর নানান ধরনের অত্যাচার চালাচ্ছেন।
মাছ কুটে উঠোনে রাখার উপায় নেই। মোয়া বা নাড়ু বারান্দায় বসে খেতে গেলেও ছোঁ মারে। ছোট বাচ্চাকাচ্ছা বাড়িতে বেড়াতে এলে সামলে রাখতে হয়। নতুবা তাদের হাতের খেলনা বা ঝুমঝুমি হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে।
এ বছর তো গাছে চড়ে আমই পাড়া গেলো না। নানী পাড়ার একটা ছেলেকে বলেছিলেন আম পেড়ে দিতে, তো সে গাছের অর্ধেক উঠে পারে নি… কঃকঃ করে তেড়ে এসে ঠোকর মেরেছে। পাকা আম নিচে যেকটা পড়েছিলো তাও কাকের ঠোকরে ফুটো হওয়া।

আমার নানা বড়ই নির্ভেজাল মানুষ। আজীবন অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, জীবনে কখনো পামোলিভ এর বদলে কসকো বা লাক্স সাবান কেনেননি। তিনি আস্ত একটা কাক দম্পত্তির বাড়িকে কি করবেন বুঝে উঠতে পারতেন না। ফলে, কাকেদের দৌরাত্ম বেড়েই চলেছিলো।
নানীর ভাইঝি পাপিয়া বেড়াতে এসে বারান্দায় বসে পায়ে নুপুর পরছিলেন। নানীই খাঁটি রূপো দিয়ে স্যাকরার কাছ থেকে গড়িয়ে এনেছেন। আদরের ভাইঝি বলে কথা….! একপায়ে মাত্র নুপুর পরে পাপিয়া খালা আমাকে বলেছেন মাত্র, … দেখোতো সুনু কেমন দেখাচ্ছে?
আমি কিছু বলে ওঠার আগেই “ঝপাৎ”। কাক ঠোঁটে বাধিয়ে দ্বিতীয় নুপুর নিয়ে গাছের মগডালে।

নানীর পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হলো না। তিনি নানাকে আলটিমেটাম দিলেন কাকের বাসা ভাঙার ব্যবস্থা করতে হবে।
নানা বিমর্ষ মুখে ডোমপাড়ায় চললেন। এসব কাজ একমাত্র ডাকাবুকো লোকেরাই পারে।
পরদিন সকাল সকাল দুজন লোক চলে এলো। হাতে বাঁশের লাঠির সাথে আংটা বাঁধা আর ঘাড়ে গামছা আর চাদর। আমাদের সবাইকে ঘরে ঢুকে যেতে বলা হলো কিন্তু আমি জানালার পৈঠাতে উঠে দাঁড়িয়ে আছি।
লোকদুটো চাদর ঘাড়ে মাথায় পেঁচিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে নিলো। কোমরে গুঁজে নিলো একটা করে কাটারি। শুধু চোখ দুটো একটুখানি দেখা যাচ্ছিলো। তারপরে তরতর করে উঠে গেলো গাছে।

কাকেরা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলো। প্রথমে খুব ডাকাডাকি চেঁচামেচি ঠোকর দিতে চেষ্টা করলো। তারপরে উড়ে গিয়ে পাশের কাঁঠাল গাছের ডালে বসে রইল। বাসাটা গাছের ডালের থেকে কাটারি দিয়ে কেটে নামিয়ে আনল।
কি না বেরুলো সেই বাসা থেকে। তার, শিক, নানীর খুন্তি, চায়ের চামচ, বাচ্চাদের ঝুমঝুমি, সাত আট টুকরো সাবান। পাতা ছেঁড়া ইংরেজি বই, আমার চুলের ফিতে, নানার জুতোর ফিতে, একখানা মাফলার আর পাপিয়া খালার পায়ের নুপুর।

নানা দাঁড় কাকের বাসা ভাঙার দাম ঠিক করে এনেছিলেন। নানি দাম দিলেন আর মোয়া দিলেন খেতে। বললেন, … যাক বাবা, আপদ গেলো। তোমরা খুব উপকার করলে বাবা।
… কি যে কন চাচি, ইডাই তো আমাগো পেশা। আবার বাসা বান্ধলি ডেইকেন নে। আসি ভাঙি দেব।
নানা বিমর্ষ হয়ে রইলেন, আমি আর পাপিয়া খালা প্রায় কেঁদেই ফেললাম।
কাকের বাসার ঠিক মাঝখানে চারটে নীলচে ডিম ছিল যে…